দ্বিতীয় অধ্যায়
ছায়া পূর্বগামিনী
তিন
দাক্ষিণাত্যে পলায়িত খুররমের কোনও সন্ধান না পাইয়া বিজয়ী মহাবত খাঁ এবং শাহজাদা পরবেজ শত্রুর গন্তব্যস্থল সম্বন্ধে যখন জল্পনা-কল্পনা করিতেছিলেন, সেই সময় জরুরি ফরমান মারফত তাঁহারা অবগত হইলেন “বে-দৌলত” মশরিকী তিন সুবার উপর কব্জা করিয়া সুবা এলাহাবাদের জৌনপুর শহরে [শাহজাদা খুররম ১০৩৩ হিঃ অর্থাৎ ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দের প্রথমভাগে জৌনপুরে ছিলেন (Vide Amal-i-Salih Text p. 187)] ডেরা করিয়া আছে। খুররমকে পরাজিত এবং বৃদ্ধ খান-ই-খানান আবদুর রহিমকে গ্রেপ্তার করিয়া মহাবত খাঁ খান-ই-খানান খেতাব এবং শাহজাদা পরবেজ চল্লিশ-হাজারী মনসব পাইয়াছিলেন। তাঁহারা নূতন উদ্যমে চল্লিশ হাজার সেনাসহ দিনরাত কুচ করিয়া বিদ্রোহপর্ব সমাপ্ত করিতে চলিলেন। এই সংবাদ পাইয়া খুররম জৌনপুর হইতে পশ্চাদপসরণ করিয়া বিহারপ্রান্তে সৈন্য সংস্থাপন করিলেন। টৌস বা তমসাতীরে ব্যূহবদ্ধ হইয়া উভয় পক্ষ আক্রমণের সুযোগ প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে গতিক ভালো নয় দেখিয়া অনতিদূরে গঙ্গাবক্ষ হইতে শাহজাদার বাঙালি “নৌবারা” (জঙ্গী নৌকার বহর) অকস্মাৎ অদৃশ্য হইয়া গেল; কিন্তু যুদ্ধ না করিয়া খুররমের পলায়নের উপায় নাই। খুর্রমের সৈন্যসংখ্যা অল্প হইলেও সেনানায়কগণ সকলেই তাঁহার জীবন-মরণের সঙ্গী, রণনিপুণ এবং অসমসাহসিক যোদ্ধা। আক্রমণ আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় স্থির করিয়া তিনি মহাবত খাঁর উপর হামলা করিলেন। রাজা ভীম শিশোদিয়া এবং শের খাঁর নেতৃত্বে তাঁহার অগ্রগামী সেনা বাদশাহী তোপখানা দখল করিয়া প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবেগে শত্রুব্যূহের কেন্দ্রস্থলে শাহজাদা পরবেজকে আক্রমণ করিল, বাদশাহী ফৌজে হাহাকার পড়িয়া গেল। শাহী ফৌজের বামভাগে নদীর পারে কিছু দূরে ছিলেন যোধপুরপতি গজসিংহ। বিদ্রোহী খুররম যোধপুরের দৌহিত্র; কিন্তু এক বৎসর পূর্বে শাহজাদা পরবেজ গজসিংহের কন্যাকে বিবাহ করিয়াছেন; এই দোটানা স্রোতে পড়িয়া চিন্তা করিতে করিতে তাঁহার প্রস্রাবের বেগ হইল। গজসিংহ পায়জামার ডোরী সবেমাত্র খুলিয়াছেন, এমন সময়ে কুম্পাবৎ গোবর্ধনদাস রাঠোর ঘর্মাক্ত দেহে তথায় পৌঁছিয়া কড়াসুরে বলিল, “মহারাজ! সব ভাসিয়া গেল, এখন আপনার লঘুসংখ্যা করিবার সময়?” [গৌরীশঙ্কর ওঝাকৃত হিন্দি রাজপুতানেকা ইতিহাস, ৩য় খণ্ড ৮২৬ পৃ.] যোধপুররাজ কার্যটি না সারিয়াই নিতান্ত সপ্রতিভভাবে পায়জামা কষিয়া বলিলেন, “আমি দেখিতেছিলাম খবর দেওয়ার জন্য কোন রাজপুত অবশিষ্ট আছে নাকি?” মহাবত খাঁ বিচক্ষণ সেনাপতি, তিনি রাজা ভীম ও শের খাঁর গতিরোধ করিবার জন্য জটাজুট [Khafi Khan, Muntakhab-ul labab] নামক পাগলা জঙ্গী হাতি ছাড়িয়া দিলেন; এবং এই অবসরে তাঁহার সেনাবাহিনী পুনরায় ব্যূহবদ্ধ হইল। এইবার আবদুল্লা খাঁ খুররমের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া পলায়ন করিল। মহাবত খাঁর সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে রাজা ভীম শস্ত্রপূত হইয়া বীরগতি লাভ করিলেন। দ্বিতীয়বার বিদ্রোহী খুর্রমের প্রায় সুনিশ্চিত জয়-পরাজয় ও পলায়নে পর্যবসিত হইল।
তমসার জলে খুররমের ক্ষীণ আশা ভাসিয়া গেল। যে পথে আসিয়াছিলেন, আবার সেই পথে স্ত্রী-পুত্র ও হতাবশিষ্ট অনুচরবর্গের সহিত শাহজাদা “বে-দৌলত” দাক্ষিণাত্যে পলায়ন করিলেন। মহাবত খাঁ এবং পরবেজ অন্যপথে আবার দাক্ষিণাত্যে উপস্থিত হইলেন। দুর্ভাগ্যের পুনঃ পুনঃ আঘাতে খুর্রমের অকাল স্বপ্ন ভাঙিয়া গেল; স্ত্রী-পুত্রসহ হতপ্রভ জ্যোতিষ্কের ন্যায় তিনি মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরে দিনযাপন করিতে লাগিলেন গর্বিত খুররম পিতার ক্ষমা এবং নূরজাহানের করুণা ভিক্ষা করিয়া দরবারে দূত প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাঁহার উপর হুকুম হইল, জামিন-স্বরূপ কুমার দারা এবং আওরঙ্গজেবকে অগ্রে দরবারে প্রেরণ করিয়া পরে তাঁহাকে স্বয়ং হুজুরে হাজির হইতে হইবে এবং আসীরগড়, রোহতাশ প্রভৃতি যে সমস্ত দুর্গে তাঁহার সৈন্যেরা আত্মরক্ষা করিতেছে তাহাদিগকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিতে হইবে।
দারা ও আওরঙ্গজেব নাসিক হইতে (সোমবার ৩রা জমাদিউস সানী, ১০৩৫ হিঃ) দরবারে যাত্রা করিলেন; দুই লক্ষ টাকার হীরা-জহরত ও অন্যান্য সামগ্রী বাদশাহর হুজুরে পেশকশ দেওয়ার জন্য কুমারদ্বয়ের সহিত প্রেরিত হইল। খুররম পরাজিত হইয়াও বিদ্রোহের দুষ্প্রবৃত্তি ছাড়িতে পারেন নাই। তিনি ইরান-সম্রাট শাহ্ আব্বাসের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া প্রস্তাব করিলেন, তাঁহার সাহায্য পাইলে তিনি সফরী-বংশকে হিন্দুস্থানের বাদশাহী নজর করিতে পারেন। সন্ধির দ্বিতীয় শর্ত, অর্থাৎ দরবারে উপস্থিতির আদেশ পালনে তিনি নানা অছিলায় বিলম্ব করিতে লাগিলেন। ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রের ন্যায় হিন্দুস্থানের রাজনীতি রঙ্গমঞ্চে দৃশ্যপট সহসা তাঁহার অনুকূলে পরিবর্তিত হইল।
চার
