ঊনবিংশতি অধ্যায়
দারার পরাজয় ও পলায়ন
(সামুগঢ়ের যুদ্ধ, ২৯শে মে, ১৬৫৮ খ্রিঃ)
চোদ্দ
মোগল-কুরুক্ষেত্রে এইভাবে ধর্মের পরাজয় হইল, ধর্মনিরপেক্ষ মহামানবতার ভিত্তির উপর জাতি, ধর্মরাষ্ট্র ও ভাষার দ্বারা কালচক্রে খণ্ডিত ভারতের অঙ্গ যোজনা করিয়া “মহাভারত” স্থাপনার আকবরশাহী স্বপ্নের এই সামুগঢ়েই শেষ সমাধি। যুগে যুগে ধর্মের উপর অসুর-বলদৃপ্ত ছলপরায়ণ অধর্ম জয়লাভ করিয়াছে; পার্থসারথির মতো কর্ণধার থাকিতেও ধর্মের তরণী কুরুক্ষেত্রে প্রায় ডুবিতে বসিয়াছিল, অধর্মের শক্তিকে উপেক্ষা করিলে ভবিষ্যতেও ধর্মের পরাজয় ঘটিতে পারে।
সামুগঢ়ের যুদ্ধে দারাকে জয়ী করা খোদাতালারও অসাধ্য ছিল। দারার পরাজয়ের কারণ আওরঙ্গজেব, খলিলুল্লা নহেন, তাঁহারা নিমিত্ত মাত্র। শাহজাহান পুত্রকে ফৌজ, তোপখানা অপরিমিত ধন দিয়াছিলেন, কিন্তু যাহা মগজে নাই উহা তিনি কেমন করিয়া দিবেন? লড়াইয়ের দাবাখেলায় আওরঙ্গজেব ও দারা যদি স্থানবিনিময় করিতেন তাহা হইলেও দারা আওরঙ্গজেবের ঘুঁটি লইয়া নিঃসন্দেহে হারিয়া যাইতেন, খলিলুল্লার বিশ্বাসঘাতকতা আওরঙ্গজেবকে কাবু করিতে পারিত না।
আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিত্বের গুণে তাঁহার হাতে মাটি লোহা হইয়াছিল; দারার হাতে লোহাও মাটি হইয়া গেল। আওরঙ্গজেব অপেক্ষা তিনগুণ অধিক মনসব ও সুযোগসুবিধা পাইয়াও তিনি উহার সদ্ব্যবহার করিতে পারেন নাই। দারা স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়া হুকুম না চালাইলে ফিরোজ-জঙ্গ ও রাও ছত্রশাল যুদ্ধ অন্তত অমীমাংসিত রাখিয়া বাহিনীকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরাইয়া আনিতে পারিতেন। দারার পরাজয়ের জন্য তিনিই সম্পূর্ণ দায়ী; এবং জয়ের বরমাল্য আওরঙ্গজেবের উপযুক্ত পুরস্কার—ইহা অস্বীকার করিলে সত্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
এই যুগের তুলনায় সেই যুগের হাতাহাতি যুদ্ধকে একটা বড় রকমের দাঙ্গা বলিলেই হয়। তিন-চারি ঘণ্টার মধ্যে সরকারি হিসাবে আওরঙ্গজেবের পক্ষে পাঁচ হাজার ও দারার পক্ষে দশ হাজার সৈন্য নিহত হইয়াছিল; বেসরকারি হিসাবে হয়তো আরও বেশি লোক মরিয়াছিল। দারার পক্ষে নামজাদা নয়জন রাজপুত এবং উনিশ জন মুসলমান সেনাধ্যক্ষ নিহত হইয়াছিলেন; আওরঙ্গজেবের পক্ষে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান মুলতাফত খাঁ গরমেই মারা গিয়াছিলেন এবং চারিজন দ্বিতীয় শ্রেণীর মনসবদার লড়াই করিয়া মরিয়াছিলেন; ইহা ব্যতীত বাহাদুর খাঁ প্রভৃতি আটজন আহত হইয়াছিলেন। সুজানসিংহ শিশোদিয়া ধর্মাতের যুদ্ধ হইতে পলায়নের পর মোরাদের পক্ষে সামুগঢ়ের যুদ্ধে নিমকহালালি করিয়াছিলেন।
পনেরো
দারা ও সিপ্হর শুকোকে লইয়া হতাবশিষ্ট দেহরক্ষিগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াইয়া যুদ্ধক্ষেত্র হইতে তিন-চারি মাইল দূরে গিয়াছিল। শাহজাদা এইখানে এক গাছের ছায়ায় লৌহ-শিরস্ত্রাণ খুলিবার জন্য বসিয়া পড়িলেন; তাঁহার চোখে দুনিয়া আঁধার, সাজানো বাগান চোখের সামনে শুকাইয়া গিয়াছে। কিছুক্ষণ পরে অনুসরণকারী শত্রুর দামামাধ্বনি নিকটবর্তী হইতে লাগিল, কিন্তু অনুচরগণের অনুনয়-বিনয় সত্ত্বেও দারা উঠিলেন না। পলাইয়া কি হইবে? অবশেষে তাঁহাকে ঘোড়ায় তুলিয়া সকলে সন্ধ্যার অন্ধকারে আগ্রার কাছে উপস্থিত হইল, শাহজাদা আঁধারে মুখ ঢাকিয়া নিজ প্রাসাদে প্রবেশ করিলেন। সেই করাল সন্ধ্যায় আগ্রা শহরের প্রতি গৃহে রোদনের ধ্বনি, ব্যাপক আতঙ্ক। ম্যানুসী খলিলুল্লা খাঁর হাভেলির পাশ দিয়া যাইতেই এক বাঁদী আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, সাহেব, আমাদের খাঁ সাহেবের খবর কি? খলিলুল্লার উপর ম্যানুসী হাড়ে হাড়ে চটা, হঠাৎ দুষ্টবুদ্ধি মাথায় আসিল। তিনি খলিলুল্লার শোচনীয় মৃত্যুর এক বিশদ ও সম্পূর্ণ মিথ্যা কাহিনী বাঁদীকে শুনাইয়া তাঁহার বাড়িতেও মরা-কান্নার রোল তুলিলেন। (চলবে)