চতুর্দশ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়
এগারো
১৩ই ফেব্রুয়ারির রাত্রি শত্রু-মিত্র উভয় পক্ষের জন্যই “অদ্য রজনী”। ভোরের আঁধারে তল্পি-তল্লা বাঁধিয়া ঘোড়ার জিন, হাতির হাওদা কষিয়া, কামানবাহী গাড়িতে বলদ জুড়িয়া হাতিয়ার-বন্দ বাদশাহী ফৌজ যাত্রার জন্য প্রস্তুত; এমন সময়ে দূরে গঙ্গার তীর হইতে যুদ্ধধ্বনি ও কোলাহল জঙ্গল ভেদ করিয়া তাহাদিগকে সন্ত্রস্ত করিয়া তুলিল। ভিতরের ব্যাপার সম্ভবত মির্জা রাজাও জানিতেন না, জানিলে হয় বাধা দিতেন, না হয় সুলেমান ও দেলের খাঁর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া, এমন কি শুজাকে সাবধান করিয়া দিতেও ইতস্তত করিতেন না। এইরূপ কার্য মোগল শিবিরে প্রায়ই হইত।
কুমার সুলেমান শুকো এবং দেলের খাঁ নিজ নিজ তাবিনের ফৌজ লইয়া কুয়াশার পর্দায় শুজার নিদ্রিত প্রহরীগণকে পাশ কাটাইয়া পশ্চাদভাগ হইতে হঠাৎ অপ্রস্তুত শত্রুকে আক্রমণ করিয়াছিলেন; যাহাদের ঘুম ভাঙিয়াছিল, জামা হাতিয়ার হাতড়াইতে হাতড়াইতে তাহারা বাধা দিবার অবকাশ পাইল না।
আক্রমণের লক্ষ্য ছিল শিবিরের মধ্যস্থলে শাহশুজার তাঁবুর খাসমহল। আয়েসী হইলেও শুজা বঙ্গাধিপতি লক্ষ্মণসেন নহেন। অকাল-জাগ্রত ব্যাগ্রের ন্যায় মুষ্টিমেয় বিশ্বস্ত যোদ্ধা পরিবৃত হইয়া তিনি সুলেমান ও দেলের খাঁর সম্মুখীন হইলেন, কিছুক্ষণ যুদ্ধ হইল। শুজাকে বন্দী করিবার উদ্দেশ্যে একজন যোদ্ধা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করিয়া তাঁহার হাতির পায়ে আঘাত করিল; কিন্তু নির্ভীক আরোহী কিংবা আহত হস্তী পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিল না। ইতিমধ্যে মির্জা রাজা জয়সিংহ, অনিরুদ্ধ গৌর প্রভৃতি রাজপুত বীরগণ আসিয়া পড়িলেন। শুজার মাহুত প্রভুকে রক্ষা করিবার কোনও উপায় না দেখিয়া অঙ্কুশাঘাতে হাতিকে নদীর দিকে তাড়না করিল, খোঁড়া হাতি বাদশাহী বাহাদুরগণের ব্যূহ গলাইয়া চলিয়া গেল। হাতি গঙ্গায় ঝাঁপাইয়া পড়িতেই নৌবহর শাহশুজাকে তুলিয়া ভাটির দিকে ছুটিল; স্থলসৈন্যের বাদবাকি যে যেদিকে পারে পলাইয়া গেল; যাহারা নদীর ধারে ধারে নৌকায় উঠিবার জন্য কাতর চিৎকার করিতেছিল তাহাদিগকে বাঁচাইবার জন্য কোনও নৌকা কূলে ভিড়িল না। দুশমনের জান অপেক্ষা মালের উপর লোভ বেশি; সুতরাং লোকক্ষয় খুব বেশি হইয়াছিল মনে হয় না। শাহশুজার নগদে আসবাবে দুই কোটি টাকার সম্পত্তি বাদশাহী ফৌজের হাতে পড়িল। এইভাবে বাহাদুরপুরে বক্তিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয় পুনরায় অভিনীত হইয়াছিল।
বারো
শাহশুজার পলায়নের ঘটনা লইয়া যুদ্ধ শিবিরে এবং পরে আগ্রা দরবারে অনেক জল্পনা ও কানাঘুষা চলিয়াছিল। জয়সিংহ সন্দেহ করিলেন কুমার সুলেমান তাঁহার সম্বন্ধে অপবাদ (?) রটাইয়াছেন, শাহজাদা দারা উহা শাহানশাহের কানে তুলিয়াছেন। এই কথা কোনও ব্যক্তি-বিশেষের নাম উল্লেখ না করিয়া সম্রাটের কাছে তিনি জানাইয়াছিলেন এবং উম্মা প্রকাশ করিয়াছিলেন। সত্য যাহাই হউক, মির্জা রাজাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য অভিযোগের জবাবে সম্রাট লিখিয়াছিলেন—এই রকম কথা আমাকে কেহ জানায় নাই; আপনার প্রভুভক্তির উপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস এবং নির্ভরতার কথা সকলে এতই ভালো রকম জানে যে, আমার কাছে এমন বেয়াদবি কথা বলিবার দুঃসাহস কাহারও হইতে পারে না।
