অষ্টাদশ অধ্যায়
শাহজাহানের শেষ দরবার (১৮ই মে ১৬৫৮ খ্রি:)
চার
সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বে ভারতবর্ষে ঐশ্বর্যের ভরা জোয়ার। হিন্দুস্থান তখন ধনসম্পদে একালের মার্কিন মুলুক — সোনারূপা হীরাজহরত পৃথিবী ঘুরিয়া আসিয়া যে দেশে শেষ সমাধি লাভ করিত, দুনিয়ার প্রায় একচেটিয়া বাজারে যে দেশের বেচিবার কাঁচা-পাকা মাল ছিল অফুরন্ত ও অসংখ্য রকমের, বাহির হইতে শুধু আমদানি হইত হীরা-জহরত, ইরান-তুরানের ঘোড়া, রুমী বনাত, ইরানী গালিচা, বিলাতী আয়না-পিস্তল এবং কয়েকটি চটকদার অপ্রয়োজনীয় শখের জিনিস।
মোগল দরবার ছিল মধ্যযুগে দেশ-বিদেশের রত্ন আকর্ষণকারী শক্তিমান চুম্বকপ্রস্তর; মোগল সাম্রাজ্যে প্রজার ঘরে জহুরির চোরাবাজারে দুর্লভ হীরা, মণিমুক্তা কিংবা রাজাদের সভায় মনুষ্য-রত্ন আত্মগোপন করিবার উপায় ছিল না। আকবরের আমলে বাদশাহী চরের শ্যেনচক্ষু প্রাচীন বিদ্যার পুঁথি, অনাদৃত বিদ্যা এবং গুণীজ্ঞানী মনুষ্যরত্ন খুঁজিয়া বেড়াইত। জাহাঙ্গীর ছিলেন স্ত্রী-রত্ন, সুপেয় শরাব, সুনিপুণ চিত্র ও চিত্রশিল্পী, দুনিয়ার আজব জানোয়ার পশু-পক্ষীর সন্ধানে। জাহাঙ্গীর বাদশাহ “রত্নে”র খবর পাইলে ন্যায়-অন্যায় বিচার হারাইয়া ফেলিতেন, স্থান-অস্থান বিবেচনা করিতেন না। [লাভের আশায় হীরানন্দ জহুরি এক লাখ টাকায় এক খণ্ড হীরা গোপনে কিনিয়াছিল। জাহাঙ্গীর এই খবর পাইয়া তাহার কাছে কৈফিয়ত তলব করিলেন। প্রাণ বাঁচাইবার জন্য হীরানন্দ জামাইল, হুজুর, খবর ঠিক; তবে কোনদিন যদি গরিবের বাড়িতে জাঁহাপনার কদম মোবারকের মেহেরবাণীর ধুলা গোলামের মাথায় পড়ে তাহা হইলে গরিবের হেসিয়ত্মাফিক কিছু নজর দাখিল করিবার জন্যই এই সামান্য জিনিস জোগাড় করা হইয়াছে।
বলা বাহুল্য, আলা হজরত দেরি করিলেন না, হীরানন্দের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাইয়া দক্ষিণাস্বরূপ ওই হীরকখণ্ড লইয়া আসিলেন; বাদশাহী চেলাচামুণ্ডা দলকে সন্তুষ্ট করিতে কৃপণের বোধ হয় আরও পঞ্চাশ হাজার বাহির হইয়া গেল। [Forster, Early Travels, (Hawkins).]
পিতৃপিতামহের এই লোভ সম্রাট শাহজাহানের মধ্যে তৃপ্তির অতীত রত্নলালসায় পরিণত হইয়াছিল। শাহজাহানের ঐশ্বর্যের পরিমাপ ময়ূর সিংহাসন নহে। ময়ূর সিংহাসনের উপযুক্ত সভামণ্ডপে, দরবার সজ্জার গালিচা বনাত এবং সম্রাটের দরবারী পোশাক- আভরণে আরও এক রত্ন-সিংহাসনের ধন প্রোথিত ছিল।
শাহজাহানের দরবার মজলিশ, ঈদ, শাহজাদাগণের বিবাহ উৎসব ও শোভাযাত্রার সর্বাপেক্ষা বিশদ ও চিত্তাকর্ষক বর্ণনা মহম্মদ সালেহ কাম্বো-লিখিত ইতিহাসে পাওয়া যায়; কিন্তু তিনি অলকার যক্ষ-অলকপুরী ছাড়িয়া রামগিরিতে আসিবার দুর্ভাগ্য তাঁহার হয় নাই; সুতরাং প্রবাসী কিংবা পর্যটকের চোখে দিল্লি দরবারের ঐশ্বর্যচ্ছটা ও খুঁটিনাটি ব্যাপার বর্ণনা করিবার তাঁহার প্রয়োজন হয় নাই—কিম্পুরুষ বর্ষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিন্নরের মুখে ভাষা পায় না। এতদ্দেশীয় ঐতিহাসিকের অনুক্তি ও অস্পষ্টতা দোষ বিদেশীয় পর্যটকগণের ভ্রমণকাহিনীর সাহায্যে কথঞ্চিৎ দূর করা যায়; কিন্তু ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ বাজার-গুজব শুনিয়াছেন, কেহ কেহ বর্ণান্ধ, কেহ চোখে দেখিয়াও উল্টা দেখিয়াছেন—যথা টেরী সাহেব কর্তৃক হাতির কপালের কাছাকাছি উহার লম্বমান অণ্ডকোষ-দর্শন। [টেরী সাহেব (১৬১৬-১৯ খ্রিঃ) লিখিয়াছেন, “…the males testicles lye about their forehead and females (female’s) teats are betwixt her forelegs…” (Forster, Early Travels in India, p. 307)]
শাহজাহানের রাজত্বকালে এই আসুরিক ঐশ্বর্যের আড়ালে এদেশে দুঃখ-দৈন্য, ধনী ও শাসকের শোষণ, গরিবের অনশন-অর্ধাশন সবই ছিল, অথচ শহরে দরবারে মধ্যবিত্ত, এমন কি ছাপোষা গরিবের চালচলন ও কাপড়-চোপড়ে অঢেল ঠাট, দরবারীগণের আমিরী শানের কথাই নাই। দেশীয় বিদেশীয় সমস্ত লেখক রাজদ্বারে, দরবারে অন্দরমহলে প্রায় সব বস্তুই “রত্নজড়িত” (ফাঃ মোরাচ্ছা) কিংবা “studed with jewels” লিখিয়াছেন; সোনা ছাড়া কথাই নাই, রূপা কদাচিৎ; সেগুলি আবার “মিনা”র চটক ছাড়া নজরেই পড়ে না। বেগম-বাদশাহ ও ভারিক্কি আমীরের পোশাকে ঢাকাই ও বুরহানপুরী মসলিন ছাড়া কোৱা সাদা অপাঙ্ক্তেয়, সাদা থান সেকালেও বাঙালি বিধবা ও পাকাদাড়ি কাজী মোল্লা ছাড়া অন্য কেহ কদাচিৎ ব্যবহার করিত। সাদার কদর থাকিলে হিন্দুস্থানে “রং-রেজ” ব্যবসা জাঁকিয়া বসিত না। মসলিনের সুবিধা তিন প্রস্ত পোশাক [কথিত আছে, কন্যা জেবউন্নিসা তিন পরত মসলিনের পুরা পোশাক পরিয়া একদিন আওরঙ্গজেবের নিকট উপস্থিত হইলে তিনি বিরক্তির সহিত মুখ ফিরাইয়া বলিয়াছিলেন- আরও ভব্যভাবে তোমাদের পোশাক পরা উচিত।] পরিলেও গায়ের রং, জহরতের ঝলক ঢাকা পড়ে না, অথচ আরামের হানি হয় না।
যখন বয়স ছিল তখন বাদশাহ আহমদাবাদের উজ্জ্বল রঙিন মলমল পছন্দ করিতেন, বৈচিত্র্যের মোহে তিনি মর্মরের শুভ্র আভিজাত্য বিবিধ বর্ণভাস্বর প্রস্তরের পুষ্পিত-পট দ্বারা (pictra dura) সজ্জিত করিয়া চিত্র-বস্ত্রানুকারী করিয়াছিলেন।
যাহা হউক, শাহী ঝাণ্ডা ও পালকির ডাণ্ডা, শায়েস্তা খাঁর ওজুর বদনা, জাফর খাঁর হুক্কা, বেগম সাহেবার দাসীর গায়ে, খলিউল্লা খাঁর বিবির পায়ে লাখ টাকার চটিজুতায়, বড়লোকের ঘরে সেকালে সোনা মুক্তা চুনির ছড়াছড়ি — পড়িলেই মনে হয় ইহা যেন রাজা ভোজের সভাপণ্ডিতের বাড়িতে জঞ্জালের গাদা হইতে ডালিমের দানা ভ্রমে চুনির টুকরা গিলিয়া পোষা টিয়া পাখির মরিবার অবস্থা! রাজা-বাদশাহ, উজির-আমীর, জমিদার- মনসবদারের জীবনযাত্রার ব্যাপারে শাহী ঠাট না হয় মানিয়া লওয়া গেল, কিন্তু মামুলি মনসবদারের আমিরি ভড়ং, মুচ্ছদ্দীর দেওয়ানজী-চাল, বিশ টাকা মাহিনার সওয়ারের গায়ে আকবরী সিক্কায় ১০০ গজের বাক্তার লম্বা আঙ্গরাখা এবং ঘরে বিবির জন্য কমপক্ষে ছয় টাকা গজের আকবরশাহী ঝলমল “ডোরিয়া” (বাং–ডুরে) ছিটের ইজার-সালোয়ার, জরদৌজী ফুলদার আঙ্গিয়া, কাশ্মীরী শালের ওড়নী বা দোপট্টা (সাধু-রুহ পট্টা), নাকে হীরার নথ, কানে মোতির দুল, গলায় চুনি মুক্তার হার, পায়ে জড়োয়া মখমলের চটি কেমন করিয়া সম্ভব হয়?
অবিশ্বাস করিবার কোনও কারণ নাই। এই যুগের মতো সেকালেও সমাজে ভড়ং বজায় রাখিবার তাগিদে সস্তায় আমিরি করিবার অনুকল্প ব্যবস্থা ছিল — যথা, বারো রকমের হীরা, বোল রকমের মুক্তা, বারো কিসিমের চুনিপান্না। আকবরশাহী আমলে সর্ব নিকৃষ্ট শ্রেণীর হীরার রতির দাম ১ টাকা ১২ আনা হইতে ৪ আনা, মুক্তা দশ দাম অর্থাৎ ৪ আনা হইতে ২ আনা, চুনি ও অন্যান্য পাথর পৌনে মোহর (“ইলাহী” = ১০ টাকা) হইতে চার আনা। গরিবের জন্য ইহা অপেক্ষা নিকৃষ্ট শ্রেণীর হীরা-চুনি-মুক্তা আরও সস্তায় বাজারে পাওয়া যাইত, তবে আবুল ফজল দাম লিখেন নাই।* এই দেশে ছোট চাকুরিয়া এবং খানদানী গরিবের চিরকালই সেই এক অবস্থা— যাহাকে বলে “ঘরে ঠোঁট-গামছা, বাহিরে জামা-জোড়া।” পাঠান খাঁ সাহেব যখন দরবারে যাইতেন তখন পোশাকে তিনি একজন হোমরা-চোমরা বাহাদুর, দামী ঘোড়ার উপর সওয়ার,, আগে পিছে ওইদিনের জন্য দোস্তের নিকট হইতে ধার-করা, না হয় ভাড়াটে চাকর-নোকর। দরবার হইতে ফিরিয়া ঘরের চৌকাঠ পার হইলেই তাঁহার কোমরে লুঙ্গি, মাথায় ছেঁড়া কাপড়ের রুমালে বাঁধা বাবরি চুল এবং চাটাইয়ের উপর বসিয়া সস্তা বাসি গোমাংসের কালিয়া সহযোগে চাপাটি-চর্বণ কিংবা অগত্যা নিরামিষ খিচুড়ি ভক্ষণ। ** বোধ হয় এই শ্রেণীর শেখ সৈয়দেরও প্রায় এইরকম অবস্থা, বেচারা পাঠানের খামকা বদনাম। ইহাতে অবাক হওয়ার কিছুই নাই; লেপাফা দুরস্ত না রাখিলে কোনও কালেই চলে না। কলিকাতার মেসের “কার্তিক” বাবুর ঘরে পায়খানায় সকাল সন্ধ্যায় লাল গামছা, দ্বিপ্রহরে আপিসের ধুতি জামা, দিনান্তে গিলা-কোঁচানো শান্তিপুরী; কিংবা বড়বাজারের বাটপাড়িয়ার ঘরে ময়লা ধুতি কাটা ফতুয়া আহারে আচারসহ শুকনো রুটি এবং আড়তে যাওয়ার সময় মাথায় জয়পুরী “চীরা”; হাতে পেঁচদার মোটা তাগা, গলায় হার, গোঁপে চবচবে কাঁচা ঘি। মির্জাই ভড়ঙ-এ লক্ষ্ণৌর জুড়ি এখনও নাই। কাশ্মীরী মহল্লায়, চকে এবং হালে হজরতগঞ্জে দেখিতে পাইবেন মির্জা সাহেবের গায়ে সন্ধ্যাবেলা ধোপাবাড়ির ভাড়া করা ধবধবে চুড়িদার পায়জামা; মিহি চিকন দৌজী আঙ্গরাখার ঝুল, মাথায় মলমলের টুপি কিংবা পাগড়ি; জামার এক জেবে ছোলাভাজা, অন্য জেবে গুটিকয়েক এলাচ; চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি; পরিচিত লোক কেহ নজরে পড়িলেই তাড়াতাড়ি ছোলাভাজা গিলিয়া মুখে এলাচী অর্পণ এবং নিতান্ত সপ্রতিভ ভাবে বিনয়-নম্র সম্ভাষণ ও দুই-চারিটা এলাচী রুমালের উপর রাখিয়া “ইলায়চী কবুল ফরমাইয়ে, জনাব!” আসে যাহাই হউক, লক্ষ্ণৌর অবস্থা-বিপর্যয়গ্রস্ত খানদানী মুসলমান পুরাতনের ধারা এখনও বজায় রাখিয়াছে—মুখে বড় বড় কথা, “হাঁ” ছাড়া “না” নাই; ঘরে মোটা চালের হলদে রং করা ভাত খাইয়া বাহিরে “চৌগুণী” (উৎকৃষ্ট পোলাও) ও খাসা “বালাই”র (বাং-মালাই) গল্প ও ঢেঁকুর তোলা তাঁহার স্বভাব। মির্জা পারতপক্ষে ডাহা মিথ্যা কথা বলিবেন না, তবে বাজে নান্-রুটি খাইলে বলিবেন, “নাসিরী পরওয়াটা”, ঢাকা মুলাভাজা তাঁহার শায়েস্তা জবানে “মুলীকা কাবাব”, বেগুনপোড়া “বাইগন কা কোপ্তা”; সুতরাং এ-কাল ও সেকালে হিন্দুস্থানীর রুচি ও মনোবৃত্তির মধ্যে বিশেষ বিপর্যয় এই যাবৎ দেখা যায় না।
যাহা হউক, ঐতিহাসিক এই ক্ষেত্রে অসহায়, পূর্ববর্তীরা মোগল দরবার যে দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন, তাহাকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া দেখিতে হইবে––বাদবাকি পাঠকের মর্জি। (চলবে)