বিংশতি অধ্যায়
পিতা-পুত্রের ভাগ্যবিপর্যয়
পাঁচ
অতপর আগ্রায় পবিত্র রমজান মাসে পিতাপুত্রের শেষ বুঝাপড়া আরম্ভ হইল; আওরঙ্গজেব রোজা ও কূটনৈতিক মিথ্যার বেসাতি একসঙ্গেই চালাইলেন। চম্বল নদী পার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চিঠিপত্রে দারার শাঠ্য, তাঁহার একনিষ্ঠ পিতৃভক্তি ও শ্রীচরণচুম্বনের প্রার্থনা ব্যতীত আওরঙ্গজেবের অন্য কোনও মতলব ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ পায় নাই। শাহজাহান এই সমস্ত সরল প্রাণে বিশ্বাস করিয়া আপোস-মীমাংসার আশায় পিছন হইতে যথাসাধ্য দারার রাশ টানিয়া রাখিয়াছিলেন। যুদ্ধের পর ৩০শে মে (১৬৫৮ খ্রিঃ) তিনি পিতার কাছে স্বকৃত কার্যের জন্য ক্ষমা চাহিয়া এক চিঠি লিখিলেন। ইহার উত্তরে ১লা জুন সম্রাট নিজের হাতে একখানা চিঠি লিখিয়া আওরঙ্গজেবকে দুর্গে আসিবার জন্য সাগ্রহ আমন্ত্রণ জানাইলেন এবং সম্রাটের দূত মারফৎ তিনিও সম্মতি জানাইলেন। উহার পরের দিন (২রা জুন) সম্রাট অত্যন্ত আশান্বিত হইয়া প্রধান কাজী সৈয়দ হিদায়েৎ উল্লা এবং বৃদ্ধ ফাজেল খাঁকে তাঁহার “আলমগীর” (ভুবনবিজয়ী) তরবারি এবং অন্যান্য বহুমূল্য রত্ন উপহারসহ পুত্রের কাছে পাঠাইলেন। আওরঙ্গজেব উপহার গ্রহণ করিয়া আলমগিরি মেজাজে কড়া জবাব দিলেন, সম্রাট এখনও দারার পক্ষে কারসাজি করিতেছেন; এই আমন্ত্রণ আমাকে সরাইবার কপট ষড়যন্ত্র ব্যতীত আর কিছুই নয়। আওরঙ্গজেবের এইরূপ মত পরিবর্তনের কারণ সম্রাটের দূতদ্বয় বুঝিতে পারিলেন না।
বকধর্মী শায়েস্তা খাঁ ও খলিলুল্লা খাঁ তখন পর্যন্ত স্ব স্ব পদে বহাল থাকিয়া সম্রাটের নিতান্ত অনুগত শুভচিন্তক ও শান্তির দূত সাজিয়া দু’দিকেই আনাগোনা করিতেছিলেন। ১লা জুন সন্ধ্যাবেলা মাতুল শায়েস্তা খাঁ আসিয়া বলিলেন, “ভাগিনা! সাবধান! ফাঁদে পা দিও না, শাহানশাহর মতলব ভালো নয়।” ভাগিনা মামাকে তিন হাটে বেচিবার বুদ্ধি রাখিতেন, তিনি এই সংবাদে বিস্মিত হইলেন না। পিতার সঙ্গে দেখা করিবার ইচ্ছা তাঁহার আদৌ ছিল না, চিঠিপত্র, মৌখিক কথা শুধু ভাঁওতা মাত্র। যাহা হউক, এই রকম সাক্ষী পাইয়া বাহিরে দশজনের কাছে পিতার দুরভিসন্ধি পাকাপাকি সাব্যস্ত করিবার পক্ষে তাঁহার খুব সুবিধা হইল। পুত্রের এই অভিযোগ শুনিয়া শাহজাহান হতভম্ব হইলেন, কি করিবেন দুই দিন পর্যন্ত স্থির করিতে পারিলেন না, উভয় পক্ষে মনকষাকষি চলিল। শেষবারের মতো পুত্রকে বুঝাইবার জন্য তিনি ৫ই জুন ফাজেল খাঁর সহিত তাঁহার পরমপ্রিয় ভায়রাভাই খলিলুল্লা খাঁকে পাঠাইয়া দিলেন; কারণ খলিলুল্লা দুই পক্ষেরই বিশ্বাসভাজন, মেসোর কথা হয়তো আওরঙ্গজেব অবিশ্বাস করিবে না। ফাজেল খাঁর ধর্মের কাহিনী শাহজাদা কানেই লইলেন না, কিছুক্ষণ পরে খলিলুল্লাকে ভিতরে লইয়া গেলেন। কয়েকটি কথার পর তিনি বাহিরে আসিয়া ফাজেল খাঁকে সরাসরি জবাব দিলেন, বকশী-উল-মুলুক মহামান্য খলিলুল্লা খাঁ আপাতত এইখানেই বন্দী, আপনি ফিরিয়া যাইতে পারেন।
