সংবাদে প্রকাশ বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়িনী মালাল ইউসুফজাই (Malala Yousafzai) একটি নতুন আত্মজীবনী লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হতে চলেছে। এ কথা ঘোষণা করেছেন সাইমন অ্যাণ্ড শুস্টারের (Simon & Schuster) মুদ্রিত অ্যাট্রিয়া বুকস (Atria Books)। মালালার প্রথম বই ‘আই অ্যাম মালালা’য় ছিল আত্মজীবনের কথা, তাঁর শৈশব ও তারুণ্যের কথা। আর এই নতুন আত্মজীবনীতে থাকবে ব্যক্তিগত স্মৃতি, থাকবে তাঁর বিবাহের কথা (২০২১ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা আসার মালিকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি)। হয়তো মালালর প্রথম বই-এর মতো এটিও বেস্ট সেলার হয়ে যবে।
মালালর এই কৃতিত্বের জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী তালিবানরা। অচেতনভাবে যে বুলেটটি তারা গেঁথে দিয়েছিল মালালার মাথায়, সেই বুলেট কিন্তু মালালার জন্য বিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছে।
২০০৭ সালে। মওলানা ফজলুল্লাহর নেতৃত্বে পাকিস্তানি তালেবানের একটি শাখা দখল করে নিল উত্তর-পশ্চিমের সোয়াত উপত্যকা। তারপর শুরু হল নিষেধ, নিষেধ আর নিষেধ। টেলিভিশন দেখা নিষেধ, গান-বাজনা করা নিষেধ, পড়াশোনা করা নিষেধ। স্কুলগুলো সব ইসলামবিরোধী চেতনা জাগায়, তাই তালেবানরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিল ১৫০টি স্কুল। মেয়েরা আবার পড়াশোনো করবে কেন? পর্দানসীন করো তাদের। বন্ধ করো চলাফেরা।
মালালা এই অঞ্চলের মেয়ে। ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সোয়াত জেলায় পশতুন জাতিগোষ্ঠীর এক সুন্নি পরিবারে তাঁর জন্ম। এখানকার মেয়েরা লেখাপড়ায় বেশ এগিয়েছিল। কিন্তু বাধ সেধেছে তালেবানরা। পড়াশোনার ব্যাপারে ফতোয়া জারি করেছে তারা, রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় বন্দুক নিয়ে। মনে করে বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস। কিশোরী মালালা প্রতিদিনকার ঘটনা লিখতেন তাঁর ডায়েরিতে। লিখতেন ছদ্মনামে। কি সেই ছদ্মনাম? গুল মাকাই।

বিবিসির ইংরেজি ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে গেল অখ্যাত এক কিশোরীর ডায়েরি। তাঁকে নিয়ে তৈরি হল তথ্যচিত্র। পাকিস্তানেও ছড়িয়ে গেল মালালার নাম। না, মালালা নয়, ছড়িয়ে গেল গুল মাকাইএর নাম। জাতীয় যুব শান্তি পুরস্কার পেলেন মালালা। পাকিস্তানি সেনাদের দাপট বাড়ল। সোয়াত উপত্যকা থেকে পিছু হটল তালেবানরা। আবার স্কুলে যেতে শুরু করলেন মালালা। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পাততাড়ি গুটিয়ে রণে ভঙ্গ দিল তালেবানরা। একবার যাদের মগজ ধোলাই হয়ে যায়, তারা তখন’ কর্তার ইচ্ছায় কর্মই করে যায়। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর। স্কুল থেকে ফিরছিলেন মালালা স্কুলের গাড়িতে। ঘাপটি মেরে থাকা তালেবানরা ছুঁড়ল গুলি। দুই বান্ধবীসহ গুরুতর আহত হলেন মালালা। চোদ্দ বছরের মালালাকে নিয়ে আসা হল লণ্ডনে।
তালেবানের একটি বুলেট মালালার জন্য খুলে দিল বিশ্বের দরজা। সুস্থ হলেন তিনি। কিছুদিন বাদে. ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত হল তাঁর বই ‘আই অ্যাম মালালা’। লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি সে বইএর। অ্যামাজনের বেস্ট সেলার। তার স্বত্ব দেখভাল করে সালার্জাই লিমিটেড কোম্পানি। তার পরের বছর মালালা পেলেন শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার। সারা পৃথিবীর সর্ব কনিষ্ঠ নোবেলবিজয়িনী মালালা ইউসুফজাই। একটি বুলেট তাঁকে বিশ্বখ্যাত করে দিল, মা লক্ষ্মীও সদয় হলেন। একটি মাত্র বই থেকে যে অর্থ লাভ করেছেন মালালা তা অকল্পনীয়। শুধু তাই নয়। মার্কিন সংস্থা পলিসি স্টাডিজের হিসেব অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়েও লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন মালালা। প্রত্যেক ভাষণের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় ১ লক্ষ ১৪ হাজার পাউণ্ড। বলা যেতে পারে নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে মালালাই সবচেয়ে ধনী।
কিন্তু পাকিস্তান আ্ছে পাকিস্তানেই। জাতিসংঘ যতই তাঁকে সম্মান দিক, যতই পালন করুক ‘মালালা দিবস’ (১২ জুলাই), যতই তাঁকে নিযুক্ত করুন (২০১৭) ‘শান্তির দূত’, পাকিস্তানে তাঁর আসন সলমন রুশদি আর তসলিমা নাসরিনের সঙ্গেই; এঁরা সকলেই ইসলামের শত্রু। দেখা যাক, নতুন আত্মজীবনীতে মালালা একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ধর্মমোহগ্রস্তদের সম্বন্ধে কি বলেন।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক