চতুর্দশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়
তিন
মোগল সাম্রাজ্যে তখন প্রলয়ের ঝড়ের পূর্বে তমোময়ী প্রকৃতির অশুভ নিস্তব্ধতা। প্রজাদের দীর্ঘকালের বিষাদ ও আশঙ্কা ঘনীভূত হইয়া মহামেঘের মতো হিন্দুস্থানের বুকে নামিয়া আসিতেছে, সুদূর পূর্ব এবং পশ্চিম দিশার কোলে বিদ্রোহের যুগপৎ বিদ্যুৎচমক। সম্রাট শাহজাহানের করধৃত রাজদণ্ড জরা এবং শোকে কম্পমান, যৌবনের বজ্রমুষ্টি শিথিল, সতেজ চিন্তাধারার গতি মন্থর হইয়া পড়িয়াছে; উপস্থিত উভয়সঙ্কটে তাঁহার বুদ্ধি মলিনীভূত, নীতি অন্ধস্নেহ ও আত্মরক্ষার চিন্তার সংঘাতে দোদুল্যমান। অথচ বিপন্ন দিল্লি সিংহাসনের তিনিই অধীশ্বর, পুত্রগণ সকলেই মমতাজের মাতৃহারা সন্তান, শুক্তির স্নেহগর্ভে কর্কটাণ্ডজ জন্মগ্রহণ করিতে পারে না।
১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে আগ্রায় সংবাদ পৌঁছিল শাহজাদা শুজা রাজমহলে সাড়ম্বরে সিংহাসনে আরোহণ করিয়া, সম্রাট আবুলফৌজ নাসিরউদ্দীন মহম্মদ তৃতীয় তৈমুর, দ্বিতীয় সিকেন্দর শাহ শুজা গাজী উপাধি ধারণ করিয়াছেন। তাঁহার বিরাট সৈন্যবাহিনী এবং বাঙলার রণতরী বহর মুঙ্গের দুর্গে উপস্থিত, সুবা বিহার দারার হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে। গুজরাট হইতে সংবাদ পাওয়া গেল, শাহজাদা মোরাদ সম্রাটের প্রেরিত উপদেষ্টা নির্দোষ আলী নকীকে হত্যা করিয়া নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করিয়াছেন (৫ই ডিসেম্বর, ১৬৫৭) এবং সুরাট বন্দর অধিকার করিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করিয়াছেন। দাক্ষিণাত্য হইতে সংবাদ দরবারে পৌঁছিবার পথ আওরঙ্গজেব দুই মাস পূর্বেই বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন, নর্মদা নদীর সমস্ত ঘাটে কড়া পাহারা। অসহিষ্ণু মোরাদকে তাড়াহুড়া না করিবার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়াছিলেন। এবং নিজেও হাতের তাস ফেলেন নাই।
বিদ্রোহী ভ্রাতাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য দারা উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন; কিন্তু তাঁহাদিগকে বাধা দিবার মতো উপযুক্ত সৈন্যবল নাই। দাক্ষিণাত্যে প্রেরিত বাদশাহী ফৌজের রাজপুত মনসবদারগণ এবং সেনানী মহাবত খাঁ হিন্দুস্থানে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন; অন্যান্য মুসলমান মনসবদারগণকে আওরঙ্গজেব নিজের দলে ভিড়াইয়া লইয়াছিলেন। গুজরাট সুবা তখন “লস্কর-খেজ” বা যোদ্ধাবহুল দেশ বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল, মোরাদ ওইখান হইতে বহু অশ্বারোহী সৈন্য সংগ্রহ করিলেন। আওরঙ্গজেবের তোপখানা শাহী তোপখানা হইতেও অধিক শক্তিশালী ছিল। তিনি নানা দেশীয় ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ তোপখানায় ভর্তি করিয়াছিলেন। আওরঙ্গজেব ও মোরাদ শুধু পিতৃদ্রোহী এবং ভ্রাতৃদ্বেষী নহেন; তাঁহারা মোগলের প্রবল শত্রু ইরানের দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের হাতে হিন্দুস্থান তুলিয়া দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। বস্তুত তাঁহারা শাহ-আব্বাসকে এই সুযোগে দারার অধীনস্থ কাবুল সুবা অধিকার করিবার জন্য পত্র লিখিয়াছিলেন। সম্রাট শাহজাহান বিশ্বস্ত সেনাপতি মহাবত খাঁকে কাবুল সুবার নায়েব সুবাদার হিসাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার ভার দিলেন; কিন্তু পুত্র তিনজনের বিরুদ্ধে সৈন্যপ্রেরণ করিতে ইতস্তত করিতে লাগিলেন। সম্রাট তখনও আশা করিতেছিলেন, বাদশাহী ফরমান দ্বারা তিনি গোলমাল মিটাইয়া ফেলিতে পারিবেন; ইহার কিছু কারণও ছিল।
