ঊনবিংশতি অধ্যায়
দারার পরাজয় ও পলায়ন
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ, ২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিঃ)
পাঁচ
কিছুক্ষণ অশিব নিস্তব্ধতার পর রণস্থলে প্রলয়ের বিষাণ বাজিয়া উঠিল; যুগপৎ সহস্ৰ তূর্যধ্বনি, শত শত দামামা দুন্দুভির ভীষণ নির্ঘোষ, হস্তীর বৃংহিত, অশ্বের হ্রেষা ও কোষমুক্ত তরবারির ঝঞ্ঝনা যুদ্ধভূমি প্রকম্পিত করিয়া দারার সেনা সমুদ্রে রণোন্মাদনার তুফান তুলিয়াছে। গোলার ধূম্রজাল আহত বালুকাভূমি সমুখিত ধূলিরাশির দ্বারা আষাঢ়ের নির্বাত মধ্যাহ্নে উভয় সেনার মধ্যে যেন কুাটিকার পর্দা টানিয়া দিয়াছে; যোদ্ধৃগণের শাণিত অসি ও বর্শাফলক এই আঁধারে উড্ডীয়মান খদ্যোৎপুঞ্জের ন্যায় যুদ্ধহস্তীসমূহের কৃষ্ণ ছায়াকে পরিবৃত করিয়া সম্মুখে চলিয়াছে।
দক্ষিণে খলিলুল্লা, বামে ফিরোজ-জঙ্গ, মধ্যে হরাবল লইয়া রাও ছত্রশাল স্ব স্ব বাহিনীকে ঘন সন্নিবিষ্টভাবে ব্যূহবদ্ধ করিলেন; কেন্দ্রভাগ দারার অধীনে কামানশ্রেণীর পশ্চাতে রহিল, অগ্রবর্তী রিজার্ভ সেনা হরাবলের স্থান গ্রহণ করিল। দারার পৃষ্ঠরক্ষী কোনও অশ্বসাদি ছিল না, এবং শিবির রক্ষার্থ কোনও ফৌজ মোতায়েন রাখা তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেন নাই।
অকম্মাৎ সর্বপ্রথমে ব্যূহের বামপার্শ্ব হইতে বিকট যুদ্ধধ্বনি উঠিল, তারপর রাজপুতের “মার মার” রণহুঙ্কার, শেষে তাতার অশ্বারোহীর ফার্সি “বে-কুশ, বে-কুশ” হানাহানি চিৎকার। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ হাজার ধাবমান অশ্বের ক্ষুরোখিত ধুলায় ধুম্রকুটিকা ভূতলচুম্বী মহামেঘের ন্যায় রণস্থলে দারার দৃষ্টিপথ অবরুদ্ধ করিল।
ফিরোজ-জঙ্গ বাহাদুর ও কুমার সিপহর শুকোর নেতৃত্বে দারার বামপক্ষ আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ পক্ষকে আক্রমণ করিবার কথা; কিন্তু তাঁহারা সামনে শ্রেণীবদ্ধ শত্রুসেনা দেখিতে পাইয়া ওইদিকে সৈন্যচালনা করিলেন, দশ সহস্র উত্থিত তরবারি ঝড়ের বেগে শত্রুকে লক্ষ্য করিয়া ছুটিল। বিপরীত দিকে কোনও বাধা না পাইয়া ফিরোজ-জঙ্গের অশ্বারোহী দল অপ্রতিহত গতিতে নাগালের ভিতর পৌঁছিতেই তাহাদের রাস্তা হইতে শত্রুর অশ্বসাদি বিনাযুদ্ধে পিছু হটিয়া বামে দক্ষিণে সরিয়া গেল, হঠাৎ তোপখানার মৃত্যুবর্ষী অগ্নি জ্বলিয়া উঠিল। ঝাঁকে ঝাঁকে গোলাগুলির আঘাতে অশ্ব ও অশ্বারোহী ছিন্নাঙ্গ হইয়া ধরাশায়ী হইতে লাগিল।
ফিরোজ-জঙ্গের বাহিনী আওরঙ্গজেবের তোপখানার অধ্যক্ষ সফ-শিকন খাঁর কৌশলে মৃত্যুর মুখে আসিয়া পড়িয়াছিল। এই অবস্থার জন্য পূর্বে প্রস্তুত থাকিলে তোপখানা তাঁহাকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারিত না। ফিরোজ-জঙ্গ দেখিলেন পতঙ্গের মতো তোপখানার সামনে মরিলে কার্যসিদ্ধি হইবে না। তিনি তোপখানার পাশ কাটাইয়া উহার পশ্চাতে কিছুদূরে আওরঙ্গজেবের হরাবলের উপর হামলা করিতে চলিলেন। আওরঙ্গজেব তোপখানা ও হরাবলের জন্য আশঙ্কান্বিত হইয়া তাঁহার দক্ষিণ পারিক্ষক বাহাদুর খাঁকে সামনে পাঠাইয়াছিলেন; মধ্যভাগে তাঁহার পাঁচ হাজার অশ্বারোহী ফিরোজ-জঙ্গের সেনার সহিত ভীষণ হাতাহাতি যুদ্ধে ব্যাপৃত হইয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপক্ষের আক্রমণে পর্যুদস্ত হইল, বাহাদুর খাঁ গুরুত্ব ভাবে আহত এবং তাঁহার সাহসী সহকারী সৈয়দ দিলাবর খাঁ ও হাদিদাদ খাঁ নিহত হইলেন।
ছয়
এই সুখবর পাইয়া দারার মাথা ঘুরিয়া গেল, ফিরোজ-জঙ্গ নিঃসন্দেহ যুদ্ধ জিতিয়াছেন মনে করিয়া বিজয় বাদ্য বাজাইবার হুকুম দিলেন এবং মহা উৎসাহে বাহিনীর কেন্দ্রভাগ লইয়া ফিরোজ-জঙ্গের সাহায্যার্থ বাহির হইয়া পড়িলেন, তোপখানা পিছনে পড়িয়া রহিল। দারা বামে ঘুরিয়া আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ পক্ষ আক্রমণ করিতে চলিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তোপ দাগিবার হুকুম পাঠাইলেন। ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ নায়ক এত বেকুব নহে, তোপ দাগিলে সামনে স্বপক্ষের লোকই মরিবে, হয়তো শাহজাদার উপরও পড়িতে পারে; সুতরাং তাহারা দারার বুদ্ধির বাহবা দিয়া চুপ করিয়া রহিল।
বুদ্ধির দোষে দারাও সফ-শিকন খাঁর তোপের পাল্লার ভিতর পড়িয়া ফিরোজ-জঙ্গ অপেক্ষা মারাত্মক সম্বর্ধনা পাইলেন, অগ্নিবর্ষণের মুখে তাঁহার বাহিনী বিব্রত ও ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল, অথচ ইহার পাল্টা জবাব দেওয়ার উপায় নাই। নিজের ভুল বুঝিতে পারিয়া দারা তাঁহার তোপখানাকে আগাইয়া আনিবার জন্য হাতির উপর হইতে ইশারা করিলেন; কিন্তু লাথি-জুতা-চাবুক ও বল্লমের খোঁচার কাজ ইশারায় হাসিল হইবার নয়। দারা হুড়মুড় করিয়া তোপখানা ফেলিয়া না আসিলে রক্ষী সেনাগণ উক্ত উপায়ে পদাতিক ও ছাউনির দশ-পনের হাজার চাকরবাকরকে দিয়া তাঁহার বিরাট তোপখানাকে টানাইয়া আওরঙ্গজেবের তোপখানার কাছাকাছি লইয়া আসিতে পারিত; শাহজাদার উপস্থিতিতে সকলেই শায়েস্তা থাকিত। দারার তোপখানা আওরঙ্গজেবের তোপখানা ঠেকাইয়া রাখিলে উভয়পক্ষের বল সাম্য হইত; জয় না হইলেও যুদ্ধের ফল অন্তত অমীমাংসিত থাকিত। স্বয়ং যুদ্ধে লাফাইয়া পড়িয়া দারা তাঁহার বুদ্ধির খেই ও লড়াইয়ের বাগ্-ডোর দুই-ই হারাইয়া বসিলেন। সেনাপতি হিসাবে ইহাই তাঁহার সর্বাপেক্ষা নিন্দনীয় ভুল এবং সর্বনাশের প্রধান কারণ।
দারার অনুপস্থিতিতে কামান, গোলন্দাজ ও তাহাদের নায়কগণকে ফেলিয়া চাকর-বাকর ছাউনির ভবঘুরে নাপিত কসাই সিপাহী সকলেই শাহজাদার তাঁবু লুঠ করিতে লাগিল। সেখানে সিন্দুক ভাঙিয়া টাকা, আশরফি ও দামী জিনিসপত্র যে যাহা পাইল লুট করিতে লাগিল এবং পরস্পরের মধ্যে খুনোখুনি করিয়া মরিল কিংবা বাড়ি পলাইয়া গেল। কামানের গাড়ির বলদ নাই, বলদ হাঁকাইবার লোক নাই, খালাসি-লস্কর নাই; এই অবস্থায় তাঁহার বিশ্বস্ত ফিরিঙ্গি অফিসারগণ কি করিবেন? তবুও তাঁহারা ঘোড়ার চড়িয়া শাহজাদার সাহায্যার্থ অগ্রসর হইলেন, ইহাদের মধ্যে ম্যানুসী সাহেবও ছিলেন।
সাত
দারা নিজ বাহিনীকে পুনঃস্থাপিত করিয়া সোজা আওরঙ্গজেবকে আক্রমণ করিতে চলিলেন। আওরঙ্গজেবের কেন্দ্রভাগ এবং হরাবলের মধ্যবর্তী স্থানে পাঁচ হাজার অশ্বারোহী লইয়া অগ্রবর্তী সংরক্ষিত, সেনার অধিনায়ক শেখ মীর দারার গতিরোধ করিলেন। এইখানে প্রচণ্ড হাতাহাতি যুদ্ধ হইল। শার্দূল বিক্রমে দারা যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন, শেখ মীরের অধিকাংশ সৈন্য হতাহত হইল, বাদবাকি পিছু হটিল। আওরঙ্গজেবের দক্ষিণপা িতখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত, বাহাদুর খাঁ ফিরোজ-জঙ্গের সহিত যুদ্ধে আহত এবং তাঁহার অশ্বসাদি ও দক্ষিণ পক্ষের অধিনায়ক ইসলাম খাঁ বহুদূরে দারার বামপক্ষের সহিত যুদ্ধে ব্যাপৃত। দারার সামনে আওরঙ্গজেবের অল্পসংখ্যক দেহরক্ষী সেনা। আওরঙ্গজেব উচ্চস্বরে সেনামুখ্যগণের নাম ধরিয়া ডাকিতে লাগিলেন এবং সেনাকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন। শেখ মীরের সেনাদল ভঙ্গপ্রায় দেখিয়া আওরঙ্গজেব হাওদার ভিতর হইতে দুই হাত তুলিয়া চিৎকার ছাড়িতেছিলেন, “ইয়া খোদা! ইয়া খোদা! তুমিই ভরসা!”
শেখ মীরকে পরাজিত করিয়া দারা তৃষ্ণা, রৌদ্র এবং যুদ্ধাশ্রমে কাতর হইয়া পড়িয়াছিলেন; আওরঙ্গজেবের কেন্দ্রভাগকে আক্রমণ করিবার পূর্বে তিনি একটু দম লইতেছিলেন। এই বিশ্রাম তাঁহার সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড করিল। এই অবসরে চারিদিক হইতে নূতন ফৌজ আনাইয়া আওরঙ্গজেব তাঁহার ভগ্নপ্রায় ব্যূহ দৃঢ়সজ্জিত করিলেন। এইদিন দারা যদি আক্রমণ স্থগিত না রাখিয়া সোজা আওরঙ্গজেবের উপর গিয়া পড়িতেন তাহা হইলে তাঁহার সংখ্যাগরিষ্ঠতা শত্রুকে পরাজয়ের মুখে ঠেলিয়া দিতে পারিত।
ইতিমধ্যে দারার কাছে সংবাদ আসিল, রাও ছত্রশাল ও রাজপুতগণ শাহজাদা মোরাদকে পরাজিত করিয়া আওরঙ্গজেবের বামপার্ফি আক্রমণ করিয়াছেন, এখন তাঁহাদিগকে অতি সত্বর সাহায্য করা প্রয়োজন। দারা ত্রস্তব্যস্ত হইয়া নিজ ব্যূহের বাম বাহুর শেষ হইতে দক্ষিণ বাহুর দিকে সেনাবাহিনী ফিরাইয়া লইলেন। আওরঙ্গজেবের তোপখানা পার্শ্ব হইতে গোলা দাগিয়া বহু অশ্বারোহীকে হতাহত করিল। হতাবশিষ্ট ক্লান্ত সেনাদলসহ তিনি রাজপুতগণের সাহায্যার্থ উপস্থিত হইয়া শুনিতে পাইলেন ডানে বামে সব শেষ হইয়া গিয়াছে, খলিলুল্লার খবর নাই; রাও ছত্রশাল ও রামসিংহ রাঠোর নিহত, ফিরোজ-জঙ্গ বহু শত্রুসেনা দ্বারা আক্রান্ত হইয়া স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করিয়াছেন, কুমার সিপ্হর শুকো ও মুষ্টিমেয় যোদ্ধা মাত্র রক্ষা পাইয়াছে। (চলবে)