ষোড়শ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়
সামুগঢ়ের যুদ্ধ (২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)
পাঁচ
বুন্দীর রণদামামা আবার বাজিয়া উঠিল, বৃদ্ধ রাও পুত্রশোক ভুলিয়া রণরঙ্গে মাতিয়া উঠিলেন। আওরঙ্গজেবের প্রতি কোনও আক্রোশ কিংবা দারার নিকট বাধ্যবাধকতা না থাকিলেও সঙ্কট হইতে দিল্লীশ্বরকে উদ্ধার এবং ন্যায় ও ধর্মের মর্যাদা রক্ষার নিমিত্ত বুন্দীরাজ শেষ যুদ্ধ করিবার সঙ্কল্প করিলেন; লাভ-ক্ষতি জয়-পরাজয়ের আশা ও আশঙ্কার আলোছায়া তাঁহাকে কোনদিন যুদ্ধে প্রবৃত্ত কিংবা নিবৃত্ত করিতে পারে নাই। দান, পৌরুষ, ত্যাগ ও ভোগে সামসময়িক রাজন্যবর্গের মধ্যে কেহ বুন্দীশ্বরকে [ছত্রশালের বিভিন্ন রাজপুত-বংশীয়া বারোজন বিবাহিতা রানি ব্যতীত শতাধিক উপপত্নী ও অনুগৃহীতা দাসী ছিল। ইহাদের মধ্যে নয় জন রানি এবং ৪৪ জন উপপত্নী ও দাসী তাঁহার মৃত্যুর পর “সতী” হইয়াছিল। তিনি কবি চারণ ও গুণীগণের আশ্রয়দাতা ছিলেন। তাঁহার দরবারী কবি বিশ্বনাথ সংস্কৃত ভাষায় শত্রুশল্য-চরিতম্ নামক কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। কথিত আছে এই কাব্যে পুরস্কার-স্বরূপ’ তিনি কবিকে চারিখানা গ্রাম এবং নগদ এক লক্ষ টাকা দান করিয়াছিলেন। বুন্দীর “মহিয়ারিয়া” শাখার চারণ কবি দেবাকে তিনি একটি হাতি ও এক কোটি দাম (৪০ দাম-এক টাকা) দান করিয়াছিলেন। দাতার ন্যায় দানগ্রহীতারও বুকের পাটা এবং দরাজ হাত ছিল। চারণ দেবা ওই হাতি ও সম্পূর্ণ মুদ্রা তাঁহার দ্বারস্থ যাচকগণকে দান দিয়াছিলেন। এইজন্য আজ পর্যন্ত দেবার বংশধরগণকে “হস্তী-বরীস” ও “কৌড়-বরীস” (ক্রোর বখ্শ) আখ্যায় অভিনন্দিত করা হয়। একদিন কবিতার আসর ভাঙিবার পর রাও ছত্রশাল চারণ দেবা-র দুই পাটি জুতা নিজে উঠাইয়া কবির সামনে রাখিয়াছিলেন। চারণ আবার গাহিলেন : —
পাণা গহ পৈজার, সুকবি অগ্ন ধরতা সতা।
হিক হিক বার হাজার, পহ সুমা মাথৈ পড়ী।
অর্থাৎ ছত্রশাল হস্ত দ্বারা উপানৎ গ্রহণ করিয়া সুকবির সম্মুখে রাখিলেন; এক-একবার প্রভু ছত্রশালের মস্তকে দ্বাদশ সহস্র পুষ্প (দেবতাগণ কর্তৃক) বর্ষিত হইল।
এই দোহা রাজস্থানে আজ পর্যন্ত লোকের মুখে শুনা যায়। শৌর্য, গুণানুরাগ, ভাবপ্রবণতা ও দাক্ষিণ্যের এই সমাবেশে ছত্রশাল ব্যতীত অন্য রাজপুত নৃপতির চরিত্রে কদাচৎ দেখা যায়। সুরজমল কৃত “বংশভাস্কর, খণ্ড ৩, পৃ ২৬২২-২৩ ও পাদটীকা
অব দুনী রণ আপনাঁ, পড়িয়াঁ সুজস প্রকাশ ॥
প্রকটে বুন্দী পট্ট পণ, ন কটে নাম বিনাস।
(বংশভাস্কর, খণ্ড ৩; পৃ. ২৬৭৪)
অক্ষত শরীরে যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া যে যোদ্ধা গৃহ প্রত্যাবর্তন করে রাজপুতনায় তাহাকে “নকাটা” (নাক-কাটা) বলা হইত।] অতিক্রম করে নাই; বুন্দীর দরবারে কাব্যলক্ষ্মীর সাবলীল ছন্দ চারণের অগ্নিবীণা ও গুণীজনের কণ্ঠে সঙ্গীত-মূর্ছনা অসির ঝনঝনার সহিত তাল মিলাইয়াছে, এইবার দুনিয়ার সহিত তাঁহার শেষ হিসাব — নিকাশের পালা।
দশ বৎসর বয়স পূর্ণ না হইতে যে পিতৃহীন বালক পিতামহ রতন সিংহের জীবদ্দশায় বুন্দীর যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, অর্ধ-শতাব্দীকাল পরে সেই গুরুভার পুত্র ভাও সিংহকে যথাবিধি সমৰ্পণ করিয়া যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে বৃদ্ধ রাও ছত্রশাল সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হইলেন; পুত্রের প্রতি তাঁহার শেষ উপদেশ ছিল—শত্রুর নিকট কখনও বিনম্র হইয়া নতিস্বীকার করিবে না। ইহার পর তিনি নিকট ও দূর-সম্পর্কীয় সগোত্র অসগোত্র আত্মীয়-বান্ধবগণকে যুদ্ধার্থ আমন্ত্রণ করিলেন; বুন্দী হাড়াবংশের জননী; কোটার চারিজন রাজপুত্র ধর্মাতের যুদ্ধে প্রাণ দিয়াছে; পঞ্চম কুমার দেহে অস্ত্রচিহ্ন ধারণ করিয়া অপার যশের অধিকারী হইয়াছে; ইহার দ্বিগুণ ত্যাগ ও বিক্রম দেখাইতে না পারিলে বুন্দীর নাক কাটা যাইবে। খুড়া * খুড়তুতো ভাই, ভাইপো-ঘরের নাতি, আপন ভাই ও পুত্র বুন্দীরাজ বংশের এই চারি পুরুষ যুদ্ধে ছত্রশালের অনুগামী হওয়ার জন্য প্রস্তুত হইলেন; কুমার ভগবন্ত সিংহ পিতার আদেশে আওরঙ্গজেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বুন্দী চলিয়া আসিলেন।
কাকা হরিসিংহ, কাকা মহাসিংহ প্রমুখ অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ জ্ঞাতিবন্ধুগণের সহিত বিবাহের সাজে সজ্জিত হইয়া রাও ছত্রশাল আবার যেন নবযৌবনের উন্মাদনায় আত্মহারা হইয়াছেন। ইঁহাদের সকলের হাতে বিবাহের মঙ্গলসূত্র; পরিধানে কেসর-বস্ত্র, গায়ে ঝলমল জড়োয়া পোশাক, মাথায় টোপর; টোপরের নীচে কাঁধ পর্যন্ত সাদা চুলের বাহার। বিবাহের বরসজ্জায় সে যুগেও বৃদ্ধেরা নীলের রঙে প্রস্তুত চুলের কলপ লাগাইয়া বয়স চুরি করিত; কিন্তু এইবার কেহ কলপ মাখেন নাই; কারণ উহা অপবিত্র, মরণের সময় নীলের রঙ স্পর্শ করিতে নাই। বিবাহসজ্জার দ্বিতীয় ব্যতিক্রম হইল যোদ্ধৃগণের পায়ে সোনার কড়া বা রাজপুতের “রণলংগর”; ইহা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পিছপা না হইবার প্রতিজ্ঞাসূচক চিহ্ন—আভরণ নহে। বালক, বৃদ্ধ, তরুণ সকলের গায়ে বরের পোশাক, আতরের সুগন্ধ, সর্বত্র আনন্দের হিল্লোল, কোথায়ও ভয় কিংবা বিষাদের চিহ্ন নাই, পুরনারীগণ মঙ্গল-উৎসবে গা ঢালিয়া দিয়াছে। যাত্রার পূর্বরাত্রিতে প্রিয়তমা রানি সুরজকুমারী স্বর্গে পতিকে প্রত্যুদ্গমন করিবার জন্য পূর্বেই চিতারোহণের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন—ইহা শোক বা অভিমান নহে, অতি বাস্তব জ্বলন্ত বিশ্বাস, নচেৎ হিন্দু নারী সজ্ঞানে হাসিমুখে চিতায় পুড়িয়া মরিবার শক্তি পাইবে কোথায়? রাও ছত্রশাল রানিকে নিরস্ত করিয়া বলিলেন, “আগে আমি, পশ্চাতে তুমি; ইহার ব্যতিক্রম হইলে অপযশ হইবে।”
বুন্দীর জনবল এবং রাজভাণ্ডার প্রায় নিঃশেষ করিয়া রাও ছত্রশাল যুদ্ধের আয়োজন করিতেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহতের তালিকায় দেখা যায় এই অভিযানে রাজপুত, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র, পাঠান, সকল জাতি ও বর্ণ অংশগ্রহণ করিয়াছিল। তাঁহার দ্বাদশ শ্বশুরকুলের কুটুম্বগণ, রাঠোর, শিশোদিয়া, গৌর, বড়গুজর, সোনিগরা, ভাটী কচ্ছবাহ অখণ্ড যশ ও স্বর্গলাভের আকাঙ্ক্ষায় বুন্দী বাহিনীর সহিত সোৎসাহে যোগদান করিলেন। সোলাঙ্কী সুরজমল (ছত্রশালের শ্যালক), খিচী গোবর্ধন দাস, ভাটী জৈত সিংহ ও মালদেব চন্দ্ৰাবত (শিশোদিয়া), মুহুকম সিংহ, রাঠোর চন্দ্রসিংহ ও রূপসিংহ, চালুক্য লালসিংহ, ঝালা শ্যামসিংহ ও বিহারী দাস, মোহিমুকুন্দসিংহ, পুরীহর (প্রতিহার) পরশুরাম, বড়গুজর কনক সিংহ, কচ্ছবাহ কিশনসিংহ ও আজরসিংহ, তোমর প্রতাপসিংহ, পরমার জয়সিংহ, বাঘেলা ভীমসেন, দেবরা দলেলসিংহ, গৌর সদানন্দ শিবরাম ও ভীমসিংহ, দহিয়া বিজয়সিংহ ও রামসিংহ, ছত্রশাল-মুকুন্দ প্রমুখ তেরো জন ভাদোরিয়া, সোনিগরা হরিসিংহ, জাদব বিজয়পাল প্রভৃতি বীরগণ সানুচর বুন্দীর পতাকাতলে সমবেত হইলেন; ইহারা শুধু নাম নহেন, চারণগীতির উল্কাপুঞ্জ নির্বাণের পথে চলিয়াছেন। পাঠান সামন্ত দলেল খাঁ, আলী খাঁ, দায়ুদ খাঁ, মীর খাঁ, করীম খাঁ, তুর্কী রহিমবেগ, পালোয়ান শেখ কাদের প্রভৃতি তেরোজন খ্যাতনামা মুসলমান জায়গীরদার বুন্দীর মানরক্ষার জন্য শয়তানের সহিত লড়াইয়ে হাটবার পাত্র নয়—ইহাদের মধ্যে কেহই ফিরিয়া আসে নাই।
বুন্দীর পুরোহিত, ভাট, কায়স্থ, শূদ্র অসি চালনায় অপটু নহে, মরণকে তাহারাও রাজপুতের মতো তুচ্ছ করে; আজীবন যাহারা বিশ্বস্তভাবে বুন্দীর সেবা করিয়াছে তাহারা রণক্ষেত্রে প্রভুর সান্নিধ্য ত্যাগ করিতে অসম্মত হইয়া মৃত্যুর পরপারেও বুন্দীপতির অনুগমন করিবার জন্য উৎসাহী হইল। ব্রাহ্মণ যোগীরাম ও বলরাম; বৈশ্যলাল, হরি, রত্ন ও ক্ষেম; জলধারী (পানীয় রক্ষক) ব্রাহ্মণ সদানন্দ, উদাগুজর (চৌকিদার?), খেমা মালী, নাথু ইত্যাদি পাঁচ জন শূদ্র পরিচারক, সাত শত দরবারী খিদমতগার (আঁটা-সোটা ধারী, চামর ছত্রবাহক ইত্যাদি) সঙ্গে চলিল—ইহারাও ক্ষত্রিয় বিক্রমে যুদ্ধ করিয়া স্বামিঋণ মুক্ত হইয়াছিল, বুন্দীর চারণ কবি শ্রদ্ধার সহিত ইহাদের স্মৃতি রক্ষা করিয়াছেন। হিন্দুজাতি তখনও আত্মার অমরত্ব ও স্বর্গলাভে বিশ্বাস হারায় নাই, গীতার “হতো বা প্রাপ্স্যসি স্বর্গং জিত্বা বা ভোক্ষ্যসে মহীম্”—বাণী ভুলিয়া দেহ-সৰ্বস্ববাদী হয় নাই। (চলবে)