ষোড়শ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়
সামুগঢ়ের যুদ্ধ (২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)
তিন
শাহজাদা দারা আগ্রায় নূতন সেনাবাহিনী গঠন করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহার বিশ্বাসী মনসবদারগণের মধ্যে অধিকাংশই লাহোর, মুলতান ও কাবুল সুবায় শাসন ও সামরিক কার্যে ব্যাপৃত ছিলেন; সুতরাং নূতন অনভিজ্ঞ ও অর্ধবিশ্বাসী সেনাধ্যক্ষগণের উপর তাঁহাকে নির্ভর করিতে হইল। সুবা দিল্লি আগ্রা ও সরকার সম্ভল (মোরাদাবাদ) প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী স্থানের ফৌজদারগণকে সেনা সংগ্রহ করিয়া আগ্রায় আসিবার জন্য সম্রাট হুকুমজারি করিলেন, রাজকোষ দারার সৈন্যসজ্জার জন্য উন্মুক্ত হইল। এই সময়ে বাছবিচারের সময় ছিল না, ঠকবাজ নূতন মনসবদারগণ আগ্রা শহরের ভবঘুরে মুসলমান, ধোপা, নাপিত, সইস, বাসার চাকর সকলকেই সিপাহীগিরিতে ভর্তি করিয়া দল ভারী করিল। তোপখানার জন্য দারা মোটা বেতনে ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ ভর্তি করিতে লাগিলেন, উহাদের মধ্যে একজন ছিলেন তরুণ ইটালীয় চিকিৎসক ম্যানুসী। আগ্রা ও নিকটবর্তী অন্যান্য দুর্গ হইতে বড় বড় শাহী তোপ দারার তোপখানার সামিল করা হইল, কিন্তু তাঁহার তোপখানার মীর আতস ছিলেন কাশিম খাঁর প্রতিস্পর্ধী চাটুকার বাক্যবাগীশ বরকন্দাজ খাঁ ওরফে মিঞা জাফর। জাফর জাতিতে ইরানী, তোপের নিশানা ঠিক না থাকিলেও কথায় মানুষকে ঘায়েল করিতে ওস্তাদ, তুরানী তাঁহার দুই চোখের দুশমন। দারা মনে করিতেন, জাফর বড় কাজের লোক, রুস্তম আফ্রাসিয়াবের মতো বেনজির বাহাদুর; তাঁহার আশকারা পাইয়াই জাফর উচ্চপদস্থ আমীরদিগকে সমীহ করিত না। ইহার ফলে তুরানী যোদ্ধারা অধিকাংশই দারার প্রতি ক্রমশ বিমুখ হইয়া উঠিয়াছিল, আওরঙ্গজেব ইসলামের দোহাই দিয়া ইহাদিগকে হাত করিবার সুযোগ পাইলেন। ভাবী ভ্রাতৃবিদ্রোহে দারার প্রধান ভরসাস্থল ছিল রাজপুতের শৌর্য ও প্রভুভক্তি। দারার মুখে সর্বদা রাজপুতের প্রশংসা এবং তাহাদের প্রতি প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব তুরানীগণের ঈর্ষা ও বিদ্বেষের অন্যতম কারণ।
দারার আবেদন ও বিভিন্ন রাজপুত-কুলপতিগণের আহ্বানে রাজপুতানায় সাজ সাজ রব পড়িয়া গেল। কিন্তু ধর্মাতের যুদ্ধে রাজপুত ক্ষত্রশক্তি অর্ধেক ধ্বংস হইয়া গিয়াছে; অপর অর্ধাংশ বিক্ষিপ্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত। ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থ ও গৃহকলহ ভুলিয়া হিন্দুজাতি কোনদিন জাতি ও ধর্মের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য একতাবদ্ধ হইতে পারে নাই, রাজনৈতিক চেতনার অভাবে বিধর্মী ও বিজাতীয়গণের মধ্যে জাতির শত্রু-মিত্র চিনিয়া লইতে পারে নাই; এইজন্য আওরঙ্গজেব ও দারার পক্ষ হইয়া রাঠোরের বিরুদ্ধে রাঠোর, চৌহানের বিরুদ্ধে চৌহান, হিন্দুর বিরুদ্ধে হিন্দু প্রাণ খুলিয়া লড়াই করিয়াছিল। হয়তো ইচ্ছা থাকিলে দ্বিতীয় বার দারার জন্য যুদ্ধ করিবার সময় ও সামর্থ্য মহারাজা যশোবন্তের ছিল না, তাঁহার দুই হাজার শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ধর্মাতের যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করিয়াছে। যাঁহারা লাভ-ক্ষতি জয়-পরাজয় বিবেচনা না করিয়া আর্য যোদ্ধার “যুদ্ধায় যুধ্যস্ব” আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া দারার সাহায্যার্থে বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে কোটা বুন্দীর হাড়া, বিকানীরের রাঠোর এবং চম্বল উপত্যকার গৌর রাজপুত সংখ্যায় প্রধান ছিলেন।
