| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শাহজাদা দারাশুকো (৫৮নং কিস্তি) : কালিকারঞ্জন কানুনগো

Reporter
কালিকারঞ্জন কানুনগো / ৩০৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৩

সপ্তদশ অধ্যায়

দারার বিদায়

(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)

ছয়

এই সামরিক শোভাযাত্রার সূচীমুখে শাহজাদা দারার দেহরক্ষী অশ্বারোহীর প্রথম দুই রিসালা (সংখ্যায় সাধারণত ৭৫ সওয়ার) স্থান গ্রহণ করিয়াছে। তুর্কী, ইরাকী ও পারসিক অশ্বপৃষ্ঠে প্রস্তরমূর্তির ন্যায় উপবিষ্ট যোদ্ধৃগণের চরণসংকেতে ঊর্ধ্বকর্ণ বাজিব্যূহ ধীর বল্পিত চালে চলিয়াছে। সওয়ারগণের উন্নত শূলাগ্রে উড্ডীয়মান রক্তপতাকার ঢেউ; শাণিত বর্ষাফলকে প্রতিফলিত রৌদ্রে বিনা মেঘে বিজলী খেলিতেছে। অশ্বারোহীগণের পোশাকের রং, বয়স, জাতি বিভিন্ন, তাহাদের ঘোড়াগুলির বর্ণও এক নহে; অথচ এই বৈচিত্র্যের মধ্যে অসুন্দর কোথায়ও কিছু নাই। আরোহীগণের মাথায় সাদা কালো সবুজ রঙের কলগীদার “দস্তার”, উহার উপর ভিন্ন রঙের রেশমী শিরপ্যাচের আবেষ্টনী, গায়ে গলা হইতে আজানুলম্বিত ছিট কাপড়ের রংবেরং হিন্দুস্থানী “আঙ্গরাখা”, উহার উপরে কোমরে রেশমী কাপড়ের কিংবা শালের আড়াই প্যাচ বাঁদা “পট্‌কা”র দুই প্রান্ত কোঁচার ন্যায় ঝুলিয়া পড়িয়াছে। সকলের পরিধানে সুতী “তসুখ” কিংবা লম্বা ডুরিদার ‘ডোরিয়া” থানের চোঙ্গা পায়জামা (লক্ষ্ণৌর চুড়িদার কিংবা “যোধপুরী” নহে); পায়ে মোজা, পা-তাবা” (মোজার নিচে কাপড়ের ‘মোজা” ত্রাণ); এবং সলিমশাহী নাগরা জুতা। ঘোড়ার পিঠে মোটা কাপড়ের গদির উপর অর্ধেক পিঠ ও দুই পাশ আবৃত করিয়া ঝালরদার লাল বনাতের সাজ, জিনের উপর আরোহীর এক পাশে ছয় কিংবা অষ্ট চন্দ্রশোভিত চর্মাবৃত লোহার ঢাল ও কোষবদ্ধ তরবারি, অন্য পাশে তৃণ ও জ্যামুক্ত ধনুক, কোমরে “খঞ্জর” ও “কাটার” ছুরিকা। .

এই অশ্বসাদির পশ্চাতে সুদীর্ঘ পদাতিব্যূহ-মধ্যে মনোরম দরবারী সাজে চলিয়াছে শাহজাদার বাদ্যভাণ্ডবাহী কুঞ্জরশ্রেণী এবং শাহী-পতাকাবাহী এক অতিকায় গজরাজ। এই বাদ্যভাণ্ডের [বিবিধ বাজনার জন্য দ্রষ্টব্য — Ain-in-Akbari, English translations, I, pp. 50-51.] সর্বাগ্রে এক এক জোড়া বড় দামামা ও নাগারা (“নক্কারা”), মধ্যে দীর্ঘ বলয়াকৃতি রৌপ্যনির্মিত ইরানি “করানা” বা ইংরেজি বিউগল, এইগুলির জুড়ি ঐরকমের পিতলের তৈয়ারি লম্বা “শিঙ্গা”; ইরানি “সুরনা”, হিন্দুস্থানী সানাই; বাদ্যভাণ্ডের শেষভাগে ছোট দামামা বা বাংলা “দগর”, বাঁশি ও পিতলের “সান্‌জ”, — অর্থাৎ বাণভট্টের “ঘর্ঘরিকা” বা ইংরেজি cymbal, এই মধুর গম্ভীর বাদ্যনির্ঘোষের অনুগামী পতাকাশোভিত সচল দুর্গ বুরুজের ন্যায় ভীমদর্শন বারণ-পৃষ্ঠে মোগল সম্রাটের অনুকল্প সাম্রাজ্য-ধ্বজাসমূহের অপূর্ব সমাবেশ।