ইহা আগাগোড়া নাটকীয় ব্যাপার; খলিলুল্লার খেলা শাহীমহলে শেষ হইয়াছিল।
ছয়
ওই রাত্রিতে (৫ই জুন, ১৬৫৮ খ্রিঃ) আওরঙ্গজেবের মুখোশ খুলিল; শত্রুতায় তখন শাহজাহান মুখ্য, দারা গৌণ ইহা তাঁহার নিকট অজানা ছিল না। তিনি সসৈন্যে আগ্রা শহরে প্রবেশ করিয়া দুর্গ অবরোধ করিলেন, সম্রাটও উহার জন্য অপ্রস্তুত ছিলেন না। দুর্গের ফিরিঙ্গি গোলন্দাজ, সম্রাটের দেহরক্ষী বন্দুকধারী পদাতিক এবং পনেরো হাজার হাবসী, রুমী ও জর্জীয় দৃঢ়যোদ্ধা (কসাক) ক্রীতদাসের পল্টন আসদ খাঁর (?) নেতৃত্বে শত্রুপক্ষের আক্রমণ ব্যর্থ করিয়া দিল। কোনও পক্ষের তোপখানা বিশেষ কার্যকরী হইল না, দুর্গপ্রাচীর হইতে তোপ দাগিলে আধা শহর উজাড় হইয়া যায়, দুর্গপ্রাচীরের তিন দিকে অতি নিকটে বড় বড় বাড়ি, তোপের গোলা ওইগুলির আড়ালে লুক্কায়িত শত্রুর কোনও ক্ষতি করিতে পারিল না; অপর পক্ষে দুর্গের উপর গোলা দাগিয়া আওরঙ্গজেবও কোনও সুবিধা করিতে পারিলেন না, কামান বসাইয়া শুধু জুম্মা মসজিদ (বর্তমান Jahanera Mosque) অপবিত্র করিলেন মাত্র, তবে কামানের পাল্লার ভিতর মসজিদ ও পাকাবাড়ি উঠাইবার অনুমতি দেওয়াই বাদশাহী বেকুবি।
যাহা হউক, আওরঙ্গজেবের নৃশংস সামরিক প্রতিভা সম্রাটের আয়োজন ও দুর্গরক্ষীগণের বীরত্ব তিন দিনেই পণ্ড করিয়া দিল। যমুনার উপর ভরসা করিয়া আকবর বাদশাহ দুর্গের পূর্বদিক কিঞ্চিৎ কম মজবুত করিয়াছিলেন। এই দিকেই হঠাৎ আক্রমণ করিয়া আওরঙ্গজেবের ফৌজ খিজরী দরওয়াজার বহির্ভাগ দখল করিয়া বসিল, দুর্গে প্রবেশ অসাধ্য হইলেও যমুনা হইতে দুর্গের পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ হইল। দুর্গের ভিতরে যে সমস্ত কুয়া ছিল ওইগুলির নোনতা জল পানীয় হিসাবে কেহ ব্যবহার করিত না, যমুনা হইতে জল আনিবার ব্যবস্থা ছিল। নদীর জলের অভাবে দুর্গবাসীদের জীবন একদিনেই অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। যিনি রাজধানীতে যমুনার জল, সফরে উষ্ট্রবাহিত মটকা-ভরা গড়মুক্তেশ্বরের গঙ্গাম্বু, গ্রীষ্মে হিমাচল হইতে যমুনার স্রোতে ভেলাবাহিত বরফে ঠাণ্ডা করা জল ব্যতীত ত্রিশ বৎসর অন্য জল মুখে দেন নাই তাঁহার কাছে অবস্থার ফেরে কুয়ার দুর্গন্ধ খারা পানি (brackish water) “স্বাদু সুগন্ধি স্বদতে তুষারা” মনে হইল। সম্রাটের দৃঢ়তা পানীয় জলের কষ্টে দুই দিন পরেই টুটিয়া গেল, তিনি পুত্রের কাছে তিতিক্ষা ও তৃষ্ণায় জল ভিক্ষা করিয়া চিঠিতে লিখিলেন-”হিন্দু মরা বাপের জন্য পানি খয়রাত করে। আর মোছলমানের ছাওয়াল তুমি, বুড়াবাপ জিন্দা থাকিতে সাঁঝের বেলা রোজা “এপ্তার” (breaking the day’s fast) করিবার জন্য এক চুমুক মিঠা পানি তোমার কাছে পাইবে না?” পুত্র জবাবে লিখিলেন, “যেমন কর্ম তেমনই ফল। যিনি আপনার আধা বড়ভাই খসরুর গলা টিপিয়া মারিয়াছেন, দাওয়ার বখশ (খসরুর পুত্র) প্রভৃতি সাতাশ জন শাহাজাদাকে কোরবানি করিয়া খুনরেজ (bloody) তক্তে বসিয়াছেন তিনি ধর্মের দোহাই দিয়া পুত্রের নিকট কি প্রত্যাশা করিতে পারেন?”
