প্রাককথন
পুস্তকখানি ‘ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস’ নহে। সমসাময়িক নিখাদ ফার্সী পুঁথি ও বৈদেশিক ভ্রমণকারীদের বিবরণের ভিত্তিতে রচিত। মুঘল সম্রাট শাহজাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র শাহ্জাদা দারাশুকো-র এই জীবনী আচার্য যদুনাথ সরকার ও যোগেশচন্দ্র বাগল মহাশয়ের আগ্রহাতিশয্যে পিতৃদেব ‘প্রবাসী’ পত্রিকার জন্য লিখিতেছিলেন। কিন্তু বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই যে লিখিবার মেজাজ হইলে তবেই তিনি লিখিতেন। অবিচ্ছিন্নভাবে এই রচনা বাহির হইতেছে না দেখিয়া ১৯৫৩ সনে আচার্য তাঁহার কলকাতার ১০নং লেক টেরেস বাড়িতে আমাকে বলিয়াছিলেন : ‘কালিকা জানে না যে তার লেখার ধার কতটা। ওটা শেষ করছে না কেন?’ নিঃসন্দেহে ইহা আচার্যের শিষ্যের প্রতি অনুরাগের ভাষায় রঞ্জিত। তবে অন্যান্যদের মধ্যে পিতৃদেবের কবিবন্ধু মোহিতলাল মজুমদারও উহা শেষ করিবার জন্য তাগাদা দিতেন।
এই জীবনকাহিনীতে শাহজাঁহার মুঘল ভারতের চিত্র আছে। তৈমূরী ইতিহাসের বহু চরিত্রের সমাবেশও ইহাতে প্রত্যক্ষ করা যাইবে। অনেকটা ইস্কান্দারের ‘magic mirror’-এর মতো, যেখানে ‘Man’s folly and wisdom’ প্রতিভাসিত। রচনাটি অসম্পূর্ণ ছিল। উহা সম্পূর্ণ করিয়া আমি কেবল পিতৃকৃত্য সমাধা করিয়াছি। রাধারাণী দেবী শরৎচন্দ্রের এবং শ্রীতারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বিভূতিভূষণের অসম্পূর্ণ রচনার সার্থক রূপ দিয়াছেন। এই বেওকুফ তাঁহাদের ন্যায় কিছুমাত্র কৃতিত্বের দাবি করিবে না। তবে মুঘল ইতিহাস তাহার তিরিশ বছরেরও অধিককালের খানদানী পেশা। তাই এই দুঃসাহস! পাঠক যদি শেষ অধ্যায় পাঠান্তে এই ‘পাকামি’-র জন্য আমাকে ‘অস্রপদা’ স্থির করিয়া সম্মার্জনীও দেখান উহাতে দুঃখ নাই কারণ আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অসম্পূর্ণ রচনাটির সম্পূর্ণীকরণ।
শ্রীগজেন্দ্রকুমার মিত্র ও শ্রীসবিতেন্দ্রনাথ রায় (শ্রীভানু রায়), এই প্রয়াসকে উৎসাহ দিয়াছেন। উহার জন্য তাঁহাদের প্রতি যথোচিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি।
নরেন্দ্রনাথ কানুনগো
ইতিহাস বিভাগ, বিদ্যাভবন, বিশ্বভারতী, ২৮ দীনবন্ধু পল্লী, শান্তিনিকেতন, ১৫ই আগস্ট, ১৯৮৬
প্রথম অধ্যায়
বাল্য ও কৈশোরের ঐতিহাসিক পটভূমিকা
এক
১৬১৫ খ্রিস্টাব্দের বসন্তকাল। আকাশে-বাতাসে মোগল সাম্রাজ্যে আনন্দের অধীর স্পন্দন, জাহাঙ্গীর-রাজত্বের দশম বার্ষিক “নওরোজে”র ঈদ আগতপ্রায়––সূর্যদেবের মেষরাশিতে প্রথম সংক্রমণের মুহূর্তে উৎসবের বাদ্য বাজিয়া উঠিবে। আজমীর শহরের যে রাস্তা দিল্লি দরওয়াজা বামে রাখিয়া পুষ্কর তীর্থে চলিয়াছে উহার নিম্নভূমির উত্তর দিকে “অন্নাসাগর” সরোবরের বিপুল জলরাশি। সরোবরের পূর্বতীরে নগরীর পশ্চিম উপকণ্ঠে বাদশাহী ডেরা–একটি সুপরিকল্পিত মনোরম তাঁবুর। দার্-উল্-সুলতানত্ আগ্রা নগরী আজকাল দার্-উল্-বরকত্, আজমীরের সৌভাগ্যে ঈর্ষান্বিতা। রাজধানী ছাড়িয়া প্রায় তিন বৎসর যাবৎ শাহানশাহ্ জাহাঙ্গীর মিবার অভিযান পরিচালনার জন্য আজমীরে শিবির স্থাপন করিয়া আছেন। আজমীর শরিফের খ্বজা সাহেবের বরকতে আকবর বাদশাহ বিশাল ভারত সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হইয়াও ক্ষুদ্র মিবার রাজ্য জয় সম্পূর্ণ করিতে পারেন নাই। শাহজাদা খুর্রমকে মহারাণা অমরসিংহের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়া জাহাঙ্গীর পীরের দরগায় পুত্রের বিজয় প্রার্থনা করিতেছিলেন। খেয়ালী বাদশাহ ভক্তির আবেগে গত বৎসর (১৬১৪ খ্রিঃ) কর্ণভেদ করিয়া চিশতী-র কান ফোঁড়া গোলাম হইয়াছিলেন। এই জন্য দরবারী মুসলমান আমীরগণের মধ্যে কান ছিদ্র করিবার হিড়িক পড়িয়া গেল। মরার উঠানে যে অতিকায় ডেগ-যুগল এখনও আকবর-জাহাঙ্গীরের পুণ্যস্মৃতি বহন করিয়া যথাস্থানে বিরাজ করিতেছে উহার মধ্যে বড় সওয়া শ’ মণী ডেগটা আগ্রায় তৈয়ার করাইয়া বিগত বৎসরে সম্রাট জাহাঙ্গীর মহাসমারোহে আজমীরে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ওইদিন সকালবেলা স্বয়ং নূরজাহান বেগম নিজের হাতে উনুন ধরাইয়া বড় ডেগে খিচুড়ি পাক করিয়াছিলেন। রাজরাজেশ্বরীর এই অন্নপূর্ণা রূপ জাহাঙ্গীর ব্যতীত আর কেহ দেখিতে না পাইলেও তিন বৎসর পরে স্যর টমাস রো গল্প শুনিয়াছিলেন। পাক শেষ হইবার পর মইয়ের সাহায্যে আলা হজরত সর্বপ্রথম এক থালা খিচুড়ি নামাইয়া গরিবদিগের পাতে পরিবেশন করিলেন—সেইদিন পাঁচ হাজার কাঙাল খিচুড়ি প্রসাদ পাইয়াছিল।
বিজয়ী খুররম কুমার করণকে সঙ্গে লইয়া ১০২৪ হিজরী মহরম মাসের ২০ তারিখ (ফেব্রুয়ারি, ১৬১৫ খ্রিঃ) দরবারে উপস্থিত হইলেন। অপরাজেয় প্রতাপের পুত্র অমরসিংহ শাহজাদা খুররমের বীরত্ব, কূটনীতি, এবং সর্বোপরি সহৃদয়তার নিকট নতিস্বীকার করিয়া দুই মাস পূর্বে কুমার করণকে সন্ধির প্রস্তাবসহ মোগল শিবিরে প্রেরণ করিয়াছিলেন। মিবারের বিজিত ভূমি চিতোর দুর্গসহ মহারাণা ফিরিয়া পাইলেন; কিন্তু শিশোদিয়া-রাজলক্ষ্মী চিরদিনের মতো বন্দিনী রহিলেন মোগল কারাগারে। এই বিজয় উৎসবের আনন্দ ও উন্মাদনার স্রোতে ভাটা না পড়িতেই ভরা বসন্তে (মার্চ, ১৬১৫) আসিল নওরোজের নূতন জোয়ার। “নওরোজ” দরবারের নয় দিন পরে অমাবস্যার রবিবারে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ছায়ায় প্রতিবিম্বিত হইল হিন্দুকুলসূর্য শিশোদিয়া বংশের ভাগ্যবিপর্যয়। পরের দিন সোমবার রাত্রি ১২ দণ্ড ৪২ পল গতে (২৯শে সফর ১০২৪ হিঃ ২০শে মার্চ, ১৬১৫ খ্রিঃ) মমতাজমহল বেগম কন্যা জাহানারার জন্ম সম্বৎসর অতীত না হইতেই রাহুমুক্ত সূর্যের ন্যায় এক পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন, শাহী গোলাপবাগে প্রথম কোরক প্রস্ফুটিত হইয়া সম্রাটের বসন্তোৎসব দ্বিগুণ সার্থক করিল।
খুররমের প্রথম পুত্রের জন্ম-সংবাদ পাইয়া আলা হজরতের খুশির পেয়ালা বে-সামাল হইয়া পড়িল। বাদশাহ হুকুম দিলেন এইবার তিনি বাবা খুররমের দৌলতখানায় “নবাগত অতিথি”র শুভকামনা করিয়া ডবল ঈদ মানাইবেন। অন্নাসাগরের তটভূমিতে শাহজাদার তাঁবু পড়িয়াছিল। সেইস্থানে পরের দিন সম্রাটের অভ্যর্থনার আয়োজন হইল। উৎসব-মণ্ডপের তোরণদ্বারে দিল্লীশ্বরের উপর প্রাচীন ভারতের “লাজবর্ষণ’ প্রথার অনুকরণে “নিসার” (প্রকৃতপক্ষে “নিসার” কোনও চলিত মুদ্রা নহে; “খৈ” অপেক্ষা কিঞ্চিৎ ভারী পাতলা রূপার ছোট ছোট পাত, উপরে টাঁকশালের ছাপ। মোট যত তোলা রূপা নিসারে ব্যয় হইত উহার দাম ধরিয়া হিসাব হইত এত হাজার টাকার নিসার।) বা মাঙ্গলিক রৌপ্যমুদ্রা বর্ষিত হইল। শাহানশাহ সভা অলঙ্কৃত করিবার পরেই শাহজাদা খুররম হাজার আশরফি কদম মোবারকে নজর রাখিয়া শিশুর নামকরণের প্রার্থনা জানাইলেন। আলা হজরত নজর মাপ (নজর মাপ করার অর্থ বাদশাহ উহা হইতে একটি আশরফি স্পর্শ করিয়া উল্টাইয়া রাখিলেন, গ্রহণ না করিয়া দাতাকে উহা বকশিশ করিলেন ইহাই অভিপ্রায়।) করিয়া পৌত্রের নাম রাখিলেন সুলতান দারাশুকো। (চলবে)