বিহার অধিকার করিয়া সুচতুর শাহশুজা পিতার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করিয়া লিখিলেন, অনেকদিন হইতে তিনি সুবা বিহার তাঁহার কাছে ইনাম চাহিতেছেন, “দাদাভাই’ উক্ত সুবা ইনায়ৎ করিলে আর কিছু অভিযোগ থাকিবে না। সম্রাট গলিয়া জল হইয়া গেলেন; অগত্যা শাহজাদা দারা দুইটি শর্তে সুজাকে বিহার সুবা ছাড়িয়া দিতে রাজি হইলেন; প্রথম শর্ত মুঙ্গের দুর্গের নূতন রক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করিয়া ফেলিতে হইবে; দ্বিতীয়ত শুজা কিংবা তাঁহার পুত্রপরিজন দুর্গে বাস করিতে পারিবে না। এই মর্মে সম্রাটের আদেশ পাইয়া শুজা ভাবিলেন, দারা যুদ্ধে ভয় পাইয়াছেন; মুঙ্গের হইতে আর কিছু আগাইয়া বেনারস দখল করিতে পারিলে এলাহাবাদ অযোধ্যা “ফাউ” পাওয়া যাইতেও পারে। তিনি সময়ক্ষেপ করিবার জন্য সম্রাটের কাছে উত্তর লিখিতে বিলম্ব করিলেন। বিজাপুরের সহিত বুঝাপড়া এবং দাক্ষিণাত্যের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ করিবার জন্য আওরঙ্গজেবেরও কিঞ্চিৎ সময়ের প্রয়োজন ছিল। জাহানারার কাছে তিনি লিখিলেন, পিতা জীবিত আছেন শুনিয়া সুখী হইয়াছেন; কিন্তু শুনা যায় বৃদ্ধ বয়সে তিনি শাহাজাদা দারার হস্তে বন্দী; তাঁহার দুঃখকষ্টের সীমা নাই। সম্রাট মনে করিলেন ইহা সুলক্ষণ।
চার
দরবারে উপস্থিত সেনানীমণ্ডলের মধ্যে দারার মিত্র অপেক্ষা গুপ্ত শত্রুই ছিল বেশি। শাহজাহান তাঁহার শ্বশুর ইতমাউদ্দৌলার প্রাসাদ এবং বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির এক অংশ শাহজাদা দারাকে দিয়াছিলেন। এইজন্য রাজশ্যালক শায়েস্তা খাঁ প্রথম হইতে সম্রাট এবং তাঁহার প্রিয় পুত্রের উপর ইহার শোধ লইবার জন্য আওরঙ্গজেবের পক্ষ লইয়াছিলেন। দাক্ষিণাত্য এবং গুজরাটের সংযোগস্থল সুবা মালবা এই সময়ে মাতুল শায়েস্তা খাঁর হাতে নিরাপদ নহে মনে করিয়া, দারার অনুরোধে সম্রাট তাঁহাকে দরবারে তলব করিয়াছিলেন। শাহজাদা দারা মেসো খলিলউল্লা খাঁ এবং জাফর খাঁর কোনও অনিষ্ট করেন নাই; কিন্তু শাহানশাহের ভায়রাভাই হইয়াও তাঁহারা সুখী ছিলেন না। সম্রাটের শ্যালিকাদ্বয়ের শাহী মেজাজ, উহার উপর বাদশাহী আশকারা মস্কারা [*মানুচী লিখিয়াছেন, লোকে কানাঘুষা করিত এবং বেয়াদব ফকিরেরা নাকি বলিত – শ্যালিকাদের একজন বাদশাহী “ছোট হাজারী”, অন্যজন দুপুরের “বড় নাস্তা”। সত্যমিথ্যা খোদাতালাই জানেন, “দুর্জনের হাত হইতে কাহারও রেহাই নাই।]; সম্রাটের প্রতি সন্দেহ ও আক্রোশ অন্য কোনও পথ না পাইয়া তাঁহার প্রিয়তম পুত্রের প্রতি হয়তো অহেতুকী ঈর্ষার খাতে প্রবাহিত হইয়াছিল। বাদশাহী তোপখানা বিভাগের অধ্যক্ষ “মীর আতস” কাসিম খাঁ বকধার্মিক দরবারী; তাঁহার ভয় ছিল শাহজাদা দারা বাদশাহ হইলে শাহজাদার তোপখানার মীর আতস অপদার্থ জাফর তাঁহাকে ডিঙাইয়া যাইবে; এইজন্য তিনি আওরঙ্গজেবের জয় কামনা করিতেন। প্রবীণ সেনাধ্যক্ষ রুস্তম খাঁ বাহাদুর দলাদলির মধ্যে ছিলেন না, ভালোমন্দ সম্রাটের উপর ছাড়িয়া দিয়া হুকুম তামিল করিবার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। দারা তাঁহার সদ্গুণের শ্রদ্ধা করিতেন, তাঁহাকে বিশ্বাস করিতেন।