অগ্রবর্তী হাতির পিঠে তৈমুর-বংশের খাস শাহীপতাকা আকবরশাহী আমলের শমসাহ বা সূর্যধ্বজা, এবং সম্রাট শাহজাহানের নবপ্রবর্তিত অর্ধ-চন্দ্র পতাকা (crescent standard)। উজ্জ্বল লাল রেশমী বস্ত্রের উপর সুবর্ণতত্ত্ব পুষ্পিত সূর্যের প্রতীক চিহ্ন এবং রৌপ্যসূত্রচিত্রিত কৃষ্ণাপঞ্চমীর শশিকলা পতাকাদ্বয়ে শোভমান। ইহাদের পরে অন্যান্য হাতির হাওদায় সুবর্ণকেশরী চিহ্নিত “শের মরাতিব”, উচ্চধ্বজ দণ্ডলগ্ন তিব্বতদেশীয় চমরীপুচ্ছের শ্বেতকৃষ্ণ “অবচুলচামর”-স্তবক শোভিত হরজটার ন্যায় ভয়সঞ্চারী জঙ্গিসখানী “তুমান-তোঘ”, পিছনে অপেক্ষাকৃত হ্রস্ব-দণ্ডধৃত চামরকলাপের “চার-তোঘ” এবং সুবৃহৎ হিন্দুস্থানী লাল “ঝাণ্ডা” [দ্রষ্টব্য — (1) Ain, I, p. 50-51 Eng trans. (2) Arms and Jewellery of the Indian Mughals, by Abdul Aziz, chapter 1, Lahore.] পতাকাবাহী শেষ হাতির উপর সম্রাট-প্রদত্ত অধিকারবলে উড্ডীয়মান মনসবদারী “মাহী-মরাতিব” [এই মাঙ্গলিক মকর কেতনের সহিত প্রাচীন আর্য ও ইরানীয় সংস্কার জড়িত রহিয়াছে। প্রাচীন পারসিকগণের বিশ্বাস এই মকর জাতীয় মহামৎস্য প্রলয়পয়োধি জলে নিমগ্না ধরিত্রী হইতে পোতারূঢ় জীব ও মানুষকে রক্ষা করিয়াছিল। দ্রষ্টব্য – Storia, ii, p. 71] কেতন; শুভ্র মসলিন বস্ত্রের জমির উপর সূক্ষ্ম সূচীশিল্পে হরিতাভ মকর শিল্পীর জাদুস্পর্শে প্রাণবন্ত হইয়া সেনাতরঙ্গের ঊর্ধ্বে বাতাসে ভাসিয়া চলিয়াছে।

