সপ্তদশ অধ্যায়
দারার বিদায়
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ; মে ২৯, খ্রিঃ ১৬৫৮)
আট
জনসমুদ্রের মধ্য দিয়া ধ্বজপতাকাশোভিত হস্তী অশ্বপাতিসঙ্কুল তরঙ্গায়িত যোদ্ধার স্রোত সর্পিল গতিতে বড় চক ও ত্রিপোলিয়া তোরণ অতিক্রম করিয়া দুর্গের মৃত্তিকা প্রাকারস্থ দিল্লি ফটকের সম্মুখে উপস্থিত হইল। এইখানে শাহী পতাকা ব্যতীত সমস্ত পতাকা অবনমিত হইল, বাদ্যভাণ্ড নিস্তব্ধ হইল, মাৰ্গ শৈলে ব্যাহতগতি শৈলস্রোতস্বিনীর ন্যায় সেনাতরঙ্গিনী অভিমানে ফুলিয়া কিয়ৎকালের জন্য ন যযৌ ন তস্থৌ হইয়া রহিল। এইখানে সম্রাটের পক্ষ হইতে শাহজাদাকে বাড়াইয়া লইবার জন্য পদস্থ আমীরগণ উপস্থিত ছিলেন, আমীর- উল-ওমারা শায়েস্তা খাঁ স্বয়ং তাঁহাকে সু-স্বাগত জানাইবার জন্য পরিখার অপর পারে হাতিপোল দরওয়াজায় অপেক্ষা করিতেছিলেন। দুর্গের প্রথম ফটকের সম্মুখে সকলেই একবার কুর্নিশ করিলেন, সম্রাটের পুত্র-পৌত্র ব্যতীত সমস্ত মনসবদার হাতি হইতে নামিয়া অশ্বপৃষ্ঠে ফটক ও পরিখা পার হইলেন। হাতিপোল দরওয়াজায় দারা এবং সিপ্হর শুকো দরবারী পোশাকে হাওদা হইতে নামিয়া শায়েস্তা খাঁর সহিত শিষ্টাচার বিনিময় করিলেন এবং তোপধ্বনি ও শাহী নহবতখানার বাদ্যভাণ্ড দ্বারা সম্বর্ধিত হইয়া শায়েস্তা খাঁর সহিত দরবার-ই-আম প্রাসাদের দিকে অগ্রসর হইলেন। শোভাযাত্রার অনুগামী যে সমস্ত মনসবদার পতাকা উড়াইয়া, নাগারা বাজাইয়া শাহী মহল পর্যন্ত আসিবার বিশেষ অধিকার লাভ করিয়াছিলেন, হাতিপোল দরওয়াজা পার হইবার পর তাঁহাদের নাগারা বাজিয়া উঠিল, পতাকাসমূহ আবার উত্তোলিত হইল। দেওয়ান-ই-আমের তোরণের সম্মুখে বাজনা ও পতাকা বন্ধ লইয়া গেল, শাহজাদা হইতে সামান্য সওয়ার পর্যন্ত সকলেই স্ব স্ব বাহন হইতে অবতরণ করিয়া এইখানে শাহী মসনদের উদ্দেশে দ্বিতীয়বার যথারীতি কুর্নিশ করিলেন। দেওয়ান-ই-আমের ফটকে উজির-ই-আজম জাফর খাঁ পাল্কি চড়িয়া শাহজাদাকে অভিনন্দন জানাইবার জন্য উপস্থিত ছিলেন। শাহজাদা ঘোড়া হইতে নামিয়া মেসো জাফর খাঁকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করিলেন এবং তাঁহারা স্ব-স্ব পাল্কিতে চড়িয়া অন্য ফটকের মধ্য দিয়া মুসাম্মন-বুরুজ প্রাসাদের দিকে চলিলেন।
নয়
দুর্গমধ্যে লোকে লোকারণ্য, এখানে-সেখানে মেলা ও তামাশা, সমস্ত খালি জায়গা মানুষ ও ঘোড়া হাতিতে ভরিয়া গিয়াছে, শাহানশার দৌলতে খোলা ময়দানে রাস্তায় রোদ নাই, দ্বিপদ-চতুষ্পদের জন্য পানীয়জল সরবরাহের এলাহি ব্যবস্থা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শোভাযাত্রার আরোহীশূন্য হাতি ঘোড়া হাতিপোল দরওয়াজা হইতে দক্ষিণে আকবরী দরওয়াজা পর্যন্ত সুপ্রশস্ত ছায়াবীথিশোভিত দুর্গমধ্যস্থ রাজমার্গের উপর যথাযথভাবে স্থাপিত হইল, জানোয়ারের সইস মাহুত চৌকিদার পালা করিয়া মেলায় ভিড় জমাইতে লাগিল। দরবারে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত রুস্তম খাঁ বাহাদুর ও অন্যান্য মুসলমান মনসবদারগণ এবং রাও ছত্রশালপ্রমুখ রাজন্যবর্গ সম্রাটের উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ কর্তৃক অভ্যর্থিত হইয়া দেওয়ান-ই-আমের সভামণ্ডপে প্রবেশ করিলেন; এবং শাহী মসনদকে একবার কুর্নিশ করিয়া যথাযোগ্য স্থান গ্রহণ করিলেন। তাঁহাদের অনুযাত্রী যোদ্ধা ও ভৃত্যগণ বস্ত্রমণ্ডপের বাহিরে শামিয়ানার ছায়ায় দণ্ডায়মান রহিল, অন্যান্য মনসবদার ও দরবারীগণের স্থান বস্ত্রমণ্ডপে নির্দিষ্ট ছিল।
দেওয়ান-ই-আমের বাহিরে দেহরক্ষী আহদী অশ্বসাদি, বন্দুকধারী পদাতিক বাহিনী, শাহী আস্তাবলের জঙ্গী হাতি, ঘোড়া, উট, বলদ দরবারী সাজে সজ্জিত হইয়া দরবারের প্রারম্ভে যথারীতি সম্রাটের দৃষ্টিপ্রসাদ লাভ করিবার জন্য (Review) শ্রেণীবদ্ধ হইতেছিল; শাহজাদার হাতি ঘোড়া ও অশ্বারোহী সেনা ইহাদের পশ্চাতে দরবার প্রাঙ্গণ পরিক্রমা করিবার জন্য প্রস্তুত রহিল। দরবার বসিবার বাজনা তখনও বাজে নাই। এই অবসরে দরবারীগণ পরস্পরের সহিত সামাজিক শিষ্টাচার বিনিময় ও কুশল জিজ্ঞাসায় এবং সমপদস্থগণের সহিত হাস্য পরিহাসে মাতিয়া উঠিলেন; বাহিরে সওয়ার খিদমতগার সকলেই গা এলাইয়া একটু বিশ্রামের অবকাশ পাইল। (চলবে)