অষ্টাদশ অধ্যায়
শাহজাহানের শেষ দরবার (১৮ই মে ১৬৫৮ খ্রি:)
তেরো
দেওয়ান-ই-আমের চত্বরে যাত্রার বিজয়-দুন্দুভি বাজিয়া উঠিল, সম্রাট-প্রদত্ত সুসজ্জিত (সপ্তাশ্ববাহিত?) “রথ” [“রথ” শব্দ এখনও অপ্রচলিত নয়। কাম্বোর Amal-i-salih ও লাহোরী ওয়ারসের Badsha-nama গ্রন্থে একাধিক বার রথের উল্লেখ পাওয়া যায়। দিল্লি অঞ্চলে এক্কা গাড়িকে “রথ” বলা হয়; অন্যত্র সাধারণত ছপ্পরওয়ালা গরুর গাড়িকেও রথ বলে। প্রাচীন রথের নমুনা রাজপুতানার জায়গীরদারগণের চারি ঘোড়ার জুড়ি গাড়িতে দেখা যায়। হিন্দু সংস্কার অনুসারে দক্ষিণ দিকে বিজয়-যাত্রার রথই শুভ। শাহজাহান গোঁড়া মুসলমান হইলেও আপৎকালে হিন্দু সংস্কার মানিয়া চলিতেন; এই জন্যই তিনি রথের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। এই রথে কয়টি ঘোড়া ছিল জানা যায় না। সপ্তখণ্ড পৃথিবীর বিজয়-সূচক সাতটা ঘোড়া থাকাই সম্ভব।] দরবার গৃহের পাদদেশে শাহজাদাকে লইয়া প্রস্থান করিবার জন্য প্রস্তুত। শাহজাহান এতক্ষণ লোকচক্ষুর গোচরে পুত্রের প্রতিও প্রজানির্বিশেষ রাজধর্মের দূরত্ব রক্ষা করিয়া আসিতেছিলেন; কিন্তু বিদায় প্রার্থনা করিয়া দারা তাহার পদস্পর্শ করিবামাত্র তিনি এবারে ভাঙিয়া পড়িলেন। সিংহাসন হইতে উঠিয়া নিতান্ত প্রাকৃতজনের ন্যায় আকুলভাবে পুত্রকে বুকে চাপিয়া ধরিলেন, কিছুক্ষণ পরে আত্মসংবরণ করিয়া পুত্রের বিজয় কামার্থ “সুরা-পাতেহা” আবৃত্তি করিলেন, চারিদিকে তুমুল হর্ষ ও জয়ধ্বনি উত্থিত হইল। সম্রাট আদেশ দিলেন, দেওয়ান-ই-আমের সিঁড়ি হইতেই শাহজাদা রথে পদার্পণ করিবেন, সেনানীগণ অশ্বারূঢ় এবং সৈন্যগণ সামরিক কায়দায় ব্যূহবদ্ধ হইয়া তাঁহার অনুগমন করিবে, শাহজাদার বাদ্যভাণ্ড কোথাও নিস্তব্ধ হইবে না, পতাকা অবনমিত হইবে না।
দারা পিতার আশীর্বাদ লইয়া দক্ষিণমুখী হইয়া রথে উপবেশন করিলেন। তখন দেওয়ান-ই-আমের চত্বরে গোধুলির আবছায়ার উপর অন্ধকার নামিয়া আসিতেছে; তাঁবুর বাহিরে চতুর্দিকে অনতিপরিসর সঞ্চরণ মার্গে দারার পথ মধ্যস্থলে রাখিয়া সামন্তবর্গ ও যোদ্ধৃগণ পরিচালিত অশ্বারোহী, ভল্লধারী পদাতিক, বন্দুকচী ও হস্তিযূথ ঠাসাঠাসি হইয়া বিরাট অজগরের মতো মন্থরগতিতে ফটকের দিকে চলিয়াছে। সিংহাসনমণ্ডপ হইতে দারার রথ দৃষ্টির ঈষৎ বাহির হওয়া মাত্র বৃদ্ধ সম্রাট রাজদণ্ডের উপর ভর করিয়া নিচে নামিয়া সিঁড়ির উপর দাঁড়াইয়া রহিলেন। সেখান হইতে তিনি উদাসচিত্তে আকুল নয়নে চত্বর হইতে শেষ যোদ্ধার নিষ্ক্রমণ পর্যন্ত চাহিয়াই রহিলেন; আজ যেন দুনিয়ায় তিনি নিতান্ত নিঃসঙ্গ।
শাহজাহানের ওই শীর্ণ জরাকুজ রত্নদণ্ডাশ্রিত শুভ্র দেহযষ্টি বাহ্যজ্ঞানরহিত চিত্রপুত্তলিকাবৎ স্থাণু হইলেও তাঁহার মন আশা-নিরাশার ঘূর্ণাবর্তে, ভবিতব্যের গোলকধাঁধায় খেই-হারা হইয়া ঘুরিতেছিল। যাহারা চলিয়া গেল তাহারা কি আবার ফিরিবে? ইহা কি শেষ বিসর্জন, না বিজয়ী হইয়া পুনরাগমনের জন্য পুত্রের সাময়িক বিদায়? পিতার প্রাণের এই আকুল জিজ্ঞাসার কে উত্তর দিবে? মহাকাল নীরব, আড়ালে নিয়তির নিষ্ঠুর ভ্রূকুটি।
চোদ্দ
দরবারের বহুাড়ম্বরে সেই দিন দারার যাত্রাই পণ্ড হইল। তিনি দেওয়ান-ই-আমের ফটক পার হইয়া কিছু দূরে নিজের হাতিতে চড়িলেন। সেদিন যাত্রা স্থগিত রহিল, সকলেই বিশ্রামার্থ স্ব স্ব স্থানে ফিরিয়া গেলেন। জাহানারা বেগমের নিজ প্রাসাদে ফিরিয়া যাওয়ার অবকাশ বাকি জীবনে আর হইল না।
ইতিমধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিয়াছিল। এই সন্ধ্যায় হিন্দু-মুসলমানের মিলন-স্বপ্ন, মোগল সাম্রাজ্যের দৃপ্ত গৌরবচ্ছটা সবই আঁধারে মিলাইয়া গেল, দারা-শাহজাহান ও জাহানারার জীবন-নাট্যের বিয়োগান্ত শেষ অঙ্ক কালরাত্রির আঁধারেই অভিনীত হইল। দরবার-ই-আম হইতে ইহাই পিতা-পুত্রের—তথা ঐতিহাসিকের শেষ বিদায়। (চলবে)