পঞ্চদশ অধ্যায়
ধর্মাতের যুদ্ধে মহারাজা যশোবন্ত সিংহ
ছয়
ধর্মাতের আট ঘণ্টাব্যাপী তুমুল সংগ্রাম হিন্দু-মুসলমানের শক্তিপরীক্ষা নহে, আওরঙ্গজেবের সৈন্যদলে রাঠোর, বুন্দেলা, কচ্ছীরাজপুত ও মারাঠা সমান উৎসাহে বিপক্ষের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিল। হিন্দুর সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ না হইলেও তাঁহার পক্ষে নিহত চারিজন খ্যাতনামা সেনাধ্যক্ষের মধ্যে একজন ছিলেন হিন্দু। বাদশাহী ফৌজে মুসলমান রাজপুত অপেক্ষা অর্ধেকের বেশি হইলেও ধর্মাতের যুদ্ধে নিহত পঁচিশজন প্রসিদ্ধ সেনানায়কের মধ্যে চব্বিশজন রাজপুত, একজন মাত্র মুসলমান; সাধারণ যোদ্ধার মধ্যে মুসলমানের মৃত্যুর অনুপাত ইহা অপেক্ষাও কম। রাজপুত ন্যস্ত বিশ্বাসের অবমাননা করে নাই, স্বামী-ঋণ কড়ায়গণ্ডায় শোধ করিয়া ছয় হাজার মরিয়াছে, অস্ত্রাঘাতে অর্ধমৃত হইয়াছে ইহার অনেক বেশি। ছোটবড় প্রত্যেক রাজপুতকুলের বহুসংখ্যক শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা এই যুদ্ধে নিহত হইয়াছিলেন; তাঁহাদের সকলের স্মৃতি বহন করিয়া আজও দাঁড়াইয়া আছে মুকুন্দসিংহ হাড়ার মৃত্যুর সহযাত্রী রাজা রতনসিংহ রাঠোরের রণশয্যার পরবর্তীকালে নির্মিত এক স্মারকচিহ্ন।
সাত
মহারাজা যশোবন্ত তাঁহার হতাবশিষ্ট সামন্তবর্গের সহিত যোধপুরে ফিরিয়া আসিলেন। অতঃপর তাঁহার কি দশা হইল? যশোবন্ত যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করিয়াছেন এই কথা যোধপুর দূরে থাকুক হিন্দুস্তানে কেহ সহজে বিশ্বাস করিতে পারে নাই। এই ঘটনা অবলম্বন করিয়া মুখে মুখে বিবিধ জনরব আগ্রার বাজার পর্যন্ত ছড়াইয়া গিয়াছিল, সামসাময়িক বেসরকারি বৃত্তান্তে উহা ইতিহাসের স্থান দখল করিয়াছে; অথচ এইরূপ কোনও কাহিনীর অস্তিত্ব এবং ঐতিহাসিকতা রাজস্থানের আধুনিক খ্যাতনামা ঐতিহাসিকগণ স্বীকার করেন না। ধর্মাতের যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত কোনও শিশোদীয় রাজকুমারীকে যশোবন্ত বিবাহই করেন নাই; তিনি সমসাময়িক মহারাণা রাজসিংহের ভায়রাভাই, বুন্দীরাজ ছত্রশাল হাড়ার জামাতা, যশোবত্তের শাশুড়ি শিশোদিয়া বংশ-জাতা ছিলেন। এক শিলালিপিতে পাওয়া গিয়াছে বুন্দীরাজ ছত্রশাল হাড়া দেবলিয়ার শিশোদীয় রাবত সিন্হা-র রাজকুমারী নামক কন্যাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। এই স্ত্রীর গর্ভজাতা কন্যা করমেতা বাঈর সঙ্গে যশোবন্তের বিবাহ হইয়াছিল।[গৌরীশঙ্কর ওঝা-কৃত যোধপুর রাজ্যকা ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃ ৪৩৫ পাদটীকা দ্রষ্টব্য। কবিরাজ শ্যামল দাস (বীর-বিনোদ) গল্পটা একেবারে উড়াইয়া না দিয়া লিখিয়াছেন, ছত্রশাল হাড়ার কন্যাই যোধপুর দুর্গে পলাতক পতিকে প্রবেশ করিতে বাধা দিয়াছিলেন, অথচ কুত্রাপি এই গল্পের সহিত ছত্রশালের কন্যার সম্বন্ধ দেখা যায় না। তিনি এইরূপ আরও কয়েকটি কাহিনীর ঐতিহাসিক “শুদ্ধি” করিয়াছেন; আসলে কিন্তু ইহা এইরূপ গল্পের শুদ্ধি বা বিচার নয়, অভিনব “সৃষ্টি” — যাহার অধিকার ঐতিহাসিকের নাই। পণ্ডিত বিশ্বেশ্বরনাথ রেউ (মারবাড় রাজ্যবর্গ ইতিহাস, প্রথম খণ্ড) ইহা সম্পূর্ণ বর্জন করিয়াছেন।]
টড সাহেবের ইতিহাসে শিশোদীয় রানি কর্তৃক যোধপুর দুর্গে যশোবস্তের প্রবেশ নিষেধ; কন্যাকে বুঝাইবার জন্য মেবার হইতে মাতার আগমন ইত্যাদি কাহিনীর পুনরুল্লেখ অন্তত বাঙ্গালাদেশে নিষ্প্রয়োজন।
যাহা হউক, ইহাতে নাটক-উপন্যাসের ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। ইতিহাস শুধু কায়া নহে, ছায়াও ইতিহাস হইতে পারে যদি উহাতে কোনও জাতি বা সমাজের সুপরিজ্ঞাত মনোবৃত্তির যথার্থ প্রতিচ্ছায়া আমরা দেখিতে পাই। এই কাহিনীর উপর মানিনী রাজপুত বীরনারীর মনোভাবের একটা ছাপ নিশ্চয়ই আছে, প্রাচীন রাজস্থানী কবির এক নায়িকা সখীকে বলিতেছেন : —
ভল্লা হুআ জু মারিয়া, বহিনি মহারা কন্তু।
লজ্জজ্জেতু বয়ংসিঅহু জদ ভগ্গা ঘর এস্তু।।
অর্থাৎ, ভগ্নি! আমার পতি মারা গিয়াছেন ভালোই হইয়াছে। যদি তিনি পলায়ন করিয়া ঘরে ফিরিতেন, তাহা হইলে আমি সমবয়সী সখিগণের কাছে লজ্জা পাইতাম।
পুরুষের বীরত্ব নারীর দেশ ও কুলাভিমান এবং ত্যাগধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত; যে সমাজে নিত্য শাঁখা-সিন্দুরের ভাবনা সে সমাজে নিরাপত্তাই মুখ্য, বাঁচিয়া থাকিলেই বাহাদুরি। (চলবে)