সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
এক
জ্যৈষ্ঠ মাস, ১৮ই মে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ। বৃদ্ধ সম্রাট শাহজাহানের প্রৌঢ়া প্রেয়সী আগ্রানগরী উৎসবের অপূর্ব সজ্জায় অভিনব যৌবনশ্রী ধারণ করিয়া আনন্দকোলাহলে মুখর ও কর্মচঞ্চল; প্রতি গৃহচূড়ায় ছাদে অলিন্দে উড্ডীয়মান উৎসবপতাকার রূপের তরঙ্গ, বাহিরে উল্লাসের হিল্লোল, ভিতরে বিসর্জনের হর্ষ-বিষাদ।
আজ শাহজাদা দারা এবং তাঁহার সহযাত্রী সেনানী ও সামন্তবর্গের আনুষ্ঠানিক ভাবে যুদ্ধার্থে বিদায় লইবার দিন; অপরাহ্ণে আগ্রা দুর্গের প্রকাশ্য দরবারে তাঁহারা অভ্যর্থিত ও পুরস্কৃত হইবেন। কালবৈশাখী এইবার নববর্ষের “নওরোজ” উৎসব পণ্ড করিয়াছিল, ধর্মাতের যুদ্ধে দারার ভাগ্য-বিপর্যয়ই এই ঝড়ের প্রথম তাণ্ডব। নিয়তির অসিত যবনিকার অন্তরালে আশা-মরীচিকায় পুনঃপ্রলুব্ধ পিতাপুত্ৰ ইতিমধ্যেই পরাজয়ের গ্লানি ও আশঙ্কা মুক্ত হইয়াছেন। শঙ্কাকুল প্রজাগণকে আশ্বস্ত করিবার জন্য সাম্রাজ্যের পূর্ণ সামরিক শক্তি ও ঐশ্বর্যভাণ্ডার প্রিয় পুত্রের বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষে লোকচক্ষুর গোচর করিবার সপ্তাহব্যাপী বিরাট আয়োজনের আজ পরিসমাপ্তি।
আগ্রা দুর্গে ভোরের নহবত বাজিয়া উঠিতেই শহরের ভিতরে বাহিরে, সেনাশিবিরে এবং গৃহস্থবাড়িতে সমানভাবে হাঁকডাক ও কাজের সাড়া পড়িয়া গিয়াছে। সিপাহী সওয়ার তল্পিতল্পা গুটাইয়া ও জিন কষিয়া যাত্রার জন্য প্রস্তুত, কেহ কেহ “পেশখানা”র লটবহরের পাহারায় দক্ষিণে ঢোলপুরের রাস্তায় চলিয়া গিয়াছে, বাদবাকি শহরে মেলা কিংবা দরবারের তামাশা দেখিবার আশায় কিংবা সফরের প্রয়োজনীয় সওদা খরিদ করিবার জন্য ধীরে-সুস্থে শহরের দিকে চলিয়াছে। বেলা চড়িবার সঙ্গে সঙ্গে শহরের অলিগলি চক-চতুষ্পথ ছায়াঘন পুরোদ্যানসমূহে সুসজ্জিত যোদ্ধা ও উৎসুক জনতার জোয়ার আরম্ভ হইয়াছে। যুদ্ধযাত্রার পূর্বে মনসবদার হইতে সিপাহী সহিস ভিত্তি পর্যন্ত সকলেই অগ্রিম বেতন ও ভাতা পাইয়াছে; হাতে কাঁচা পয়সা ও সিপাহীগিরির আমেজ, সুতরাং মরণের মুখে নিদাঘ-মধ্যাহ্ন তাহাদের কাছে শ্রাবণের ঝুলন-সন্ধ্যা। মোগলের আগ্রা সেকালে বোগদাদ কর্দোভা কাহেরাকে (Cairo) সৌন্দর্যের অতীত স্বপ্নে পরিণত করিয়াছে; ইরানের ইস্পাহান শহর আগ্রার অর্ধাঙ্গের সমান নয়। মধ্যাহ্নেও আগ্রার বড় বড় রাস্তায় ছায়ার অভাব নাই; যে শহরে ২০০ শত তুর্কীহামাম, ৭০টা বড় মসজিদ মকবরা, ১৫টা শাহীবাগ, উক্তসংখ্যক পাকা চকবাজার, মাঝে মাঝে দুই দিকে সুপ্রশস্ত রাস্তায় পাকা ছাদের নিচে পোয়া মাইল লম্বা নিরবচ্ছিন্ন ছায়া, সেখানে নিদাঘ মধ্যাহ্নে মেলা জমিবে আশ্চর্য কি? যাহারা বাহির হইতে ফৌজে ভর্তি হইয়াছে তাহাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো শহর দেখে নাই; দেখিয়া থাকিলেও রাজধানীর মোগলাই ঠাট দেখে নাই, সুতরাং রাজপথে গ্রামীণ দেহাতি সিপাহীর জঙ্গলী বে-তমিজী, বেকুব চাহনি, সর্বত্র বেপরোয়া নাসাপ্রবেশ এবং ধমক খাইয়া ভ্যাবাচ্যাকা ভাব কৌতুকপ্রিয় নাগরিকগণের হাসির খোরাক জুটাইয়া চলিয়াছে, শহরের যাহারা ধড়িবাজ তাহারা দাঁও মারিবার মতলবে বাহির হইয়া