সন্তানের মুখে সাম্রাজ্যলালসা-দৃপ্ত যৌবনের দুষ্কর্ম ব্যাখ্যা শুনিয়া শাহজাহানের জল ও জীবনের তৃষ্ণা মিটিয়া গেল, তবুও দুর্জয়পণ—প্রাণ থাকিতে পাষণ্ডকে দুর্গে প্রবেশ করিতে দিবেন না। এইদিকে আওরঙ্গজেবও অস্থির হইয়া উঠিলেন; ভাই মোরাদের মতিগতি ভালো নয়, দিল্লিতে দারা আবার মাথাচাড়া দিয়া উঠিতেছে। সুলেমান যে কোনও মুহূর্তে হয়তো পলাইয়া বাপের কাছে পৌঁছিবে; এই দিকে দুর্গে খাদ্যের অভাব নাই, নোনতা জল খাইয়া শাহানশাহর কাবু হওয়ার লক্ষণও বিশেষ দেখা যাইতেছে না; সুতরাং কৌশলে কার্যোদ্ধার ছাড়া উপায় নাই। তিনি সম্রাটকে লিখিলেন, “পূর্বকৃত অপরাধের জন্য আমি হাজির হইয়া ক্ষমাপ্রার্থনা করিবার ইচ্ছা করিয়াছিলাম; কিন্তু অসুখে পড়িয়াছি। আপনার হুকুম পাইলে কুমার মহম্মদ সুলতান কদমবোসী করিবার জন্য দরবারে উপস্থিত হইতে পারে।” পিঁপড়ার পেটকামড়ি সম্রাট ঠিক ধরিয়া ফেলিয়াছিলেন, তবুও মোহ কাটিল না। পুত্রের হয়তো সুমতি হইয়াছে ভাবিয়া সম্রাট শান্তির আশায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন, কোনোপ্রকার সন্দেহ না করিয়া কুমার মহম্মদ সুলতানকে শাহী মহলে আসিবার হুকুম দিলেন। আওরঙ্গজেব বিশ্বস্ত ও বেপরোয়া জঙ্গী ফৌজ বাছিয়া বাছিয়া পুত্রের সঙ্গে দেহরক্ষী হিসাবে প্রেরণ করিলেন এবং গোপনে তাহাকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। বিরাট সমারোহে কুমার দুর্গে অভ্যর্থিত হইলেন, দুর্গরক্ষীগণ যুদ্ধ শেষ হইয়াছে মনে করিয়া অসতর্ক হইয়া পড়িয়াছিল; কেবল শাহীমহলে যথারীতি কড়া পাহারা। দুর্গের শেষ ফটক পার হইয়াই কুমারের দেহরক্ষীগণ ভিতর হইতে প্রাচীররক্ষী সেনাগণকে হঠাৎ আক্রমণ করিল, বাহির হইতে তাঁহার সাহায্যার্থ আরও ফৌজ ঢুকিয়া পড়িল, শাহী মহলে সম্রাট শাহজাহান অবরুদ্ধ হইলেন (৮ই জুন, ১৬৫৮)।
দুই দিন পরে জাহানারা বেগম সন্ধিপ্রার্থিনী হইয়া আওরঙ্গজেবের নিকট উপস্থিত হইলেন। আওরঙ্গজেব প্রথমে পরিষ্কার জবাব দিলেন, “ইসলামের পরম শত্রু দারাকে শেষ না করিয়া সম্রাটের সহিত আমি দেখা করিব না।” পরে সুর কিঞ্চিৎ নরম হইল, জাহানারাকে কথা দিলেন পরদিন তিনি শাহ বুরুজে পিতার পদবন্দনা করিবেন। (চলবে)