সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
সাত
প্রায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে এই শোভাযাত্রায় পর পর কুমার সিপহর শুকো, রুস্তম খাঁ বাহাদুর, রাও ছত্রশাল হাড়া, কুমার রামসিংহ কচ্ছবাহ ও অন্যান্য রাজন্যবর্গের পতাকা বাদ্যভাণ্ড, হাতি ঘোড়া পায়দল শাকরেদপেশা ও রণদুর্মদ অশ্বারোহী যোদ্ধৃগণের মিছিল চলিয়াছে। এই দীর্ঘ শোভাযাত্রায় সর্বত্র বৈচিত্র্যের রূপসম্ভার অতি প্রকট, অথচ কোথায়ও দৃষ্টিকটু অসামঞ্জস্য নাই। মধ্যযুগের ইতিহাস অশ্ব-গৌরবের ইতিহাস বলিলেই হয় — “অশ্বা যস্য জয়স্তস্য যস্যাশ্বাস্তস্যা মেদিনী।” দিল্লীশ্বর “নরপতি” কিংবা “গজপতি” নহেন, মুখ্যত তিনি ইরান-তুরান দেশাধিপতির ন্যায় হিন্দুর চোখে “অশ্বপতি”।
অশ্বশাস্ত্রে পঞ্চকল্যাণাদি লক্ষণযুক্ত ঘোড়ার জাতি বর্ণ ও বৈশিষ্ট্যের যাহা পরিচয় পাওয়া যায় মনসবদারী ফৌজে উহার একত্র সমাবেশ হইত; এইজন্য এই শোভাযাত্রায় অশ্বের জাতি বর্ণ ও সাজের বৈচিত্র্য সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় ছিল।
ইরান, ইরাক, আরব ও তুর্কীস্থান হইতে বিদেশী ঘোড়া সেকালে হিন্দুস্তানে প্রচুর আমদানি হইত; কিন্তু উহাতে ভারতবর্ষের তথা প্রাচ্যভূমির শাশ্বত রুচিবৈচিত্র ও রূপের ক্ষুধা মিটিত না। বিদেশি ঘোড়া গুণে ও আকারে শ্রেষ্ঠ হইলেও প্রায় লাল সাদা ইত্যাদি একরঙের হইত, উহাদের মধ্যে মিশ্রবর্ণ কদাচিৎ দেখা যাইত। মানবীর মধ্যে ইরান-সুন্দরীর ন্যায় অশ্বজাতির মধ্যে ইরানী অশ্বিনী সুগঠিত মস্তক, দীর্ঘগ্রীবা, উন্নত নাসিকা, কর্ণ ও নিতম্ব সৌষ্ঠবে অতুলনীয়া অথচ বায়ুগামিনী (ফাঃ বাদ-পা’) হইলেও উহাতে ইরানীর মন উঠিত না। তাহারা সাদা কিংবা ধূসরবর্ণের ঘোড়ার কেশর, পুচ্ছ এবং পায়ে লাল কিংবা কমলা রং মাখাইয়া জমকালো করিত। প্রকৃতি রূপ ও বৈচিত্র্যের ভাণ্ডার উজাড় করিয়া ভারতবর্ষকে দিয়াছিলেন; হিন্দুস্তানে ঘোড়ার রঙের কৃত্রিমতার প্রয়োজন ছিল না, ঘোড়ার জন্মগত বর্ণেই বিচিত্রতার রূপ ফুটিয়া উঠিত। যে রুচি ও মনস্তত্ত্ব এক রঙের কাপড় অপেক্ষা ছাপা ছিট কাপড়কে বাঙলার বাহিরে দেশ-বিদেশে লোকপ্রিয়তা প্রদান করিয়াছে, উহাই এই সামরিক শোভাযাত্রায় যোদ্ধৃগণের বসন ও বাহন নির্বাচনে প্রকাশ পাইয়াছে।
মোগল সরকার মনসবদারী ঘোড়ায় দাগ দেওয়ার মালিক, ঘোড়া পছন্দ করিবার অধিকার অশ্বারোহীর। হিন্দুস্থানের কচ্ছী, সিন্ধী ও মদ্রদেশীয় (পশ্চিম-পঞ্জাব) বর্ণসঙ্কর তাজী ঘোড়া আভিজাত্যে কিঞ্চিৎ ন্যূন হইলেও বর্ণ-বৈচিত্র্যে অধিকতর জনচিত্তাকর্ষক ছিল। [হিন্দুস্থানে মেষচারকগণ ভেড়া ও ছাগলের গায়ে রঙের চাকা লাগাইয়া বৈচিত্র্যের ক্ষুধা মিটাইয়া থাকে।]
একালের তুলনায় সেকালে প্রাণশক্তি ও স্থূলেন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ-রসের পিপাসা ও জাঁকজমকপ্রিয়তা অধিক ছিল, একালের বালকসুলভ রঙের মোহ সেকালের বৃদ্ধেরাও কাটাইয়া উঠিতে পারেন নাই, দাড়ি পাকিলেও মন তাজা থাকিত, রুচি একঘেয়ে হইত না; শোভাযাত্রার অশ্ব ও অশ্বারোহী ইহার প্রমাণ।
সুসজ্জিত বিবিধ বর্ণের ঘোড়া যেন রাজপথে রূপের তরঙ্গ তুলিয়া চলিয়াছে; কোথায়ও “নীলা”র (সূর্যতেজের মতো উজ্জ্বল ধবল), বামে “অম্বরী” (ধূম্রবর্ম), ডানদিকে চিকনকালো “কুমৈত” ঘোড়া; সামনে হয়তো চিত্র-ব্যাঘ্রবর্ণ “আব্রাশ”, পশ্চাতে ইতস্তত সবুজবর্ণ “হরা”, পিঙ্গলবর্ণ “জরবা”, পাটলবর্ণ “করড়া”, লাক্ষারস রক্তবর্ণ “কুলংগ”, বাদামী “সমন্দ” পাকা তালের রঙ “কিয়াই”, বোলতার বর্ণ “বোল্লাহ্” ইত্যাদি ছাড়া আরও কল্পনাতীত মিশ্রবর্ণের ঘোড়ায় চড়িয়া যোদ্ধৃগণ দরবারে চলিয়াছে।
ইহার উপর রাজপুতের ঘোড়ার মুখে লৌহনির্মিত মুখোশ, কোনটা ব্যাঘ্রমুখ, কোনটা সিংহমুখ, মুখোশের উপর গণ্ডার শৃঙ্গের ন্যায় লোহার “সনীন” (শিং)।
এইবার মানুষের পালা। রাজপুত, পাঠান, সৈয়দ, ইরানী, তুর্কী, তাতার, মোগল অশ্বারোহী প্রত্যেকেই জাতীয় বসন-ভূষণে ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। সর্বাগ্রে বার্হাবাসী হিন্দুস্থানী সৈয়দগণের ভব্যতাসূচক সাদা পাগড়ির নীচে আরবের সূপর্ণনাসা, চঞ্চল তীক্ষ্ণদৃষ্টি, দৃঢ় সংযত ও বীরত্বব্যঞ্জক গাম্ভীর্য। ইঁহাদের পরে ইতস্তত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে আগুয়ান ইরানীর সুগৌর উন্নত আর্যদেহ, আভিজাত্যব্যঞ্জক ভব্য সংযত পরিচ্ছেদ, গর্বিত স্থির দৃষ্টি; তুর্কী সওয়ারের বিরাট দেহ, গোঁপ দাড়ির দৈর্ঘ্য, চামছাঁটা চুলের উপর পালকযুক্ত কলগীদার দস্তার বা পাগড়ি, দেমাগী মোরগ চাল; কোথায় বা দীর্ঘকায় তাতারী মোগলের শ্মশ্রুবিরল ভাববিকারবর্জিত মুখমণ্ডল, মিটমিটে ক্রূর চক্ষু, মুণ্ডিত মস্তকের উপর পশুলোমের কুল্লা; অসুরাকৃতি বাঘা পাঠানের আধা-কাবুলী পোশাক, অর্ধমুণ্ডিত মাথায় বাবরী ছাঁটা চুল, কুল্লা-বাঁধা সাদা কালো পাগড়ির এলায়িত-পুচ্ছ, “হামবড়া” দাপট ও বেপরোয়া ঝগড়াটে মেজাজ; হিন্দুস্থানী মুসলমানের “না ঘরকা, না বাহারকা” পোশাকের ঠাটে শেখ সৈয়দ ভ্রান্তি ঘটাইবার চেষ্টা।
বুন্দীপতি ছত্রশাল জ্ঞাতিবর্গসহ বিবাহের সাজে দরবারে চলিয়াছেন, অবশ্য চেলির জোড় পরিয়া নহে। রাজপুতগণের পরিধানে ডোরাদার ছিটের মোগলাই চোঙ্গা (ফাঃ চুত, পায়জামা, লম্বা কোর্তা ও আঙ্গাখা, কোমরে শাল কিংবা রেশমী চাদরের ‘পটকা”, গলায় দীর্ঘ হারের লহর, কানে মোতির দুল, কপালে কুঙ্কুমতিলক, বাহুতে তাগা, হাতে বলয়, পায়ে সোনার ‘কড়া”; মাথায় আস্কন্ধলম্বিত চুলের উপর জরোয়া মন্দীল, কেহ কেহ পাগড়ির উপর মোগলাই ঠাটে সাদা কালো বকের পালক চড়াইয়াছে। তখনও রাজপুতদের মধ্যে দাড়ি, গালপাট্টা রাখিবার রেওয়াজ আমদানি হয় নাই। তাহাদের ক্ষৌরকর্ম পরিচ্ছন্ন তেজোদৃপ্ত বদনমণ্ডল সুপ্তমীন হ্রদের ন্যায় প্রশান্ত, কিন্তু চোখ দেখিলে আশঙ্কা হয় ঝড় উঠিতে বিলম্ব নাই। জপ না করিলেও সকলের হাতে জপের নানারকম জপমালা মুসলমানের তসবীর প্রতিস্পর্ধীরূপে বিরাজমান। রাজপুত আফিমের নেশা ও স্বর্গের খেয়ালে বিভোর হইলেও বিলক্ষণ প্রকৃতিস্থ। (চলবে)