| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শাহজাদা দারাশুকো (৪৭নং কিস্তি) : কালিকারঞ্জন কানুনগো

Reporter
কালিকারঞ্জন কানুনগো / ৩০১ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৩ আগস্ট, ২০২৩

পঞ্চদশ অধ্যায়

ধর্মাতের যুদ্ধে মহারাজা যশোবন্ত সিংহ

চার

১৫ই এপ্রিল সূর্যোদয়ে রণদামামা বাজিয়া উঠিল। নিজ বাহিনীকে নিখুঁত বাবরশাহী কায়দায় ব্যূহবদ্ধ করিয়া আওরঙ্গজেব ধর্মাতের যুদ্ধক্ষেত্রে পানিপথ খানোয়ার পুনরভিনয় করিতে চলিলেন। উভয় পক্ষে সেনাবল সমান, প্রত্যেক পক্ষে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী; কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রে যোদ্ধার মনোবল ও সেনাপতিত্বে আওরঙ্গজেবের বাহিনী বাদশাহী ফৌজ অপেক্ষা প্রবল। সমর ব্যূহের কেন্দ্রস্থলে বর্মাচ্ছাদিত গজপৃষ্ঠে স্বয়ং আওরঙ্গজেব; কেন্দ্রভাগের দক্ষিণ ও বামপার্শ্বে রহিল যথাক্রমে সাহসী ও বিশ্বস্ত সেনানায়ক শেখমীর এবং সফশিকন খাঁর নেতৃত্বে পার্ফিরক্ষক অশ্বারোহী সৈন্য। ভীমকর্মা মোরাদ বক্‌স মূল বাহিনীর দক্ষিণ পক্ষ (right wing) এবং নামমাত্র অধিনায়ক আওরঙ্গজেবের বালক-পুত্র আজমের উপদেষ্টা স্বরূপ মূল তফাত খাঁ বামপক্ষ পরিচালনা করিতেছিলেন। কেন্দ্রভাগের কিঞ্চিৎ অগ্রভাগে উহার পর্দাস্বরূপ ইল্লিমিশ বা অগ্রগামী সহায়কসেনা; আওরঙ্গজেবের দেহরক্ষী সৈন্য লইয়া মূর্তাজা খাঁর নেতৃত্বে এই দল যুদ্ধার্থ প্রস্তুত রহিল। ইল্লিমিশ সেনার পুরোভাগে অষ্ট সহস্র রণকুশল বর্মাবৃত অশ্বারোহী পরিবৃত আওরঙ্গজেবের জ্যেষ্ঠপুত্র মহম্মদ সুলতান হরাবল বা ব্যূহমুখ পরিচালনার ভার গ্রহণ করিলেন। এই হরাবল অশ্বযোদ্ধা লইয়া গঠিত হইলেও হামলার প্রথম ধাক্কা সামলাইবার জন্য ইহার সঙ্গে কয়েকটা কামান ও যুদ্ধহস্তী দেওয়া হইয়াছিল। বিশাল দত্তযুগলে সুশাণিত তরবারি বদ্ধ, শুশুদ্বারা ভল্লযুদ্ধে শিক্ষিত, মনুষ্য-মাংস-স্বাদোন্মত্ত পৃষ্ঠে হাওদার মধ্যে বন্দুকধারী যোদ্ধা রক্ষিত, সর্বাঙ্গ লোহার সাজে সুসজ্জিত রণহস্তী এযুগের অভেদ্য ট্যাঙ্কের ন্যায় সেকালের যুদ্ধে নিজপক্ষে ছত্রভঙ্গ সেনার আশ্রয় সচল দুর্গবুরুজ এবং প্রতিপক্ষের অশ্বারোহী-ব্যূহ বিপর্যস্ত করিবার দুর্বার কীলক-স্বরূপ ব্যবহৃত হইত। হরাবলের সামনে ছিল যাহাকে বলা হইত হরাবলের “মোরগ বাচ্চা” (জৌজা-ই হরাবল); ইহা একটি দীর্ঘ পাতলা পাকা ঘোড়সোওয়ারের পর্দা। শত্রুর অবস্থানের সংবাদ সংগ্রহ এবং ইতস্তত আক্রমণ ও পলায়নের ভান করিয়া শত্রুকে বিভ্রান্ত করাই ছিল মোরগ বাচ্চার কাজ। মোরগ বাচ্চার আড়ালে রহিল আওরঙ্গজেবের প্রধান তোপখানা এবং তোপখানারক্ষক বন্দুকধারী বরকন্দাজ ও অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়ক অসমসাহসী এবং স্থিরবুদ্ধ মুর্শিদকুলি খাঁ। এইভাবে সুশৃঙ্খলার সহিত মন্থর গতিতে অগ্রসর হইয়া বেলা এক প্রহরের সময় আওরঙ্গজেবের বাহিনী অপেক্ষমাণ বাদশাহী ফৌজের দৃষ্টিপথে উপস্থিত হইল।

