পঞ্চদশ অধ্যায়
ধর্মাতের যুদ্ধে মহারাজা যশোবন্ত সিংহ
এক
ঈর্ষাপরায়ণ গুপ্তশত্রু কাসিম খাঁর ন্যায় জগদ্দল পাথর বুকে চাপাইয়া সম্রাট শাহজাহান মহারাজা যশোবন্তকে ত্রিশ হাজার সৈন্যসহ মালব-সীমান্তে আওরঙ্গজেব ও মোরাদকে বাধা দেওয়ার জন্য দক্ষিণ দিকে প্রেরণ করিয়াছিলেন (ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ ১৬৫৭ খ্রিঃ)। সেনাপতিদ্বয়ের উপর প্রকাশ্য হুকুম ছিল তাঁহারা একযোগে কাজ করিবেন, পারতপক্ষে রক্তপাত ঘটাইবেন না। অধস্তন সেনানীমণ্ডলী এবং সাধারণ সৈনিকগণ প্রথম হইতেই মনে করিয়াছিল এই অভিযানে যুদ্ধের আশঙ্কা নাই; হয়তো কিঞ্চিৎ হৈ-হল্লা হইবে মাত্র, বাদশাহী ফরমান পৌঁছিলেই আওরঙ্গজেব-মোরাদ ভড়কাইয়া যাইবেন।
মালব-অভিযানের মুখ্য সেনাপতি মহারাজ যশোবন্ত (জন্ম ডিসেম্বর ১৬২৬ খ্রিঃ)। এই সময়ে ত্রিশ অতিক্রম করিয়া মাত্র একত্রিশে পা বাড়াইয়াছেন; সুতরাং সেকালের দরবারী বয়সের পরিমাপে তিনি নাবালক, প্রথম শ্রেণীর পক্ককেশ আমীরগণের কৃপাকুটিল বক্রদৃষ্টিতে মাতৃ-অঙ্কশায়ী শিশু। বারো বৎসর বয়সে মাড়বার রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া মহারাজা যশোবন্ত মোগল-দরবারে সামত্তমণ্ডলীর মধ্যে ক্রমশ উচ্চতম মনসবের অধিকারী হইয়াছিলেন, প্রতিষ্ঠা ও শৌর্যে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁহার পশ্চাতে রহিয়াছে রাঠোরকুলের লক্ষ তরবারির উন্মুক্ত তেজোদৃপ্ত গৌরবচ্ছটা।
দুই
মহারাজা যশোবন্ত ও কাসিম খাঁ পরিচালিত সেনাবাহিনী আগ্রা হইতে মামুলি চালে কুচ করিয়া প্রায় দুই মাস পরে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে (১৬৫৮ খ্রিঃ) শিপ্রাতীরে উপস্থিত হইল। আওরঙ্গজেব তখনও বহু দূরে—খান্দেশের রাজধানী বুরহানপুর অতিক্রম করেন নাই। নর্মদার দক্ষিণ তীর হইতে কোনও সংবাদ বাদশাহী ফৌজের কাছে পৌঁছবার সর্ববিধ উপায় অনাগতবিধাতা আওরঙ্গজেব অনেক পূর্বেই বন্ধ করিয়াছিলেন, অথচ কাসিম খাঁ ও যশোবত্তের গতিবিধি তাঁহার নিকট প্রত্যক্ষবৎ, যেহেতু তাঁহার চরের দুরবীনের পাল্লায় আগ্রাই ছিল নিকটতম স্থান। যুদ্ধ করিতে আসিয়া যশোবন্ত অকূল পাথারে পড়িলেন, শত্রু কোথায় কখন এবং কোন্ পথে আসিবে তিনি ভাবিয়া পাইলেন না; বাদশাহী হরকরা বা গুপ্তচরসমূহ তাঁহাকে কোনও নির্ভরযোগ্য সংবাদ দিতে পারিল না। একবার পশ্চিমে, একবার দক্ষিণে লক্ষ্যহীনভাবে কুচ করিয়া বাদশাহী ফৌজ হয়রান হইয়া গেল; যশোবন্ত উজ্জয়িনীতে শিবির স্থাপন করিয়া শত্রুর আগমন প্রতীক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা অবশেষে করিলেন।
