সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
চার
নিদাঘ মধ্যাহ্নের বেলা পশ্চিমে হেলিতেই আগ্রা দুর্গের দিল্লি-তোরণে শাহী নহবতখানা হইতে আনক-দুন্দুভি-ভেরী-পণব-বিষাণ দিগন্ত কাঁপাইয়া বজ্রনির্ঘোষে বাজিয়া উঠিল। দামামা, নাগরা, ঢোল, সানাই, শিঙ্গার এই গম্ভীর বাদ্যধ্বনি সংকেতে দুর্গের ভিতরে বাহিরে অন্যান্য শাহী নহবতখানা হইতে অনুরূপ বাদ্য আরম্ভ হইল। কিঞ্চিৎ পরেই জাহানারা ও দারার যমুনা তীরস্থ প্রাসাদ হইতে যাত্রার বাজনা শোনা গেল। সম্রাট নন্দিনী প্রিয়তম ভ্রাতাকে বিদায় দেওয়ার জন্য বিপুল আড়ম্বরে দরবারে চলিয়াছেন। তাঁহার সওয়ারীর সর্বাগ্রে বেতদণ্ডধারীসুসজ্জিত অশ্বারূঢ় প্রতিহারগণ ঘোড়া হাঁকাইয়া “দূর বাশ” অর্থাৎ “হঠ যাও” চিৎকার ছাড়িয়া রাস্তা খালি করিয়া চলিয়াছে। প্রতিহার অশ্বারোহীর পশ্চাতে সুদর্শন হস্তিপৃষ্ঠে তৈমুর বংশের সুবর্ণ-সূর্যলাঞ্ছিত রাজধ্বজ, পরে অন্যান্য পতাকা ও বাদ্যভাণ্ডবাহী হাতি, এই হস্তিযূথের পশ্চাতে সশস্ত্র খোজা দেহরক্ষী পদাতিক ব্যূহের মধ্যভাগে মাতঙ্গিনী-পৃষ্ঠে স্বয়ং জাহানারা বেগম; দূর হইতে দর্শনার্থী জনতার পিপাসু নয়ন শাহজাদীর গৌরবমদমত্তা রূপসজ্জা দেখিয়াই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাইতেছে। সুস্নাতা তৈলমর্দনে ঘনকৃষ্ণা হস্তিনীর পৃষ্ঠে তুলাভরা মোটা “গাদেলা”; উহার উপরে উদর পর্যন্ত দোলায়মান বিচিত্র স্বর্ণতত্তখচিত লাল রুমী বনাতের প্রাবরণ। এই প্রাবরণের উপর বর্ণসমৃদ্ধ কাচসারচিত্রিত সোনার আস্মারী বা হাওদা, হাওদার সামনে ও পিছনে আকবরশাহী “চৌরাসী” [“Chaurasi consists of a number of bells attached to a piece of broad cloth which is tied on before and behind (the back of an elephant) with a string passed through it.” — (Ain-i-Akbari, Eng. trans., Vol. I, P. 128).] (ঝালরদার সোনালী কাজ করা বনাতের সাজ, কিনারায় উভয় পার্শ্বে ক্ষুদ্র রৌপ্য ঘণ্টিকার কিঙ্কিণী), লেজে সাদা চামর, জঘনদেশে দুই দিকে ভৈ বা গাত্রসেবকদ্বয়ের জন্য নির্দিষ্ট দুইটি রেশমী দড়ির “ঝুলা”। সৌভাগ্যবতী করিণীর কপাল হইতে শুণ্ডাগ্র পর্যন্ত সিন্দূর-রঞ্জিত, গজকুম্ভদ্বয়ে ঝালরদার “রণপিয়ালা”-র [“Ranpiyala is a fillet for the forehead (of an elephant ), made of bro- cade or similar staffs, from the hem of which nice ribbon and qutas hang down”…qutas are Tibetan yak… white, black of pied (in colour). Ibid, pp. 