এই বাদ্যভাণ্ডের পশ্চাতে পতাকাবাহী হস্তিযূথের পশ্চাতে বল্লমধারী এবং বন্দুকধারী পদাতিক সেনার মধ্যভাগে যুগল পর্বতোপম মদস্রাবী যুদ্ধহস্তীদ্বয় গাত্রসেবকগণের স্তোকবাক্য-চালিত হইয়া সম্মুখে চলিয়াছে। ইহাদের বেয়াড়া মেজাজ গাত্রগন্ধে আশ্বস্ত করিবার জন্য প্রত্যেকের পাশে স্থাপিতা হইয়াছেন দরবারী সাজে সজ্জিতা তাহার প্রিয়তমা আলানসঙ্গিনী। [টোরী সাহেব লিখিয়াছেন : — “The King (Jehangir) allows everyone of his great elephant four females …they call wives” — Foster’s Early Travels, p. 307).] এই খাসা জঙ্গীহাতি দুইটি ধ্বজা পতাকাসজ্জিত সচল কোট্টগুল্মের ন্যায় শোভমান। ইহাদের পিঠে ও পার্শ্বদ্বয়ে মজবুত দড়িবাঁধা মোটা গদি বা গাদেলা; গাদেলার উপরে “পাখর” বা কড়াযুক্ত পাত-লোহার বর্ম; বর্মের উপরে তিন ভাঁজ মোটা কাপড়ের গজ-ঝাঁপ; স্কন্ধ, গজকুম্ভ ও শুণ্ডদেশ অনুরূপ বর্মাবৃত। লৌহ-বর্মাবৃত শস্ত্রকণ্টকিত হাওদার বাহিরে পিঠের বাকি অংশের অপর “চৌরাসী” নামক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রৌপ্য-ঘণ্টিকাযুক্ত বনাতের সুরম্য সাজ, গলায় লাল কাপড়ের মোটা মাল্যবেষ্টনী হইতে লম্বমান বৃহৎ বীরঘণ্টা, দুই কানের গোড়ায় সাদা ও কালো চামরের স্তবক, মাথার উপর হইতে প্রায় গণ্ডদেশ পর্যন্ত “আঁধিয়ারী”র দ্বারা আবৃত। এই “আঁধিয়ারী” মোটা চামড়ায় হাতির মাথার উপরে নিম্নমুখী পেরেক-আঁটা এবং মাহুতের পায়ের নীচে মোটা দড়ির সঙ্গে বাঁধা চোখের ঠুলি, মাহুত নীচের দড়িতে পায়ের চাপ দিলেই কাঁটার জ্বালায় হাতি শায়েস্তা হইয়া যায়।

জঙ্গী হাতির হাঁটুর উপর লোহার কড়ার ঝুমকা, দীর্ঘ দত্তদ্বয়ে সোনা-রূপার আংটা, লৌহকবচাবৃত শুণ্ডে যুদ্ধকালে ধারাল অস্ত্র বাঁধিবার কড়া; সামনের এক পা পিছনের দিকে বিপরীত পায়ের সহিত বাঁধা মোটা শিকল।

আকবরশাহী [হাতির জন্যও শরিয়ত মাফিক ব্যবস্থাই বটে! আনুমানিক ৬৪ তোলা ওজনের কাঁচা সেরের মাপ। দ্রষ্টব্য — Ain. i, p. 130, p. 134] আমল হইতে বরাদ্দ দৈনিক চারি সের ঘি, পাঁচ সের চিনি, লবঙ্গ- গোলমরিচ সহকারে আধ মণ দুধে অর্ধসিদ্ধ আধ মণ চাউলের কড়া প্রসাদ নিত্য সেবন করিয়া এবং অধিকন্তু শীতের দুই মাস প্রত্যহ তিন শত গাছি আখ চিবাইয়া যাহার দেহ সুপুষ্ট হইত, জাহাঙ্গীর যাহার জন্য কিঞ্চিৎ শরাবের বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন, শাহজাহানের আমলে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীর তাজা লাশের শুরুয়া খাওয়াইয়া যাহাকে নরমাংস-লোলুপ করা হইত সেই জঙ্গী হাতির সামনের এক পায়ের সহিত পিছনের একপা মোটা শিকলে আড়াআড়ি ভাবে না বাঁধিয়া বাহির করিবার উপায় কি?

