চতুর্দশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়
পাঁচ
মোগল সিংহাসনের দুই মহাসিংহ জয়সিংহ-যশোবন্তকে লইয়া এই সঙ্কটে সম্রাট এবং শাহজাদা দারা কিঞ্চিৎ বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিলেন। বয়সে এবং সামরিক অভিজ্ঞতায় মির্জা রাজা জয়সিংহের সমান না হইলেও যশোবন্ত তাঁহার এক মাস পূর্বেই ছয় হাজারী মনসবদার হইয়াছিলেন এবং আরও কিছু আগে “রাজা” হইতে উন্নীত বংশানুক্রমিক “মহারাজা” উপাধি পাইয়াছেন। ইহাতে মির্জা রাজা নিজেকে উপেক্ষিত এবং কচ্ছবাহ কুলকে অপমানিত মনে করিলেন এবং বহু শতাব্দীর পুরাতন অথচ বর্তমানকাল পর্যন্ত অনির্বাণ রাঠোর কচ্ছবাহ বৈরাগ্নিতে ঘৃতাহুতি পড়িল।
মারোড়ারের মরদ (“মারোড়ারী” নহে), বিকানীরের উট, জয়শলমীরের স্ত্রীলোকের রাজস্থানে জুড়ি নাই বলিয়া আজও প্রসিদ্ধি আছে। সেকালে জাঁদরেল চেহারা, বেপরোয়া হিম্মত ও হমবড়া দেমাকে শাহী দরবারে পাঠান ব্যতীত রাঠোরের জুড়ি ছিল না। রাঠোরের নজরে যোধপুরের বাহিরে “মরদ” কোথায়? কচ্ছবাহ? তাঁহার তিন হাত দেহে সাড়ে তিন শত প্যাচ, তলোয়ারের ধারে চামড়া কাটে তো হাড় কাটে না। কচ্ছবাহের কাছে রাঠোর আর যাহাই হউক অন্তত “ভদ্রলোক” নহে; বাজরার রুটি খায়, আদবকায়দা মানে না; অকারণে ঝগড়া বাধাইয়া বসে; মাথায় গোঁ আছে, মগজ নাই; হুজুর “হাঁ” মুখে আনিতেই রাঠোর হামলা করিয়া বসে, কচ্ছবাহ “হাতরাস” [এন-আর-এল জংশন।] ঘুরিয়া যাইবার ঈশারা বুঝিয়া থাকে।
শাহজাহানের দরবারে উক্ত দুই প্রতিস্পর্ধী রাজপুত-সিংহের মনোভাব ইহা অপেক্ষা ভালো ছিল না, সমানতালে পিঠ না চাপড়াইলে মালিকের বিপদ।
শাহজাহান যশোবন্তকে স্নেহ করিতেন, মির্জা রাজাকে শ্রদ্ধা ও সমীহ করিতেন; দুইজনের উপরই তাঁহার সমান বিশ্বাস —তবে মির্জা রাজাকে বেশি কাজের লোক মনে করিতেন। যশোবন্তকে দূরে রাখিয়া আওরঙ্গজেব জয়সিংহকে তাঁহার পক্ষে টানিবার চেষ্টায় ছিলেন; কিন্তু রাজপুত হইলেও মির্জা রাজা গভীর জলের মাছ, বুদ্ধি ও নীতিনৈপুণ্যে আওরঙ্গজেবের টক্কর লইবার মতো পাকা খানদানী “মোগল”। চরিত্র হিসাবে দারা এবং আওরঙ্গজেব যাদৃশ বিপরীত, দারার প্রিয়তম বন্ধু মহারাজা যশোবন্ত এবং জয়সিংহের মধ্যেও হুবহু ওইরূপ বৈপরীত্য লোকচক্ষুর আগোচর ছিল না। মির্জা রাজা দাক্ষিণাত্যে বলখ-বদকশানে কান্দাহারে আওরঙ্গজেবের অধীনে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, কান্দাহারের তৃতীয় অভিযানে যোদ্ধা, লোকনায়ক এবং মানুষ হিসাবে শাহজাদা দারাকে যাচাই করিবার সুযোগও তিনি পাইয়াছিলেন, সুতরাং ঘোড়া সওয়ার চিনিয়া ফেলিয়াছিল। মির্জা রাজা মহারাজা যশোবন্ত নহেন, এক পা ফেলিয়া আর এক পায়ে সামনের মাটি হাতড়াইয়া দেখা তাঁহার চিরকালের অভ্যাস; আকবরশাহী আমলের প্রাণে মায়াহীন, স্বার্থে উদাসীন মজবুত “রাজপুত” তিনি নহেন; বন্ধুত্বের খাতিরে মিথ্যা অভিমানে ঔদার্যের প্রেরণায় বিপদ ডাকিয়া আনিয়া নিজের ভবিষ্যৎ স্বার্থকে বিপন্ন করিতে পারে নির্বোধ রাঠোর, কচ্ছবাহ নহে। মির্জা রাজা দরবারে কার্যহানি হইবার ভয়ে দারাকে বাহিরে খোশামোদ করিতেন, অথচ ভিতরে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের ভাব।
