ঊনবিংশতি অধ্যায়
দারার পরাজয় ও পলায়ন
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ, ২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিঃ)
তিন
পূর্বদিনের স্নায়ু যুদ্ধে দৃঢ়সত্ত্ব আওরঙ্গজেবের নিকট দারা পরাজিত হইয়াছিলেন; অপ্রস্তুত অবস্থায় শত্রুকে তিনি যুদ্ধে নামাইতে পারেন নাই, নিজে প্রস্তুত থাকিয়াও শেষ পর্যন্ত আওরঙ্গজেবকে আক্রমণ করিবার সাহস তাঁহার হয় নাই।
সেই দিন তিনি মাঝরাতে অকারণে বাহির হইয়া পড়িয়াছিলেন, সিপাহী সওয়ার মনসবদার কাহাকেও নিরুপদ্রবে ঘুমাইতে দেন নাই। আওরঙ্গজেব যথারীতি ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যাত্যাগ করিয়া চুপচাপ তসবী জপ করিতে করিতে হয় খোদাতালা না হয় লড়াইয়ের ধ্যান করিতেছিলেন, বাদবাকি মানুষ ও জানোয়ার নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাইতেছিল। পরের দিন সকাল আটটা বাজিতেই দারার ব্যূহবদ্ধ বিরাট বাহিনীর হাত-পা খিঁচুনি আরম্ভ হইল, চারিদিকে “আসিয়া পড়িল” চিৎকার; অথচ তখনও চার-পাঁচ মাইল দূরে আওরঙ্গজেব সবেমাত্র রেকাবে পা দিয়াছেন! সেইদিন ভোরবেলা দারার ছাউনিতে হিন্দু সিপাহীর খিঁচুড়ির ভঙ্গু ও মুসলমানের ডেগ চড়িয়াছিল কিনা সন্দেহ; বলদের জল-ভুষি, ঘোড়ার ঘাসদানা, হাতির খোরাকের খবর কে রাখিবে? দুশমনের টিকির দেখা নাই; অথচ গোলা দাগিবার হুকুম, লড়াইয়ের বাজনা ও অনর্থক হই-হল্লা। ইহা অপেক্ষা স্নায়ু-বিকারের আর কি লক্ষণ থাকিতে পারে? ইহার উপর দিন বারোটা পর্যন্ত আষাঢ় মাসের রৌদ্র মাথায় করিয়া ঠায় মাঠে দাঁড়াইয়া উদ্বেগ ও অপেক্ষা করিবার যন্ত্রণা ভোগ করিলে ৫০/৬০ হাজার সিপাহী লস্করের স্নায়ুবল অক্ষুণ্ণ থাকিবার কোনও কারণ নাই।
বাবরশাহী কায়দায় বন্দুকধারী পদাতিক রক্ষিত তোপখানা লইয়া খোলা ময়দানে লড়াই করিতে হইলে দুইটি কৌশল অপরিহার্য ছিল; প্রথমত তোপখানাকে পাতলা অশ্বারোহীশ্রেণীর পর্দার আড়ালে রাখিয়া শত্রুকে প্রথম আক্রমণের জন্য প্ররোচিত এবং প্রলোভিত করা; দ্বিতীয়ত শত্রুর আক্রমণকে তোপখানার সম্মুখে প্রতিহত করিয়া নিজের দক্ষিণ ও বাম পক্ষের বাহিরে পার্ফিঘাতক সঞ্চরমাণ অশ্বসাদির দ্বারা শত্রুকে পরিবেষ্টিত ও বিব্রত করা। বাবরশাহী ব্যূহ আক্রমণাত্মক রীতির উপযুক্ত নহে। এই প্রকারের ব্যূহ স্বস্থান পরিত্যাগ করিয়া আগে পিছে সহজে নড়িবার সাধ্য নাই; অধিকন্তু, চলমান অবস্থায় আক্রান্ত হইলেই বিপদ। কুচ করিবার সময় রাস্তায় এই প্রকার আক্রমণ আশঙ্কা করিয়াই আওরঙ্গজেব অতি সন্তর্পণে বাহিনী চালিত করিতেছিলেন। ওইদিন সকালবেলা দারা যদি