সম্রাজ্ঞী নূরজাহান খুর্রমের আচরণে ঠেকিয়া শিখিয়াছিলেন কাহাকেও অতি বাড় বাড়িতে দিলেই বিপদ। খুররমকে দমন করিবার জন্য প্রয়োজন ছিল মহাবত খাঁর মতো ভীমকর্মা সুদক্ষ সেনাপতির; সুতরাং কাজ হাসিল হওয়ার পর হাতিয়ার কেন করিয়া ভাঙিবেন নূরজাহান সেই চিন্তায় উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন। কিন্তু খান-ই-খানান মহাবত খাঁ তখন মোগল সাম্রাজ্যের স্তম্ভস্বরূপ (রুকনউল-সুলতানত) এবং জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় পুত্র, দিল্লির মসনদের ন্যায্য উত্তরাধিকারী পরবেজের আতালিক। সাম্রাজ্যের শান্তি, স্বার্থ এবং উত্তরাধিকারিত্বে ন্যায়বিচার যদি নূরজাহান বেগমের কাম্য হইত, যদি জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর স্বীয় প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখিবার মতো নিতান্ত সংকীর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থ তাঁহার রাজনীতিকে বিপথগামী না করিত, তাহা হইলে তিনি পুনরায় পরবেজ এবং মহাবত খাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করিতেন না। সম্রাটের দাসীগর্ভজাত কনিষ্ঠ পুত্র অকর্মণ্য শারিয়ারের সহিত নূরজাহান বেগম শের আফগানের ঔরসজাতা কন্যা লাডলী বেগমের বিবাহ দিয়াছিলেন। সম্রাজ্ঞী মনে করিতেন শাহজাদাগণের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা দিল্লির মসনদ তাহাকেই তিনি দিতে পারেন। নিতান্ত বিপদে পড়িয়া তিনি খসরুর পুত্র দাওয়ার বকশ্ এবং পরবেজকে দাবা খেলার ঘুঁটির ন্যায় আগে বাড়াইয়া খুর্রমের বাজিমাত করিয়াছিলেন। মহাবত খাঁর বাহুবলে পরবেজ নূরজাহানের শিখণ্ডী শারিয়ার এবং আসফ খাঁর জামাতা খুররমকে ডিঙাইয়া পাছে সিংহাসন অধিকার করে, এই আশঙ্কায় ভ্রাতা-ভগ্নী পূর্ব বিরোধ চাপা দিয়া একযোগে কার্য আরম্ভ করিলেন। আলা হজরত সাম্রাজ্যে সাংখ্যের পুরুষ, তাঁহাদের হাতে কলের পুতুল। মহাবত এবং পরবেজকে পরস্পর দূরে সরাইয়া একে একে দুই জনকে দমন করিবার অভিপ্রায়ে পরবেজকে দাক্ষিণাত্যে বহাল রাখিয়া মহাবত খাঁকে সরাসরি বাংলায় বদলি করা হইল, এবং মহাবত খাঁর স্থানে খানজাহান লোদী শাহজাদা পরবেজের আতালিক বা অভিভাবক নিযুক্ত হইলেন—ইনি আসফ খাঁর চর এবং নজরবন্দী শাহজাদার ‘কারারক্ষক’। মহাবত খাঁ কূটনীতির মারপ্যাঁচ কিছু কম বুঝিতেন; সুতরাং তিনি অসন্দিগ্ধ চিত্তে বাংলায় চলিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে পৌঁছিতে-না-পৌঁছিতেই দরবারে তাঁহার ডাক পড়িল, অধিকন্তু তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ হইল বহু লক্ষ টাকা তিনি সরকারি তহবিল হইতে তছরূপ করিয়াছেন; শাহানশাহ্র হুকুম, তাঁহাকে হিসাব বুঝাইয়া দেওয়ার জন্য লাহোরে হাজির হইতে হইবে। বাদশাহী আমলে কোনও আমীরকে বেকায়দায় ফেলিয়া অপমানিত ও অপদস্থ করিবার প্রয়োজন হইলেই কড়াক্রান্তি হিসাব দাখিল করিবার হুকুম হইত; কারণ যাঁহারা সেকালে দস্তুরমতো আমীর, তাঁহারা কোনোদিনই হিসাব রাখিতেন না, দিতেও পারিতেন না- এই সমস্ত বাজে কাজ করিত কায়স্থ দেওয়ানজী। মহাবত খাঁ ব্যাপার বুঝিতে পারিয়া কাগজপত্র কিছু সঙ্গে লইলেন না; তাঁহার সঙ্গে চলিল বাছা বাছা পাঁচ হাজার রাজপুত সিপাহী, সেকালের গুর্খা; হুকুম পাইলে “পিতরমপি ন জানামি”। মহাবত কোমর কষিয়া লাহোরে হাজির হইলেন; দরবারে হিসাবের কথা চাপা পড়িয়া গেল।
নূরজাহান বেগম বুঝিতে পারিলেন সিন্ধুনদের এই পারে খান-ই-খানান মহাবত খাঁর সহিত হিসাব-নিকাশ নিরাপদ নয়। কিন্তু ঝিলম নদী পার না হইতেই সম্রাট জাহাঙ্গীর মহাবত খাঁর হস্তে বন্দী হইলেন। নূরজাহান এবং আসফ খাঁ সম্রাটকে উদ্ধার করিতে অসমর্থ হইয়া তাঁহার সহিত বন্দীদশা স্বীকার করিলেন। মহাবত খাঁর কোনও মন্দ অভিপ্রায় ছিল না; সম্রাটের ইচ্ছা অনুসারে তিনি নিতান্ত বিশ্বস্তচিত্তে আটক অতিক্রম করিয়া কাবুল চলিলেন। ইতিমধ্যে নূরজাহান নিশ্চেষ্ট ছিলেন না, তাঁহার প্রেরিত চরগণ মোটা বেতনে উপজাতীয় পাঠান সিপাহী ভর্তি করিয়া গোপনে রাস্তায় অপেক্ষা করিতেছিল। একদিন পেশাওয়ারের নিকট মহাবত খাঁর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটিল। মহাবত খাঁ হতাবশিষ্ট তিন হাজার ফৌজ সঙ্গে লইয়া দিল্লি অভিমুখে পলায়ন করিলেন, পশ্চাতে নূরজাহান বেগম লাহোর পর্যন্ত তাঁহাকে দম ফেলিবার অবকাশ দিলেন না। এইবার মহাবত খাঁকে দমন করিবার জন্য সপ্ততিপর মুমূর্ষু বৃদ্ধ আব্দুর রহিমের ডাক পড়িল। খুররমের সহিত বিদ্রোহে শরিক হওয়ার অপরাধে মনসব এবং খান্-ই-খানান উপাধি হারাইয়া এই সময়ে আব্দুর রহিম হুমায়ু-মকবরার মুখোমুখি নিজের সমাধি নির্মাণ করিতেছিলেন। নির্বাণোন্মুখ আশা-প্রদীপের শেষ শিখায় বিভ্রান্ত হইয়া সুকবি আব্দুর রহিম একটি ফার্সি কবিতা রচনা করিয়া দিল্লীশ্বরকে ধন্যবাদ প্রদান করিলেন।
“মারা লুতফে জাঁহাগীরি জে তাইদাতে রব্বাণী।
দো বারঃ জিন্দগী দাদঃ দো বারঃ খানখানানী ॥”
(অর্থাৎ খোদার রেজামন্দী ও জাহাঙ্গীর বাদশাহর মেহেরবাণী আমাকে দ্বিতীয়বার জিন্দগী (জীবন) এবং দুই-দুইবার খানখানানী বকশিশ করিয়াছে।)
যাহা হউক, আখেরী লড়াই ফতে করিবার জন্য কোমরবন্দ কষিতেই খান্-ই-খানান আব্দুর রহিমের প্রাণবায়ু বহির্গত হইল। মহাবত খাঁ মিবারের পথে পলায়ন করিয়া নাসিক শহরে বিদ্রোহী শাহজাদা খুররমের সহিত মিলিত হইলেন (সেপ্টেম্বর, ১৬২৭ খ্রিঃ)। [আমল-ই-সালেহ মূল পৃ. ২০১।] এইবার জাহাঙ্গীর রাজত্বের শেষ দৃশ্য এবং শাহজাহানের রাজত্ব তথা দারাশুকোর জীবন-নাট্যের প্রথম অঙ্ক। (চলবে)