যুদ্ধের জন্য মোগলাই কায়দায় প্রতিব্যূহ রচনা করিবার উপযোগী স্থান যশোবত্তের ছিল না। কাসিম খাঁর তোপখানা নামে বাদশাহী, আওরঙ্গজেবের তোপখানার তুলনায় কিন্তু আতসবাজির বাড়া কিছুই নয়। এহেন তোপখানা সামনে রাখিয়া উহার পশ্চাতে যশোবন্ত রাজপুত মুসলমান দুই দলে বিভক্ত বাদশাহী হরাবল বা অশ্বযোদ্ধার ব্যূহমুখ স্থাপন করিলেন। হরাবলের দশ হাজার অশ্বারোহীর মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান সংখ্যায় সমান; কাসিম খাঁ মুসলমান এবং মুকুন্দসিংহ হাড়া রাজপুত বাহিনীর অধিনায়ক মনোনীত হইয়াছিলেন। হরাবলের সম্মুখে রহিল তাতার অশ্বারোহীর ইতস্তত ধাবমান “মোরগ বাচ্চা”। দুই হাজার রাঠোর অশ্বারোহী পরিবেষ্টিত হইয়া বাহিনীর মধ্যভাগে যশোবন্ত সেনাপতির স্থান গ্রহণ করিলেন। স্থানাভাবে যশোবত্তের দক্ষিণ ও বামপার্ফি (right and left hand sides of the centre) কেন্দ্রস্থ বাহিনীর উভয় পার্শ্বে বগলদাবা হইয়া রহিল; উহার বামে দক্ষিণে ব্যূহের পক্ষবিস্তার করিবার স্থান না থাকায় বাদশাহী ফৌজ একরকম ঠুটো জগন্নাথ হইয়া পড়িল। হরাবল এবং কেন্দ্রভাগের মধ্যবর্তী স্থানে ইল্লিমিশ বা অগ্রগামী সহায়ক সেনা রাজপুত অশ্বারোহী লইয়া গঠিত হইয়াছিল। একজন রাঠোর এবং একজন গৌর রাজপুত মনসবদার এই দলের সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন। যুদ্ধস্থলের পশ্চাতে রাজা দেবীসিংহ বুন্দেলার ফৌজ মূল শিবির ও অসামরিক ব্যক্তিগণের জন্য নিযুক্ত হইল।

পাঁচ

যুদ্ধের প্রারম্ভে আওরঙ্গজেবের তোপখানা পাল্লার ভিতরে পৌঁছিবার পূর্বেই বাদশাহী তোপখানা ফাঁকা মাঠে গোলা ছুঁড়িতে লাগিল। আওরঙ্গজেবের তোপখানা অপেক্ষাকৃত উচ্চভূমিতে সারিবদ্ধ হইয়া যখন অব্যর্থ লক্ষ্যে গোলা বর্ষণ আরম্ভ করিল তখন বাদশাহী তোপখানার নাভিশ্বাস উপস্থিত। দ্বিতীয়বার দাক্ষিণাত্যের সুবাদারি গ্রহণ করিবার পর হইতে (১৬৫২ খ্রিঃ) আওরঙ্গজেবের কামানে মরিচা ধরার অবকাশ ছিল না, গোলন্দাজেরা গোলকুণ্ডা-বিজাপুরে চারি বৎসর যাবৎ হাত পাকাইয়াছে; অধিকন্তু তিনি উচ্চ বেতনে সুদক্ষ ফিরিঙ্গি, পর্তুগীজ ও ফরাসি কর্মচারী তোপখানায় ভর্তি করিয়া উহাকে ভয়াবহ মারণাস্ত্র করিয়া তুলিয়াছিলেন। বাদশাহী তোপখানার হিন্দুস্তানী গোলন্দাজ কোনও কালেই রুমী ও ফিরিঙ্গির মতো কাজের লোক ছিল না; কান্দাহার অভিযানের পর (১৬৫৩ খ্রিঃ) তাহারা সেলামী তোপদাগা কিছুই করে নাই। মোট কথা, কয়েক দফা গোলা দাগিবার পর বাদশাহী তোপখানা নিস্তব্ধ হইয়া গেল, কারণ ইতিমধ্যে গোলাবারুদ ফুরাইয়া গিয়াছে! পরে খবর রটিয়াছিল যে, বিশ্বাসঘাতক কাসিম খাঁর ইঙ্গিতে আওরঙ্গজেবের উৎকোচে বশীভূত বাদশাহী গোলন্দাজগণ পূর্বরাত্রেই গোপনে অধিকাংশ গোলাবারুদ মাটির ভিতর পুঁতিয়া ফেলিয়াছিল। এই গুজব অবিশ্বাস করিবার কোনও সঙ্গত কারণ নাই।

বাদশাহী তোপখানাকে ঠাণ্ডা করিয়া আওরঙ্গজেবের তোপখানা দ্বিগুণ তেজে বাদশাহী হরাবলের উপর অগ্নিবৃষ্টি আরম্ভ করিল। কয়েকটা গোলা ফাটিবার পর হরাবলের তুরানী মোরগ বাচ্চা উধাও হইয়া গেল; নিতান্ত চাকরির দায়ে তাহারা “কাফের” দারার পক্ষে ধর্মপ্রাণ আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছিল। তখন বাদশাহী হরাবলের ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা, প্রতি মুহূর্তে তোপের গোলায় সাহসী অশ্বযোদ্ধৃগণ অসহায় ভাবে ভূপতিত হইতে লাগিল। পরাক্রম ও সাহসে হরাবলের রাজপুত অধিনায়ক মুকুন্দসিংহ হাড়ার সমকক্ষ সেযুগে বুন্দীরাজ ছত্রশাল হাড়া ব্যতীত মোগলসাম্রাজ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল না। তিনি দেখিলেন শত্রুর তোপখানা দখল করিতে না পারিলে কেহই বাঁচিবে না। সহসা তরঙ্গায়মান রণসমুদ্রে ঝটিকাবর্ত সৃষ্টি হইল, রাজপুত অশ্বারোহীদের “রাম রাম” যুদ্ধধ্বনি তোপের গর্জনকে উপহাস করিয়া দিগন্ত কাঁপাইয়া তুলিল। নিষ্কাশিত তরবারি হস্তে মহাকালের বক্ষ অসিলাঞ্ছিত করিয়া মৃত্যুকে জয় করিবার জন্য মুকুন্দসিংহ হাড়া, রতনসিংহ রাঠোর, দয়ালসিংহ ঝালা, অর্জুনসিংহ গৌর, সুজানসিংহ শিশোদিয়া তোপখানা লক্ষ্য করিয়া ঘোড়া ছুটাইলেন, পশ্চাতে বিভিন্ন কুলের পঞ্চসহস্র রণোন্মত্ত রাজপুত অশ্বারোহী মৃত্যুর সহিত পাল্লা দিয়া চলিয়াছে। তোপের গোলা ও বন্দুকের অবিশ্রান্ত অগ্নিবর্ষণকে তাহারা শিলাবৃষ্টির ন্যায় উপেক্ষা করিয়া বেপরোয়া হামলা করিল, বাঁচা-মরার কোনও খতিয়ান নাই। অনেক হতাহত হইলেও রাজপুতগণ তোপখানা অধিকার করিয়া লইল; তোপখানারক্ষী অশ্বারোহীর অধিনায়ক মুর্শিদকুলী খাঁ অমিতবিক্রমে যুদ্ধ করিয়া প্রাণত্যাগ করিলেন এবং তাঁহার সৈন্যেরা ছত্রভঙ্গ হইয়া পলায়ন করিল। কামানগুলিতে কীলক প্রবিষ্ট করাইয়া নিষ্ক্রিয় করিবার মতো সাজসরঞ্জাম বিজয়ী রাজপুতগণের সঙ্গে ছিল না; অন্য কোন বুদ্ধি তাহাদের মগজে আসিবার কথা নয়। তাহারা মনে করিল গোলন্দাজ মরিয়াছে, কামান কি করিবে?

এই দিকে মুখরক্ষার খাতিরে কাসিম খাঁ হরাবলের অপরাধ লইয়া রাজপুতের পিছনে পিছনে কিছুক্ষণ ঘোড়া দৌড়াইয়া দেখিলেন রাজপুতের মাথায় বুনো শুয়োরের গোঁ চাপিয়াছে, পিছে ফিরিবার আশঙ্কা নাই। গায়ে আঁচড় লাগিবার পূর্বেই তাঁহার পঞ্চসহস্র মুসলমান অশ্বারোহী সহযোদ্ধা রাজপুতগণকে মরণের মুখে ফেলিয়া নিরাপদ স্থানে ফিরিয়া আসিল। মুকুন্দসিংহ হাড়ার নেতৃত্বে জয়দৃপ্ত রাজপুতগণ বলাবল বিবেচনা না করিয়া প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার ন্যায় আওরঙ্গজেবের হরাবলের উপর আপতিত হইল। আওরঙ্গজেব শঙ্কিতচিত্তে দেখিতে লাগিলেন উন্মত্ত রাজপুত বরাহ তাঁহার হরাবল বিদীর্ণ করিয়া উহার মধ্যভাগে উপস্থিত হইয়াছে, কিছুক্ষণের মধ্যে হয়তো তাঁহার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করিবে। হরাবলের পুনর্বার ব্যূহবদ্ধ করিবার জন্য তিনি অগ্রগামী সহায়ক দলকে কুমার মহম্মদ সুলতানের সাহায্যার্থ প্রেরণ করিলেন এবং মূল বাহিনীর মধ্যভাগসহ স্বয়ং অগ্রসর হইয়া হরাবলের পশ্চাৎ হইতে যুদ্ধ পরিচালনা করিতে লাগিলেন।

বাদশাহী ফৌজের রাজপুত হরাবল পূর্ণবেগে কীলকের ন্যায় শত্রুব্যূহের মধ্যে প্রবেশ করিয়াও পশ্চাতে আগুয়ান যশোবন্তের অশ্বসেনার জন্য পথ প্রস্তুত করিতে পারিল না; দুই দিক হইতে নূতন শত্রুসৈন্য আসিয়া হরাবলের ভগ্ন স্থানসমূহ পূর্ণ করিল। যশোবত্তের অগ্রগামী সহায়ক সেনার একাংশ মাত্র মুকুন্দসিংহ হাড়ার সাহায্যার্থ শত্রুব্যূহে প্রবেশ করিয়াছিল, উহার মুখে যশোবত্তের বাহিনী প্রচণ্ড আঘাত হানিয়াও অবরুদ্ধ হইয়া রহিল। আওরঙ্গজেবের হরাবলের পেটের মধ্যে জালবদ্ধ সিংহযুথের ন্যায় মুকুন্দসিংহ প্রমুখ রাজপুত সেনানীগণ মহামারী কাণ্ড ঘটাইলেন, কিন্তু তাহাদের অতুলনীয় শৌর্য নীতিনিয়ন্ত্রিত না হইয়া নিয়তির বিধানে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইল। একযোগে শত্রুব্যূহের এক নির্দিষ্ট অংশের উপর আঘাত হানিবার পরিবর্তে হাড়া, রাঠোর, গৌর, শিশোদিয়া নিজ নিজ কুলপতির নেতৃত্বে বিক্ষিপ্ত ভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। আওরঙ্গজেবের কৌশলে প্রত্যেক জঙ্গী হাতিকে কেন্দ্র করিয়া যুদ্ধের এক-একটি আবর্ত সৃষ্টি হওয়ায় রাজপুত আক্রমণের বেগ স্তিমিত হইয়া গেল। তখন কোন্ যোদ্ধা কতজনকে মারিয়া মরিতে পারিবে ইহাই হইল তাহাদের শেষ প্রয়াস, — যুদ্ধ কেবল দুই হাতে কোপাকোপি, হয় মাথা না হয় তলোয়ার না খসিলে বিরাম নাই। চক্রব্যূহবদ্ধ সপ্তরথীবেষ্টিত বীর অভিমন্যুর ন্যায় মুকুন্দসিংহ হাড়া প্রমুখ ছয়জন রাজপুত চমুপতি এইভাবে সানুচর বীরগতি প্রাপ্ত হইলেন, পঞ্চসহস্রের মধ্যে কেহ অবশিষ্ট রহিল না।

এই সময়ে যুদ্ধের সঙ্গীন অবস্থা, জয় পরাজয় অনিশ্চিত। মহারাজা যশোবন্ত স্বয়ং যুদ্ধে নামিয়াছেন, রাজপুত মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে। এই সঙ্কট মুহূর্তে আওরঙ্গজেবের নিস্তব্ধ তোপখানা পরিত্যক্ত স্থান হইতে হঠাৎ বজ্ৰনাদে গর্জিয়া উঠিল। মুকুন্দসিংহ হাড়ার তলোয়ারের পাল্লার ভিতরে পড়িবার পূর্বেই আওরঙ্গজেবের গোলন্দাজগণ পলাইয়া গিয়াছিল। রাজপুত হরাবল মহম্মদ সুলতানের সেনামুখের মধ্যে অদৃশ্য হইবার পর গোলন্দাজগণ ময়দান খালি দেখিয়া পুনরায় ফিরিয়া আসিল এবং কামান সাজাইয়া সোজা যশোবন্তের সৈন্যবাহিনীর উপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিল। ইতিমধ্যে শাহজাদা মোরাদ আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ পক্ষ লইয়া যশোবত্তের বামপারিক্ষক ইফতিখার খাঁ-র সেনাভাগকে আক্রমণ করিলেন। ইফতিখার খাঁ নিমকহালাল করিয়া যুদ্ধস্থলে প্রাণ দিলেন। যশোবন্তের বামপার্শ্ব ছিন্নভিন্ন করিয়া মোরাদ একেবারে যশোবন্তের শিবির রক্ষক দেবীসিংহ বুন্দেলার উপর আপতিত হইলেন। দেবীসিংহ আত্মসমর্পণ করিলেন, বাদশাহী ফৌজের সর্বস্ব লুঠ হইয়া গেল। এইবার আওরঙ্গজেব বিজয় দামামা বাজাইয়া তাঁহার সমগ্র বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার হুকুম দিলেন।