ফিরোজ জঙ্গ বাহাদুরের মতো সাহসী ও বিচক্ষণ সেনানীর অধিনায়কত্বে দশ হাজার অশ্বারোহী শত্রুকে রাস্তায় হঠাৎ হামলা করিবার জন্য পাঠাইয়া দিতেন কিংবা পশ্চাদ্ধাবমান শত্রুকে প্রতারিত করিয়া নিজ পক্ষের তোপখানার পাল্লার ভিতর লইয়া আসিতে পারিতেন তাহা হইলে সেদিন আওরঙ্গজেবের যাত্রাভঙ্গ হইত; কিন্তু দারার সেই সাহস ও রণপাণ্ডিত্য কোথায়? সকালবেলা সমগ্র বাহিনীর সহমরণ ব্যবস্থা না করিয়া দারা যদি কয়েকটি সংবাদ-সংগ্রাহক অশ্বারোহীদল (scouting parties) সামনে পাঠাইয়া দিতেন কিংবা তাঁহার শিবিরের নিকটস্থ পূর্বোক্ত উজাড় গ্রাম হইতে মুষ্টিমেয় শত্রুকে বিতাড়িত করিয়া দিতেন তাহা হইলে অহেতুক ত্রাসে নিজ পক্ষের মনোবল হ্রাস পাইত না।
দারা নিজ ছাউনি পিছনে রাখিয়া সৈন্যসজ্জা করিয়াছিলেন। স্থান-নির্বাচন ভালোই হইয়াছিল, পাশ কাটাইয়া শত্রুর পার্শ্ব কিংবা পশ্চাতে পৌঁছিবার উপায় ছিল না। সেনাব্যূহের সম্মুখে বালুকাভূমি, মাঝে মাঝে ফাটল, শুকনা ঝিল, উঁচু-নীচু ঢিবি; অশ্বারোহীর পক্ষে সুগম না হইলেও দুর্গম নহে। কিন্তু তোপখানা লইয়া পাল্লার ভিতরে আসা আয়াসসাধ্য ব্যাপার। এরূপ স্থানে যে পক্ষ আগুয়ান হইয়া অপর পক্ষকে আক্রমণ করিবার চেষ্টা করিবে তাহারা উক্ত অসুবিধার দরুন বেকায়দায় পড়িবে। এইজন্য আওরঙ্গজেব দারাকেই আক্রমণে টানিবার ফিকিরে ছিলেন, ময়দানে উপস্থিত হইয়া তিনি লড়াইয়ের কোনও গরজ দেখাইলেন না—দারার তোপখানার পাল্লার দ্বিগুণ দূরে থাকিয়া তাঁহার তোপখানা কয়েকটা হাউইবাজি ফাটাইয়া বাদশাহী ফৌজকে অভ্যর্থনা জানাইল। এইদিকে দারার তোপখানা পূর্বেই গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিয়াছিল। চোখের দৃষ্টির পাল্লা ও তোপের পাল্লা সেকালে সমান ছিল না; গোলা কতদূর যাইবে, কিসের উপর নিশানা করিবে এই বিবেচনার অবকাশ দারা তোপখানার মনসবদারগণকে দিলেন না; ব্যস্তসমস্ত হইয়া তাহাদিগকে তোপ দাগিবার হুকুম পাঠাইলেন। বাদশাহী তোপখানার গোলা ময়দানের মাঝখানে ফাটিতে লাগিল, আওরঙ্গজেবের কেশাগ্রও কম্পিত হইল না। ম্যানুসী [STORIA, i 276] প্রমুখ তোপখানার ফিরিঙ্গি অফিসারগণ এইরূপ বৃথা পরিশ্রমে বিরক্ত হইয়া উঠিল।
চার
প্রায় এক ঘণ্টাকাল দারার শতাধিক কামান গর্জনে যুদ্ধভূমি কাঁপিয়া উঠিল; ধূলি ও ধূম্রজালে ভূতল আকাশ আচ্ছন্ন, উহার আড়ালে কোথায় কি ঘটিতেছে কাহারও দেখিবার সাধ্য নাই। আওরঙ্গজেবের তোপখানার আওয়াজ ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া অবশেষে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হইয়া গেল, সেনাদল নিশ্চেষ্ট। দারা মনে করিলেন লড়াই আধা জিতিয়া লইয়াছেন—ইহা তাঁহার তোপখানার কেরামতি। এমন সময় বাহিনীর দক্ষিণ বাহুর অধিনায়ক ঘোড়া দৌড়াইয়া ছুটিয়া আসিলেন এবং দারাকে অভিবাদন করিয়া বলিলেন, “শাহজাদা বুলন্দ-ইকবাল’ আপনার ফতে মোবারক! দুশমন একেবারে ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে; এখনই হামলা করিয়া ময়দানের মালিক হওয়ার সুযোগ।” মেসোর কথা দারার মতের সঙ্গে মিলিয়া গেল, পরামর্শ করিবার জন্য তিনি প্রধান সেনানায়কগণকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। খলিলুল্লার বক্তব্য শুনিয়া ফিরোজ জঙ্গ বাহাদুর নিবেদন করিলেন, “শত্রুপক্ষ অনেক দূর হইতে আমাদিগকে আক্রমণ করিতে আসিয়াছে; লড়াইয়ের কায়দা অনুসারে আমাদিগের উপর হামলা করা ব্যতীত তাহাদের গত্যন্তর নাই; সুতরাং তাহাদের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিসঙ্গত। তোপখানার সামনে হামলা করিতে আসিলেই তাহারা বেকায়দায় পড়িবে, তখন আমরা আমাদের সুরক্ষিত অবস্থানের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করিয়া উহাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িব।”
উক্ত অবস্থায় ইহাই ছিল ফিরোজ-জঙ্গের মতো প্রবীণ সেনানী এবং দারার প্রকৃত হিতৈষীর উপযুক্ত উপদেশ; কিন্তু অসহিষ্ণু দারা স্নায়ুযুদ্ধে আবার হার মানিলেন। এই উপদেশমত কাজ করিলে এইদিন যুদ্ধ না করিয়া আওরঙ্গজেবকে ব্যর্থকাম হইয়া নিজ শিবিরে ফিরিয়া যাইতে হইত, বহু সৈন্যক্ষয় করিয়া জয়ের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি লইবার মতো হঠকারী অপরিপক্ক যোদ্ধা তিনি নহেন; দারার বাহিনীকে পিছনে রাখিয়া আগ্রার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিপদ তাঁহার অজানা ছিল না।
ধূর্ত খলিলুল্লা দেখিলেন ঘাটে আসিয়াই বুঝি বেইমানির ভরা ডুবিল। মহামানী ফিরোজ-জঙ্গের দুর্বলতা কোথায় তিনি জানিতেন। তিনি কৃত্রিম ক্রোধ প্রকাশপূর্বক টিটকারি দিয়া বলিলেন, “দুশমনকে আমরা প্রায় সাবাড় করিয়া আনিয়াছি, একটু হিম্মত দেখাইলেই ফতে হাসিল হইয়া যায়। এমন সুযোগে হামলা না করিয়া বুজদিলের মতো হাত-পা গুটাইয়া বসিয়া থাকিবার কথা ফিরোজ-জঙ্গ বাহাদুরের মতো নামী সিপাহসালারের মুখে শুনিয়া আমি তাজ্জব হইয়া গেলাম।”
দারা খলিলুল্লার কথায় সায় দিয়া সেনানীগণকে স্ব স্ব স্থান হইতে একযোগে বিপক্ষব্যূহ আক্রমণ করিবার সরাসরি আদেশ দিলেন, তোপদাগা বন্ধ করিয়া কামানশ্রেণীর শিকল খুলিয়া দিয়া অশ্বারোহী হাতি-উটের নির্গমপথ পরিষ্কার করিবার হুকুম হইল। (চলবে)