“হিন্দুকুলসূর্য” মহারাণা রাজসিংহ হিন্দুর ভবিষ্যৎ না ভাবিয়া তাঁহার বিদ্রোহের দণ্ডস্বরূপ সম্রাট কর্তৃক বাজেয়াপ্ত পুর-মণ্ডল ইত্যাদি কয়েকটি পরগণা আওরঙ্গজেবের কৃপায় ফিরিয়া পাইবার কথাই ভাবিতেছিলেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও স্মরণ করিতে পারিলেন না যে, ওই ব্যাপারে শাহজাদা দারা মাঝখানে না পড়িলে তিনি চিতোর-উদয়পুরও হারাইয়া বসিতেন। আসন্ন যুদ্ধে মহারাণা নির্লিপ্ত থাকিলেও শিশোদিয়া দারার বিপক্ষেই যুদ্ধ করিয়াছিল। মোগলসংসর্গে রাজপুত আদর্শভ্রষ্ট হইয়াছিল, পরার্থ অপেক্ষা স্বার্থকেই বড় করিয়া দেখিত—ইহার প্রমাণ কচ্ছবাহপতি মির্জা রাজা জয়সিংহ। তাঁহার পুত্র কুমার রামসিংহ বাদশাহী মনসবদার হিসাবে দারার পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়াছিলেন; কিন্তু কচ্ছবাহগণ রাঠোর-চৌহানের মতো জান কবুল করিয়া লড়াই করে নাই। বুন্দেলাগণ রাজপুত হইলেও তাহারা রাজপুত চরিত্রের প্রশংসনীয় গুণসমূহ হারাইয়াছিল; পৃথ্বীরাজের যশঃস্পর্ধী “আল্হা-উদন্” মহোবাওয়ালের বীর গাথা বুন্দেলা চরিত্রকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করিতে পারে নাই; মোগল আমলে বুন্দেলাগণ নিকৃষ্টশ্রেণীর রাজপুত বলিয়া গণ্য হইত। দস্যুবৃত্তি, বিদ্রোহ, কৃতঘ্নতা বুন্দেলার চরিত্রে সমধিক প্রকট, ধর্মাধর্মজ্ঞান বিসর্জন দিয়া অর্থ ও জায়গীরের লোভে জঘন্যতম গুপ্তহত্যায় বুন্দেলার জুড়ি ছিল না। সম্রাট শাহজাহান বুন্দেলখণ্ড জয় করিয়া বুন্দেলা সামন্ত রাজগণকে প্রায় ধ্বংস করিবার উপক্রম করিয়াছিলেন, যাঁহারা শাহজাদা দারার আশ্রয়ভিক্ষা করিয়া সম্রাটের কোপ হইতে রক্ষা পাইয়াছিলেন তাঁহাদের অন্যতম ছিলেন সরকারি নজরে কুখ্যাত দস্যু ও বিদ্রোহী, কিংবা মতান্তরে স্বাধীনতার পূজারী অদম্য দেশপ্রেমিক চম্মাত্রায় বুন্দেলা। চম্মত্রায় দারার অধীনে কান্দাহারে যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন, কিন্তু আশানুরূপ কোনও কৃতিত্ব দেখাইতে না পারিলেও ফিরিয়া আসিয়া মোটারকম জায়গীর মনসবের দাবি করিয়া বসিলেন। কোনও সুবিধা করিতে না পারিয়া চম্মত্রায় মোগল সরকারে চাকুরি অপেক্ষা পূর্বপুরুষের পেশা ডাকাতি অধিক লাভজনক বিবেচনা করিয়া বিদ্রোহী হইয়াছিলেন। ধর্মাতের যুদ্ধের পরনীতিনিপুণ আওরঙ্গজেব যে সমস্ত কাজের লোককে হাত করিয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে চম্মত্রায় বুন্দেলা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। বুন্দেলখণ্ডের রাজপুত সম্বন্ধে শত্রু মিত্র নিরপেক্ষ কেহই নিশ্চিন্ত হইয়া থাকিতে পারিত না, সুযোগ পাইলে নির্বিচারে সকলের অনিষ্ট করাই ছিল তাহাদের মজ্জাগত প্রবৃত্তি।
শৌর্য ও নির্ভরযোগ্যতায় মধ্যযুগে হিন্দুস্থানের মুসলমান সেনানায়কগণের মধ্যে রাজপুতের সমকক্ষ ছিলেন উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত মুজাফফরনগর জেলার বারহাবাসী সৈয়দ; ইহাদের পরেই পাঠান। সৈয়দ ও পাঠান পাকা মুসলমান হইলেও, দারাকে ইসলামের শত্রু বলিয়া আওরঙ্গজেবের প্রচারকার্য ইঁহাদিগকে বিভ্রান্ত করিতে পারে নাই। দারার এই সঙ্কটে বারহাবাসী সৈয়দ এবং সম্ভল-মোরাদাবাদের পাঠান উপনিবেশ হইতে দলে দলে যোদ্ধা রাজপুতের পাশে দাঁড়াইয়া তাঁহার জন্য যুদ্ধ করিতে উপস্থিত হইল। দারার নূতন বাহিনীতে রাজপুতের তুলনায় মুসলমান সংখ্যায় প্রায় চারিগুণ ছিল, বিশ্বাসঘাতকের অনুপাত কিন্তু মালববাহিনীর অনুপাত অপেক্ষা অনেক কম।