যুদ্ধের অবস্থা দেখিয়া যশোবন্তের সেনাবাহিনীর অগ্রভাগ হইতে রায়সিংহ শিশোদিয়া এবং দক্ষিণপার্শ্ব হইতে অমরসিংহ চন্দ্রাবত (শিশোদিয়া) ও সুজানসিংহ বুন্দেলা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করিলেন। এই সুযোগে আওরঙ্গজেবের উভয় পারিক্ষক সেনা লইয়া শেখমীর ও সফশিকন খাঁ যশোবস্তের ভগ্নাবশিষ্ট ব্যূহের কোমরে আঘাত হানিতে লাগিল। প্রারম্ভেই বাদশাহী ফৌজের প্রায় অর্ধেক সৈন্যসহ কাসিম খাঁ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে সরিয়া দাঁড়াইয়া দূর হইতে যশোবত্তের দ্রুত সদগতি কামনা করিতেছিলেন। শাহজাদা মোরাদ দেবীসিংহ বুন্দেলাকে পরাজিত করিবার পর কাসিম খাঁকে না ঘাঁটাইয়া পশ্চাৎ দিক হইতে যশোবন্তের প্রতি ধাবিত হইলেন। মহারাজা যশোবন্ত তখনও অটুট বিক্রমে যুদ্ধ করিতেছিলেন, আহত হইয়াও আঘাতের প্রতি ভ্রূক্ষেপ নাই; কিন্তু তাঁহার বাহিনীর তখন সমুদ্রে ভাঙা জাহাজের অবস্থা। যশোবত্তের মাথার উপরে অগ্নিবৃষ্টি, সম্মুখে আওরঙ্গজেব, পশ্চাতে মোরাদ, দৃষ্টিপথে অক্ষত শরীর উদাসীন কাসিম খাঁ; চতুর্দিক হইতে নবোদ্যমে শত্রুবাহিনী তরঙ্গের পর তরঙ্গের ন্যায় তাঁহার হতাবশিষ্ট সেনাকে গ্রাস করিবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছে। জয়ের আশা না থাকিলেও সম্মুখে মৃত্যুর পথ উন্মুক্ত, সেই পথ লক্ষ্য করিয়া যশোবন্ত ঘোড়া ছুটাইলেন, সহসা শোণিতাপ্লুত অশ্বারোহীব্যূহে যশোবস্তের অশ্ব অবরুদ্ধ হইয়া পড়িল। তিনি দেখিলেন সম্মুখে আওরঙ্গজেব-মোরাদ নয়, রণভূমিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়া রুখিয়া দাঁড়াইয়াছেন প্রভুভক্ত অস্করণ, গোবর্ধন দাস, মহেশ দাস গৌর—ইহারা কেহই কাপুরুষ নহেন, তাঁহার জন্য ত্যক্তজীবিত মৃত্যুঞ্জয়ী বীর। ইহারা সসম্ভ্রমে অকম্পিতকণ্ঠে নিবেদন করিলেন, “মহারাজ, আপাতত আপনি বন্দী, সৈন্যদলের নেতৃত্বভার আমরা গ্রহণ করিয়াছি। মারবাড়ের রাজলক্ষ্মীকে অনাথা করিয়া আত্মঘাতী হইবার অধিকার আপনার নাই।” উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া তাঁহারা দ্বিধাগ্রস্ত যশোবত্তের অশ্ব যুদ্ধক্ষেত্রের বাহিরে টানিয়া লইয়া গেলেন। রাওযোধার বংশধর অজাতসন্তান যশোবন্তের নিকট প্রজার অধিকার দাবি করিয়াই সেনাধ্যক্ষগণ দৃঢ়তা অবলম্বন করিয়াছিলেন। যাহারা তাঁহার জন্য অসাধ্যসাধন করিয়া প্রাণ দিয়াছে, তিনি বাঁচিয়া না থাকিলে তাহাদের অনাথ স্ত্রী-পুত্রগণকে ভরণপোষণ করিবে কে? আওরঙ্গজেবের যে রোষাগ্নি তিনি প্রজ্বলিত করিয়াছেন উহার লেলিহান প্রতিহিংসা-শিখা হইতে রাঠোরকুলকে রক্ষা করা কি রাজধর্ম নহে? নিজের বিশ্বস্ত সামন্তগণের হস্তে অসম্পূর্ণ কর্তব্যের দায়ে বন্দীদশা স্বীকার করিয়া অন্তঃরুদ্ধবীর্য হতমান নাগরাজের ন্যায় মহারাজা যশোবন্ত গৃহাভিমুখে চলিলেন; আওরঙ্গজেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া খোদাতালাকে ধন্যবাদ দিলেন — হার-জিত আল্লার মর্জি। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev