ঊনবিংশতি অধ্যায়
দারার পরাজয় ও পলায়ন
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ, ২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিঃ)
বার
যুদ্ধক্ষেত্রের বামভাগে দারা যখন আওরঙ্গজেবের অগ্রবর্তী রিজার্ভ ফৌজকে ছত্রভঙ্গ করিয়া পরবর্তী আক্রমণের জন্য একটু দম লইতেছিলেন তখন এই দুঃসংবাদ তাঁহার কাছে পৌঁছিল; দারা তাঁহার সামনে অসহায় আওরঙ্গজেব ও সুনিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনাকে ছাড়িয়া চলিলেন। ইহাই তাঁহার কাল হইল, তিনি দুই দিকই হারাইয়া বসিলেন। তিনি যদি বিচলিত না হইয়া এই সময়ে সরাসরি আওরঙ্গজেবের ভগ্নপঞ্জর কেন্দ্রস্থ সেনার কলিজা”র (Qalb) উপর সরাসরি হামলা করিতেন তাহা হইলে সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং বামপার্ফি হইতে রাজপুত আক্রমণে বিব্রত শত্রুসৈন্য আওরঙ্গজেবকে রক্ষা করিতে পারিত কি না সন্দেহ।
বিচারমূঢ় সেনাপতি দারা তাঁহার নিজ বাহিনীকে যুদ্ধস্থলের এক সীমান্ত হইতে অন্য সীমান্তে চালিত করিলেন। দারুণ রোদে বালুজমির উপর বামে দক্ষিণে প্রায় দেড় মাইল রাস্তা দৌড়াদৌড়ি করিতে করিতে ঘোড়াগুলি আধমরা হইল, সওয়ারের গায়ে ইস্পাতের সাঁজোয়া রোদে তাতিয়া ফোস্কা ফেলিল, জলের অভাবে তৃষ্ণায় জানোয়ার ও মানুষের ছাতি ফাটিতে লাগিল; ইহার উপর আওরঙ্গজেবের তোপখানা হইতে অগ্নিবৃষ্টি। এইভাবে শাহজাদার ক্রমশ ক্ষীয়মাণ সেনাদল অবশেষে তাঁহার হরাবলের সহিত মিলিত হইল।
দারার দক্ষিণ-পক্ষ লইয়া বিশ্বাসঘাতক খলিলুল্লা বিনাযুদ্ধে উধাও হইয়াছিল, ফিরোজ-জঙ্গের মৃত্যুর পর বামপক্ষের অস্তিত্ব রহিল না। শাহজাদার বাহিনীর তখন রামায়ণের পক্ষদ্বয় ছিন্ন জটায়ু পাখির অবস্থা; অধিকন্তু রাবণের রথ গিলিবার জন্য হরাবল-চঞ্চুও ছত্রশাল-রামসিংহ-রূপসিংহের সহিত কাটা পড়িয়াছে। ইতিমধ্যে মোরাদ আওরঙ্গজেবের বামপক্ষকে পুনঃস্থাপিত করিয়া কেন্দ্রের বামপার্ফির সহিত মিলিত হইয়াছিল এবং বিজয়ী দক্ষিণ পক্ষ ইসলাম খাঁর নেতৃত্বে পলায়মান কুমার সিপ্হর শুকোকে তাড়া করিতে দারার পশ্চাৎ ভাগে আসিয়া পড়িল। মুষ্টিমেয় বিশ্বস্ত অশ্বারোহী কোনপ্রকারে কুমারকে রক্ষা করিয়া দারার সহিত মিলিত হইল।
পড়ন্ত রোদে পশ্চিমমুখী হইয়া দারার বাহিনী আবার যুদ্ধ আরম্ভ করিল, বক্শী আস্কর খাঁর নেতৃত্বে হরাবল তখন দারার দক্ষিণ বাহুস্বরূপ হইল, দারা স্বয়ং নিজ তাবিনের তিন হাজার অশ্বারোহী লইয়া ব্যূহমূখে আক্রমণার্থ প্রস্তুত হইলেন, তাঁহার বামপা িকুমার সিপ্হর শুকোর সহিত মিলিতভাবে বামপক্ষের স্থান গ্রহণ করিল। কেন্দ্রের বাকি নয় হাজার বাদশাহী ফৌজ এই পর্যন্ত শাহজাদাকে ঝড়ঝাপটার মুখে ফেলিয়া তামাশা দেখিতেছিল, ইহাদের মধ্যে অনেকেই বাম দিক হইতে দক্ষিণে ফিরিবার সময় ইচ্ছা করিয়া পিছনে পড়িয়াছিল; যাহারা