128,129] কিনারায় চমরীপুচ্ছের দোলায়মান ওড়না, কর্ণমূলে শ্বেতকৃষ্ণ চমরীপুচ্ছের কানপাশা, গলায় বিচিত্র রক্তবস্ত্রের মাল্যবেষ্টনী হইতে লম্ববান বৃহৎ রুপালী ঘণ্টা, পিছনের দুই পায়ে রূপার কড়া, কাঁধের উপর “মেঘডম্বরে”র [মেঘাড়ম্বর : দ্রষ্টব্য — Ain i, p. 129। বার্নিয়ার “পীতাম্বর”-কে ভুল করিয়া Mikdanbar লিখিয়াছেন (Storia, ii, p.72)] ছায়ায় মুখাবৃত মাহুতের আসন। সুরম্য সুবর্ণকঞ্চুকাবৃত হাওদার মধ্যে বেগমসাহেবার খাস দীবান নাম “পীতাম্বর” [পীতাম্বর — “… Pitambar, which is a dome roofed throne, very brilliant, made of enam- elled gold and highly adorned…” — (storia, ii, p. 72 )]। এই পীতাম্বর একজন বসিবার মতো অনুচ্চ সুখাসন, উপরে রক্তখচিত বস্ত্রের গম্বুজাকার ঘেরা-টোপ, চারিপাশে সোনার “লেসের (Lace) চিকন ডবল পর্দা, ভিতর হইতে পর্দা খেলাপ না করিয়া আসমান জমীন সবকিছুই দেখা যায়। হাওদার বাকি অংশে পিছনে নিম্নতর ঢালু চাঁদিনার ছায়ায় ব্যজনরতা চামরধারিণী, তাম্বুলকরস্কবাহিনী, পানীয়রক্ষিকা ও সর্বপশ্চাতে পিকদানিবাহিকা ইত্যাদির বসিবার স্থান। সুরাট বন্দরের রাজস্ব পিতা যাঁহার পান-খরচের জন্য বরাদ্দ করিয়াছিলেন (Manuci, Storia, I, P. 65), তাঁহার ঐশ্বর্য সহজেই অনুমেয়। জাহানারার রূপসজ্জা দূরের কথা, তাঁহার অনাবৃত নখাগ্র পর্যন্ত প্রাকৃতজনের দৃষ্টিগোচর কিংবা শিল্পীর কল্পনার বিষয়ীভূত হয় নাই। তবে বলা যায় তাঁহার মণিবন্ধে পিতৃদত্ত উপহার অন্তত পাঁচ লাখ টাকার এক শত ত্রিশটি মুক্তাদানার “দস্তবন্দ” নিশ্চয়ই ছিল; সুতরাং ইহার সহিত আরও পঁচানব্বই লাখ টাকার জহরত শাহজাদীর অঙ্গে না থাকিলে মানাইবে কেন?
মহাসেন-দুহিতা বাসবদত্তার সুশীলা ভদ্রবতীর ন্যায় এই বেগম-সোহাগিনী গজঘণ্টাধ্বনিদত্ততালে জঘনস্থলাস্ফালন-রসিত রত্ন-রশনা দোলাইয়া দুর্গতোরণে ক্রমশ অদৃশ্য হইল। বেগম সাহেবার হস্তিনীর পশ্চাতেই অশ্বারোহী, খোজা দেহরক্ষী অশ্বারোহী, অশ্বারূঢ় “খোজা সরা” (খোজা ভৃত্যগণের সর্বাধিনায়ক), “মহল সরা” (প্রধান খানসামা), “নাজীর” (নপুংসক ও খাসীকৃত ভৃত্যবর্গের সর্দার) ইত্যাদি পদস্থ কর্মচারীগণের দীর্ঘ শ্রেণী, দরবারী আমীরগণের ন্যায় এই শিখণ্ডী বাহিনীর ঘোড়া ও ঘোড়ার সাজেও যেন শাহী শান ও তুর্কী দেমাগের ছোঁয়াচ লাগিয়া রহিয়াছে। অশ্বারোহী দলের পিছনে নারীস্কন্ধবাহিত দুই প্রস্থ সোনার পালকি। এই শিবিকাদ্বয়ের কাচসার-রঞ্জিত সুবর্ণ কঞ্চকের রত্নপ্রভা চীনাংশুক