অষ্টাদশ অধ্যায়
শাহজাহানের শেষ দরবার (১৮ই মে ১৬৫৮ খ্রি:)
এক
সামুগঢ় যুদ্ধের মাত্র এগার দিন পূর্বে শাহজাদা দারার বিদায় সম্বর্ধনার জন্য আগ্রা দুর্গের দরবার-ই-আমে আহূত অনন্যসাধারণ আড়ম্বরপূর্ণ দরবারই সম্রাট শাহজাহানের শেষ দরবার, দারার এই “রুত” (প্রস্থানের অনুমতি) পিতা ও ভগ্নী জাহানারার নিকট হইতে শেষ বিদায়। এই দরবার উপলক্ষ্য করিয়া সুবিলাসী দিল্লীশ্বরের অপরিমেয় ঐশ্বর্য ও সাম্রাজ্যাভিমানের অচিরাংশুবিলাস,—এই যুগে অতীতের রঙিন স্বপ্ন, অর্বাচীনের কল্পনাবিলাস।
জাঠ-মারাঠা-ইংরেজ দানব মর্দিত মোগলের এই ইন্দ্রপুরীর দরবার গৃহ ও রাজান্তঃপুরের বর্তমান শোকাবহ কঙ্কালকে বাস্তব রূপ প্রদান ঐতিহাসিকের অতি সীমাবদ্ধজ্ঞান ও নজির প্রমাণের গণ্ডির মধ্যে সম্ভব নয়। ধ্যানধারণায় ঐতিহাসিক হয়তো উহার ছায়া দর্শনলাভ করিতে পারে, কিন্তু ওই অস্থিপঞ্জরে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করিতে পারিবে না।
মধ্যযুগের সাহিত্য, ইতিহাস, বিদেশীয়গণের ভ্রমণবৃত্তান্ত, মোগলচিত্রকলা, পুরাতত্ত্ব এবং দিল্লি-আগ্নার ধূলিধূসর ও বিলুপ্তপ্রায় অলিখিত লোক-কাহিনীর মধ্যে যাহা কিছু সুন্দর এবং হয়তো সত্য—উহা তিল তিল সংগ্রহ করিয়া মোগল ইতিহাসে তিলোত্তমা সৃষ্টির প্রয়াস গরিবের পক্ষে ছেঁড়া চাটাইয়ের উপর শুইয়া সোনার ইটে কাফুরের খামিরায় গাঁথা সাত-মহল রাজবাড়ির মধ্যে সালঙ্কারা ঘুমন্ত রাজকন্যার কাহিনী শুনাইবার বাতিক নিরাপদ নয়; তবে বিস্মৃতি অপেক্ষা বাস্তবতার কাছাকাছি স্বপ্ন হয়তো ভবিষ্যতে সত্যের স্বরূপ নির্ণয়ের সহায়ক হইতে পারে। ঐতিহাসিকের কিন্তু স্বপ্নেও সোয়াস্তি নাই, কারণ সে তাহার সংশয়াত্মক বিচারবুদ্ধিকে ঘুম পাড়াইবার চেষ্টা করিলে উহাই দুঃস্বপ্নের মতো বুকের উপর চাপিয়া বসে।
দুই
আগ্রা দুর্গে শাহজাহানের দেওয়ান-ই-আম দালানে তাজমহলের অম্লান রূপসজ্জা নাই, সুকুমার শিল্পকলার রত্ন-দুকূল নাই, মোতিমসজিদের বিবিধ প্রস্তরসমাবেশে বর্ণ-বৈচিত্র্য নাই; এমন কি মসনদ-ঝরোকা ব্যতীত অন্যত্র সাধারণ সাদা মার্বেল পাথরও বিশেষ নাই। মসনদ-ঝরোকায় যাহা কিছু মর্মর পাথরের কাজ আছে উহাও ফতেপুর সিক্রির মসজিদ প্রাঙ্গণস্থ সেলিম চিশতীর মকবরার তুলনায় কিছুই নয়। সুবিলাসী সুরুচিসম্পন্ন সম্রাটের প্রকাশ্য দরবার গৃহের এই দৈন্য কেন? শাহানশাহ্ এই ক্ষেত্রে কিছু সস্তায় কাজ সারিয়াছেন, লাল বেলেপাথরের উপর মর্মর পাথরের চুন খামিরার মোটা আস্তর লাগাইয়া ঠাট বজায় রাখা হইয়াছে মাত্র; এইখানে সৌন্দর্যের মালমশলার অভাব স্থপতিকারের সুরুচি ও নৈপুণ্যগুণে হয়তো লোকের চোখে পড়ে না। যিনি তাজের সমাধির মসৃণ মর্মর পাথরের গায়ে রংবেরঙ পাথরের ফুল ফুটাইয়াছেন (Pietra dura), দিল্লির শাহীমহলে স্বর্গ-নদীর (নহর্-ই-বিহিত) খাতে পাথরের বৈচিত্র্যময় ঢেউ তুলিয়াছেন, দরবার-ই আমে তিনি প্রস্তরের সজ্জায় উদাসীন হইলেন কেন?
আসল কথা, দেওয়ান-ই-আমে যাহা স্থায়ী কিছু ছিল এবং এখনও আছে উহা ইহার আসল দরবারী চেহারা নহে, বড়লোকের বাড়িতে যাত্রার ভাঙা আসর, বাঁশখুঁটির মানানসই কাঠামো—অথচ মোগলের দরবার-ই-আমে আসিলেই রুচিবাগীশ ঐশ্বর্যস্পর্ধী ইরানের ইন্চীর (রাজদূত) চক্ষু চড়কগাছ হইত, ইউরোপীয় পর্যটকগণ হতভম্ব হইতেন, দরবারী ঐতিহাসিকের কবি-কবি ভাব হইত, মোল্লারা কেতাবী নজরে দেখিত এই দরবার হজরত সুলেমান নবীর [হজরত সুলেমান নবী (Bib. Solomon, son of David) খোদার বরকতে শয়তান, জিন ও ‘দেও’গুলির উপর হুকুম চালাইতেন। যে গালিচার উপর তাঁহার দরবার বসিত সেই গালিচা জাদুবলে তাঁহার পুরা ফৌজকে লইয়া সকালবেলা বায়েত উল্ মোকদ্দস জিরুসালেম (সিরিয়ার রাজধানী) হইতে উড়িয়া সন্ধ্যাবেলা আফগানিস্থানের তখত্-ই-সুলেমান পাহাড়ের উপর নামিত। দুনিয়ার সমস্ত পাখি আকাশ জুড়িয়া তাহার ভ্রাম্যমাণ গালিচায় রোদ লাগিতে দিত না!] তখগাহ্ -জাদু এবং “জিন-দেও”র কাণ্ডকারখানা।
শাহজাহানের বাপ-পিতামহের আমলে খোলা ময়দানে “বার-গাহ্” তাঁবুর (recep- tion tent) ছায়ায় আম বা প্রকাশ্য দরবার বসিত। তিনিই সর্বপ্রথম দিল্লি-আগ্রায় দেওয়ান-ই-আম প্রাসাদ প্রস্তুত করান। সেকালে খোলা ময়দানের এক অংশে লাল কাপড়-মোড়া কাঠের ঘেরার (red railing) মধ্যে সিংহাসনের সম্মুখে উচ্চপদস্থ মনসবদার, উজির, মীরবকশী প্রভৃতি অভিজাতবর্গের দাঁড়াইবার স্থান ছিল, বাদবাকি এই লাল বেষ্টনীর বাহিরে। শাহজাহানের নবনির্মিত সভাগৃহে লাল বেষ্টনীর পর ক্রমশ ক্ষুদ্রতর এবং সিংহাসনের অধিকতর নিকটবর্তী পর পর আরও দুইটি রূপা ও সোনার বেষ্টনী ছিল। বাহিরের প্রাচীরবেষ্টিত ময়দানে পূর্ববৎ “বার্গাহ্” কিংবা “গুলালবার” তাঁবু ও সামিয়ানার নীচে নয় শতী এবং ইহার নিম্নতর মনসবদারবর্গ, অর্থী, প্রত্যর্থী এবং দর্শকগণের দাঁড়াইবার নিয়ম ছিল। এই দেওয়ান-ই-আম দরবার ব্যতীত অন্য সময়ে বাহিরের ফটকে তালাচাবি বন্ধ হইয়া থাকিত; সুতরাং অন্দরহমলের ফরাশ্ (বস্ত্রাগারের ভৃত্য), ভিস্তি প্রভৃতি ব্যতীত বাহিরের কোনও লোকের নজর এই স্থানে পড়িত না। শাহজাহান এইজন্যই অস্থানে অপব্যয় করেন নাই; এই সভাগৃহ সোনার ইটে তৈয়ারি হইলেও উহার নীচে উপরে দামী গালিচা ও মখমল-বনাতে দরবারের সময় ঢাকা পড়িত, সোনা কোথায়ও হয়তো নজরে পড়িত না। তাঁবুকে প্রাসাদোপম এবং পাকা দালানকে গালিচা বনাতে জমকালো তাঁবু করিতে না পারিলে বাদশাহী শান কোথায়? (চলবে)