ষোড়শ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়
সামুগঢ়ের যুদ্ধ (২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)
এক
আগ্রায় দুর্যোগের ঘনঘটায় বৃদ্ধ সম্রাট শাহজাহানের ভগ্নস্বাস্থ্য পূর্বাপেক্ষা আরও ভাঙিয়া পড়িল। চিকিৎসকগণের পরামর্শে আগ্রা হইতে সম্রাট দিল্লি যাওয়াই স্থির করিলেন (এপ্রিল ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মোরাদ ও আওরঙ্গজেবের কোনও সংবাদ দরবারে পৌঁছে নাই, বিদ্রোহী শুজা বাহাদুরপুরের যুদ্ধে পরাজিত হইয়া মুঙ্গের দুর্গে অবরুদ্ধ; সুতরাং সম্রাট ভাবিলেন মেঘ কাটিয়া গিয়াছে। এপ্রিল মাসের ১১ তারিখে সম্রাটের সহিত শাহজাদা দারা দিল্লির দিকে যাত্রা করিয়া দিল্লির কাছাকাছি বেলোচপুরে পৌঁছিলেন। এইখানে পঁয়ত্রিশ বৎসর পূর্বে এপ্রিল মাসে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী শাহজাদা খুররম (শাহজাহান) জীবনের প্রথম পরাজয় স্বীকার করিয়া পলাতক হইয়াছিলেন। এই বেলোচপুরেই ধর্মাতের যুদ্ধের দশ দিন পরে মালববাহিনীর ভগ্নদূত সংবাদ লইয়া আসিল মহারাজা যশোবন্তের রাজপুত-বাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, কাসিম খাঁ বিশ্বাসঘাতক, যোধপুররাজ আহত অবস্থায় যুদ্ধস্থল ত্যাগ করিয়াছেন। সম্রাট শিবিরে হাহাকার পড়িয়া গেল, সকলেই কিংকতর্ব্যবিমূঢ়; শাহানশাহর মন তখনও কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত, দোটানা স্রোতে পড়িয়া বিচার বুদ্ধির খেই হারাইয়াছে। তিনি দারাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন যুদ্ধে নিবৃত্ত হওয়াই শ্রেয়, দিল্লি পৌছিয়াই তিনি মোরাদ ও আওরঙ্গজেবকে শান্ত করিবেন; কিন্তু দারার কাকুতিমিনতি ও পীড়াপীড়িতে তিনি আগ্রায় ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হইলেন (২রা মে, ১৬৫৮ )।
দুই
দারা যুদ্ধার্থে কৃতনিশ্চয় হইয়া দ্রুত সমরায়োজনে ব্যাপৃত হইলেন; কিন্তু সৈন্য কোথায়? তিনি আশা করিয়াছিলেন, কুমার সুলেমানের বাহাদুরপুর-যুদ্ধজয়ী বাহিনী শাহশুজাকে মুঙ্গের দুর্গ হইতে বিতাড়িত করিয়া সহসা আগ্রায় ফিরিয়া আসিবে। মির্জা রাজা জয়সিংহ বাহাদুরপুর হইতে শুজাকে শুধু পলায়নের সুযোগ দেন নাই; ছত্রভঙ্গ শত্রুসেনার পশ্চাদ্ধাবনেও সন্দেহজনক শৈথিল্য প্রকাশ করিয়াছিলেন। বাদশাহী ফৌজ ধীরেসুস্থে মুঙ্গের পৌঁছিবার পূর্বেই শুজা কিউল-নদীর তীরে মুঙ্গের হইতে পনের মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম সুরজগড় উপদুর্গকে কেন্দ্র করিয়া রক্ষাব্যূহ স্থাপিত করিলেন। সম্মুখে অপ্রশস্ত খরস্রোতা নদী, নদীর তীর ধরিয়া উত্তরে গঙ্গার পার হইতে দক্ষিণে খড়্গপুর পর্বতমালার পাদদেশে গভীর অরণ্যানী পর্যন্ত বিস্তৃত উচ্চ মাটির