সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
তিন
সম্রাট আকবরের সময় হইতে আগ্রা দুর্গের দিল্লি-দরওয়াজা বা হাতিপোল ফটকের সহিত কৃতিত্বের স্মৃতি ও সুমঙ্গলের সংস্কার জড়িত ছিল। এই তোরণ কেবলমাত্র সম্রাটের যাত্রা কিংবা কোনও শাহজাদা অথবা বৈদেশিক দূতগণকে সম্বর্ধিত করিবার জন্য উন্মুক্ত হইত, দৈনন্দিন কার্য এবং সর্বসাধারণের যাতায়াতের জন্য আকবরী দরওয়াজা (অমরসিংহ ফটক) খোলা থাকিত। বিদায়ের দিনে বিজয়-সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করিবার জন্য সম্রাট শাহজাহান আদেশ দিয়াছিলেন শাহজাদা দারা তাঁহার বিশিষ্ট সেনাধ্যক্ষগণের সহিত পূর্ণ সামরিক সজ্জায় শোভাযাত্রা সহকারে দিল্লি-তোরণ অতিক্রম করিয়া দরবারে উপস্থিত হইবেন এবং বিদায়ের পর আকবরী দরওয়াজার পথে জয়যাত্রায় বাহির হইবেন। এইজন্য দুর্গের বাহিরে ত্রি-পোলিয়া ফটকের সম্মুখে দারার অনুযাত্রী সামন্ত ও মনসবদারগণের অনুচরবর্গ শোভাযাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। ভোরের নহবত বাজিবার সঙ্গে সঙ্গেই আকবরী
দরওয়াজা দেওয়ানী সেরেস্তার কর্মচারী ও সরকারি অন্যান্য আমলা, অর্থী প্রত্যর্থী, দরবারী ও জনসাধারণের জন্য যথারীতি খোলা হইয়াছিল। সেকালে আম-দরবারের দিনে দুর্গে কাহারও প্রবেশ নিষেধ ছিল না; দুর্গের ভিতর শাহীরাস্তার ধারে ও ফাঁকা জায়গায় তামাশা ও কেনা-বেচার মেলা জমিয়া উঠিত। বিশিষ্ট অভিজাতবর্গের পর্দানশীন বেগমগণ দরবারের দিন সম্রাটের অন্তঃপুরে তদ্বির তদারক ও সুপারিশের মতলবে কিংবা দরবারের তামাশা দেখিবার জন্য যাইতেন, ভিতরে পুরনারীগণের দরবার বসিত; এই দরবারে সম্রাট-দুহিতা জাহানারা বেগম সম্রাজ্ঞীর স্থান গ্রহণ করিতেন, কনিষ্ঠা রৌশনারার ঈর্ষার আগুন ধূমায়িত হইত।
সম্রাট শাহজাহান শেষ বয়সে জাহানারাকে দুর্গের বাহিরে তাঁহার নিজস্ব প্রাসাদে বাস করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন। তিনি সাধারণত অধিকাংশ সময় পিতার কাছেই থাকিতেন, কোন কোন দিন সকালবেলা নিজের প্রাসাদে গিয়া পর্দার আড়ালে দরবারে বসিতেন, বিকালবেলা সম্রাটের কাছে চলিয়া আসিতেন। এই স্বতন্ত্রাধিকার ভগ্নী রৌশনারার অন্য প্রয়োজনে অতি কাম্য হইলেও তিনি লাভ করিতে পারেন নাই; রৌশনারা আশা করিয়াছিলেন ভ্রাতা আওরঙ্গজেব শাহীতক্তে বসিলেই জাহানারার অধিকার তাঁহাকেই দিবেন, তিনিও দিনে দুই বার তাঁহার নিজ হাভেলি হইতে শাহী শান জাহির করিয়া দুর্গে যাতায়াত করিবেন। দারার বিদায় সম্বর্ধনা উপলক্ষে সম্রাটের কুটুম্বিনীগণ আমন্ত্রিত হইয়াছিলেন। তাঁহারাও বেগম সাহেবার সওয়ারীর সহিত নিজ নিজ পদমর্যাদা অনুসারে সাড়ম্বরে প্রস্তুত হইতেছিলেন। আকবরী দরওয়াজার পথেই জানানা মহলের সওয়ারী দুর্গে প্রবেশ করিবে; অথচ ওই রাস্তা অপেক্ষাকৃত জনবিরল, পথিকগণ যেন ভয়ত্রস্ত, মারাত্মক কৌতূহলের বশে মার খাওয়ার উৎসাহ কাহারও নাই।
শাহী অন্তঃপুরের সওয়ারীর হাতি পালকি রাস্তায় বাহির হইলেই লোকজন প্রহার ও অপমানের ভয়ে একশ হাত দূরে আড়াল খুঁজিত; বেগতিকে কোনও হতভাগ্য কাছে আসিয়া পড়িলে সটান মাটির উপর উপুড় হইয়া দুই হাতে মুখ না ঢাকিলে রক্ষা ছিল না। এই অবস্থায় কেহ কিছু দেখিলেও লেখা দূরের কথা, লোকের কাছে বলাও বেতমিজি। বৈদেশিক আগন্তুকগণ অনেকে না দেখিয়া এবং অল্প কয়েকজন কিছু কিছু দেখিয়া অনেক কথা এই সম্বন্ধে লিখিয়া গিয়াছেন; দেশীয় ঐতিহাসিকগণ মামুলী যাহা লিখিয়াছেন উহার অনুক্তি দোষ খণ্ডন করিতে হইলে বৈদেশিক বৃত্তান্ত ব্যতীত গত্যন্তর নাই। এই সামাজিক ইতিহাস সমসাময়িক চিত্র ও শিল্পকলার আলোকসম্পাত ব্যতীত সুষ্ঠুরূপে প্রকাশ পায় না। আওরঙ্গজেবের রাজ্যারোহণের পর নূতন “বেগম সাহেব” রৌশনারার শাহী ঠাট ম্যানুচী দেখিয়াছিলেন। সামুগঢ়ের যুদ্ধের কিছুদিন পূর্বেই তিনি সবেমাত্র দারার তোপখানায় চাকরি লইয়াছিলেন, সুতরাং বিদায়ের দিনে বেগমগণের সওয়ারীর জৌলুস দেখিবার তাঁহার অবকাশ কোথায়? (চলবে)