অষ্টাদশ অধ্যায়
শাহজাহানের শেষ দরবার (১৮ই মে ১৬৫৮ খ্রি:)
নয়
শাহী দরবারের “কবি সম্রাট” মোল্লা কুদ্সী এই তখত্-ই-তাউসের শান্ এবং শাহজাহানী সৌকৎ বর্ণনা করিয়া এক মসনবী (ফার্সি কবিতালহরী) লিখিয়াছিলেন এবং উহা এই সিংহাসনগাত্রে সম্রাটের আদেশে উৎকীর্ণ হইয়াছিল। ইরানী কবির ভাষা ঐতিহাসিক কোথায় পাইবে? সুতরাং কাব্যরসিকগণ দরবারী ইতিহাস বাদশাহ-নামায় ছাপার অক্ষরে উহা পড়িতে পারেন।
সাদা কথায় এই ময়ূর সিংহাসন [ময়ূর সিংহাসনের তক্তা পায়া ময়ূর ইত্যাদি বিভিন্ন অংশ বাক্সবন্দী হইয়া অন্দরমহলের রত্নভাণ্ডারে রক্ষিত হইত। কেবলমাত্র বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে ও নওরোজের উৎসব-দরবারে শিল্পীগণ এই সমস্ত অংশ জোড়া লাগাইয়া সিংহাসন খাড়া করিত।] সোনার পায়া ও কাঠামের উপর সোনার তক্তার ছাউনি খাট বিশেষ, অনেকাংশে বিষ্ণুমণ্ডপে ঠাকুরের সিংহাসনের মতো। এই সিংহাসন প্রস্তুত করিবার জন্য প্রথম দফায় একলক্ষ তোলা সোনা এবং আড়াই সের হীরা চুনি পান্না ইত্যাদি দেওয়া হইয়াছিল। এই খাট বা মসনদের উপরে দরবারের সময় তিনপ্রস্থ গালিচা ও জড়োয়া মখমলের আস্তরণ বিছাইয়া পিছনে বড় শাহী তাকিয়া এবং সামনে ছোট দুইটি তাকিয়া বসানো হইত; এই তাকিয়াগুলির উপর কাবুল-ইরানে প্রস্তুত জড়োয়া “তাকিয়া-নামদ” (coverlet)। বড় শাহী তাকিয়ার পশ্চাৎদেশে সুবর্ণদণ্ডের মাথায় মুক্তার ঝালরদার রত্নমণ্ডিত শাহী শ্বেতছত্র। সামনে ছোট তাকিয়াদ্বয়কে আড়াল করিয়া স্থাপিত হইত দুই দিকে মুখোমুখি দুইটি রত্নময়ূর। আম-দরবারে নাচের মহড়া নাই; সুতরাং ময়ূরও পেখম ধরে নাই। খোদাতালা ময়ূরকে মোরগের মতো পায়ের উপর খাড়া করিয়া অবিচার করিয়াছিলেন, শাহানশার ইনসাফে ময়ূরের পা, মায় নখাগ্র পর্যন্ত “মোরাচ্ছা” বা রত্নমণ্ডিত হইয়া গিয়াছে। রঙের বাহার থাকিলেও আসল ময়ূরের গলায় মালার মতো কিছুই খোদাতালা বখশিশ করেন নাই; কিন্তু মোহনমালা না হইলে বাদশাহী ময়ূরকে মানাইবে কেন? এইজন্য এই ময়ূরযুগলের গলায় বসানো (inlay) বদশানী চুনি, পেগুর নীলা, মিশরের সবুজ পান্না, (yokut) তুতীকরণ (Tuticonri মাদ্রাজ) ও বাহেরিন উপসাগরের মুক্তা ইত্যাদি রত্নসমুচ্চয়শোভিত হার খোদার কুদরতকে হার মানাইয়াছে। ইহার মধ্যে একটি ময়ূরের হারের ধুগধুগীর শেষ মুক্তাদানা [Tavernier, edited by Ball; ii, 103 “…which…is suspended from the neck of a peacock made of precious stones and rests on the brest…” — Abdul Aziz, Imperial