এই দম্পতি-সখ যুদ্ধহস্তীর পিছনে শাহাজাদার আস্তাবলের খাসা হাতি ও ঘোড়া শোভাযাত্রার গাম্ভীর্য বর্ধন করিয়াছে। হাতিগুলির অসামরিক সাজ, পিঠে হাওদার পরিবর্তে জরদৌজী কিনারাদার বনাতের “চৌরাসী” নামক প্রাবরণ, কপালে সিন্দূর, গলায় রূপার ঘণ্টা। খাসা জঙ্গী ঘোড়ার যত্ন ও সজ্জা শাহী নজরের পরিমাপেই ছিল। যে রঙের ঘোড়া উহার গায়ে ঠিক বিপরীত রঙের মোটা ছিট কাপড়ের তুলাভরা “আরক” (horse quilt)। এই আরতকের উপরে ইস্পাত নির্মিত “বখতর” বা শিকলের তনুত্রাণ। বর্মের উপরে লেজ হইতে গলা পর্যন্ত লম্বা জরদৌজী মখমলের বর্ণভাস্বর প্রাবরণ; ইহার উপরে সোনার উপর মীনা-করা জীন-রেকাব। ঘোড়ার মাথা ও মুখ “তাজা” বা অশ্বমুখ কবচের দ্বারা আবৃত পিঠের আস্তরণের যে জঘনাবৃত অংশ ঝুলিয়া পড়িয়াছে, উহার স্থানে স্থানে সূক্ষ্ম সূচী-শিল্পে সুবর্ণতত্ত্ব-খচিত মাঙ্গলিক চিহ্ন প্রস্ফুটিত পদ্ম। জিনের দুই দিক হইতে লম্বমান উজ্জ্বল লাল রেশমী কাপড়ের ভাঁজ-করা কোঁচা হাঁটুর উপর পড়িয়াছে; সামনের হাঁটুদ্বয়ের উপরেও প্রায় এক হাত লম্বা অনুরূপ দোলায়মান কোঁচা। যুদ্ধাশ্বের গলদেশে রত্নখচিত ‘হুমা” বা অশ্বাবতংস, সম্মুখের উরুদ্বয়ে রূপার উপর মীনা-করা মোটা “তাগা” বা বীরকঙ্কণ, ঘোড়ার ঘাড়ের চুলে হয় হিন্দুস্থানী ছাঁট, না হয় দুই পাশে লম্বমান বিনুনী; ইহাতে স্ত্রী-পুরুষ ভেদ নাই, অশ্বপালের রুচি ও মর্জিমাফিক লিঙ্গনির্বিচার হুকুম। এই সমস্ত আরোহীশূন্য অশ্ব অশ্বসেবকের করধৃত বল্গা চালিত হইয়া সম্মুখে চলিয়াছে।