আসিয়াছিল তাহারা মধ্যভাগে রহিল; কুমার রামসিংহ এবং সৈয়দ বহির খাঁর অধীনে দারার অগ্রবর্তী দশ হাজার রিজার্ভ অশ্বারোহী বাদশাহী ফৌজের পিছনে ব্যূহের পৃষ্ঠরক্ষক (rearguard) রহিল। ময়দানের যেখানে খাদ ঢিবিটিলা-টক্কর ছিল, বাহাদুর বাদশাহী আহুদী রিসালা ওইগুলির আড়ালে লুকাইয়া ভাবিতেছিল, মরিয়া গেলে নয়া সরকারে চাকরি করিবে কে? পাছে দারা জিতিয়া যায় এই আশঙ্কায় শুধু তাহারা পলায়নের অপেক্ষা করিয়া রহিল।
তের
সাহায্যার্থ দারা উপস্থিত হওয়া মাত্র হরাবলের নির্বাপিতপ্রায় বীর্যবহ্নির শেষ শিখা জ্বলিয়া উঠিল। রাজপুতগণ নায়কশূন্য হইয়াও পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে নাই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত ক্ষুধিত বৃকপালের ন্যায় প্রত্যেক বংশের যোদ্ধারা রণহুঙ্কারে যুদ্ধস্থল কাঁপাইয়া শত্রুসেনার মধ্যে শিকারের সন্ধানে চলিল, তাহাদের সামনে যাহারা পড়িল তাহারা রক্ষা পাইল না। অনিয়ন্ত্রিত শৌর্যশঙ্কার কারণ হইলেও পরিণামে ফলপ্রসূ হয় না। বহুগুণ অধিক শত্রুর দ্বারা পরিবৃত রাজপুতগণ দারুণ মার-কাট করিয়া স্বর্গের পথে চলিল। দারার বক্শী আস্কর খাঁ এবং দায়ুদ খাঁর কয়েক হাজার অশ্বারোহী অধিকতর শৃঙ্খলা রক্ষা করিয়া অচল শিলাখণ্ডের ন্যায় মোরাদের পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করিয়া শাহজাদার আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল, এইবার তাহারা শেষ আঘাত হানিবার জন্য অগ্রসর হইল।
দারা অসীম সাহসে আওরঙ্গজেবকে লক্ষ্য করিয়া সম্মুখে সেনাচালনা করিলেন। এই সময়ে জুলফিকর খাঁর তোপখানা ও পাঁচ হাজার অশ্বারোহী বামপার্শ্ব হইতে তাঁহার বাহিনীকে আক্রমণ করিল এবং একই সময়ে শাহজাদা মোরাদ তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্বের উপর ভীমবেগে আপতিত হইলেন। কিছুক্ষণ তুমুল যুদ্ধ হইল, বকশী আস্কর খাঁ ও দায়ুদ খাঁ নিহত হইলেন, দারার ব্যূহের দক্ষিণ পঞ্জর ভাঙিয়া গেল; গোলাবর্ষণ ও নূতন সৈন্যের আক্রমণে -বাম পঞ্জরও নিশ্চিহ্ন হইল। কুমার সিপ্হর শুকো ক্রমশ হটিয়া গেলেন, আওরঙ্গজেবের তোপখানা দ্বিগুণ তেজে সরাসরি দারার কেন্দ্রভাগের উপর অগ্নিবৃষ্টি আরম্ভ করিল, অথচ পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো দারার কাছে একটা হাউইবাজিও নাই—একশত কামান পরিত্যক্ত অবস্থায় বহুদূরে পড়িয়া রহিয়াছে।
