ষোড়শ অধ্যায়
গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়
সামুগঢ়ের যুদ্ধ (২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ)
আট
২০শে এপ্রিল (১৬৫৮) উজ্জয়িনী ত্যাগ করিয়া আওরঙ্গজেব পূর্বদিকে দোরাহা (ভূপালের কয়েক মাইল উত্তরে) পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া উত্তরমুখী গোয়ালিয়রের রাস্তা ধরিয়া ধীরগতিতে অগ্রসর হইতে লাগিলেন এবং এক মাস পরে (২১ মে) গোয়ালিয়র পৌঁছিলেন। আওরঙ্গজেবের এই মন্থর গতির কূটনৈতিক কারণ ছিল। গোয়ালিয়র অত্যন্ত সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত বাদশাহী দুর্গ, দুর্গরক্ষক নাসিরী খাঁ বিখ্যাত যোদ্ধা এবং সম্রাটের বিশ্বস্ত আমীর; অথচ অবিজিত গোয়ালিয়র পশ্চাতে রাখিয়া আগ্রার পথে ধোলপুর ঘাটে চম্বল নদী পার হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং প্রায় অসম্ভব। দারা আশা করিয়াছিলেন গোয়ালিয়র অবরোধ করিয়া হস্তগত করিতেই বিদ্রোহী ভ্রাতাদ্বয়ের কয়েক মাস লাগিয়া যাইবে, ইতিমধ্যে বর্ষা নামিবে এবং পুত্র সুলেমান মুঙ্গের হইতে আগ্রায় ফিরিবার অবকাশ পাইবে; কিন্তু আওরঙ্গজেবের কূটনীতি নিতান্ত অপ্রত্যাশিত ভাবে বাদশাহী হিসাব বানচাল করিয়া দিল, গোয়ালিয়র পৌঁছিবার পূর্বেই তাঁহার জন্য দুর্গদ্বার উন্মুক্ত হইয়া রহিল। পথে আওরঙ্গজেব নাসিরী খাঁর কাছে বিশ্বাসী দূত মারফত চিঠি লিখিয়া জানাইলেন তাঁহার পরলোকগত পিতার “খান-দৌরাঁ” খেতাবসহ পাঁচ হাজারী মনসব তাঁহারই জন্য অপেক্ষা করিতেছে। উভয়পক্ষে সংবাদ বিনিময় ও কথাবার্তা পাকা হইতে কিছু সময় লাগিয়াছিল, না-হয় ইচ্ছা করিলে তিনি দশ দিনেই উজ্জয়িনী হইতে ঝড়ের বেগে গোয়ালিয়র পৌঁছিতে পারিতেন। নাসিরী খাঁ গোড়া মুসলমান, শাহজাহানের প্রতি অনুরক্ত হইলেও দারাকে তিনি আওরঙ্গজেবের নজরেই দেখিতেন। আওরঙ্গজেব উপস্থিত হওয়া মাত্র তাঁহার হাতে দুর্গ সমর্পণ করিয়া নাসিরী খাঁ বাদশাহী ফৌজ লইয়া দারার বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইলেন।
অন্য কারণ, সম্রাটের মনের উপর ধর্মাত যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া আগত হওয়ার জন্য আওরঙ্গজেব ধীর-গতিতে সৈন্যচালনা করিতেছিলেন। তাঁর “পঞ্চমবাহিনী” পূর্ব হইতেই সম্রাটের দরবারে অনুপ্রবিষ্ট ছিল; উহার মারফত যুদ্ধের পর শাহজাহানের সংশয়াচ্ছন্ন দ্বৈধীভাব এবং কোন কোন সময় দারার যুদ্ধচেষ্টায় বিরক্তি ও স্পষ্ট অনিচ্ছাপ্রকাশ ইত্যাদি সংবাদ তিনি অবিলম্বে জানিতে পারিলেন, পিতার নাড়ির গতি লক্ষ্য করিয়া ভ্রাতার যুদ্ধায়োজন শিথিল করিবার জন্য আওরঙ্গজেব পিতার কাছে লিখিলেন, দারাই শাস্তির বিরোধী, তাঁহার কোনও দোষ নাই। ধর্মাতের যুদ্ধের পর ভগ্নী জাহানারা আওরঙ্গজেবকে লিখিলেন, “আর অগ্রসর হইও না, দরবারে তোমার দাবি পেশ কর”; শাহজাহান নিজের হাতে ফরমান লিখিয়া পাঠাইলেন “দাক্ষিণাত্যে ফিরিয়া যাও, উহার পাঁচসুবা তোমার।” আওরঙ্গজেব পিতার দুর্বলতা বুঝিতে পারিয়া প্রত্যুত্তরে জানাইলেন, “কদমবোসী করিবার জন্য এত কাছে আসিয়া ফিরিয়া যাওয়ার প্রশ্ন উঠিতে পারে না; দাদাভাই দীর্ঘকাল দরবারে খেদমত করিয়াছেন, তাঁহাকে নিজ-সুবা লাহোরে পাঠাইয়া আমাকে ও ভাই মোরাদকে কিছুকাল আপনার সেবার অধিকার দিলেই বিরোধ চুকিয়া যায়।”
