তৃতীয় অধ্যায়
দারার মনসব ও সুবাদারি
এক
দারার মনসব ও সুবাদারি আলোচনা করিবার পূর্বে মোগল সাম্রাজ্যে অভিজাত শ্রেণী সম্বন্ধে কয়েকটি গোড়ার কথা বলা আবশ্যক। মোগল সাম্রাজ্যে অভিজাত শ্রেণী দুই ভাগে বিভক্ত ছিল; পুরুষানুক্রমিক ভূস্বামীবর্গ এবং সম্রাট দরবারের উপাধিপ্রাপ্ত সামরিক অসামরিক উচ্চশ্রেণীর রাজপুরুষগণ। প্রথমোক্ত অভিজাতবর্গের মধ্যে সাধারণত হিন্দু সামন্তরাজগণই ছিলেন প্রধান। মুসলমান আমলে মুসলমানদিগের মধ্যে পুরুষপরম্পরা জন্মগত অধিকারে সৃষ্ট কোনও জমিদার-শ্রেণী ছিল না। মোগল সাম্রাজ্যে স্বয়ং সম্রাটই একমাত্র প্রভু, যুবরাজ হইতে দীনতম ব্যক্তি সকলেই প্রজা এবং আজ্ঞাবহ ভৃত্য। তিনি অন্নদাতা, নিমকের মালিক, প্রজার ধন-মান-ইজ্জত এবং ধর্মের রক্ষক। প্রজাগণের মধ্যেই গুণ কর্ম এবং স্বভাব অনুযায়ী শ্রেণীসংস্থাপনে তাঁহারই একমাত্র অধিকার, রাজসেবা ছিল আভিজাত্য লাভের প্রশস্ত পথ, এবং রাজার নিকটতম অতি বিশ্বস্ত অনুচরবর্গকে রাজসংসারে এক-একটি “পোশাকী” পদ ও কার্যভার প্রদান করা হইত। ইয়োরোপের মধ্যযুগের সামন্ত দরবার এবং মিশরের ফাতেমী খলিফার দরবারের ন্যায় হিন্দুস্থানে সুলতানী আমলে সুলতানের খাস ভৃত্যগণ অভিজাত শ্রেণীর মুখপাত্র ছিলেন, পদবীও প্রায় অনুরূপ ছিল। সুলতানী দস্তার খানের (আধুনিক খানার টেবিল) চাশনীগীর (যিনি প্রত্যেক পেয়ালা বা থালি পরিবেশনের পূর্বে চাখিয়া দেখিতেন), সর্-দোয়াতদার (প্রধান মস্যাধার রক্ষক), হস্তী ও অশ্বশালার রক্ষকের পদ অতি সম্মানজনক ছিল। সম্রাট প্রথম চার্লস শিকার হইতে ফিরিবার পর তাঁহার ডান পায়ের এবং বাঁ পায়ের বুটজুতা খুলিবার পুরুষানুক্রমিক অধিকার (Grand Jack boot of the Empire) যেমন আভিজাত্যসূচক ছিল, সুলতানী আমলে সুলতানের ঘোড়ার অস্থায়ী সহিসের পদও (মীর আখৌর) তদ্রূপ একটি বিশেষ অধিকার এবং শ্লাঘনীয় পদ বিবেচিত হইত। মোগল আমলে সম্রাটই ছিলেন সাম্রাজ্য, বাদশাহী দরবার শাহীমহলের প্রতিচ্ছবি এবং বিরাট সংস্করণ মাত্র। মোগল দরবারের মীর-সামান পদে নিযুক্ত হইতেন একজন অতি উচ্চপদস্থ আমীর; কাগজে-কলমে শাহীমহলের যাবতীয় সরঞ্জাম — বাদশাহী “তোষাখানা”র (Ward- robe) সকল জিনিসের তত্ত্বাবধায়ক। অতীতকে উপহাস করিয়া “মীর সামান” বা “খান-ই-সামান” “খানসামাত্ব” প্রাপ্ত হইয়া কলিযুগে বড়লোক সাহেব-সুবার অনুরূপ পরিচর্যা করিতেছে। প্রাক্-মোগল যুগের “সরবত-দার” পানীয় পরিবেশক ইত্যাদি খেতাব মোগল যুগে না থাকিলেও বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে উচ্চপদস্থ আমীরগণ ওই কাজ করিতেন।
সম্রাট আকবর সর্বপ্রথম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে অভিজাতবর্গের মধ্যে “শ্রেণী” বা “জাত” এবং প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে লঘিষ্ঠ গরিষ্ঠ স্থান নির্ণয় এবং বেতন নির্ধারণের জন্য সওয়ার নির্দিষ্ট করিয়া মনসবদারি প্রথা প্রবর্তিত করেন। মনসবদারির বাহিরে অন্য অন্য কোনও শ্রেণীর পদের অস্তিত্ব ছিল না। সরকারি বেতনভুক অসামরিক এবং সামরিক উভয় শ্রেণীর কর্মাধ্যক্ষ, এমন কি খ্যাতনামা কবি, চিকিৎসক, চিত্রশিল্পী, রাজস্ব বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মচারীবর্গ, কবুতরখানার ভৃত্যবর্গ পর্যন্ত সকলেই ক্রমশ এই মনসবদারি ব্যবস্থার আওতায় আসিয়া পড়িল। সামরিক বিভাগে অশ্বারোহী যোদ্ধার অধিনায়কগণ আকবরশাহী “দহ-বাসী” হইতে ‘দহ-হাজারী” পর্যন্ত ছেষট্টি ভাগে বিভক্ত ছিল, কিন্তু সাধারণত কোনও সামন্ত কিংবা সেনানায়ককে “পাঁচ-হাজারী”র ঊর্ধ্বে মনসব প্রদান করা হইত না। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের আমলে মনসব ক্রমশ ফাঁপিয়া ষাট-হাজারী পর্যন্ত হইল, কিন্তু সাত-হাজারীর ঊর্ধ্বতন মনসব সম্রাটের পুত্র, পৌত্র, শ্যালক, শ্বশুর কিংবা সম্রাজ্ঞী ভিন্ন প্রজাসাধারণকে দেওয়া হইত না। সামরিক বিভাগের প্রত্যেক শ্রেণীর মনসবদারকে কোন্ শ্রেণীর কয়টা ঘোড়া, হাতি, উট, খচ্চর এবং গরুর গাড়ি রাখিতে হইবে নির্দিষ্ট ছিল; কিন্তু কয় জন অশ্বারোহী সৈন্য কোন্ শ্রেণীর মনসবদার প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহার “তাবিন” (Con- tingent) অনুযায়ী রাখিতেন উহার হিসাব আজ পর্যন্ত কোনও ঐতিহাসিক সঠিক ভাবে নির্ণয় করিতে পারেন নাই। মোটামুটি বলা যাইতে পারে “সদী” (একশতী মনসবদার) হইতে ঊর্ধ্বতন প্রত্যেক মনসব বা Command একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক ইউনিট ছিল। নমুনাস্বরূপ আইন-ই-আকবরী হইতে আমরা “সদী”, “হাজারী” এবং “দহ-হাজারী” মনসবদারের বিবরণ উদ্ধৃত করিতেছি।
(১) “সদী”––ঘোড়ার সংখ্যা ও শ্রেণী—
ইরাকী ২ + মুজন্নস ২ + তুর্কী ২ + ইয়াবু ২ + তাজী ২ = ১০টি
ঘোড়া হাতি বিভিন্ন শ্রেণীর ৪টি, উট ২টি, গরুর গাড়ি ৫টি
মাসিক বেতন —
প্রথম শ্রেণী — ৭০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্ৰেণী — ৬০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণী — ৫০০ টাকা
(২) “হাজারী”
ঘোড়া — (ইরাকী ১০ + মুজান্নস ১০+ তুর্কী ২১ + ইয়াবু ২১ + তাজী ২১ + জঙ্গলা (২১) = মোট ১০৪
হাতি — (শেরগীর ৭ + সাদা (শ্বেতবর্ণ নয়) ৮ + মঞ্জোলা ৭ + করাহা ৭ + কাণ্ডুরকিয়া ২) = মোট ৩১
উট — ২১ কাতার অর্থাৎ ২১টা
খচ্চর — ৪.২০ – কাতার (বোধ হয় ৫টিতে এক কাতার) অর্থাৎ ২১টা
গরুর গাড়ি — ৪২
মাসিক বেতন —
প্ৰথম শ্ৰেণী — ৮২০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণী–৮১০০ টাকা, তৃতীয় শ্রেণী—৮০০০ টাকা
(৩) দহ বা “দশ-হাজারী”
ঘোড়া—ইরাকী ৬৮ + মুজন্নস ৬৮ + তুর্কী ১৩৬ + ইয়াবু ১৩৬ + জঙ্গলা ১৩৬ ) = মোট ৫৪৪
হাতি — (শেরগীর ৪০ + সাদা ৬০ + মঞ্জোলা ৪০ + করাহা ৪০ + কাণ্ডুর কিয়া ২০) = মোট ২০০
উট — ১৬০ (কাতার)
খচ্চর–৪০ কাতার অর্থাৎ আনুমানিক ২০০
গরুর গাড়ি — ৩২০
মাসিক বেতন — ৬০,০০০ টাকা
আকবরনামার “পরিশিষ্ট” আইন-ই-আকবরী পুস্তকের সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক-একজন মনসবদারের আনুমানিক মাসিক ব্যয় : –
(ক) ঘোড়া
একটি ইরাকী (অর্থাৎ আরব দেশজাত কিংবা তাদৃশ গুণসম্পন্ন) ঘোড়ার মাসিক খাদ্য-ব্যয়- ৭২০ দাম বা ১৮ টাকা
[যথা দৈনিক ৬ সের দানা ২.৫ দাম; ঘি ২ দাম; চিনি ১৭.৫ এবং ৫ সের ঘাস ৩ দাম। ইহা ছাড়া “জীন” খরচ (ঘোড়ার চিরুনি, নাল, গামছা ইত্যাদি বাবদ মোট) ৭০ দাম বা এক টাকা বারো আনা]।
একটি মুজন্নস (ইরানী-তুর্কী দো-আঁশলা) ঘোড়ার মাসিক ব্যয় ১৪ টাকা (৫৬০ দাম)
একটি তুর্কী (তুরান দেশ হইতে আমদানি) ঘোড়ার মাসিক ব্যয় ১২ টাকা।
একটি ইয়াবু (তুর্কী এবং হিন্দুস্তানী দো-আঁশলা) ঘোড়ার মাসিক ব্যয় ১০ টাকা।
একটি তাজী (মদ্রজন্তু ভবেত্তাজী) মদ্র অর্থাৎ পশ্চিম পঞ্চনদ দেশজাত উৎকৃষ্ট ঘোটকী ৮ টাকা।
একটি জঙ্গলা (দেশী মাঝারি) ৬ টাকা।
(খ) হাতি
শেরগীর শ্রেণী— মাসিক ব্যয় ৩০ টাকা চার আনা (১২১০ দাম )
সাদা (সাধারণ) — মাসিক ব্যয় ২০ টাকা
মঙ্গোলা–মাসিক ব্যয় ১৫ টাকা
করাহা–মাসিক ব্যয় ১৩ টাকা
কাণ্ডুর কিয়া — মাসিক ব্যয় ৭ টাকা আট আনা
(গ) উট
একটির মাসিক ব্যয় ৮ টাকা
(ঘ) গরুর গাড়ি
প্রত্যেক গাড়ির জন্য বরাদ্দ ১৫ টাকা (৪টি বলদের খোরাকি ১২ টাকা, চাকার চর্বি, মেরামত ইত্যাদি ৩ টাকা)।
উল্লিখিত খরচবাদ ঘোড়সওয়ার, চাকর-বাকর ইত্যাদির বেতন ও মজুরি মোটামুটি নিম্নে লিখিত হইল : —
(১) অশ্বারোহী, ইরানী-তুরানী মাসিক ২৫ টাকা, হিন্দুস্থানী ২০ টাকা।
(২) একটি শেরগীর অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর হাতির মাহুত, “ভৈ”, মেঠ ইত্যাদি পাঁচজন চাকর। মাহুতের মাসিক বেতন চার টাকা আট আনা; “ভৈ” মাসিক বেতন ২ টাকা নয় আনা, মেঠ দৈনিক মজুরি চারি দাম।