শাহজাদা আজীবন হিন্দুর উপকার ব্যতীত কোনও অনিষ্ট করেন নাই, শাহী দরবারে আকবরের মৃত্যুর পর হইতে স্তিমিত রাজপুত গৌরব তাঁহারই সহৃদয়তা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় শাহজাহানের রাজত্বের শেষভাগে শেষবারের মতো জ্বলিয়া উঠিয়াছিল। দারার প্রধান ভরসা ছিলেন সাম্রাজ্যের রাজপুত সামস্তগোষ্ঠী। রাঠোরকুল সম্রাট শাহজাহানের মাতুলবংশ, কচ্ছবাহগণ আকবরশাহী আমল হইতে শাহী পরিবারের সহিত বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ; ইঁহারাই ছিলেন দরবারে হিন্দুর মুখপাত্র। স্বাতন্ত্র্যাভিমানী শিশোদিয়া কোটা-বুন্দীর ভীমকর্মা হাড়াবংশ, অমিতবিক্রম গোর রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন, রাঠোর-কচ্ছবাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিরপেক্ষ। মহারাণা রাজসিংহ সন্ধি ভঙ্গ করিয়া চিতোর দুর্গের সংস্কারসাধন করিয়াছিলেন। এই অপরাধ এবং অন্যান্য ব্যাপারের জন্য সম্রাট শাহজাহান মেবারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করিয়া ত্রিশ হাজার সৈন্যসহ আওরঙ্গজেবের বন্ধু উজির সাদুল্লা খাঁকে মহারাণার বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছিলেন (১৬৫৪ ইং)। যুদ্ধ করিয়া রাজ্য ও মানরক্ষার জন্য হঠকারিতাবশে মহারাণা চিতোর রক্ষার্থ প্রস্তুত হইলেন; কিন্তু ধর্মোন্মাদনায় প্রতিহিংসাপরায়ণ সাদুল্লা খাঁ ও মুজাহিদগণ (ধর্মযোদ্ধা) আরাবল্লীর পাদদেশস্থ সমগ্র সমতলভূমি দখল করিয়া ছারখার করিল। সম্রাট স্বয়ং আজমীরে উপস্থিত হইলেন। মহারাণার সাহস টুটিয়া গেল। জয়সিংহের কাছে দারার লিখিত পত্রে মহারাণার জন্য দারার দুর্ভাবনা ও সহানুভূতি বিশেষভাবে প্রকাশ পাইয়াছে। কিন্তু তখন আলাহজরতের জেহাদী মেজাজ। অবশেষে মহারাণা সাদুল্লার শত্রু দারার শরণাপন্ন হইয়া বশ্যতা স্বীকারের অভিপ্রায় জানাইয়াছিলেন। দারা অনেক কষ্টে সম্রাটের ক্রোধ শান্ত করিয়া সন্ধিস্থাপন করাইলেন; কিন্তু সাদুল্লা খাঁকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য মহারাণার পুর মাণ্ডল প্রভৃতি কয়েকটি পরগণা (বর্তমান মুসলমান রিয়াসৎ জাওরা) বাজেয়াপ্ত করিয়া লইলেন; সাদুল্লা গাজী হইয়া চিতোরকে পুনরায় ধ্বংস করিলেন। দারার পক্ষে ইহার ফল হইল বিপরীত। দারার প্রতি মহারাণার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দূরে থাকুক, তিনি উদয়করণ চৌহান এবং শঙ্করভট নামক দুইজন দূতকে গোপনীয় কূটনৈতিক প্রস্তাব লইয়া দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন এবং বন্ধুত্বের উপঢৌকন স্বরূপ শাহজাদার নিকট হইতে তাঁহার অতি বিশ্বস্ত দূত ইন্দ্ৰভট এং ফিদাই খোজা মারফত একপ্রস্ত খেলাত, একটা হাতি এবং একটি হীরকাঙ্গুরীয়ক পাইয়া ধন্য হইলেন ও সুদিনের (?) প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। এইভাবে “হিন্দুকুল-সূর্য” মহারাণা রাজসিংহ হিন্দুজাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হইয়াছিলেন। (চলবে)