এই অশ্বরত্নসমূহের পশ্চাতে শাহজাদার খাস সওয়ারীর আগমন সূচনা করিয়া চলিয়াছে জমকালো পোশাকপরিহিত আশাসোঁটাধারী দরবারী শাকরেদ-পেশা বা ভৃত্যবর্গ। শাহজাদার ঐরাবততুল্য বারণমুখ্যের সুস্নাতদেহ তৈলাভিষেকে মসীচিক্কন, কর্ণমূলে এবং পুচ্ছদেশে লম্বমান শ্বেতচামর, গজকুন্তুদ্বয়ে জড়োয়া বনাতের অবগুণ্ঠন, ললাটে সিন্দূর-কুঙ্কুমের জয়-টীকা, কুত্তদ্বয়ের মধ্য উভয় পার্শ্ব হইতে শুণ্ডাগ্র পর্যন্ত সিন্দুরের ক্রম-সংকীর্ণ ত্রিপুণ্ড্রক, গলায় লাল রেশমী কাপড়ের গলবেষ্টনী ও রৌপ্য বীর-ঘণ্টা, হইতে গলদেশ পর্যন্ত পিঠজোড়া বহুমূল্য ঝালরদার বনাতের প্রাবরণ। গজরাজের নিতম্বে রৌপ্য ঘণ্টিকার কিঙ্কিণী, কুক্ষিরজ্জুপ্রলম্বিত ঘণ্টা ও চামর এবং পৃষ্ঠদেশে পতাকাসজ্জিত এই হাওদা-মধ্যে অগ্রভাগে শাহজাদার জন্য নির্দিষ্ট চতুর্দোলের ন্যায় সোনার সুখাসন; সুখাসনের উপরে বহুমূল্য জরদৌজী মখমলের ঝালদার ক্ষুদ্র চন্দ্রাতপ। হাওদার বাকি অংশের উপর সুখাসনের চন্দ্রাতপ অপেক্ষা নিম্নতর স্বতন্ত্র চাঁদিনা। সুখাসনের মধ্যে পিতার সম্মুখে উপবিষ্ট কুমার সিপহর শুকো প্রভাতের বালসূর্যের ন্যায় শোভমান। তাঁহার পরিধানে বর্ণসমৃদ্ধ মণিমুক্তাখচিত বহুমূল্য দরবারী পোশাক, গলায় মুক্তামালা, মাথায় ছোট “দস্তারে”র (দরবারী শিরোভূষণ) উপর পদ্মরাগমণিখচিত (সর-পেচ), ললাটের ঊর্ধ্বদেশে কৃষ্ণপালক শোভিত তৈমুরী “তুররা”। শাহজাদা দারার পরিধানে সাদা মসলিনের পোশাক; উহাতে কোনও আড়ম্বর নাই, সুরুচি ও সংযমের ছাপ আছে। তাঁহার মাথায় হীরকখচিত শিরবষ্টনীবদ্ধ সাদা “দস্তারে”র উপরে সাদা বকের পালকযুক্ত তুররা, গলায় মুক্তার মালা, হাতে সুবর্ণসূত্রগ্রথিত ক্ষুদ্র রত্নমালিকা বা জপের তসবী। হাতি হইতে নামিবার সময় মসলিনের লম্বা আঙ্গরাখার উপর সম্রাট প্রদত্ত সর্বশেষ জরোয়া খেলাতবস্ত্র ও কোমরে জরাউ শালের “পট্‌কা” কষিলেই পুরাদস্তুর দরবারী সাজ হইবে। সুখাসনে উপবিষ্ট পিতা-পুত্রের পিছনে হাওদা মধ্যে ব্যজনরত শ্বেত চামরধারী “চৌরী-বরদার” “খাদার” (পাদুকা-বাহক), “তর্কশ কামান- বরদার” (তৃণ ধনুরক্ষক), “তাম্বুলদার” (তাম্বুল করগুবাহক), “আতাবা-চী” (পানীয়রক্ষক), এবং “সর-খাবাস”-এর (দাস ও ভৃত্যাধিনায়ক) হেফাজতে শাহজাদার দরবারী পোশাক ও তরবারি। সামনে হাতির কাঁধের উপর “মেঘডম্বরে”র ছায়ায় উপবিষ্ট রৌপ্য অঙ্কুশধারী মাহুত।

শাহজাদার বাহনের অনুগামী কয়েকটি সুসজ্জিত হাতির পিঠে চলিয়াছে তাঁহার খাস “জিরাহ্ খানা” (বর্ম, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি যুদ্ধের সরঞ্জাম), “খয়রাখানা” (দান-ভাণ্ডারের মুদ্রা, বস্ত্র ইত্যাদি) এবং “পেশকষ-খানা”র তহবিলে শাহানশাহকে উপঢৌকনের জন্য নির্দিষ্ট বড় বড় থালায় আশরফি ও অন্যান্য বহুমূল্য সামগ্রী।

ইহাদের পিছনে চলিয়াছে পদাতিক রক্ষীবেষ্টিত শাহজাদার দরবারী সোনার পাল্কি, পোশাকে ঠাটে প্রত্যেক পালকির আটজন বাহক যেন এক এক জন হাজারী মনসবদার।

শাহজাদার সওয়ারীর পশ্চাৎভাগে তাঁহার নিজ তাবিনের মনসবদারগণ পরিচারক বেষ্টিত হইয়া চলিয়াছেন। ইহাদের পিছনে পৃষ্ঠরক্ষী অশ্বসাদি। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev