সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
দুই
দিল্লি হইতে বাদশাহী রাস্তা আগ্রা শহরের উপর দিয়া দুর্গের উত্তর-পশ্চিমে দিল্লি তোরণ (হাতিপোল দরওয়াজা) বামে রাখিয়া অর্ধচন্দ্রাকারে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে “আকবরী- দরওয়াজা”র (বর্তমানে অমরসিংহ ফাটক) [আকবর বাদশাহ-র সময়ে ইহাই বোধ হয় আজমীর দরওয়াজা ছিল। তাঁহার মৃত্যুর পর ইহার প্রচলিত নাম “আকবরী দরওয়াজা” কাজিম-রচিত আলমগীর নামায় পাওয়া যায়। Kazim, Alamgirnama, Pers, text, p 423] বাহিরে দ্বিমুখী হইয়াছে। ইহার এক শাখা ক্রমশ পশ্চিমে হেলিয়া শহরের বাহিরে আজমীরের দিকে চলিয়া গিয়াছে, অপর শাখা সোজা দক্ষিণে ধোলপুর-গোয়ালিয়র হইয়া মালব ও দাক্ষিণাত্যে বহুমুখী হইয়াছে। পূর্বে যমুনা নদী এবং শহরের ভিতর এই রাজমার্গের দ্বারা বেষ্টিত লোদী দুর্গের ধ্বংসস্তূপের উপর আকবর বাদশাহ আগ্রা দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন। এই দুর্গ মধ্যযুগে ভারতীয় সামরিক স্থপতিবিদ্যা ও চারুকলার শ্রেষ্ঠতম অবদান; নির্মাণ-কৌশল, প্রশংসনীয় রুচি, অনুপম সৌন্দর্য এবং অপ্রধৃষ্য রাজসিক গাম্ভীর্যে সেকালে ইহার তুলনা ছিল না। প্রশস্ত পাষাণ পরিখারক্ষিত ‘প্রাকার-ত্রয়’ শোভিত মোগলের রক্তবসনা রাজলক্ষ্মীর ন্যায় এই রাজদুর্গ আগ্রা নগরীর উত্তমাঙ্গস্বরূপ; দুর্গমধ্যে রক্তপ্রস্তর নির্মিত আকবরীমহাল (অধুনা জাহাঙ্গীরীমহল নামে মিথ্যা পরিচিত) ইহার আরক্তিম মুখচ্ছবি; শাহজাহানের মর্মরসৌধরাজি-মোগললক্ষ্মীর পত্রকরচনা, মোতি-মসজিদ ললাটের রত্নতিলক; বাহিরে যমুনার বঙ্কিমনীলধারার কুটিল কবরীর উপর শোভমান নশ্বর-সৌন্দর্যের অম্লানমুকুটমণি তাজমহল।
অসমভুজ অর্ধবৃত্তাকার দেড় মাইল পরিধি বিশিষ্ট আগ্রা দুর্গের পাদদেশে পাকা শান-বাঁধা বিশ হাত প্রস্থ সুগভীর পরিখা যমুনার জলে সেকালে কানায় কানায় ভরা থাকিত। এই পরিখা দুর্গকে তিনদিক সুরক্ষিত করিয়া পূর্বদিকে যমুনার সৈকতভূমি পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। ইহার বাহিরে আকবরশাহী আমলের বিপুলায়তন ভীমাকৃতি উচ্চ মৃত্তিকাপ্রাচীর।[যশোবন্ত কর্তৃক বন্দী শাহজাহনকে আগ্রা দুর্গ হইতে মুক্ত করিবার বিফল চেষ্টার পর সাবধানী আওরঙ্গজেব এই মাটির রক্ষা প্রাচীরকে লাল পাথরে বাঁধাইয়া এক উপদুর্গ প্রস্তুত করিয়াছিলেন এবং উহার বাহিরে আর একটি কাঁচা পরিখা কাটিয়া উহাকে হঠাৎ আক্রমণের আশঙ্কামুক্ত করিয়াছিলেন। (দ্রষ্টব্য — Kazim’s Alamgirnama, Pers, text p. 423) আসল মাটির প্রাচীর সম্ভবত মোরি-দরওয়াজা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।] প্রাচীরের মাঝে মাঝে লাল পাথরের বুরুজ ও কামান বসাইবার প্রাকার-বেদী, শীর্ষদেশে রক্ত-প্রস্তর নির্মিত প্রাকার ফালিকা সারির অন্তরালে রক্ষীসেনার সঞ্চরণভূমি (মাচী)। ইহার উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণদিকে অন্তঃদুর্গের হাতিপোল ও আকবরী দরওয়াজার মুখোমুখি দুইটি সুদৃঢ় তোরণ ওই নামেই পরিচিত ছিল (বর্তমানে নিশ্চিহ্ন)। বাহিরের দিকে বাদশাহী সড়ক ও প্রাকারের মধ্যবর্তী স্থানে মাটির প্রশস্ত চত্বর। এই চত্বরের উপর সারি সারি তাঁবু, মনসবদারী অশ্বসাদির পালাক্রমে ‘হপ্তচৌকি”র প্রথম চৌকির কড়া পাহারা। সম্রাট শাহজাহান হাতিপোল দরওয়াজার মুখোমুখি মৃত্তিকা-প্রাকারের তোরণের বিপরীত দিকে রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে এক ত্রি-ফোলিয়া ফাটক এবং উহার সম্মুখে এক পাকা চক নির্মাণ করিয়াছিলেন। এই ফাটকের উপরে শাহী নহবতখানা, নীচে তিনটি সূচীমুখ খিলানের দ্বারা আবৃত ত্রিধা-বিভক্ত প্রবেশদ্বার (স্মৃতি ব্যতীত অন্য কিছুই বর্তমানে অবশিষ্ট নাই) [District Gazetteers of U.P., Vol. VII (Agra), p. 202.]
দুর্গের, পাকা পরিখার কিনারা ঘেঁষিয়া উঠিয়াছে ৬৫ ফুট উচ্চ লাল পাথরে গাঁথা দ্বিতীয় প্রাকার বলয় (Curtain)। ইহার স্থানে স্থানে সুবৃহৎ কোট্টগুল্মক (বুরুজ), প্রাকারশীর্ষে কামান বসাইবার প্রাকার বেদিকা, প্রাচীরের গায়ে অর্ধাবৃত বাহিরের দিকে নিম্নমুখী সারি সারি প্রাকার রন্ধ্র; প্রাচীরের উপরের দণ্ডায়মান যোদ্ধৃগণকে শত্রুর লক্ষ্য হইতে আড়াল করিবার জন্য প্রাকার পালিকার (rampart) সুরম্য রক্ষাবেষ্টনী। এই প্রাচীর পরিখা ও বাহিরের মাটির প্রাকার ছাড়াইয়া পূর্ব দিকেও দুর্গকে বেষ্টিত করিয়া বৃত্তাকারে নির্মিত হইয়াছিল। ইহার উত্তর-পশ্চিমে দিল্লিতোরণ (হাতিপোল), উত্তরে মোরি দরওয়াজা [এই দরওয়াজার স্পষ্ট উল্লেখ না থাকিলেও অনুমান করিয়া লইতে হইবে; কারণ দুর্গের জঞ্জাল ও ময়লার গাড়ি অন্য কোনও ফটক দিয়া বাহির করিবার সম্ভাবনা ছিল না। দিল্লি এবং অন্যান্য শহরে সেকালে ইহার জন্য একটি অপরিসর মোরি-দরজা ছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে আগ্রা দুর্গরক্ষী কৃপণ খোজা মাতবর খাঁ বার্ষিক দশ হাজার টাকায় এই জঞ্জাল ইজারা দিত (ম্যানুসী বলেন, শুধু হাতির লাদ বিক্রি করিয়া এই টাকা লইত)।] (wicketgate), পূর্বদিকে খিজিরী দরওয়াজা (watergate), শাহবুরুজের নীচে দর্শন দরওয়াজা এবং দক্ষিণ-পূর্বদিকে আজমীরি দরওয়াজা (পরে আকবরী ও বর্তমানে অমরসিংহ ফটক নামে পরিচিত)। বাহিরে মাটির প্রাচীরের দিল্লি ও আকবরী ফটক এবং এই দ্বিতীয় প্রস্তর-প্রাকারের উক্ত নামে পরিচিত তোরণদ্বয়ের মধ্যে পরিখা অতিক্রম করিবার জন্য মজবুত মোটা তক্তার টানা সেতু (draw-bridge)। দ্বিতীয় পাকা প্রাচীরের ফটক পার হইবার পর প্রায় ৪০ ফুট শানবাঁধানো চালু রাস্তা চড়িয়া উপরে উঠিলেই আসল দিল্লি দরওয়াজা বা হাতিপোল এবং আকবরী দরওয়াজা। এই প্রাচীরের পরে দুর্গের সর্বাপেক্ষা সুদৃঢ় এবং সুমসৃণ লাল পাথরের দশ ফুট চওড়া শেষ প্রাচীর। ভূমিতল হইতে এই প্রাকারের উচ্চতা ১০৫ ফুট এবং নিম্নস্থ পাষাণ প্রাকারের শীর্ষদেশ হইতে ৪০ ফুট উচ্চ। এই দুই প্রাকারের মধ্যবর্তী অপরিসর স্থানে মাটির ঢালু এবং অসমান উপসর্পণ-পথ। দুর্গের তোরণসমূহ প্রত্যেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ উপদুর্গ (redoubt) বিশেষ। দিল্লি বা হাতিপোল দরওয়াজার দুই পার্শ্বে অতিকায় আকাশচুম্বী সুরম্য গম্বুজ ও “ছত্রী” শোভিত ভীষণ “ভীষণ রমণীয়” কোট্টগুল্ম; উহার বহির্ভাগ হইতে দুইটি আড়াআড়ি পাকা প্রাচীর নিম্নস্থ প্রাকারের ফটককে যেন সজোরে টানিয়া ধরিয়াছে। ঢালুর নিচে ও উপরের ফটকের মধ্যবর্তী সমতল চত্বরে মর্মরবেদীর উপর দুই দিকে দ্বার-প্রতিহারের ন্যায় কৃষ্ণপ্রস্তরখোদিত বিরাট বারণ-যুগল (আওরঙ্গজেব কর্তৃক ভগ্ন ও ইংরেজ আমলে স্থানান্তরিত)––তখন পর্যন্ত আকবরশাহী আমলের আর্যসংস্কার এবং পুনর্জীবন প্রাপ্ত ভারতীয় ভাস্কর্যশিল্পের মহিমার মৌন সাক্ষীরূপে দণ্ডায়মান। এই হাতিপোল দরওয়াজার উপরে শাহী “নক্কারখানা” (বাদ্যভাণ্ডাগার), “আলমখানা” (ধ্বজ পতাকাগার), বালুঘড়ি ও জলঘড়ি, রাজকীয় সময় রক্ষক জ্যোতিষী-নজুমীর কক্ষ, দুর্গপালের দপ্তর ইত্যাদি অবস্থিত; এই স্থান হইতে সময়জ্ঞাপক বড়দামামা বাজিয়া উঠিলেই ভিতরে বাহিরে প্রত্যেক ফটকের নহবতখানা হইতে বাদ্যধ্বনি হইত। এই প্রাকারের গায়ে মাঝে মাঝে উপরে উঠিবার সিঁড়ি, প্রাচীর-শীর্ষে যোদ্ধৃগণের উপসর্পণমার্গ, প্রত্যেক বাঁকে বড় বড় কামান-সজ্জিত কোট্টগুল্ম, গাত্রে প্রাকাররন্ধ্র; অনুচ্চ “মাচী”র (rampart) উপর প্রাকার ফালিকার প্রস্তর মালিকা (battlement)। এই প্রাকারে রক্ষীসেনা ও আহদী বরকন্দাজ ও ফিরিঙ্গি গোলন্দাজগণের অষ্টপ্রহর সজাগ পাহারা। দুর্গের ভিতরে হপ্তচৌকির দ্বিতীয় হইতে পঞ্চম চৌকির অশ্বসাদিগণ প্রাকারের নীচে দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ানখানা (কাছারি) ও কারখানাগুলির চারিধারে মোতায়েন হইয়াছে; দেওয়ান-ই-খাস ও অন্দরমহলের বাহিরে রাজপুত চৌকির তাঁবু।
দিল্লি-তোরণের বাহিরে বাম দিকে দুর্গপালের বাসগৃহ, উহার পর প্রাচীর বরাবর বাদশাহী অস্ত্রাগার, মোটা-সরঞ্জামের কারখানা, শিকারখানার পশুশালা, সম্রাটের হস্তীশালা, অশ্বশালা, উট্টশালা, গোসালা ইত্যাদি পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ক্ষুদ্র “মোরি” দরজা বা জঞ্জাল নিকাশের ফটক পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে; দক্ষিণ দিকে প্রাচীরের নীচে প্রহরীগণের চলাচল রাস্তা বাদে “মীনাবাজারে”র সুরম্য চত্বর। ভিতরে দিল্লি-তোরণ হইতে তরুবীথিশোভিত প্রশস্ত রাজমার্গ দুর্গকে প্রায় সমান দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া “আকবরী” দরজা পর্যন্ত (বর্তমান অমরসিংহ ফটক) চলিয়া গিয়াছে। এই রাস্তার পূর্বদিকে শাহীমহলের বহিঃপ্রাঙ্গণ, মাঝে মাঝে উদ্যান, এক প্রান্তে ইষ্টক-প্রাচীর ও তোরণসমন্বিত লালপাথরের আকবরী মহাল (পরবর্তী জাহাঙ্গীরী মহাল); পশ্চিম দিকে মীনাবাজারের দক্ষিণ হইতে পর পর বাদশাহী পোশাক-খেলাত প্ৰস্তুত করিবার দর্জির কারখানা, নানাপ্রকার চিকনকাজ, জহুরি স্বর্ণকার ইত্যাদির “কারখানা” (সরকারি কার্যস্থান)। রাস্তার প্রায় অর্ধপথে পূর্ব দিকে দেওয়ান-ই- আমের ময়দান, বিপরীত দিকে প্রাচীরবেষ্টিত সরকারি দপ্তর বা “দেওয়ানখানা”; এইখানে এক কোমর উচ্চ আমিরি দীবানের উপর উজির-আজমের বসিবার স্থান, নিচে ফরাশের উপর দপ্তর। দেওয়ানখানার পরে প্রধান কাজীর আদালত, পরে অন্যান্য বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট দেওয়ান বা আপিস (বর্তমানে ধূ ধূ মাঠ)। [দ্রষ্টব্য — 1. Ashraf Husain. Historical guide to the Agra Fort. 2. Latif, Agra Historical and Descriptive. chapter ii.] (চলবে)