সরকারি মুনশীয়ানাকে সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া নির্বিচারে গ্রহণ করিলে ইতিহাস হয় না, অবস্থার ফেরে পড়িয়া সরকারকে “অশ্বত্থামা হত-ইতি-গজ” করিতে হয়। বার্নিয়ার লিখিয়াছেন, “বাহাদুরপুরে যুদ্ধ না বাধাইবার চেষ্টা করিতে গিয়া জয়সিংহ অকৃতকার্য হইলেন…নিশ্চিতভাবে বলা যাইতে পারে যদি জয়সিংহ ও তাঁহার বুকের বন্ধু (?) দেলের খাঁ ইচ্ছা করিয়া হাত না গুটাইতেন, শত্রু-সৈন্য অধিকভাবে ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িত এবং সম্ভবত তাহাদের সেনাপতি (শাহশূজা) বন্দী হইতেন।” বানিয়ারের এই উক্তির মধ্যে কেবল দেলের খাঁর অংশটুকু মিথ্যা — যাহার জন্য দোষী সম্ভবত মির্জা রাজা স্বয়ং। সুলেমানের সহিত দেলের খাঁর ঘনিষ্ঠতা ভঙ্গ করিয়া পাঠানের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করিবার জন্য জয়সিংহের প্ররোচনায় তাঁহার চরগণ মন্দের ভালো হিসাবে দেলের খাঁর নামও এই অপবাদের সহিত জুড়িয়া দিয়াছিল। বার্নিয়ারের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত রচনার সময়ে পরে দেলের খাঁ রাজার অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়াছিলেন সত্য; কিন্তু বাহাদুরপুরে তাঁহারা মনে মনে অন্য রকম ছিলেন।
যাহা হউক, বাহাদুরপুর যুদ্ধের সরকারি ফতেহনামা বা বিজয়-পত্রিকায় জয়সিংহের জয়জয়কার, দারা ও শাহজাহান চিঠিপত্রে রাঠোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; সুনাম এবং পুরস্কারের মোটা অংশ তাঁহার ভাগেই পড়িয়াছিল। এক হাজার “জাত” ও পাঁচ শত “সওয়ার” মনসবে ইজাপা পাইয়া মির্জা রাজা মহারাজা যশোবন্তের উপর টেক্কা মারিয়া “হপ্ত হাজারী” (সাত হাজারী) বা বাংলা কথায় “বড়লাট” হইয়া গেলেন। শাহজাদা দারা মির্জা রাজাকে সর্বাগ্রে অভিনন্দন জানাইয়া লিখিলেন, “এই যুদ্ধে আপনি যাহা ‘নিমকহালালি’, দানাই (বুদ্ধিমত্তা) এবং ‘সিপাই-গিরী’ (শৌর্য) জাহির করিয়াছেন, আমার বিশ্বাস স্বয়ং রাজা মানসিংহ উহা করিতে পারেন নাই; গত এক শত বৎসরের মধ্যে হিন্দুস্থানে এই রকম বিজয়লাভের সৌভাগ্য কাহারও হয় নাই।” বিপরীত অর্থে দারার কথাই ঠিক। রাজা মানসিংহ যদি আকবরশাহী আমলে এই প্রকার নিমকহালালি ও বাহাদুরি দেখাইতেন তাহা হইলে কাবুল বিহার বাংলা উড়িষ্যা মোগল সম্রাটের পদানত হইত না।
দেলের খাঁর ভাগ্যে জুটিল মির্জা রাজার অর্ধেক সম্মান পাঁচশতী প্রমোশন — যাহা মির্জা রাজার অধীনস্থ তৃতীয় শ্রেণীর মনসবদার রাজা অনিরুদ্ধ গৌরকেও দেওয়া হইয়াছিল। ইহাকেই বলে “ইতিহাস” — কে বা মারে মশা, কে বা “মারে” (খায়) যৌসা! (চলবে)