বিন্ধ্যপর্বতের যে বিচ্ছিন্ন বাহু গুজরাটের পূর্বসীমান্ত হইতে নর্মদা নদীকে বরাবর প্রায় ২০/২৫ মাইল দক্ষিণে রাখিয়া পূর্ব দিকে ধারা নগরী পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে এবং আবার দক্ষিণ দিকে মাণ্ডু শহর ছাড়াইয়া প্রায় পুনরায় নর্মদার কাছে পৌঁছিয়াছে, তাহার অনতিদূরে নদীর দক্ষিণ তীরে আকবরপুরের ঘাট, আকবরপুর হইতে দাক্ষিণাত্যের প্রধান রাস্তা মাণ্ডু, ধারা ও উজ্জয়িনী হইয়া ঢোলপুরে চম্বল নদী পার হইয়া আগ্রা পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। আকবরপুর হইতে মাণ্ডু প্রায় সোজা উত্তরে আনুমানিক বিশ মাইল; মাণ্ডুর ১৬/১৭ মাইল উত্তরে ধারা নগরী এবং ধারা ও উজ্জয়িনীর ব্যবধান প্রায় পঞ্চাশ মাইল, গুজরাট হইতে দোহদ হইয়া বাদশাহী সড়ক বহু ব্যবধানে ঈষৎ উত্তর-পূর্ব হইয়া উজ্জয়িনী পৌঁছিয়াছে। কোন বুদ্ধিতে যশোবন্ত সুদূর উজ্জয়িনীতে ঘাঁটি স্থাপন করিয়া আওরঙ্গজেব ও মোরাদকে ঠেকাইবেন ভাবিয়াছিলেন বলা যায় না। তাঁহার প্রধান শিবির মাণ্ডুর কাছে থাকিলে তিনি হয়তো আওরঙ্গজেবকে নর্মদা তীরে আটকাইয়া মোরাদকে একাকী যুদ্ধ করিবার জন্য বাধ্য করিতে পারিতেন। যশোবন্ত মাণ্ডুর ফৌজদার রাজা শিবরামের উপর নর্মদা তীরে পাহারার ভার অর্পণ করিয়া এবং মাণ্ডু ও ধারার মধ্যবর্তী স্থানে কয়েকটি থানা বসাইয়া উজ্জয়িনীতে নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন, অথচ এই চালে যুদ্ধের পূর্বেই তিনি পরাজয় বরণ করিয়া লইয়াছেন এই কথা বুঝিতে পারিলেন না।
তিন
আওরঙ্গজেব বিনা বাধায় দাক্ষিণাত্য বাহিনীকে নর্মদা পার করাইয়া (৩রা এপ্রিল ১৬৫৮) মাণ্ডু ও ধারা অধিকার করিলেন; ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বাদশাহী থানা জোয়ারের মুখে বালির বাঁধের ন্যায় ভাসিয়া গেল। রাজা শিবরামের ভগ্নদূত যশোবন্তের শিবিরে পৌঁছিবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আওরঙ্গজেবের অগ্রগামী সেনাদল উজ্জয়িনীর বিশ মাইলের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল। তাঁহাকে বাধা দিবার জন্য যশোবন্ত ও কাসিম খাঁ উজ্জয়িনীর ঈষৎ পশ্চিম-দক্ষিণে ১৪ মাইল দূরে ধর্মাত (বর্তমান ফতেয়াবাদ) নামক স্থানে যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইলেন। গুজরাট বাহিনীর কোনও সংবাদ তখন পর্যন্ত যশোবন্তের কাছে পৌঁছায় নাই; পরে শুনিলেন শাহজাদা মোরাদ ধর্মাত হইতে মাত্র এক মঞ্জিল (৫/৬ মাইল) ব্যবধানে বাদশাহী ফৌজের কান ঘেঁষিয়া দক্ষিণ দিকে চলিয়া গিয়াছেন এবং ১৪ই এপ্রিল চম্বলের উপনদী গম্ভীরার পশ্চিম তীরে আওরঙ্গজেবের সহিত একত্র হইয়া যুদ্ধের আয়োজন করিতেছেন।
খোলা ময়দানে অবিলম্বে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ না করিয়া আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করিবার জন্য মহারাজা যশোবন্ত এমন এক স্থানে সেনাব্যূহ স্থাপন করিলেন যেখানে তাঁহার প্রধান ভরসা অশ্বারোহীবাহিনীর গতিবেগ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং যুদ্ধকৌশল নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িল। ধর্মাত বা বর্তমানে