সম্রাট শাহজাহান আম্বের যোধপুরের সহিত কোনও পুত্রের বিবাহ-সম্বন্ধ করেন নাই; এক ডোগরা রাজপুত রাজা-রাজ্ঞীর এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যার সহিত আওরঙ্গজেবের বিবাহ দিয়াছিলেন। শাহজাদা দারা মির্জা রাজা জয়সিংহের সহিত মিত্রতা ঘনিষ্ঠতর এবং রাঠোর ও কচ্ছবাহ উভয় কুল রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে নাগোরের পরলোকগত রাজা অমরসিংহের কন্যা এবং মির্জা রাজা জয়সিংহের ভাগিনেয়ীর সহিত পুত্র সুলেমান শুকোর বিবাহ দিয়াছিলেন। পিতা কর্তৃক যোধপুরের গদি হইতে বঞ্চিত অমরসিংহ ছিলেন যশোবন্তের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা। ১৬৫৩ হইতে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লিখিত পত্রাবলী হইতে জানা যায়, মির্জা রাজাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য অনেক কিছু করিয়াছিলেন, এমন কি খোশামোদ পর্যন্ত করিয়াছেন; কিন্তু ফাটা বাঁশ ও ভাঙা মন জোড়া লাগিবার নহে। মির্জা রাজা মালা জপ করিতেন, ব্রাহ্মণভোজন করাইতেন; বোধহয় এইজন্য তাঁহাকে “হিন্দু” মনে করিয়া শাহজাদা তাঁহার কাছে চিঠির শিরোনামায় “সচ্চিদানন্দ” লিখিতেন। হিন্দুত্বের নামে ভিজিবার মতো মন যশোবত্তের ছিল, মির্জা রাজার নয়। তিনি হিন্দুর ভবিষ্যৎ বলিয়া কোনও বস্তুর কল্পনাও করিতে পারিতেন না; তাঁহার সঙ্গীর্ণ বাস্তবধর্মী মন নিজের স্বার্থ ও আম্বেরের ভবিষ্যতের গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ ছিল।
হিন্দুর উপকার ও ভারতীয় সংস্কৃতির উদ্ধার করিতে বসিয়াই দারা গোঁড়া মুসলমান সমাজকে শত্রুভাবাপন্ন করিয়াছিলেন, আওরঙ্গজেবকে “ইসলাম বিপন্ন” মিথ্যা চিৎকারে মুসলমানকে বিভ্রান্ত করিবার সুযোগ দিয়াছিলেন; অথচ হিন্দুর মোহনিদ্রা ভাঙিল না।
ছয়
১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে অবস্থা চরমে উঠিল। মুঙ্গের হইতে শাহশুজা পূর্বমুখী না হইয়া সুবা এলাহাবাদের সীমান্ত অতিক্রম করিয়াছেন এবং শাহজাদা মোরাদ ও আওরঙ্গজেব মালবের দিকে সৈন্য চালনা করিতেছেন—এই সংবাদ পাইয়া সম্রাট অবশেষে বিদ্রোহী পুত্রগণের বিরুদ্ধে সৈন্য-সজ্জার আদেশ দিলেন। শাহজাদা দারার সর্বাপেক্ষা সুশিক্ষিত এবং বিশ্বস্ত যোদ্ধা লইয়া গঠিত বাইশ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী শাহশুজার বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য প্রস্তুত হইল। কুমার সুলেমান শুকো এই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হইলেন। সুলেমানের বয়স তখন বাইশ বৎসর, পূর্বে কোনও গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেন নাই; এই জন্য সম্রাট তাঁহার বিশ্বাসপাত্র প্রবীণ সেনানী সুচতুর মির্জা রাজাকে কুমার সুলেমানের “আতালিক” (উপদেষ্টা এবং অভিভাবক) নিযুক্ত করিয়া যুদ্ধ চালনার সম্পূর্ণ ভার তাঁহার উপরেই ন্যস্ত করিলেন। রাজা মানসিংহের পরে কোনও শাহাজাদার “আতালিক” হওয়ার সম্মান কোনও হিন্দুর ভাগ্যে ঘটে নাই। মহারাজা যশোবন্ত শায়েস্তা খাঁর স্থলে মালবের সুবাদার এবং শাহজাদা মোরাদকে বেরার সুবায় বদলি করিয়া মীর আতস কাসিম খাঁকে গুজরাটের সুবাদার নিযুক্ত করিলেন। রাঠোর, শিশোদিয়া, হাড়া, গৌর প্রভৃতি রাজপুত মনসবদারগণের সেনা লইয়া গঠিত এক বাহিনীর অধিনায়ক মনোনীত হইলেন সিংহবিক্রম