Treasury of the Indian Mughuls, p. 360] — যাহা বুকের উপর পড়িয়াছে—উহার দামই প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা, ইহার জুড়ি আর একটি মুক্তা অন্য ময়ূরের জন্য বহু চেষ্টা করিয়াও খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই—আলা হজরতের জপমালার (তসবী) চল্লিশ হাজারের মধ্যেও বেশি দামের মুক্তাফল ছিল না।
যাহা হউক, এই সমস্ত মণি-মাণিক্য হজরত সুলেমান নবীর তাঁবেদার “শয়তান” কোনও স্থান হইতে চুরি করে নাই, কিংবা “জিন” ডুবুরী বাহেরিন উপসাগরে ডুব দিয়া মুক্তা উঠাইয়া আনে নাই। হিন্দুস্থানের মাটি মানুষের পরিশ্রমেই সোনা ফলাইয়াছে, এই দেশে বংশানুক্রমিক চর্চায় উন্নততর শিল্পকলার জাদু দেশ-বিদেশ হইতে দুষ্প্রাপ্য রত্নরাজি আকর্ষণ করিয়া যুগে যুগে এইভাবে রাজদরবার সাজাইয়াছে, কিন্তু প্রজার দুর্গতি ঘুচে নাই।
প্রধানমন্ত্রী জাফর খাঁ ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ আমীরগণ সম্রাটের পক্ষ হইতে দারাকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য দেওয়ান-ই-আমের ফটকে অপেক্ষা করিতেছিলেন, ভিতরে গোধূলির স্নিগ্ধতা নামিয়া আসিয়াছে, বিরাট ময়দানের মধ্যভাগে বস্ত্রমণ্ডপ হস্তী ও অশ্বতরঙ্গ বিক্ষুব্ধ জনসমুদ্রে পতাকাশোভিত অর্ণবপোতের ন্যায় শোভমান। ফটকের সামনে পালকি হইতে নামিয়া সানুচর শাহজাদা প্রধানমন্ত্রীর পশ্চাতে পদব্রজে চলিলেন এবং বস্ত্রমণ্ডপের তোরণের বাহিরে সকলেই জুতা খুলিয়া মণ্ডপ মধ্যবর্তী পথে সিংহাসন-অলিন্দের দিকে অগ্রসর হইলেন, জনতার জয়ধ্বনি ও সেনানীগণের মোবারকবাদে দরবার প্রাঙ্গণ কাঁপিয়া উঠিল।
অল্পক্ষণ পরেই গম্ভীরতর বাদ্যধ্বনি সম্রাটের আগমন ঘোষণা করিল। মহাপ্রতিহার- পুরঃসর স্বয়ং সম্রাট কোষবদ্ধ রাজতরবারির উপর ভর করিয়া জরাকম্পিত পাদক্ষেপে মসনদ-ঝরোকায় প্রবেশ করিবামাত্র “বাদশাহ সালাম”, “জাঁহাপনা সালাম” ধ্বনিতে শাহীমহল প্রতিধ্বনিত হইল, সঙ্গে সঙ্গে প্রধান নকীব সিংহাসনের নিম্নদেশ হইতে তীক্ষ্ণ মোরগকণ্ঠে শাহানশার-কুলজী ও প্রশস্তি পাঠ আরম্ভ করিল এবং আমীর ও রাজন্যবর্গ সকলেই স্ব স্ব স্থানে দণ্ডায়মান থাকিয়া আনতমস্তকে হিন্দুস্থানী প্রথায় হাতজোড় করিয়া “জোহার” জানাইলেন। অপূর্ব রাজন্যপ্রভায় উদ্ভাসিত দরবারগৃহ ও চত্বরের দিকে দিল্লীশ্বর ঋজুদেহে ও স্থিরনেত্রে দৃষ্টিপাত করিয়া প্রত্যভিবাদনচ্ছলে দক্ষিণহস্তের রত্নজপমালা উঠাইয়া প্রজাবর্গকে বরাভয় দান করিলেন। অতপর দেহরক্ষীর [ বাদশাহ-নামায় দেখা যায় শাহজাহানের রাজত্বের প্রথম ভাগে রাজা বিঠলদাস গৌর এই সম্মানের অধিকারী ছিলেন। অন্দরমহল হইতে সিংহাসনমণ্ডপে প্রবেশ করিয়া সম্রাট ইঁহার হাতে রাজতরবারি রাখিয়া চটিজুতা ছাড়িয়া শাহী গালিচায় সুখাসনে (cross-legged) উপবিষ্ট হইতেন। সম্রাটের তরবারি ও পাদুকা রাজার হেপাজতে থাকিত।
দশ
বিঠলদাসের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র অর্জুনসিংহ গৌর সম্ভবত এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। ধর্মাতের যুদ্ধে অর্জুনসিংহের মৃত্যুর পর কাহাকে ওই স্থান দেওয়া হইয়াছিল জানা যায় না। আকবরের আমল হইতে সম্রাটগণের দেহরক্ষী রাজপুতই ছিল।] হাতে রাজতরবারি অর্পণপূর্বক সবিতৃমণ্ডলস্থিত নারায়ণের ন্যায় তিনি সিংহাসনে উপবিষ্ট হইলেন।
সম্রাটের পরিধানে মসলিনের সাদা হিন্দুস্থানী পোশাক, মাথায় সাদা “দস্তার” (পাগড়ি), শির-প্যাচের (উষ্ণীষবন্ধনী) উপর সাদা বকের পালকযুক্ত তুরা, গলায় মুক্তার প্রালম্বিকা “মোহনমালা”, ডান হাতে তসবী, অঙ্গুলীসমূহের অঙ্গুরীয়প্রভা সম্মুখস্থ রত্নময়ূরের পৃষ্ঠে বিদ্যুৎচমক ভ্রম জন্মাইয়াছে। তাঁহার পরিচ্ছদ ও অভূষণ আড়ম্বর ও বাহুল্যবর্জিত, অথচ উহার মধ্যে মোগল-ভাণ্ডারের শ্রেষ্ঠতম রত্নরাজি দেদীপ্যমান। শাহশাহ্-র শিরপ্যাচ বা উষ্ণীষ-বেষ্টনীর মধ্যেই চব্বিশটা মুক্তাদানা ও পাঁচখণ্ড চুনি (ruby); এই সমস্ত চুনির মধ্যমণিখণ্ড ললাটের উপর অগ্নিগর্ভ হরনেত্রের ন্যায় ধকধক করিয়া জ্বলিতেছে। ইহা ওজনে ২৮৮ রতি, সরকারি হিসাবে দাম মাত্র দুই লাখ টাকা (Badshahnama ii 391)।
মোগল সম্রাটের উষ্ণীষে পুরুষানুক্রমে প্রাপ্ত একাধিক বৃহৎ হীরকখণ্ড ছিল, কিন্তু এইগুলির মধ্যে কোন্ হীরক শাহজাহানের রাজ্যচ্যুতির একাশি বৎসর পরে নাদিরশাহকে মোহিত করিয়া তাঁহার নিকট হইতে “কোহিনূর” আখ্যা প্রাপ্ত হইয়াছিল— উহা কেহ সঠিক বলিতে পারে না। [হিন্দুর পরবর্তী রূপকথা অনুসারে এই “কোহিনুর” যদুবংশের সেই বিবদমান “সামস্তক” মণি, কিংবা শ্রীকৃষ্ণের গলার হারের “ধুগধুগী” কৌস্তভ রত্নও হইতে পারে! উহা কোথা হইতে কেমন করিয়া দিল্লির ভাণ্ডারে আসিয়া পড়িল—এই প্রশ্ন নিতান্ত অরসিক না হইলে কেহ তুলিবেন না। রত্নের গতিবিধি মানুষের অদৃষ্টের ন্যায় বিচিত্র ও দুর্ব্বেয়। মহীশূরের কোনও অজ্ঞাত মন্দিরে লুক্কায়িত সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে কানা করিয়া কোনও চোর রুশ সম্রাটের রাজদণ্ডের জন্য Or loff Diamond জোগাড় করিয়াছিল কে বলিতে পারে?
যাহা হউক, Prof. Maskelyne বলেন, বাবর বাদশাহ আগ্রায় ইব্রাহিম লোদীর রাজকোষে ২২১.৬ রতি ওজনের যে হীরা পাইয়াছিলেন, এবং যাহার দাম “দুনিয়ায় আড়াই দিনের খাইখরচা” বলিয়া জনপ্রবাদে পরিণত হইয়াছিল––উহাই ইতিহাস- বিস্তৃত “কোহিনূর” (Natare, 1891, p. 556)। এক লাখ দেড় লাখ টাকার হীরাকে শাহজাহান আমলই দিতেন না। এক লাখ টাকা দামের একটুকরা হীরা তিনি দারাকে দিয়াছিলেন, দেড় লাখ টাকার আর এক খণ্ড কাবাশরীফে মোমবাতি জ্বালাইবার জন্য এক “খন্দিল” বা candlestick-এ লাগাইয়া মক্কা পাঠাইয়াছিলেন। দরবারী ঐতিহাসিক ওয়ারেস লিখিয়াছেন, উজীর-আজম মোয়াজ্জম খাঁ (মীরজুমলা) ২১৬ রতি ওজনের একখণ্ড হীরক “পেশকশ” হিসাবে উপহার দিয়াছিলেন। (১৭ই ডিসেম্বর ১৬৫৫ খ্রিঃ )। সম্রাটের আদেশে উহার দাম দুই লক্ষ ষোল হাজার টাকা বহিতে লেখা হইয়াছে (Badshah- nama, part III MS.) এই মীরজুমলা হীরককে কেহ কেহ পরবর্তীকালের “কোহিনুর” হীরক বলিয়া অনুমান করেন।
Tavernier গোলকুণ্ডার সুলতান আবদুল্লা কুতবশাহর কাছে একখণ্ড হীরা চারি লক্ষ টাকা দামেও কিনিতে পারেন নাই। গোলকুণ্ডা বিজয়ের পর ইহা আওরঙ্গজেবের হাতে পড়িয়াছিল। Prof. Maskelyne বলেন, ইহাই নাদিরশাহর কবলে পড়িয়া দরিয়া নূর (জ্যোতি – সমুদ্র) নামে পরিচিত হইয়াছিল। আওরঙ্গজেবের নিকট প্রেরিত (ওজন আড়াই আউন্স?) প্রায় হাজার পাউণ্ড দামের একখণ্ড হীরা মারাঠা দস্যুগণ লুঠ করিয়াছিল। (Forster, Eng. Factory Records 1661. 64, p. 119 )] এই উষ্ণীষের উপরিভাগে “তুরা”য় (উষ্ণীষ-মণ্ডন) রাজলক্ষ্মীর শুভ্র কীর্তিবিন্দুর ন্যায় শোভমান ছোট পেয়ারার আকৃতি (guava-shaped) একটি বৃহৎ মুক্তাদানা (ওজন ৪৭ রতি; দাম ৫০,০০০ — ( Badshahnama)।
সম্রাটের গলায় কোমর পর্যন্ত লম্বমান কয়েক লহর মোহনমালায় কয় শত মুক্তার দানা ছিল সে হিসাব কেহ রাখিয়া যায় নাই। মুক্তার কাঠামোর মধ্যে শাহজাহান নিজের এক ছবি আবদুল্লা কুতবশাহকে উপহার পাঠাইবার সময় উহা টাঙাইবার জন্য মুক্তা গাঁথা সরু দড়িও দিয়াছিলেন, ইহা হইতে সম্রাটের গলায় মুক্তার সংখ্যা ও দাম অনুমান করিতে হয়। দরবারী ইতিহাসে দেখা যায়, সম্রাটের দুইটি জপমালা বা তসবী ছিল। প্রত্যেক দুই খণ্ড ইয়াকুতের (সবুজ পাথর, কচুরি পানার রং) মধ্যে এক এক দানা মুক্তা এই তসবীর মধ্যে ছিল। দুইটি তসবীতে দরবারী ইতিহাস অনুসারে ১২০ দানা মুক্তা ছিল এবং পাথর সমেত মোট দাম বিশ লক্ষ টাকা, জপমালার “সুমেরু” বা মধ্য-মুক্তার ওজন ৩২ রতি, দাম ৪০,০০০। এই দুইটি পছন্দ না হওয়ায় শাহজাহান পাঁচখণ্ড চুনি ও ত্রিশ দানা দামী মুক্তার ছোট তসবী প্রস্তুত করাইয়াছিলেন, দাম ৮ লক্ষ টাকা। ইহাই তিনি সাধারণত জপ করিতেন অন্তত পোশাকের অঙ্গস্বরূপ ডান করে রাখিতেন।
মোগল যুগে তুর্কী পশমী লম্বা কোট “চারকোর্” জামা (বর্তমান সংস্করণে লক্ষ্ণৌ শিরওয়ানী) ব্যতীত অন্য কোনও জামায় “কলার” কিংবা বোতাম থাকিত না। সুতি কাপড়ের জামা আঙ্গরাখায় কাপড়ের টানা (Strings) ব্যবহার হইত। জাহাঙ্গীর বাদশাহর বোতামদার নাদিরীজামা দরবারে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল–এই জামায় মুক্তার দানার “তুমা” (বোতাম) ব্যবহৃত হইত। আকবর ও জাহাঙ্গীর চিশতীপীরের কান ফোঁড়া বান্দা ছিলেন এবং দুই কানে রাজপুত রাজাদের ন্যায় মোতির কুণ্ডল পরিতেন, দুইটি দামী চুনীর মাঝখানে মুক্তার একটি বড় দানা এই কুণ্ডলে থাকিত। শাহজাহান গোঁড়া মুসলমান, কুণ্ডল ধারণ করিবার লোভে তিনি শরিয়ত উপেক্ষা করিয়া কান ফোঁড়াইতে রাজি হইবার ব্যক্তি নহেন।
যাহা হউক, শাহজাহানের চটিজুতায় কয়শত মুক্তা ও কয় টুকরা দামী পাথর ছিল এবং উহার কত দাম ইতিহাসে লেখা নাই। যাঁহার ছোট শালীর পায়ে লাখ টাকার চটি ছিল বলিয়া জানা যায়, তাঁহার দরবারী পাদুকায় হয়তো ইহার দ্বিগুণ দামের হীরা-জহরত ছিল। সেই কালে দরবারে “heel” ছাড়া চটি জুতাই ফ্যাশন ছিল, এই মোগলাই চটি [বেগম-বাদশাহর পোশাকি চটির তলি — যাহাতে মাটি লাগিবার কথা নয়– অত্যন্ত হালকা এবং আগাগোড়া সমান হইত; অর্থাৎ গালিচার পক্ষে ক্ষতিকর heel থাকিত না; উপরে কার্পেটের গায়ে জরির কাজ, এবং দামী পাথর বসানো হইত। পুরনো ফ্যাশনের চটির ন্যায় বেগমদের চটির মাথা চেপ্টা হইত; কিন্তু পুরুষের চটি তলার ডগায় এক অতিরিক্ত পুরু ও দীর্ঘতর পট্টির উপর ভর করিয়া মাথা চাড়া দিয়া উঠিত, এবং সাপের মাথায় উল্টা ফণা কিংবা নৌকার পালের মতো মাথা পিছনে হেলাইয়া সদর্পে পুরুষত্ব জাহির করিত।
পুরুষের জন্য বাহিরে ব্যবহার্য নাগরা জুতার গড়নেও ওইপ্রকার উদ্ধত ভাব ছিল, পরে পরে উহার মাথায় “তুরার” মতো চামড়ার সরু ফালির দীর্ঘ শিং লাগাইয়া চেহারা করা হইত। আজকাল হিন্দুস্থানী, পাঞ্জাবীর আমিরি জুতায়, পাঠানের পেরেক বছল চারি সের ওজনের জাহাজী নাগ্রায়—যাহা সফরে মালিকের মাথার নীচে বালিশের কাজও করে- উহার রকমারি দেখা যায়।] হয়তো শাহশুজার সহিত সরাসরি ঢাকা গিয়াছিল, কিংবা পরে লক্ষ্ণৌর নবাবী দরবার হইয়া মুর্শিদাবাদ-কলিকাতা পৌঁছিয়াছিল। সে যুগে আট আনায় সাধারণ গরিব ভদ্রলোকের ব্যবহার্য এই ধরনের চটি পাওয়া যাইত, আওরঙ্গজেব বন্দী পিতাকে মরিবার পূর্বে এই দামের একজোড়া চটি খোজা এতেবার খাঁর মারফত কিনিয়া পাঠাইয়াছিলেন। (চলবে)