প্রাবরণের জালমার্গে বিচ্ছুরিত হইয়া বাহিকাগণের কালো বোরখার উপর বিদ্যুৎ সঞ্চার করিয়াছে। দুর্গমধ্যে আকবরী মহালের তোরণ অতিক্রম করিয়া জাহানারা বেগম পাল্কিতে চড়িয়া “শাহ-বুরুজ” (octagonal tower) প্রাসাদে যাইবেন; [বিধবা মেহেরুন্নিসা সধবা নূরজাহান হইবার পূর্বে তিন-চারি বৎসর শাহীমহলে জাহাঙ্গীরের মাতার এই শ্রেণীর সেবকা-সঙ্গিনী ছিলেন।] এক মহল হইতে অন্য মহলে যাতায়াতেও বেগমগণের মাটিতে পা পড়িত না। প্রত্যেক পাল্কির আটজন পাল্কিবাহিকা দাসীগণের পুরাদস্তুর দামী পোশাক। ইহাদের পরিধানে গঙ্গাজলী ছিটের কষা ইজার, গায়ে “আঙ্গিয়া”, রঙ্গীন “চোলী” (bodice জাতীয়), “তসুখ” ছিট কাপড়ের জানু পর্যন্ত লম্বা সরুহাতা “কুর্তী”, উপরে তদুপরি দরবারী ডবল ভাঁজের আঙ্গরাখা এক পাশে বাঁধা; অঙ্গরাখার উপরে কোমরে জড়ানো কাশ্মীরী শাল; পায়ে চটিজুতা-মাটি হইতে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকিয়া রেশমী কালো বোরখা, কাঁধে পাল্কির রূপার ডাণ্ডা। বেগম সাহেবার খালি পাল্কির পিছনে তাঁহার সহচরী ভদ্রবংশীয়া সৌরিন্ধ্রীগণের (maids of honour) পালকির পাশে পাশে বোরখাওয়ালী চেলি। [মানবতার অপমান দূর করিবার জন্য আকবর বাদশাহ “গোলাম” “বাদী” শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ করিয়া উহাদিগকে “চেলা”, “চেলী” বলিবার আদেশ দিয়াছিলেন। ইহা “জগদগুরু” সম্রাটের উপযুক্তই বটে। মোগল দরবার ও অন্তঃপুরে এই প্রথা শেষ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।] ইহাদের পরে অন্দরমহলে “মাতৃকা”গণ নানারকমের ঘেরাটোপ ডুলিতে চড়িয়া চলিয়াছে। ডুলি বাহিকাগণের সহিত সংযোগ রক্ষা করিয়াছে ঘনসন্নিবিষ্ট দশপ্রহরণধারিণী নারী পদাতিক পত্তি; ইহাদের সঞ্চরমাণা অশরীরী কৃষ্ণছায়া দ্বিপ্রহরে নরপতি-পথে অমানিশার অন্ধকার নামাইয়া ভূতলচুম্বী আসন্নবর্ষণা মেঘমালার ন্যায় মন্দাক্রান্তা ছন্দে দুর্গাভিমুখে চলিয়াছে। গুল্ফাবলম্বী রেশমী কৃষ্ণ কঞ্জুকের মধ্যে সুন্দর কুৎসিত, কর্ষিত কাঞ্চন-গাত্রী মোগ্লানী, গৌরাঙ্গী তীক্ষ্ণস্বভাবা তাতারী; স্থূলোষ্ঠী, করালবদনা হাবসী, আয়তলোচনা আরক্তিমকপূরগৌরী কাবুলী খোরাসানী সব ডাকা পড়িয়াছে। পদাতিক নারী যোদ্ধৃগণের পিছনে শোভাযাত্রার আঁচলে বোরখাবৃতা পুরুষায়মানা নারী অশ্বসাদির রিসালা। ইহাদের পিঠে তৃণ, কোমরে তরবারি, এক হাতে পতাকাশোভিত দীর্ঘ ভল্ল, অন্য হাতে অদম্য তুর্কী ঘোড়ার বল্গা; এক একজন যেন অবগুণ্ঠনাবৃতা চিত্রাঙ্গদা; ইহাদের পাল্লার ভিতর পড়িলে মানুষ মাত্রই নির্ঘাত ডবল খুন! এই শোভাযাত্রার শেষভাগ আকবরী দরওয়াজার আড়াল হইবার পরেই সন্ত্রস্ত অবরুদ্ধ জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া দিল্লি-তোরণের দিকে চলিল।
পাঁচ
বেলা মধ্যাহ্নের পর হইতে শাহজাদা দারার যমুনাতীরস্থিত হাভেলির সম্মুখে ও বাদশাহী রাস্তার উপর দরবারী শোভাযাত্রা মিছিল ক্রমশ দীর্ঘতর হইয়া উঠিয়াছে, ফিরোজ জঙ্গ বাহাদুর, রাও ছত্রশাল হাড়া প্রমুখ রাজন্যবর্গ এবং হিন্দু ও মুসলমান মনসবদারগণ শহর কিংবা শহরের উপকণ্ঠে শিবির হইতে সুসজ্জিত দলবলসহ যাত্রা করিয়া বিভিন্ন পথে এইস্থানে উপস্থিত হইয়াছেন। দুর্গ হইতে শুভ মুহূর্তজ্ঞাপক বাদ্য-সংকেতের কিছুক্ষণ পরেই দারা তাঁহার কনিষ্ঠ নাবালক পুত্র সিপার শুকোকে সঙ্গে লইয়া বাহিরে আসিলেন। দর্শনার্থী জনতার মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি দ্বারা সম্বর্ধিত এবং আমীর-ওমরাহ ও রাজন্যগণ কর্তৃক অভিনন্দিত হইয়া পিতা-পুত্র একই হাওদায় উপবিষ্ট হইলেন। অনুযাত্রী সামন্তবর্গের যুদ্ধদামামা এবং শাহজাদার বাদ্যভাণ্ড যুগপৎ বাজিয়া উঠিল, তরঙ্গায়িত যোদ্ধার স্রোত রাজপথ প্লাবিত করিয়া ধীরমন্থর গতিতে দিল্লি-তোরণ অভিমুখে অগ্রসর হইল।
শাহজাদা নিজ হাভেলি হইতে বাহির হইবার পরেই মানুষের চাপে শোভাযাত্রার পথ কাশীর বিশ্বনাথ গলি হইয়া পড়িয়াছিল, দুই পাশে দর্শনার্থী “গণ” দেবতা ফকির কালন্দর (সং “অশ্বৌবস্তিক”) দরবেশের ভিড়; অথচ পথ খালি করিবার জন্য ঘোড়া দাবাইয়া জনতার উপর তুর্কী জুলুম চালাইবার হুকুম নাই। আগ্রা নগরীর জনসাধারণের সহিত দারার নাড়ির টান ছিল। ফকির দরবেশ সাধু-সন্তগণ শাহজাদাকে প্রায় তাহাদেরই একজন মনে করিত। কেহই নিছক তামাশা দেখিবার জন্য কিংবা খয়রাতের আশায় আসে নাই; কেহ কেহ তাঁহার জন্য দাঁতন, তসবী উপহার লইয়া আসিয়াছিল। হস্তিপৃষ্ঠে শাহজাদা নিজের তসবী মাথায় ঠেকাইয়া সকলকে প্রত্যভিবাদন করিলেন, তাহাদের প্রদত্ত সামান্য জিনিস পরম আদরে গৃহীত হইল। শাহজাদার পিছনে তাঁহার খয়রাত ভাণ্ডারবাহী হাতির উপর হইতে তাম্রমুদ্রা ও জামা-কাপড় ইত্যাদি ফকির-মিসকিনের উপর বর্ষিত হইতে লাগিল; শাহজাদা থলি হইতে স্বয়ং রৌপ্যমুদ্রা লইয়া জনতার উদ্দেশ্যে নিসার করিয়া চলিয়াছেন। তোপখানা অপেক্ষা গরিবের আশীর্বাদ ও ফকির দরবেশের দোয়ার উপর তিনি চিরকালই অধিক ভরসা রাখিতেন। শেষরক্ষা হইল না। খোদার মর্জি, মানুষ কেমন করিয়া বুঝিবে ইহাই দাতার শেষ দান? (চলবে)