মহারাজা যশোবন্ত সিংহ। মহারাজার সঙ্গে মীর আতস কাসিম খাঁ বাদশাহী মুসলমান লইয়া মালবে যাইবার আদেশ পাইলেন। ডিসেম্বর মাসের (১৬৫৭ ইং) শেষ সপ্তাহে দরবার হইতে উভয় বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ বিদায় লইয়া বিদ্রোহী শাহজাদাগণের অগ্রগতি রোধ করিবার জন্য যাত্রা করিলেন। বিদায় দেওয়ার সময় পর্যন্ত সম্রাটের মন দ্বিধাগ্রস্ত; সৈন্য প্রেরণ করিয়াও রক্তপাত নিবারণের জন্য তিনি উদ্বিগ্ন, পরিণাম ভাবিয়া শঙ্কাগ্রস্ত। আওরঙ্গজেব এবং মোরাদকে বলপ্রয়োগে নর্মদার অপর তীরে রাখিবার ভার যশোবন্তের উপর ন্যস্ত করিয়া তিনি পুত্রদ্বয়ের জন্য দুর্ভাবনায় পড়িয়াছিলেন; তাঁহার ভয় ছিল অমর্যপরায়ণ যশোবন্ত সুযোগ পাইলেই যুদ্ধ বাধাইবে, দারার পথ নিষ্কণ্টক করিবার জন্য পুত্রদ্বয়কে প্রাণে রেহাই দিবে না। এইজন্যই তিনি সিংহের লেজ টানিয়া ধরিবার জন্য বিশ্বাসঘাতক কাসিম খাঁকে সঙ্গে পাঠাইয়াছিলেন, কাসিম খাঁ মহারাজার হুকুমের অধীন না হইলেও যশোবত্তের সঙ্গে মিলিতভাবে কার্য করিবেন, আক্রান্ত না হইলে কিংবা মালব সুবা হাতছাড়া হইবার উপক্রম না হইলে বাদশাহী ফৌজ প্রথম আক্রমণ করিবে না ইহাই ছিল সেনাপতিদ্বয়ের উপর সম্রাটের আদেশ।
শুজার বিরুদ্ধে প্রিয়তম পৌত্র সুলেমান শুকোকে পাঠাইয়া সম্রাট অনুরূপ আশঙ্কায় অস্থির হইয়াছিলেন। সুলেমান নির্বিঘ্নে তাঁহার কাছে ফিরিয়া আসুক এবং শুজা অক্ষত শরীরে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করুক ইহাই ছিল স্নেহাতুর বৃদ্ধ সম্রাটের আন্তরিক কামনা। ইহা চাপিয়া রাখিবার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সম্রাটের তখন ছিল না। এই উভয় সঙ্কট হইতে একমাত্র স্থিরবুদ্ধি ও যুদ্ধকৌশল পরায়ণ মির্জা রাজাই মাথা ঠাণ্ডা রাখিয়া হাসিল করিতে সক্ষম। এই বিবেচনায় তিনি কুমার সুলেমানের রাশ টানিয়া ধরিবার জন্য মির্জা রাজাকে সঙ্গে পাঠাইয়াছিলেন এবং প্রয়োজনীয় মৌখিক উপদেশ তাঁহাকেই দিয়াছিলেন। দারার কার্যোদ্ধারের জন্য তিনি চলিয়াছেন; কিন্তু দারার উপর তাঁহার বিশ্বাস নাই। পাছে সম্রাটের নামে কোন আদেশ পাঠাইয়া শাহজাদা তাঁহাকে বিব্রত বিভ্রান্ত করেন এই আশঙ্কায় মির্জা রাজা তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র রামসিংহকে দরবারের হালচালের উপর নজর রাখিয়া সঠিক সংবাদ সরবরাহ করিবার জন্য আগ্রায় রাখিয়া গিয়াছিলেন। শাহজাহান পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছিলেন, বড় বড় যুদ্ধও করিয়াছিলেন। সুতরাং যোদ্ধা—বিদ্রোহী পুত্রের পিতার প্রতি মনোভাব তিনি হয়তো জানিতেন; তবুও এই দুর্বলতা কেন? বড় বড় সেনাপতিকে তিনি যুদ্ধ করিবার জন্য নয়, যেন লাঠি উঁচাইয়া সাপ তাড়াইবার জন্য পাঠাইয়াছিলেন। লড়াইয়ের ময়দানে সাপের মাথা ও লাঠি দুইটার জন্য সমান দরদ নিতান্তই বুদ্ধিভ্রংশের লক্ষণ। দারা নিরুপায়, বাদশাহী ফৌজ জয়সিংহ-কাসিম খাঁর আনুগত্য তাঁহার প্রতি নয়, তাঁহার হুকুম সম্রাটের জীবদ্দশায় তামিল করিতে তাঁহারা বাধ্য নহেন। যশোবন্তের উপর কাসিম খাঁ, তেজস্বী সুলেমানের উপর জয়সিংহ দুই জগদ্দল পাষাণ লইয়া সম্রাটের সৈন্যদল ডিসেম্বর মাসের (১৬৫৭ ইং) শেষ সপ্তাহে বিজয়োল্লাসে আগ্রা হইতে যাত্রা করিল। (চলবে)