বিংশতি অধ্যায়
পিতা-পুত্রের ভাগ্যবিপর্যয়
তিন
পিতার নির্দেশ অনুসারে দারা পলায়নের জন্য প্রস্তুত হইলেন; পত্নী নাদিরা বানু মূর্তিমতী প্রজ্ঞার ন্যায় তখন তাঁহার বিভ্রান্তচিত্তের একমাত্র আশ্রয়, আঁধারের মধ্যে আশার প্রদীপ। পুত্রকন্যা, পুত্রবধূ ও পৌত্র-পৌত্রী (সুলেমানের পরিবার) লইয়া নাদিরা বানু হাতির পিঠে অবগুণ্ঠনাবৃত হাওদার মধ্যে স্থানগ্রহণ করিলেন, তাঁহাদের সঙ্গে মাত্র কয়েকজন মুখ্যা ক্রীতদাসী চলিল; বাদবাকি পরিচালিকা ও ভৃত্যগণ আশ্রয়ার্থ দুর্গে প্রেরিত হইল। উটের পিঠে নগদ টাকা আশরফি; বহনযোগ্য দামি কয়েকটি জিনিস দারার পাথেয় হিসাবে সঙ্গে চলিল। হস্তীপৃষ্ঠে দারা ও সিপহর শুকো রাত্রি ৩টার সময় গৃহ হইতে চিরবিদায় লইলেন, শাহজাদার বিরাট সংসারের বিলাসোপকরণ যেখানে সাজানো ছিল সেইখানে পড়িয়া রহিল; কিন্তু মালিক অদৃশ্য হইতে-না-হইতে রাতারাতি হাতিঘোড়া সাজ-সরঞ্জাম সব লুঠ হইয়া গেল। চব্বিশ ঘণ্টা পূর্বে অর্ধলক্ষ অশ্বারোহী যাঁহার আদেশের অপেক্ষা করিতেছিল এখন তাঁহার শেষযাত্রার সাথী হইল মাত্র বারোজন সওয়ার।
৩০শে মে সূর্যোদয়ের পূর্বে দারা বাদশাহী রাস্তা ধরিয়া আগ্রা হইতে অনেকদূর আসিয়া পড়িলেন। ইতিমধ্যে শহরে তাঁহার পলায়নের সংবাদ প্রচারিত হইবামাত্র শুধু প্রাণের টানে কয়েকশত অনুচর আগ্রা হইতে দারার সঙ্গ লইবার জন্য ছুটিয়া পড়িল। বেলা ১টার সময় ম্যানুসী সাহেবও তল্পিতল্পা লইয়া বাহির হইয়াছিলেন, তখন শত্রুসেনা শহরের বাহিরে দিল্লির রাস্তায় মোতায়েন হইয়াছে; উহাদের সেনাধ্যক্ষের কৃপায় কোনোরকমে রক্ষা পাইয়া তিনি ভগ্নহৃদয়ে ফিরিয়া আসিলেন।
যাহা হউক, দুই-একজন করিয়া বিভিন্ন দিক হইতে পাঁচ শত অশ্বারোহী এক মঞ্জিল পার হইবার পূর্বেই দারার দলে আসিয়া জুটিল – অন্তত ডাকাতের হাতে সর্বস্ব লুঠ হইবার আশঙ্কা রহিল না। দুই দিন পর্যন্ত ছোটখাটো দলে বিভক্ত হইয়া দারার অনুচরবর্গ আগ্রা হইতে কোনোক্রমে পলাইতেছিল, বাদশাহী ভৃত্যগণ শত্রুর দৃষ্টি এড়াইয়া আরও কিছু অর্থ দারার কাছে পৌঁছাইল; শত্রুসৈন্য তখন পর্যন্ত দারাকে ধরিবার জন্য ধাবিত হয় নাই। এইভাবে দিল্লি পৌঁছবার পূর্বে দারার সৈন্যসংখ্যা বারোজন হইতে বাড়িয়া পাঁচ হাজার হইল। পাঁচ দিন কুচ করিয়া দারা ৫ই জুন (১৬৫৮ খ্রিঃ) দিল্লি পৌঁছিয়া শাহজাহানাবাদ দিল্লির বাহিরে পুরাতন দিল্লিতে (যাহার বর্তমান নিদর্শন শেরশাহ নির্মিত অন্তদুর্গ, শেরমঞ্জিল ও শেরশাহী মসজিদ) তাঁবু ফেলিলেন। এইখানে নূতন ফৌজ ভর্তি আরম্ভ হইল এবং সাত দিনে সাত হাজার নূতন অশ্বারোহী সংগৃহীত হইল। যুদ্ধের প্রয়োজনে তিনি শাহী খাজনাখানা, হাতি, ঘোড়া ইত্যাদি দখল করিলেন এবং কোনও কোনও আমীরের ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপরও হস্তক্ষেপ করিতে ইতস্তত করিলেন না। কুমার সুলেমানকে আগ্রার পথ ছাড়িয়া যমুনার পূর্বতীরের পথে দিল্লি আসিবার জন্য দারা জরুরি চিঠি লিখিয়াছিলেন। তাঁহার ভরসা ছিল আওরঙ্গজেব সহজে আগ্রা দুর্গ অধিকার করিতে পারিবেন না এবং ইতিমধ্যে সুলেমানের ফৌজ নিশ্চয়ই আসিয়া পড়িবে।
চার
সামুগঢ়ে দারার পৃষ্ঠপ্রদর্শনের পর বিজয়ী আওরঙ্গজেব দুই-দুই বার হাতি হইতে নামিয়া পরম ভক্তিভরে মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া খোদাতালাকেই জয়ের কৃতিত্ব নিবেদন করিলেন। উহার পর দারার শিবির অধিকার করিয়া শাহজাদার সাজানো তাঁবুতেই রাত্রিবাস করিবার অভিপ্রায় করিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করিলেন না। কোথায়ও মাটির নীচে চোরা সুড়ঙ্গে বারুদ পুরিয়া তাঁহাকে উড়াইয়া দিবার জন্য হয়তো কোনও ফাঁদ রাখিয়া গিয়াছে সন্দেহ করিয়া মাটি খুঁড়িবার হুকুম দিলেন। এত বুদ্ধি মগজে থাকিলে দারার তাজ ও মাথা দুইটাই কি এইভাবে বিপন্ন হইত?
অতঃপর ওইখানে নিজ তাঁবুর নীচেই তিনি সেনাধ্যক্ষগণের মোবারকবাদ গ্রহণ করিলেন। মোরাদ বকশ্ “হজরত-জীউ”-কে বিজয়-সম্বর্ধনা জানাইবার জন্য উপস্থিত হইলে আওরঙ্গজেব প্রথমেই ‘বাদশাহজীউ! ফতে মোবারকবাদ!” বলিয়া তাঁহাকে অভিনন্দিত করিলেন এবং দরবারে ঘোষণা করিলেন, “অদ্য তারিখ হইতে মোরাদশাহী হুকুম হিন্দুস্থানে কায়েম হইল আপনারা জানিবেন।” মোরাদের বুকের ছাতি কথাতেই পাঁচ হাত চওড়া হইয়া গেল: মোরাদের শরীরের অবস্থা দেখিয়া আওরঙ্গজেব ভাইকে ভিতরে লইয়া গেলেন এবং শল্যচিকিৎসকগণকে তলব করিলেন। মোরাদের মুখে গায়ে বহু আহত স্থান হইতে তখনও রক্ত পড়িতেছিল, তাঁহার মাথা নিজের কোলে রাখিয়া আওরঙ্গজেব হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন এবং নিজের জামার আস্তিন দিয়া রক্ত মুছিতে লাগিলেন; বাহিরে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল, সকলেই ভাবিল শাহজাদা ভ্রাতৃপ্রেমে দ্বিতীয় রামচন্দ্র।
যাহা হউক, বিজেতা শিবিরে সারারাত্রি আওরঙ্গজেব ব্যতীত বাদবাকি মুসলমান আমীর সিপাহী খিদমতগার স্থানে স্থানে মজলিশ জমাইয়া বিজয়লব্ধ নাচওয়ালীগণের নাচগান ও শরাবে মশগুল হইয়া রহিল; হিন্দুরা কেবল মড়া পোড়াইয়া মরিতেছিল—কেননা মুসলমানের মুর্দা বাসি হইলে জাঁকজমক বেশি হয়, কিন্তু বাসি মড়া হইলে হিন্দুর ঠিক সদ্গতি হয় না। রাজপুত মারাঠা বুন্দেলা স্বপক্ষ-বিপক্ষ নির্বিচারে স্ব স্ব গোত্রের নিহত যোদ্ধাদের মৃতদেহ যথাসাধ্য একত্র করিয়া শবদাহ করিতে লাগিল, দূরে প্রজ্জ্বলিত অসংখ্য চিতার অগ্নিশিখায় যুদ্ধভূমি মহাশ্মশানের উদাস-গম্ভীর মূর্তি ধারণ করিল। রাও ছত্রশাল হাড়ার পুত্র ভগবন্ত সিংহ সারাদিন আওরঙ্গজেবের পক্ষে যুদ্ধ করিয়া রাত্রিতে পিতার মুখাগ্নি এবং নিহত হাড়াগণের অগ্নি-সৎকার সমাধা করিলেন—এইভাবে বিজয়ী পক্ষের রাঠোর গৌর কচ্ছবাহ স্ব স্ব কুলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করিয়া জ্ঞাতিঋণমুক্ত হইলেন। মৃত শত্রুর শবের উপর জঘন্য প্রতিশোধ লইবার একাধিক বিশদ বিবরণ মধ্যযুগে মুসলমান ও খ্রিস্টানের ইতিহাসে পাওয়া যায় যাহা হিন্দুর পক্ষে কল্পনার অতীত। হিন্দুর জ্ঞাতিবাৎসল্য, স্বজাতি-প্রেম জীবিত অপেক্ষা মৃতের উপরই বেশি প্রকট; [গোসাঁই ওমরাহগীর ও অনুপগীর নবাব শুজাউদ্দৌলার অধীনে নাগাফৌজ লইয়া পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আবদালীর পক্ষে লড়াই করিয়াছিলেন। যুদ্ধের পর আবদালীর নিকট হইতে তাঁহারা অন্য অনুগ্রহ প্রত্যাখ্যান করিয়া কেবলমাত্র যুদ্ধস্থলে নিহত মারাঠাগণের শব অগ্নিসাৎ করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন।] শ্মশানে, পিতৃপক্ষের তর্পণ-স্নানে উদার আর্যসন্তানের মনের দুয়ার আদিকাল হইতেই খোলা ছিল, সম্প্রতি মাত্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম হইয়াছে। (চলবে)