দেয়াল; উহার উপর কামানশ্রেণী এবং বাংলার পদাতিক সৈন্যের ঘাঁটি। এইস্থানে বাদশাহী ফৌজের অগ্রগতি প্রায় এক মাস ব্যাহত হইয়া পড়িয়াছিল; বাহাদুরপুরের মতো এইস্থানে জঙ্গল না কাটিয়া শত্রুর নাগাল পাওয়ার উপায় ছিল না। মির্জা রাজার ঠিক এক বৎসর পরে এই স্থানে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলা শুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে আসিয়া এইভাবে আটক হইয়া পড়িয়াছিলেন। মীরজুমলা কিন্তু এই স্থানে নিশ্চেষ্টভাবে কালক্ষেপ না করিয়া খড়্গপুর পর্বতমালার মধ্য দিয়া সোজা রাজমহলের দিকে বাহির হইয়া গিয়া শুজাকে মুঙ্গের ত্যাগ করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায় ও বিক্রমে মির্জা রাজা মীরজুমলা অপেক্ষা ন্যূন ছিলেন না এবং আওরঙ্গজেবের জন্য যুদ্ধ করিতে আসিলে এই কৌশল তাঁহাকে কেহ বলিয়া দেওয়ার অপেক্ষাও তিনি করিতেন না। আসল কথা, দারার জন্য স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া লড়াই করিবার গরজ তাঁহার ছিল না। মুঙ্গের হইতে অকৃতকার্য হইয়া ফিরিবার এগার মাস পরে আওরঙ্গজেবের হুকুমে আজমীর হইতে পলায়মান হতভাগ্য দারাকে বন্দী করিবার জন্য মির্জা রাজা যেমন রাতকে দিন করিয়াছিলেন, উহার শতাংশের একাংশ উৎসাহ, বুদ্ধিমত্তা এবং রণকৌশল যদি তিনি শুজার বিরুদ্ধে প্রকাশ করিতেন তাহা হইলে এই গৃহযুদ্ধের পরিণাম ও হিন্দুর ভবিষ্যৎ হয়তো অন্যরকম হইত।
যাহা হউক, আওরঙ্গজেবের জন্য কালহরণ করাই ছিল শুজার মুখ্য উদ্দেশ্য এবং মির্জা রাজার গৌণ অভিপ্রায়। কুমার সুলেমান এইভাবে মূল্যবান সময় নষ্ট হইতেছে দেখিয়া অসহিষ্ণু হইয়া পড়িলেন, কিন্তু মির্জা রাজার অমতে কিছু করিবার ভরসা পাইলেন না। কিছুদিন জঙ্গল কাটিবার পর বাদশাহী ফৌজ অবশেষে জিৎপুর হইয়া গুপ্তপথে সুরজগড় রক্ষাব্যূহের পার্শ্বভাগ বিপর্যস্ত করিল; কিন্তু ইহাতে কোনও সুবিধা হইল না। ইতিমধ্যে শুজা পশ্চিমে গঙ্গার বাঁক হইতে পূর্বে খড়্গপুরের পাহাড় পর্যন্ত এক নূতন দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া করিয়া ফেলিয়াছিলেন, সুতরাং বাদশাহী ফৌজের আবার ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। এই সময়ে ধর্মাতের যুদ্ধে যশোবন্তের শোচনীয় পরাজয়ের পর দরবার হইতে জরুরি হুকুম আসিল শুজার সহিত অবিলম্বে সন্ধিস্থাপন করিয়া কুমার সুলেমান মির্জা রাজা যেন দ্রুত কুচ করিয়া আগ্রায় ফিরিয়া আসেন। মে মাসের ৭ তারিখে উভয়পক্ষে স্থিতাবস্থা শর্তে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইল, যুদ্ধে জয়ী হইয়া পরাজিতের ন্যায় দারার প্রাচ্যবাহিনী অর্ধবিজিত শত্রুর নিকট পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিতে বাধ্য হইল। (চলবে)