দ্বিতীয় অধ্যায়
ছায়া পূর্বগামিনী
পাঁচ
আসফ খাঁ ছায়ার ন্যায় জাহাঙ্গীর বাদশাহর পার্শ্বে থাকিয়া সুদিনের আশায় সম্রাটের নাভিশ্বাস গণিতেছিলেন। জামাতার বিদ্রোহের পর দরবারে তিনি বিড়াল তপস্বী সাজিয়াছিলেন- অপদার্থ বে-দৌলত খুর্রমের কথা মুখেও আনিতেন না। দাসীগর্ভজাত অকর্মণ্য শাহজাদা শারিয়ারকে দিল্লির সিংহাসনে বসাইবার আয়োজন নূরজাহান বেগম প্রায় সম্পূর্ণ করিয়াছিলেন। কিন্তু আসফ খাঁ প্রকাশ্যে শাহজাদা খসরুর পুত্র দাওয়ার বক্শকে ন্যায়ের খাতিরে সম্রাটের ভাবী উত্তরাধিকারী বলিয়া মত প্রকাশ করিলেন। সুতরাং হতভাগ্য খসরু এবং সম্প্রতি পরলোকগত শাহজাদা পরবেজের প্রতি অনুরক্ত দরবারী মনসবদারগণ সহজেই আসফ খাঁর অনুগত হইয়া পড়িল। আসফ খাঁ গভীর জলের মাছ, বাহ্যত তিনি সম্রাটের সেবা ব্যতীত সর্ববিষয়ে উদাসীন—কেবল ন্যায় এবং ধর্মের খাতিরে সুযোগ মতো খুররমের দুষ্কার্যের তীব্র নিন্দা এবং দাওয়ার বকশ্নে দাবি সমর্থন করিয়া নিজের নিঃস্বার্থ অপক্ষপাতিত্ব জাহির করিতেন।
১৬২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে অক্টোবর রবিবার সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীর হইতে ফিরিবার পথে নরলীলা সংবরণ করিলেন। বৈধব্য-দশাপ্রাপ্ত শোকার্তা সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ভ্রাতা আসফ খাঁকে একবার অন্দরমহলে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য কাতর অনুরোধ জানাইলেন। কিন্তু আসফ খাঁ জানিতেন ভগ্নীর অসাধ্য কাজ কিছুই নাই। সুতরাং তিনি সেই ফাঁদে পা বাড়াইলেন না। অধিকন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সম্রাটের দরবারে পিতার প্রতিভূ স্বরূপ নজরবন্দী দারা, শুজা এবং আওরঙ্গজেবকে ভগ্নীর কবল হইতে উদ্ধার করিয়া সম্রাজ্ঞীকে বন্দিনী করিলেন। লাহোর দুর্গে নূরজাহানকে সতর্কভাবে কারারুদ্ধ করিয়া আসফ খাঁ বেচারা দাওয়ার বককে একপ্রকার জোর করিয়াই প্রকাশ্য দরবারে সম্রাট বলিয়া ঘোষণা করিলেন, তাঁহার নামে খুৎবা পাঠ এবং সিক্কা জারি হইল। ঠিক ওইদিন ধূর্ত আসফ খাঁ নিজের সাঙ্কেতিক অঙ্গুরীয় বেনারসী নামক গোলামের হাতে দিয়া তাঁহাকে কোনও অজ্ঞাত স্থানে সুগোপনে প্রেরণ করিলেন।
ছয়
তিন মাস পরে (২১শে জানুয়ারি, ১৬২৮ খ্রিঃ) লাহোর দুর্গে আসফ খাঁ স্বীয় জামাতার কল্যাণার্থ এক অকাল বকরঈদ পর্ব মানাইয়া দিলেন। এই ঈদের প্রথম বলি, ইতিহাসে আসফ খাঁর “বকর ঈদের মেষশিশু” বলিয়া পরিচিত সেই হতভাগ্য দাওয়ার বকশ্, তাঁহার পর শাহজাদা শারিয়ার এবং এইরূপে পর পর পাঁচজন রাজপুত্র ওই ঈদে বলি পড়িল— তৈমুর বংশে দিল্লির মসনদের কোনও সম্ভাব্য দাবীদার আর অবশিষ্ট রহিল না। আসফ খাঁ অবশ্য বিনা হুকুমে এই কাজ করেন নাই। রাজ্যারোহণের এক মাস পূর্বে শাহজাহান এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের আদেশ দিয়াছিলেন।
শাহজাহানের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করিয়া আসফ খাঁ দৌহিত্রত্রয়কে সঙ্গে লইয়া (২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৬২৮ খ্রিঃ) আগ্রার অনতিদূরে আকবরের সমাধিক্ষেত্র সেকেন্দ্রায় উপস্থিত হইলেন। পঞ্জিকায় (হিন্দু এবং ইউনানী জ্যোতিষমতে গণিত) ওইদিন রাজধানী প্রবেশের পক্ষে অশুভ ছিল বলিয়া শাহজাদাগণ সেকেন্দ্রায় অপেক্ষা করিবার হুকুম পাইলেন, কিন্তু মায়ের মন পঞ্জিকা মানে না। ২৬শে ফেব্রুয়ারি বিকালবেলা সম্রাজ্ঞী মমতাজমহল আগ্রা ও সেকেন্দ্রার মধ্যবর্তী স্থানে একটি তাঁবুর মধ্যে পুত্রগণকে দেখিবার জন্য চলিলেন। সুদীর্ঘ তিন বৎসর নির্বাসনের পর দারা ও আওরঙ্গজেবের মাতৃদর্শন হইল, পিতামহের কাছে প্রতিপালিত বালক শুজা আবার মায়ের কোলে ফিরিয়া আসিলেন।
পরের দিন আসফ খাঁকে অভিনন্দিত করিবার জন্য মহাসমারোহে আগ্রা দুর্গে দরবার-ই-আম বসিল। দৌহিত্রগণসহ আসফ খাঁ কুর্নিশ করিবার পর সম্রাট মসনদের “ঝরোকা” (অলিন্দ) হইতে নামিয়া আসিয়া পুত্ৰত্রয়কে একে একে আলিঙ্গন করিলেন। আসফ খাঁ দীন ও দুনিয়ার মালিক শাহানশাহর “কদম-বোসী” করিয়া ধন্য হইলেন। শাহজাদা দারাশুকো যথারীতি বাদশাহর দরবারে নজর এবং নিসার পেশ করিবার পর তাঁহাকে নগদ দুই লক্ষ টাকা বকশিশ করিয়া তাঁহার জন্য দৈনিক এক হাজার টাকা ভাতা মঞ্জুর করিলেন।
শাহজাদা দারাশুকো এই রুধিরপ্রসিদ্ধ পিতৃ-সিংহাসনের বিধিনির্দিষ্ট ভাবী উত্তরাধিকারী। এই পটভূমিকা পরবর্তী ইতিহাসের পূর্বগামিনী ছায়া। (চলবে)