ছন্নমতি সম্রাট ইহাতে আরও বিভ্রান্ত হইয়া আপোসমীমাংসার জন্য উদ্গ্রীব হইলেন; একবার ভাবিলেন, উত্তম প্রস্তাব – পুত্রদ্বয়কে আগ্রার রাস্তা ছাড়িয়া দিলে ক্ষতি কি? ছেলেরা আমার অবাধ্য হইবে না, আমি হুকুম করিলে দারাকে পূর্ববৎ আমার কাছে রাখিয়া তাহারা নিশ্চয়ই কয়েকদিন পরে নিজ-নিজ সুবায় চলিয়া যাইবে; কখনও বলিতেছিলেন স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে যাইয়া পুত্রগণকে অস্ত্রত্যাগ করিতে বাধ্য করিবেন। যুদ্ধক্ষেত্রে গেলে তিনি কিনা যুদ্ধেই মহাবত খাঁর হস্তে সম্রাট জাহাঙ্গীরের দশাই প্রাপ্ত হইতেন; আওরঙ্গজেব মহাবত খাঁ নহেন, কোহিনূরের বদলে তিনি পিতার পদধূলি লইয়া নিশ্চয়ই দৌলতাবাদে ফিরিয়া যাইতেন না। দরবারে বসিয়া দিল্লীশ্বর যখন এইরূপ প্রলাপ বকিতেছিলেন, তখন দারার অগ্রগামী সেনা বড়বড় শাহীতোপ লইয়া আগ্রা হইতে আনুমানিক ত্রিশ মাইল দক্ষিণে, গোয়ালিয়র হইতে চল্লিশ মাইল উত্তরে ধোলপুরে যুদ্ধার্থ প্রস্তুত, দারা পিতার নিকট হইতে বিদায় লইবার জন্য অস্থির। অবশেষে সম্রাট একদিন মন্ত্রকক্ষে তাঁহার মানিকজোড় ভায়রাভাই খলিল-উল্লা খাঁ ও জাফর খাঁ, রাজশ্যালক শায়েস্তা খাঁ এবং উচ্চপদস্থ ইরানী ও তুরানী আমীরগণকে তলব করিলেন, রাও ছত্রশাল তখনও সম্ভবত আগ্রা পৌঁছেন নাই। বিরুদ্ধমুখী চিন্তাধারার সংঘাতে সম্রাটের বুদ্ধি প্রায় লোপ পাইয়াছিল; আসন্ন যুদ্ধের মুখে তিনি আওরঙ্গজেবের চিঠির দ্বারা প্রতারিত হইয়া এই সমস্ত নিমকহারামের সহিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন; তাঁহারা আলাহজরতের মুখে এই শান্তির বাণী শুনিয়া প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইলেন, এই সর্বনাশা জল্পনা যাঁহাদের মনঃপুত হইল না তাঁহারা চুপ করিয়া রহিলেন; মুখের উপর বাদশাহী মর্জির খেলাপ কিছু বলিবার সাহস কাহারও হইল না। কিছুক্ষণ বাগবিতণ্ডার পর কথার মারপ্যাচে দারার মাথা গরম হইয়া উঠিল; মেজাজ ও জিহ্বার উপর রাশ টানিয়া ধরিতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না; রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারাইয়া দারা বলিয়া ফেলিলেন, লড়াই করিবার যদি কাহারও হিম্মত না হয়, রাও ছত্রশাল হাড়া ও মীর আতস জাফর আওরঙ্গজেব মোরাদকে একজোড়া খরগোশের মতো নর্মদা নদীর অপর পারে তাড়াইয়া যাইবে! ইরানী তুরানীর বুকে এই শ্লেষ তীরের ন্যায় বিধিয়া রহিল, আওরঙ্গজেবের কূটনীতি দারাকে পঙ্কে পাতিত করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিল। (চলবে)