চার
রাজপুত রাজন্যবর্গের মধ্যে বুন্দীরাজ ছত্রশাল হাড়া বয়সে ও শৌর্যে ভীষ্মপ্রতিম ছিলেন। তিনি দশ বৎসর বয়স হইতে বৃদ্ধাবস্থা পর্যন্ত কেবল যুদ্ধই করিয়াছেন, স্বয়ং সম্রাটের নিকটও কোনোদিন অনুগ্রহ যাঞা করেন নাই। তিনি জাহাঙ্গীরের রাজত্বে বিদ্রোহী কুমার খুররমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিলেন; খুররমের (সম্রাট শাহজাহান) রাজ্যারোহণের পর বুন্দীরাজ ত্রিশ বৎসর মোগলসম্রাটের সেবা করিয়াও প্রথম শ্রেণীর মনসব লাভ করিতে পারেন নাই, বরং ইহার প্রতিদানে পাইয়াছিলেন মনস্তাপ ও অপমান; অখণ্ড বুন্দীরাজ্যের অঙ্গহানি করিয়া সম্রাট শাহজাহান কোটারাজ্য সৃষ্টি এবং নূতন রাজ্যের কনিষ্ঠ শাখাকে বুন্দী হইতে স্বাধীন করিয়াছিলেন। ইহার কারণ বুন্দীরাজ ছত্রশালের উদ্ধত আত্মাভিমান। তাঁহার পূর্বপুরুষ রাও সুর্জনের সঙ্গে আকবরের যে সন্ধি হইয়াছিল উহার মধ্যে শর্ত ছিল, মোগলসম্রাট কোনদিন বুন্দীর রাজকন্যাকে বধূরূপে প্রার্থনা করিবেন না, বুন্দীর সেনা স্বয়ং সম্রাট কিংবা শাহাজাদাগণের সেনাপতিত্ব ব্যতীত অন্য কোনও হিন্দুরাজা কিংবা মুসলমান সেনাধ্যক্ষের অধীনে যুদ্ধ করিবে না, বুন্দীসওয়ারের ঘোড়ার গায়ে মনসবদারী দাগ দেওয়া হইবে না, চৌহান-নারী নওরোজের উৎসবে মোগল অন্তঃপুরে আমন্ত্রণ গ্রহণ করিবেন না, বুন্দীর রাও সিন্ধুনদী পার হইয়া কোথায়ও যুদ্ধ করিবে না; বুন্দীর নজরানা কোষমুক্ত তরবারি ও যুদ্ধক্ষেত্রে শস্ত্রপূত শবদেহ।
প্রাচীনপন্থী ছত্রশাল সিন্ধুনদী সম্বন্ধে কুসংস্কারমুক্ত হইতে পারেন নাই। সিন্ধুর পশ্চিম তীর রাক্ষসভূমি, ওইখানে শ্রাদ্ধাদি ধর্মকর্ম নিষিদ্ধ, মরিলে মুক্তি নাই। এই জন্য বুন্দীসেনা সম্রাটের ইচ্ছা সত্ত্বেও বল্ল্খ কান্দাহার অভিযানে অংশগ্রহণ করিতে আপত্তি করিয়াছিল; কিন্তু কোটা শাখার রাও মাধবসিংহ, মুকুন্দসিংহ হাড়া প্রভৃতি হাড়া চৌহানগণ যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন। এই অপরাধে সম্রাট বুন্দীর গৌরব খর্ব করিবার জন্য ছত্রশালের জায়গীর বারা ও মৌ পরগণা বাজেয়াপ্ত এবং উহা কোটাপতিকে প্রধান করিয়া ছত্রশালের বুকে শল্য প্রবিষ্ট করাইলেন। দিল্লীশ্বরের এই অবিচার বুন্দীপতিকে স্বামীধর্ম-ভ্রষ্ট করে নাই; তিনি সম্রাটের আদেশে আওরঙ্গজেবের অধীনে আবার দাক্ষিণাত্যে যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন এবং তাঁহারা হুকুমে আওরঙ্গজেবের অনুমতি না লইয়াই হিন্দুস্থানে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন। ছত্রশালের তৃতীয় পুত্র কুমার ভগবত্ত সিংহ বুন্দীর অঙ্গহানির নিমিত্ত দারা ও শাহজাহানের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্য আওরঙ্গজেবের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছিলেন। দ্বিতীয় পুত্র ভীম সিংহ শাহজাদা দারার অধীনে মনসবদার হিসাবে শাহশুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে গিয়াছিলেন। ধর্মাতের যুদ্ধের কিছুদিন পূর্বে ভীম সিংহের মৃত্যুসংবাদে বুন্দীরাজ্যে হাহাকার পড়িল; ইহার অব্যবহিত পরে আসিল সাহায্যের জন্য হতপ্রভ শাহজাদা দারার করুণ আবেদন ও দিল্লীশ্বরের সনির্বন্ধ অনুরোধ — গতানুগতিক চাকরির ডাক নহে। (চলবে)