ঊনবিংশতি অধ্যায়
দারার পরাজয় ও পলায়ন
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ, ২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিঃ)
এক
আষাঢ়ের হ্রস্বযামা যামিনী প্রভাত হইবার পূর্ব হইতেই আগ্রার অদূরে সামুগঢ় প্রান্তরে দারা ও আওরঙ্গজেবের অনীকিনী যুদ্ধার্থ ব্যূহবদ্ধ হইতেছিল। প্রায় এক প্রহর রাত্রি থাকিতে দারা স্বল্পসংখ্যক দেহরক্ষী অশ্বারোহী পরিবৃত হইয়া শিবির হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন। শিবিরের সম্মুখে সারিবদ্ধ তোপখানা, তোপগাড়ির পিছনে তোপখানার মনসবদারগণের তাঁবুর সারি, তাঁহাদের চাকর, খালাসি ও তোপের লটবহর। শাহজাদার অশ্বারোহিগণের জন্য তাঁবু উঠাইয়া রাস্তা করিবার হুকুম হইল। তাঁবুর সঙ্গে তোপখানার নূতন অফিসার ম্যানুসী সাহেবও উঠিয়া পড়িলেন। তিনি পূর্বে কখনও লড়াই দেখেন নাই; কিছুক্ষণ পরে রাতের আঁধারে তিনিও ঘোড়ার চড়িয়া বাহিরে কি হইতেছে দেখিবার জন্য চলিলেন; এই গোলমালে আরও অনেকে অন্য মতলবে গা-ঢাকা দিয়া বাহির হইয়া পড়িল। ছাউনির বাহিরে সাস্ত্রী পাহারা নাই, গুপ্তসঙ্কেত (passward) তলব করিবার বালাই নাই। কিছুদূর ঘোড়া দৌড়াইয়া ম্যানুসী এক গ্রামে পৌঁছিলেন, গ্রামটা উজাড়-জনমানবশূন্য, পাশে টিলার মতো উঁচু জায়গা। ওই টিলার উপর বসিয়া তিনি চারিদিক দেখিতেছিলেন; তখনও ভোর হওয়ার অনেক দেরি, বিপক্ষের কোনও সাড়াশব্দ নাই, অথচ ওই স্থান অতিক্রম করিয়া এ পক্ষের ঘোড়সওয়ার যাহারা যাইতেছে তাহারা ফিরিতেছে না। ভোরের কিঞ্চিৎ পূর্বে দেখা গেল—অপর দিক হইতে স্বল্পসংখ্যক অশ্বারোহী পরিরক্ষিত একদল পদাতিক ও কয়েকটি উট দ্রুত গাঁয়ের দিকে আসিতেছে। উহারা গাঁয়ের কাছে আসিয়া থামিয়া গেল এবং ছোট ছোট দলে বিভক্ত হইয়া কিছুদূরে স্থানগ্রহণ করিল; উটগুলির পিঠে গাদাকরা “বোমা” অর্থাৎ হাউইবাজি, পটকা, “হুক্কা” (ডাবার খোলাকৃতি পোড়ামাটির খোলে বারুদ ভর্তি সেকেলে হাতবোমা)। সূর্যোদয়ের পর দিগ্বলয় রেখায় দেখা গেল বিপক্ষ সেনা পাঁচ অশ্বারোহী দলে বিভক্ত অথচ অবিচ্ছিন্ন ভাবে সচল অরণ্যানীর ন্যায় নিঃশব্দে ধীরমস্থর গতিতে অগ্রসর হইতেছে।
আরও একটু আড়াল হইয়া ম্যানুসী সাহেব মনের সুখে বেলা আটটা পর্যন্ত তামাশা দেখিতেছিলেন, এমন সময় ছাউনি হইতে হুকুম আসিল— যাহারা বাহিরে আছে তাহারা জলদি লাইনে ঢুকিয়া পড়ুক, তোপদাগা শুরু হইবে। ম্যানুসী সাহেব ঘোড়া দৌড়াইয়া কোনক্রমে ছাউনিতে ঢুকিয়া পড়িলেন; একজন মোগল সওয়ারও ম্যানুসীর পিছে পিছে আসিতেছিল, তোপের প্রথম গোলায় বেচারা উড়িয়া গেল, অথচ তখনও বিপক্ষ সেনা অন্যূন তিনমাইল দূরে।
দুই
যাত্রার প্রাক্কালে আওরঙ্গজেব সেনাধ্যক্ষগণকে ডাকাইয়া প্রয়োজনীয় উপদেশ দেওয়ার পর বলিলেন, তোমাদের দৃষ্টিপথে আগ্রা, দৌলতাবাদ বহুদূর; পশ্চাতে চম্বল-নর্মদা, দুর্গম অরণ্য ও দুর্লঙ্ঘ্য বিন্ধ্যগিরি; বাহাদুরির ইনাম হিন্দুস্থানের ধনদৌলত ও দিল্লির বাদশাহি; ভীরুতার পরিণাম মৃত্যু ও অপমান; কাফের দারার কবল হইতে সম্রাটের মুক্তি ও ইসলামের ইজ্জত রক্ষার ভার তোমাদের উপর —আল্লা তোমাদের সহায়।
আওরঙ্গজেবের সেনা সংখ্যায় বোধ হয় চল্লিশ হাজারের বেশি ছিল না, মোরাদের দশ হাজার অশ্বারোহী লইয়া তোপখানার লস্কর ও পদাতিক বাদে মোট পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী। সামনে অশ্বারোহী এবং পিছনে তোপখানা ও পদাতিকগণকে রাখিয়া আওরঙ্গজেব শিবির হইতে বেলা আটটায় যাত্রা করিয়াছিলেন, ঘোড়া-হাতিও প্রায় গাড়ির বলদের মতো শম্বুক গতিতে হাঁটিয়া চলিতেছিল। চারি ঘণ্টায় অনধিক চার মাইল খোলা ময়দান অতিক্রম করিয়া বেলা বারোটার সময় প্রায় মাইলখানেক দূরে আওরঙ্গজেবের অর্ধচন্দ্র পতাকা ও লৌহগোলক-চিহ্নিত ধ্বজা দারার বাহিনীর দৃষ্টিগোচর হইল। যুদ্ধস্থলে পৌঁছিবামাত্র তোপখানা পশ্চাৎ হইতে ব্যূহের অগ্রভাগে চলিয়া আসিল; তোপখানার আড়ালে অশ্বারোহীদল পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে শৃঙ্খলার সহিত ব্যূহবদ্ধ হইল; কোথাও চাঞ্চল্য নাই, বাহ্বাস্ফোটন নেই।
আওরঙ্গজেব নিজের জ্যেষ্ঠপুত্র কুমার মহম্মদ সুলতানকে দশ হাজার অশ্বারোহীসহ রণব্যূহের “হরাবল” বা সুচীমুখে স্থাপন করিলেন। কুমারের পাশেই তাঁহার সামরিক উপদেষ্টা-স্বরূপ রহিলেন “খানখানাঁ” উপাধির দ্বারা সদ্য সম্মানিত অমিত পরাক্রম বিচক্ষণ সেনানী নেজাবত খাঁ। হরাবলের যোদ্ধৃগণ সকলেই মুসলমান, বেশির ভাগই তাতার মোগল জাতীয়।
‘ব্যূহের বাম পক্ষের (Left Wing) পরিচালক আওরঙ্গজেবের দক্ষিণহস্তস্বরূপ শাহজাদা মোরাদবশ। ভীমকর্মা মোরাদের অধীনে দশ হাজার রণকুশল অশ্বারোহী — অধিকাংশই মোগল-তাতার জাতীয় পাকা সওয়ার। দক্ষিণ পক্ষ (Right Wing) পরিচালনার জন্য মনোনীত হইয়াছিলেন বিশ্বাসী সেনানী ইসলাম খাঁ। ইঁহার অধীনে বুন্দেলা, রাজপুত ও মুসলমানের পাঁচমিশাল ফৌজের মধ্যে দারার প্রতি বিশ্বাসঘাতক মহোবার রাজা চম্পরায় বুন্দেলা, ধামদেরার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এবং রাও ছত্রশালের পুত্র সিংহপরাক্রম ভগবন্ত সিংহ হাড়ার নাম উল্লেখযোগ্য।
অতঃপর উভয়পক্ষের স্নায়ু-যুদ্ধ কিছুক্ষণ চলিতে লাগিল। (চলবে)