(৩) প্রত্যেক দুইটি ঘোড়ার জন্য একজন সহিস, মাসিক বেতন সাড়ে তিন টাকা
আস্তাবলের ভিত্তি (১৫ ঘোড়ার আস্তাবল), মাসিক বেতন আড়াই টাকা
আস্তাবলের ফাশ (সরঞ্জাম-রক্ষক), মাসিক বেতন সওয়া তিন টাকা
আস্তাবলের ঝাড়ুদার, মাসিক বেতন এক টাকা সাড়ে চৌদ্দ আনা
কুলীর মজুরি দৈনিক ২ দাম আনুমানিক সাড়ে তিন পয়সা (৪০ দামে এক টাকা, ১ টাকা = পুরাতন ৬৪ পয়সা হিসাবে)
(৪) প্রত্যেক ৫০টি উটের জন্য একজন ‘সর্বান্’, এবং উহার অধীনে পাঁচজন চাকর।
“সর্বানে”র বেতন মাসিক ৫ টাকা
প্রত্যেক চাকর দৈনিক ২ দাম বা দুই পয়সা
খরচপত্র বাদ দিয়া মনসবদারগণের লাভ বিশেষ কিছুই থাকিত না। এ জন্য প্রথম প্রথম মনসবদারগণ মিলিটারি ঠিকাদারগণের ন্যায় সরকারকে ঠকাইবার জন্য অনেক কাণ্ড করিতেন, বদায়ুনীর ইতিহাসে উহার সবিস্তার উল্লেখ আছে। পরবর্তীকালে সামরিক বিভাগে দুর্নীতি দমন করিবার উদ্দেশ্যে আকবর বাদশাহ সুলতানী আমলের “দাগ” (ঘোড়ার গায়ে সরকারি মার্কা) এবং “চেহারা” (সিপাহীর অঙ্গাবয়ব বর্ণনা বা হুলিয়া) পুনঃপ্রবর্তিত করেন। একজন পাঁচ-হাজারী মনসবদার সাধারণত এক হাজার অশ্বারোহী নিজ তাবিনে রাখিলেই বোধ হয় পাঁচ হাজারীর বেতন পাইতেন। ছোট বড় সকল মনসবদার একমাত্র সম্রাটের আজ্ঞাধীন। প্রয়োজনমত কোনও অভিযানে দশ হাজারী মনসবদারের অধীনে এক হাজারী, সাত হাজারীর অধীনে সাত-শতী মনসবদারকে কাজ করিবার হুকুম সম্রাট দিতে পারিতেন, কখনও কখনও এক জন উচ্চপদস্থ সর্বাধিনায়কের নির্দেশ অনুসারে কাজ করিবার জন্য দুই বা ততোধিক কিঞ্চিৎ নিম্নপদস্থ (যথা একজন সাত হাজারীর অধীনে “চার হাজারী” হইতে ‘হাজারী” ‘পর্যন্ত) মনসবদার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরিত হইলে এই অধীনস্থ মনসবদারগণকে “কৌমকী” বা সাহায্যকারী সেনানায়ক বলা হইত। প্রধান সেনাপতি সাধারণত এইরূপ “কৌমকী” মনসবদারের কোনরূপ গুরুতর শাস্তিবিধান করিতে পারিতেন না, সম্রাটের কাছে তাঁহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিতে পারিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা শান্তির সময়ে প্রত্যেক মনসবদারকে তাঁহার অধীনস্থ সৈন্যগণের যানবাহন, রসদ এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করিতে হইত। বাদশাহ হুকুমজারি করিয়াই প্রায় খালাস। এইজন্যই পাঁচ হাজারী মনসবদারকে এক হাজার যোদ্ধার জন্য পাঁচ হাজারীর বেতন দেওয়া হইত। (চলবে)