ফতেয়াবাদের কিঞ্চিৎ পশ্চিমে নিম্নভূমির মধ্যভাগে একটি দ্বীপের মতো অপরিসর উচ্চভূমিতে ঠাসাঠাসি ভাবে বাদশাহী তোপখানা ও অশ্বারোহী স্থান গ্রহণ করিয়াছিল। ইহার প্রায় তিন দিক জলাভূমিবেষ্টিত। ব্যূহের আশেপাশে যে জায়গায় ফাঁক ছিল, নৈশ আক্রমণের ভয়ে সে জায়গায় পরিখা খনন করিয়া ১৪ই এপ্রিল দিবাভাগে উহা শত্রুর পক্ষে দুর্ভেদ্য করা হইয়াছিল। ইহাই হইল যেন বোতলের পেটে প্রবিষ্ট যশোবন্তের স্বখাতসলিলে ডুবিবার ব্যবস্থা। সম্মুখে সংকীর্ণ নির্গম পথে বাদশাহী তোপখানা পথ আগলাইয়া রহিল, উহার পশ্চাতে সুসজ্জিত বাদশাহী হরাবল বা অগ্রগামী অশ্বাদি। প্রধানত তোপখানার উপর ভরসা করিয়া বোধ হয় কাসিম খাঁর পরামর্শে যশোবন্ত এইরূপ স্থানে সৈন্যসজ্জা করিয়াছিলেন; কিন্তু সিংহের নিরাপত্তা ও বিক্রম গুহার বাইরে অন্তহীন অরণ্যানীর মধ্যে, ভিতরে পশুরাজের অসহায় অবস্থা। আওরঙ্গজেব বুঝিলেন রাজপুত বরাহ ভয়ভীত হইয়া মরণের ফাঁদে পা দিয়াছে।
যুদ্ধের পূর্বদিনেই ধীরবুদ্ধি সুচতুর যোদ্ধা আওরঙ্গজেব সম্মিলিত গুজরাট ও দাক্ষিণাত্য সেনাবাহিনীকে দাবার গুটির মতো যুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে বিভিন্ন সেনানায়কগণের স্থান ও সৈন্যসংখ্যা নির্দিষ্ট করিয়া সাজাইয়া রাখিলেন। আওরঙ্গজেবের বিরাট তোপখানা ব্যূহমুখে কিঞ্চিৎ অগ্রগামী স্থানে স্থাপিত হইয়া রাজপুতবাহিনীকে সন্ত্রস্ত ও ছত্রভঙ্গ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া রহিল। অবস্থা সঙ্গীন দেখিয়া মহারাজা যশোবন্তের সামন্ত প্রধান অসকরণ ১৪ই এপ্রিল সন্ধ্যার পরে তাঁহার সহিত গোপনে সাক্ষাৎ করিয়া নিবেদন করিলেন মহারাজ, শাহজাদাদ্বয় আমাদের মুখোমুখি তাঁহাদের তোপখানা খাড়া করিয়াছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে রাজপুত স্ত্রীপুত্রের মায়া কিংবা নিজের প্রাণের মমতা রাখে না এই কথা আপনার অজানা নয়, যদি অনুমতি হয় আমরা চারি সহস্র রাজপুত সহায় করিয়া মধ্যরাত্রে অতর্কিত আক্রমণে ওই তোপখানা অধিকার করিব। যশোবন্ত উত্তর দিলেন, “ছলকৌশলে রাত্রির অন্ধকারে শত্রুকে বধ করা বীরধর্ম নহে; উহা রাজপুত পৌরুষের অবমাননা।” পরের দিন প্রকাশ্য দিবালোকে অগ্নিবর্ষণ উপেক্ষা করিয়া রাজপুতের অসি যে কার্য সাধন করিয়াও যুদ্ধে জয়লাভ করিতে পারিল না, সেই কাজ রাত্রিকালে সম্পন্ন করা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল এবং তোপখানা ধ্বংস হইলে আওরঙ্গজেব ওইস্থানে হয়তো যুদ্ধই করিতেন না। মহারাজ যশোবত্তের প্রাচীন ক্ষত্রিয়োচিত উক্তি আর্যধর্ম হইতে পারে, কিন্তু ইসলামের অনুশাসন উহার সম্পূর্ণ বিপরীত, যুদ্ধে কোন কার্যই পাপ কিংবা বিধিবিগর্হিত নহে। আসল কথা, রাজপুতানার ইতিহাসে ভীষ্ম ভীম অভিমন্যু পাওয়া যায়, কিন্তু পার্থসারথি নাই; এই জন্যই মধ্যযুগে হিন্দু কোনও কুরুক্ষেত্র-জয়ও করিতে পারে নাই। (চলবে)