চতুর্দশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়
সাত
কুমার সুলেমান শুকো দারার পুত্র হইলেও বাইশ বৎসর বয়সে সাহস, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মতৎপরতায় উদীয়মান শাহজাদা আওরঙ্গজেব। তাঁহার নিজের মনসবদারী ফৌজ এবং তাঁহার পিতার বিশ্বস্ত সৈন্যবাহিনী জয়সিংহের অধীনে বাদশাহী ফৌজ অপেক্ষা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অধিক শক্তিশালী ছিল। তিনি দ্রুত লম্বা লম্বা মঞ্জিলে অগ্রসর হইয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবার জন্য অস্থির হইলেন, “সহসা ন বিদধীত ক্রিয়াম্” উপদেশে তাঁহাকে নিরস্ত করা জয়সিংহের পক্ষে কঠিন ব্যাপার হইয়া উঠিল। মির্জা রাজা স্থির করিয়াছিলেন, সম্রাটের ইচ্ছানুরূপ তিনি শাহশুজাকে চালেই হঠাইবেন, অসতর্ক অবস্থায় বাদশাহী ফৌজের কোন অংশকে আক্রমণ করিয়া অবকাশ শত্রুকে দেওয়া হইবে না। যমুনা পার হইয়া মির্জা রাজা এই ব্যূহ রচনা করিবার মামুলি কায়দামতো কুচ করিতে লাগিলেন যেন শাহজা ইটাবা-ফতেপুর দখল করিয়া বসিয়া আছেন! এইরূপ অনর্থক বিলম্ব সুলেমানের পক্ষে অসহনীয় হইয়া উঠিল, মির্জা রাজাও ফাঁপরে পড়িলেন। কুমার সুলেমান বাপের মতো সকলকেই ভালোমানুষ মনে করিতেন না; পিতামহের স্নেহাবিল দুর্বল নীতিও তাঁহার মনঃপূত ছিল না; কিন্তু মির্জা রাজার সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে তিনি খুল্লতাত আওরঙ্গজেবের মতই সজাগ ছিলেন। এই অভিযানের সময় সুলেমান অগ্রগামী সেনাদল লইয়া কিঞ্চিৎ দ্রুত অগ্রসর হইতেছিলেন, মির্জা রাজার অধীনে মূল বাহিনী পিছনে থাকিত; এইজন্য দুইজনেই পরস্পরের প্রতি পরোক্ষে দোষারোপ করিয়া দরবারে চিঠি লিখিয়াছিলেন। জয়পুর দরবারে রক্ষিত এই সমস্ত “আখবরাত” বা দৈনন্দিন সংবাদ তালিকাভুক্ত চিঠির নকল পড়িলে বুঝা যায়, দারা ও সম্রাট যেন জয়সিংহের কাছে তটস্থ; তাঁহাদের নিশান ফরমানে হুকুম অপেক্ষা তোয়াজ অনেক বেশি—কিঞ্চিৎ তাড়াতাড়ি করিবার জন্য রাজার কাছে “অনুরোধ”, কুমার সুলেমানকে রাজার উপদেশমত কার্য করিবার কড়া নির্দেশ।
আট
শীতকাল, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ। চুনার দুর্গকে প্রদক্ষিণ পূর্বক উত্তরবাহিনী গঙ্গা কাশীযাত্রা সমাপ্ত করিয়া নগরীর অদূরে যেখানে আবার পূর্বগামিনী হইয়াছেন উহার বাঁকে কয়েক মাইল ভাটিতে সুবা বাংলার রণতরীবহর নদীবক্ষ অবরুদ্ধ করিয়া নঙ্গর ফেলিয়াছে; দক্ষিণ তীরে বালুকাভূমিতে গঙ্গার উচ্চ সুপ্রশস্ত পাড়ের উপর বহুদূর ব্যাপী শিবিরশ্রেণী রণকোলাহলে মুখর; বাংলার হস্তী অশ্ব ও পদাতিক বাহিনী এইখানে ছাউনি ফেলিয়া যুদ্ধের প্রতীক্ষা করিতেছিল। বারাণসীর ঘাটে গঙ্গার বুকে নবনির্মিত নৌসেতু; এই পুল পার হইয়া বাদশাহী ফৌজ বর্তমান রেলপুলের পূর্বমুখ হইতে আড়াই মাইল আন্দাজ উত্তর-পূর্বে বাহাদুরপুরে ছাউনি ফেলিয়াছিল; শাহশুজা অল্পের জন্যে ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে বেনারসকে লক্ষ্য করিয়া ঘোড়দৌড়ের বাজিতে হারিয়া গেলেন। আগ্রা