পড়িয়াছে। বড় বড় রাস্তার দুই ধারে ছাদের তলায় গাছের নীচে, কোথায়ও বা মোটা ময়লা চাঁদিনার ছায়ায় দোকানপসার ঠক-জুয়াচোর বসিয়া গিয়াছে। যেখানে মানুষ সেখানেই হই-হুল্লোড়, মেলার ভিড়, তামাশা-ঠকবাজি, বাজিকরের বাঁশ-পেটরা ডুগডুগি, বেদের ঝাঁপি ও বাঁশি, তামাশাওয়ালার দড়ি-বাঁধা মোগলাই পোশাকে বাঁদর মিয়া-বিবির আশনাই, তরমুজ খরমুজার ফালি, গরম গরম বাসি শিককাবাব, রুপালী তবকমোড়া হালুয়াইর পচা মিঠাই, লোভনীয় “দহি-বড়া”-র কাঠের থালার উপর মানুষে-মাছিতে লড়াই, হজমী “সোঁঠ-কা পানি”র মটকা ও তেলেভাজা কচুরির ঝুড়ি, পান-শরবত ও বারোয়ারি হুঁকা-চিলমচির কড়া ধোঁয়ায় আরামের অপূর্ব পরিবেশ। ইহার কাছেই তালপাতার বড় ছাতা কিংবা টাটের নীচে ত্রিকালজ্ঞ তিলক কাটা যোশীর (জ্যোতিষী) পঞ্জিকা-রাশিচক্র ও পাশা, সাদা পাগড়িওয়ালা নজুমীর (মুসলমান গণৎকার) দাড়ি দোয়া তাবিজ ও ইউনানী ছক, অথর্ব ফিরিঙ্গির সামুদ্রিক মানচিত্র ও কম্পাসের দৌলতে লোকের ভাগ্যগণনার ফিকির, কোথাও বা ভণ্ড ফকির-দরবেশের বত্রিশতালি বিচিত্রিত ময়লা খিরকা জোব্বা ও আল্লার নামে খয়রাতের চিৎকার, রাস্তার আসরে গলিত-যৌবনা নাচওয়ালীর নীল-সবুজ ঘাঘরার পেখম সোনালি “আঙ্গিয়া” কুর্তি বাসন্তী রঙের ওড়নায় জরির ঝলমল বাহার, চোখে সুরমা দাঁতে মিশি গায়ে গিল্টির গয়না, হাবভাবের অপচেষ্টা, ফাটা গলা ও পা-জেব-ঘুংঘুরুর আওয়াজ; তবুও খরিদ্দার- সমঝদারের অভাব নাই। পরকাল সর্বস্ব হিন্দু সিপাহী দুপুর রোদে মেলার ভিড়ে পথের শেষ সম্বল খুঁজিতে খুঁজিতে কুমহারের মাটির পুতুলের ঝাঁকার উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে; কিষণজী সীতারামজী ও হনুমানজীর উপর দাম-কষাকষি চলিতেছে, দাড়ি ফেলিয়া দেবতাকে ভক্তিভরে পাগড়ির ভাঁজে রাখিতেছে; হরেকরকমের মালার দোকানে ভিড় লাগিয়া গিয়াছে, মালা ছাড়া মুক্তি নাই, সুতরাং কেহ গলায় কেহ হাতে মালা ঝুলাইয়া ভাবনাহীন-চিত্তে আনন্দ-সাগরে ভাসিয়া হাতি পোলের চকে চলিয়াছে।
[“The Moghul… delights not so much in any as Agra…it is at least twice as big as Ispahan, and it is as much as a man to ride about it on horse-back in a day…Its streets are fair and spacious, and there are some of them vaulted, which are above a quarter of a League in length…There are fifteen maidans and bazars, whereof the most spacious is that which is before the Castle. There are in the City fourscore Caravanseras…with very noble Lodgings, Stonehouses, Vaults and Stables…a great number of Metschid…among the rest seventy are great ones…
There are numbered in the city of Agra above eight hundred Baths or Hothouses…these places are frequented by an infinite number of persons…
The great Lords about the Court,… have their Houses and Palaces in the City, besides their Country-houses, all magnificent, as to structure and house- hold stuffe.
(The Travels of John Albert de Mandelslo, Second Edition, 1669, London; Book III, pp. 30-31)] (চলবে)