ঐতিহাসিক এবং প্রত্যক্ষদর্শী শত্রু-মিত্র কেহই সামুগঢ়ের যুদ্ধে দারার বুদ্ধির তারিফ করিবার অবকাশ না পাইলেও সকলে একবাক্যে শাহজাদার বেপরোয়া সাহস ও বিপদের মুখে অসামান্য দৃঢ়তার উচ্চ প্রশংসা করিয়াছেন। যুদ্ধের শেষভাগে ময়দানের যে অংশে গোলাবৃষ্টি সর্বাপেক্ষা মারাত্মক, যেখানে শত্রুর চাপে বাহিনী ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম, সেইখানেই উপস্থিত হইয়া দারা সৈন্যগণকে নূতন প্রেরণা জোগাইয়াছিলেন—তাঁহার দিকে চাহিয়াই ক্লান্ত ও শত্রুবিমর্দিত যোদ্ধৃগণ প্রাণের মমতা ত্যাগ করিয়া শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যুদ্ধ করিতেছিল। হরাবলের রাজপুত সেনা ধ্বংস ও ফিরোজ-জঙ্গ নিহত হইবার পরেও মুসলমান সেনা দারার জন্য প্রাণপণ করিয়া যুদ্ধ করিবে—আওরঙ্গজেব ইহা মনে করিতে পারেন নাই। আজীবন তিনি যাহাকে “পাগলের মুরব্বি”, অর্বাচীন ভীরু কাফের, কাছা-খোলা পণ্ডিত বলিয়া ঘৃণা ও অবজ্ঞা করিয়াছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চিত পরাজয় ও মৃত্যুর মুখে তাহার দুর্জয় পরাক্রম দেখিয়া আওরঙ্গজেব শঙ্কিত হইয়া পড়িলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন, দারা বাঁচিয়া থাকিতে বিপক্ষ সেনা রণে ভঙ্গ দিবে না; সুতরাং দেহরক্ষীবেষ্টিত দারার হাতিই তাঁহার প্রধান লক্ষ্য হইল। এইবার আওরঙ্গজেব তাঁহার ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়িলেন। কুমার মহম্মদ সুলতান ও নেজাবত খাঁ হরাবলের দশ সহস্র অশ্বারোহী চর্মবন্ধনীমুক্ত লেলিহান শিকারী চিতাবাঘের ন্যায় দারার বিধ্বস্ত বাহিনীর উপর হামলা করিল; আওরঙ্গজেব স্বয়ং কেন্দ্রস্থ সেনা লইয়া হরাবলের পিছন হইতে আক্রমণ পরিচালনা করিতে লাগিলেন। দারার উপর যাহাদের প্রাণের টান ছিল তাহারা শাহজাদার হাতিকে মধ্যে রাখিয়া অদ্ভুত দৃঢ়তা ও সাহসের সহিত দুশমনের তাজা ঘোড়া ও সওয়ারকে ঠেকাইয়া রাখিল, কিন্তু তাঁহার হাওদাকে তোপের নিশানা হইতে বাঁচিবার উপায় নাই; আট-দশ সের ওজনের গোলা কাহারও হাত কাহারও মাথা উড়াইয়া লইয়া গেল, নক্ষত্ৰ-বৃষ্টির ন্যায় মাথার উপর জ্বলন্ত হাউইবাজি পড়িতে লাগিল। দারার দেওয়ান মহম্মদ সালেহ্, আলীমর্দান খাঁর দুই পুত্র, দায়ুদ খাঁ পাঠান, বকশী আস্কর খাঁ এবং শৌর্যে অতুলনীয় বার্হা-বাসী পাঁচজন সেনানায়ক সিংহবিক্রমে যুদ্ধ করিতে করিতে শেষের ডাকে খোদার দরবারে এত্তালা দিতে চলিলেন। চাটুকার মতলববাজ মোসাহেব বলিয়া দারার যে সমস্ত অন্তরঙ্গ কর্মচারী সাধারণের নিন্দাভাজন ছিল তাহারা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়া প্রভুর অকপট বিশ্বাস ও দয়া-দাক্ষিণ্যের মর্যাদা রক্ষা করিল।
এই আক্রমণের মুখে দারা বিচার বুদ্ধি ও মাত্রাজ্ঞান হারাইয়াছেন, কিন্তু দুর্জয় অভিমান তাঁহাকে পাইয়া বসিয়াছে; বিপদ যতই ঘনীভূত হইতেছে, স্বকৃত ভুলের অনুশোচনায় ততই নিজের উপর কঠোরতা যেন বাড়িয়া চলিয়াছে। উজির খাঁ প্রভৃতি তাঁহার কয়েকজন আমীর দারার সম্মুখেই ভূতলশায়ী হইলেন, তবুও শাহজাদা অকুতোভয়ে আগাইয়া চলিলেন। যাঁহারা দীর্ঘকাল একনিষ্ঠ সেবার দ্বারা তাঁহার উপর জোর চালাইবার সাহস অর্জন করিয়াছিলেন তাঁহারা হাতিকে পিছনে হটাইয়া শাহজাদাকে অগ্নিবৃষ্টির মধ্যে হাওদা ছাড়িয়া নীচে নামিতে বাধ্য করিলেন। [ম্যানুচী ইহার জন্য খলিলুল্লাকে দোষী করিয়াছেন! খলিলুল্লা বহু পূর্বেই সরিয়া পড়িয়াছিলেন। ইহা জল্পনা ব্যতীত কিছুই নয়।] এই তাড়াহুড়ার মধ্যে হাওদার ভিতরে তাঁহার লৌহকবচ অস্ত্রশস্ত্র (ধনু ব্যতীত?) ও পায়ের জুতা পড়িয়া রহিল। দারা শিরস্ত্রাণরক্ষিত মাথা বাঁচাইয়া খালি পায়ে ঘোড়ার উপর চড়িলেন, একজন বালকভৃত্য তাঁহার কোমরে তৃণ বাঁধিয়া দিতেছিল, গোলার আঘাতে তাহার দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। যাঁহারা শাহজাদাকে হাতি হইতে নীচে নামিয়া আসিবার জন্য জিদ করিয়াছিলেন, তাঁহারা কেহ পলাইয়া নিজেদের প্রাণ বাঁচাইবার মতলবে এইরূপ করেন নাই; তাঁহাদের কোনপ্রকার দুরভিসন্ধিও ছিল না; হাওদার ভিতরে নিশ্চিত মৃত্যুকে ডাকিয়া আনা অপেক্ষা ঘোড়ায় চড়িয়া যুদ্ধ চালাইয়া যাওয়া শ্রেয়স্কর বিবেচনা করা ব্যতীত অন্য কোনও অপরাধ তাঁহারা করেন নাই।
যাহা হউক, ইহার ফল বিপরীত হইল। এতক্ষণ পর্যন্ত গজারূঢ় শাহজাদার ব্যক্তিত্ব ও পৌরুষ শক্তিশালী চুম্বকখণ্ডের ন্যায় বাহিনীর খণ্ডাংশসমূহকে যুদ্ধক্ষেত্রে সংহত করিয়া রাখিয়াছিল। হাওদা খালি দেখিয়া দূরস্থ সেনাগণ ধরিয়া লইল দারা গতাসু হইয়াছেন, এখন কাহার জন্য তাহারা যুদ্ধ করিবে? বাদশাহী ফৌজ যেদিকে পারিল পলাইতে লাগিল, সর্বপশ্চাতে কুমার রামসিংহের রাজপুতগণও এই ধাক্কায় সরিয়া পড়িল, শেষ পর্যন্ত হতাবশিষ্ট দেহরক্ষী ও কয়েকশত অশ্বারোহী দারাকে রক্ষা করিবার জন্য পড়িয়া রহিল। দক্ষিণ হইতে মোরাদ, বাম দিক হইতে জুলফিকর খাঁ, পশ্চাৎভাগ হইতে ইসলাম খাঁ দারার হতাবশিষ্ট সেনাকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছিল; সামনে কুমার মহম্মদ সুলতান ও নেজাবত খাঁর অশ্বারোহী তরঙ্গ; ভুলের চরে ঠেকিয়া ভাঙা জাহাজের আনাড়ি কাপ্তান কতক্ষণ বাঁচিবেন? এই সময়ে ভীষণ ধূলিঝঞ্ঝা ও তাপপ্রবাহ আওরঙ্গজেবের পিঠের উপর দিয়া দারার সৈন্যগণের মুখে আঘাত করিল; অপরাহ্ণে সন্ধ্যার অন্ধকার—পাঁচ হাত দূরে লোকের মুখ দেখা যায় না; যাহারা “জল, জল” করিয়া চিৎকার করিতেছিল তাহাদের মুখ ধূলায় ভর্তি, সর্বাঙ্গে গরম হাওয়ার ছেঁকা। দারার পাশে তাঁহার কচি নাবালক পুত্র সিপ্হর শুকো আতঙ্ক ও যন্ত্রণায় কাঁদিতে লাগিলেন। বালকের ক্রন্দন শত্রুর শস্ত্রাঘাত অপেক্ষাও তীব্রভাবে তাঁহার মর্মস্থলে আঘাত করিল, তিনি মৃত্যুর সন্ধানে সম্মুখে অশ্ব চালিত করিলেন। যাঁহারা নিজের প্রাণ অপেক্ষা দারার প্রাণের উপর অধিক মমতা রাখিতেন তাঁহারা পিতা-পুত্রের ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া আগ্রার পথ ধরিলেন। ঝঞ্ঝার অবসানে শবাকীর্ণ রণভূমি কাঁপাইয়া আওরঙ্গজেবের বিজয়-দুন্দুভি বাজিয়া উঠিল। (চলবে)