হইতে বেনারসের দূরত্ব সেকালের মাপেও প্রায় ৪০০ মাইল, এবং মুঙ্গের হইতে বেনারস অন্যূন ১৫০ মাইল। প্রায় একই সময়ে জানুয়ারির প্রথমে (১৬৫৮ ইং) বাদশাহী ফৌজ পশ্চিম হইতে বেনারসের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। সাধারণত দিনে গড়পড়তা ৫ মাইলের বেশি রাস্তা চলা কোনও বড় ফৌজের পক্ষে সম্ভব ছিল না; বোধ হয় মির্জা রাজার ফৌজও এই হারে চলিয়াছিল। কেবল পায়ে হাঁটিলে কিংবা ঘোড়া দৌড়াইলে যুদ্ধযাত্রা হয় না; বাইশ হাজার মোগল ফৌজের কুচ বরযাত্রীর হাঁটা কিংবা বিরাট মিছিল আগাইয়া যাওয়ার তুলনায় শম্বুক গতিই বটে। প্রত্যেক মনসবদারের দুই প্রস্থ তাঁবু ও সরঞ্জাম; ভোরবেলা একটি চলমান নগর গুটাইয়া সন্ধ্যাবেলা পূর্বসজ্জিত আর একটি তাঁবুর শহরে রাত্রিযাপন––এই ব্যবস্থা না থাকিলে কুচ হয় না; মানুষের গরজ থাকিলে দৌড়াইতে পারে, কিন্তু কামানের গাড়ির বলদ নিজের চাল ছাড়িবার নহে। শাহশুজার সেনাবাহিনী গঙ্গার কূল ধরিয়া এবং তাঁহার নানা রকমের ছোটবড় জঙ্গী নৌকার বহর গুণ টানিয়া গঙ্গার উজানে কাশীর দিকে আসিতেছিল; এইজন্য তিনিও বাদশাহী ফৌজ অপেক্ষা দ্রুততর অগ্রসর হইতে পারেন নাই। সুতরাং মামুলি হিসাবে মুঙ্গের হইতে শাহশুজা ২৫ দিনে এবং মির্জা রাজার আগ্রা হইতে আশি দিনে বেনারস পৌঁছিবার কথা; কিন্তু সুলেমান শুকো চাচার হিসাব বানচাল করিয়া দিয়াছিলেন।
রাস্তায় কোন জায়গায় এবং কয় তারিখ কাশীর দিকে শাহশুজার সৈন্যচালনার সংবাদ বাদশাহী শিবিরে পৌঁছিয়াছিল জানা যায় না। শুজা বেনারস পৌঁছিতে পারিলে চুনার এবং এলাহাবাদ হাতছাড়া হইবে, এই কথা জানিয়াও মির্জা রাজা বিচলিত হইলেন না, শাহী ফৌজের মন্থর গতি দ্রুততর হইল না; কিন্তু যাযাবর তাতার রক্ত মোগলের ধমনীতে তখনও ঠাণ্ডা হয় নাই। কুমার সুলেমান শুকো জয়সিংহের হিন্দুস্থানী চাল ছাড়িয়া আদিম জঙ্গীসখানী কায়দায় ঘোড়ার জিন ও নিজের পিঠে গাঁটরী-কম্বল বাঁধা কয়েক হাজার অশ্বারোহী লইয়া ঝড়ের বেগে বেনারসের দিকে ছুটিলেন এবং দশ দিন প্রায় একটানা ঘোড়া দৌড়াইয়া জানুয়ারি মাসের ১৯/২০ তারিখে শহরে প্রবেশ করিলেন, মানের দায়ে মির্জা রাজা পিছে পিছে হাঁফাইতে লাগিলেন। যাহারা পিছনে পড়িয়াছিল তাহাদিগের জন্য কাশীতে তিন দিন অপেক্ষা করিয়া ত্বরিতকর্মা কুমার সুলেমান চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রশস্ত নৌসেতু নির্মাণ করিয়া ফেলিলেন। গঙ্গার এই পারে থাকিয়া নৌ-বলে বলীয়ান খুল্লতাতকে বাধা দেওয়া অসম্ভব বিবেচনা করিয়া সম্ভবত ২৩শে জানুয়ারি (১৬৫৮ ইং) সুলেমান গঙ্গা পার হইয়া বাহাদুরপুরে ছাউনি ফেলিয়াছিলেন। ২৪শে জানুয়ারি বাহাদুরপুরের কাছাকাছি পৌঁছিয়া শাহশুজা সংবাদ পাইলেন ভ্রাতুষ্পুত্র কাশী ও চুনারের পথ আগলাইয়া সেনা সন্নিবেশ করিয়াছেন, সুতরাং এই যাত্রা কাশীপ্রাপ্তির আশা ভঙ্গ হওয়ায় বাহাদুরপুরের ২/৩ মাইল উত্তর-পূর্বে গঙ্গার ধারে উচ্চভূমির উপর শিবির সন্নিবেশ করিয়া আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছিলেন। (চলবে)