নজিরবিহীন অত্যাচার চালিয়ে ১৯৪২-এর আগস্ট বিদ্রোহ দমন করা হয়েছিল। ১৯৪৩ সালের শেষ দিকে সরকারি বিবরণ থেকে জানা যায়, এই বিদ্রোহ দমন করতে মোট ৯১ হাজার ৮৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ ও মিলিটারির গুলিতে ১০৬০ জন প্রাণ হাইরয়েছিলেন। লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস প্রভৃতি চিরাচরিত ব্যবস্থা অবলম্বন ছাড়া বিমান থেকে মেশিনগান চালানোর দৃষ্ঠান্তও ছিল। তা ছাড়া প্রকাশ্যে বেত মারা ও নারীধর্ষণের মতো ঘটনার সংখ্যা ছিল অগুনতি। অপরদিকে বিদ্রোহীরা ২০৮টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি, ৩৩২টি রেলস্টেশন এবং ৯৮৫টি ডাকঘর ধ্বংস করেছিলেন। বিদ্রোহীদের হাতে ৬৩ জন পুলিশ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছিলেন ২১৬ জন পুলিশ। অন্তত ৬৫৪টি ক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। এ তো গেল সংখ্যার হিসেব। ১৯৪২, ৪৩, ৪৪ — এ গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের দুর্দিনের দিনলিপি ফুটে উঠেছে সেকালের সংবেদনশীল কথাশিল্পীদের কলমে। ২০২২ সালে স্বাধীনতার ৭৫ বছরের পূর্তিতে দাঁড়িয়ে, উত্তাল চল্লিশের দশককে স্পর্শ করতে হলে সমসাময়িক লেখকদের শরণাপন্ন হতে হবে বই কী!
‘সাবেব ডাকল আম্মাকে, বলল, বুড়ি কী চাই তোমাদের ?
—ভাত দাও, সাহেব, ভাত দাও, ফ্যান দাও, ফ্যান।
—কোথা থেকে সরকার দেবে তা ? — লড়াইয়ের টাইম।’

লিখছেন সাহিত্যিক গোপাল হালদার :
‘শুনেই আম্মা খেপে গেলেন — লড়াইয়ের টাইম তোমাদের কোথা সাহেব? তোমাদের হাকিম চলছে, হুকুম চলছে, আলো জ্বলছে, পঙ্খা চলছে, গাড়ি চলছে, ফুর্তি চলছে। লড়াইয়ের টাইম তো আমাদের — আমাদের ছেলে গেছে লড়াইতে, আমরা পাই না ভাত। হালিম গেছে ফৌজে, আর তার বাচ্চারা আজ না খেতে পেয়ে মরছে। ও মরালী মরেছে ফৌজে — তার আউরাৎ সেদিন পেটের জ্বালায় ফাঁসি দেতে গেল। আমরাই গেছি লড়াইতে, আর আমরাই না খেতে পেয়ে মরছি। লড়াই তোমাদের কী ? জান দিয়েছে লড়াইতে আমাদের ব্যাটারা — তোমরা ফ্যান দাও, ফ্যান — চাট্টি করে ফ্যান ভাত।’ (তেরশ পঞ্চাশ, পাতা — ১৮৭-৮৮)
নিছক এই উপন্যাসের কয়েকটি পাতা এটি নয়। এক যন্ত্রণাবিদ্ধ সময়ের সার্থক দলিল হয়ে উঠেছে গোপাল হালদারের রচনাটি। ফ্যাসিজমের অমানবিক রূপ সাধারণ মানুষের অদেখা ও অজানা। তবুও সুদুরের যুদ্ধ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) এগিয়ে এসে গ্রাস করল তাঁর দিন-রাত্রি। তাঁর নিষ্প্রদীপ বিনিদ্র রাত সাইরেনের তীব্র আর্তনাদ খান খান হয়ে যায়। অসহায় চোখ মেলে সে দেখে বিদেশী সৈন্যদের দাপাদাপি আর রাজপথে ক্ষুধিত মানুষের মিছিল। স্টালিনগ্রাড রণাঙ্গনে দ্বিতীয় যুদ্ধের পরিণাম নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, লালফৌজের পাল্টা আক্রমণ শুরু এবং নাৎসী বাহিনীর পিছু হটার পালার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এত বড় পটপরিবর্তন, এই যুগান্তকারী পালা বদল ক্ষুধা ও মহামারি কবলিত বাংলার অর্ধউলঙ্গ মানুষের কাছে কতখিনি অর্থবহ ছিল? এই সময়ে তো গ্রাম বাংলার মানুষ নিছক বাঁচার জন্য আর এক গৌরবহীন কঠিন লড়াই-এ ব্যস্ত ছিল।
১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন ও তার পরবর্তী দু-বছর ১৯৪৩ ও ১৯৪৪ সাল মানুষের জীবনে দুঃসহ অভিজ্ঞতার ঝাঁপি উপুড় করে দিয়েছিল। আকাল-মহামারি-অবক্ষয়-মৃত্যু এই সবই ছিল এই সময়টির পরিচিত ছবি। সর্বাত্মক ধ্বংসের কিনারায় এসে পৌঁছেছিল গোটা দেশ ও সমাজ। চেতনার স্পন্দনটুকুও কোথাও আর অবশিষ্ট ছিল না।

নৈরাশ্যের আঁধার কবি মঙ্গলাচরণকেও গ্রাস করেছিল। তিনি পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দেশ, সমাজ ও আত্মজনের কাছ থেকে বহুদূরে। তাঁর ‘মেঘ বৃষ্টি ঝড়’ কবিতায় ফুটে উঠেছে সেই মর্মব্যথা —
‘অনেকদিন অনেক দূর রেললাইন ধরেই জীবন থেকে পালাই।
ঊনিশশো তেতাল্লিশ … ঊনিশশো চুয়াল্লিশ … শহর থেকে শহর।
বাংলাদেশে হারিয়ে যাই, বাংলাদেশ ছাড়াই। পতের শেষে খবর :
পিছন থেকে নরক তার হাত বাড়ায় — মড়ক, রুগ্নদেহ, বালাই !
সামনে মন টলচে, ঘোর কুয়াশা দিকসীমায়, সন্ধ্যা গোনে প্রহর।’
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসেই ধান বিক্রি হয়েছিল চোদ্দ আনা মণ দরে। ১৯৪৩ সালে মাত্র তিন মাসের মধ্যে সেই চালের দর তিন টাকা মণ থেকে ছাপান্ন টাকায় গিয়ে পৌঁছেছিল। তারপর দেখা গেল শতাব্দীর করুণতম দৃশ্য। লক্ষ লক্ষ নিরন্ন মানুষের কলকাতামুখী মিছিল।
ভাত নয় — তারা ফ্যান চাইছে শহরবাসীর কাছে। গ্রাম খালি করে চলে গেল মানুষ। তারা চেয়েছিল যেভাবে পারে বাঁচতে — বীজধান খেয়ে, জমি বিক্রি করে, গরু বিক্রি করে, ঘটি-বাটি বন্ধক দিয়ে। তারপর এলো গ্রামের বাইরে। ছুটল ভাতের খোঁজে। শুধু নিজের প্রাণ বাঁচানোর চিরন্তন দায়ে। স্ত্রী নয়, পুত্র নয়, পিতা নয় — কেউ আর আপনার নয়। সবচেয়ে আদিম যে চেতনা প্রাণরক্ষা, তাই তাড়িত করে নিয়ে চলছে তাদের। গোপাল হালদারের ভাষায়, ‘নিরন্নের জোয়ার গ্রাম ছাপিয়ে এসে পড়েছে শহরে। রাসবিহারী এভিন্যু ছাপিয়ে বন্যা পৌঁচেছে রসা রোডে। পৌঁচেছে তা চৌরঙ্গীর সামানায়। চব্বিশ পরগণা, মিদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি — বুঝি সমস্ত বাংলার হতভাগ্যরা দেখতে এসেছে তাদের রচিত ঐশ্বর্য প্রসাদপুরী কলকাতা।’ তিনি আরও লিখছেন, ‘চারদিকে ডাস্টবিনের ছাপিয়ে পড়া আবর্জনা, তার চারদিকে পাতি পাতি করে খুঁজছে মানুষ খাদ্য। বুড়ো, ছেলে, নারী, পুরুষ — শ্মশানের প্রেতের মূর্তি — খাদ্য খুঁজছে। ছক কেটে কেটে বসে আছে সারের পর সার এখনি — বিকেল চারটেয় কন্ট্রোলের দোকান খুলবে। আবার দলে দলে ছুটছে পথের উপর দিয়ে আরও মানুষ, দুপুরের লঙ্গরখানার উদ্দেশে। অসংখ্য তারা, হাতে সেই ভাঙা থালা, মাটির পাত্র, টিনের কৌটো। ঘুরছে দলে দলে — শিশু বুকে নিয়ে ছেলের হাত ধরে। এরা মরীয়া হয়ে উঠেছে। লঙ্গরখানা এদের স্বর্গ, ফ্যান এদের অমৃত। এরা বাঁচতে চায়।’ (তেরশ পঞ্চাশ, পাতা-৩৩৯)

এই পটভুমিতে কবি সমর সেন দেখছেন :
‘আজ তাম্রসীতা, উলঙ্গিনী দুর্ভিক্ষকন্যা আমাদের দেশ
লঙরের সামনে অস্থি চর্মসার সন্তানের ভিড়ে নীরবে হাসে।’
(ক্রান্তি, সমর সেনের কবিতা, পাতা-১১০)
একমাত্র রাতের অন্ধকারই আজ গাঁ — ঘরের মেয়ে-বৌদের লজ্জার আবরণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন :
‘রাঘব উঠে দাঁড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে গৌতমের পায়ে, দুহাতে দু’পা চেপে ধরে বসে, আজ চলাচলি নেই বাবাঠাকুর ! কাপড়গুলো মোদের দিয়ে তুমি যাও গো। মেয়েগুলো ন্যাংটা বাবাঠাকুর। মা-বুন ন্যাংটো, মেয়ে-বৌ ন্যাংটো —
কোথা দিয়ে কী সব হয়ে গেল। সব ছারখার হয়ে গেল।’
(রাঘব মালাকার, আজ কাল পরশুর গল্প)
এই অমানবিক পরিবেশে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হচ্ছে, সাহিত্য সংস্কৃতি — সবই আজ অবান্তর। তিনি লিখছেন —
‘বিশ্বব্যাপী ধ্বংস লীলার তাণ্ডব মহাতাণ্ডব চলছে আজ ছ’বছর ধরে। যুদ্ধ বাংলার দ্বারদেশে। ঝড় জলপ্রাবণ দুর্বিক্ষ মহামারি অব্যাহতগতিতে বিপর্যয় করে দিয়েছে। আজ বাংলার চিত্রশিল্পীদের মডেল হয়ে উঠেছে — নরকঙ্কাল, গলিত শব, তার চারিপাশ্বে ক্ষুধার্ত মাসংভুক কুকুর, শেয়াল, শকুন। সাহিত্যিকের দৃষ্টির সম্মুখ থেকে চিরন্তন মানবতার মহাপ্রকাশ আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে।’ (মন্বন্তর ও সাহিত্য, ভারতবর্ষ, চৈত্র ১৩৫০)
১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি রাজনৈতিক দলের তৎকালীন দলিলে ফুটে উঠেছে সার্বিক সংকটের ছবি :
১) ‘দুর্ভিক্ষের আঘাতে বাংলায় অনুমান দেড় কোটি লোক দুঃস্থ হইয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে বোধ হয় পঞ্চাশ লক্ষ লোক মরিয়া গিয়াছে, বাকি এক কোটি এখনও দুঃস্থাগারে। ইহাদের অধিকাংশ কৃষি, মজুর। কিন্তু কাজ করিতে তাহার অক্ষম। অথচ সরকারের তরফ হইতে রিলিফের কাজ বন্ধ করিয়া দিবার কথা শুনা যাইতেছে।’
২) ‘দুর্ভিক্ষের পর আসিয়াছে দুরন্ত সংক্রমক ব্যাধি, বিশেষত ম্যালিরিয়া। ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের মত এই ম্যালেরিয়া সারা বাংলায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। প্রায় অর্ধেক লোক ম্যালেরিয়ায় শয্যাগত, এবং প্রায় এক কোটি লোক মৃত্যুর সম্মুখীন। অথচ উপযুক্ত পরিমাণে কুইনিন সরবরাহের ব্যবস্থা নাই। লোভী মজুতদারের কুইনিন মজুত করিয়া চোরা কারবার চালাইতেছে। ত্রিশ টাকার কুইনিন তিনশত টাকায় বেচিতেছে।’

৩) ‘অনাহারে এবং রোগের আঘাতে গ্রাম অঞ্চলে ভীষণ শ্রম সঙ্কট বা মজুরের অভাব দেখা দিয়াছে। গ্রাম্য মজুরদের তিন ভাগের এক ভাগ মাত্র কার্যক্ষেত্রে সচল আছে। চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বরিশাল প্রভৃতি জেলায় মজুরের অভাবে মাঠের ধান মাঠে পড়িয়া আচে, সময়মত কাটা হইতেছে না। এইভাবে প্রচুর ধান এইবার নষ্ট হইবে। নৌকা, গড়ুরগাড়ী প্রভৃতি গ্রাম্য যানবাহন একরকম অমিল। গ্রাম হইতে শহরে ধান রপ্তানি করা বা শহর হইতে গ্রামে কাপড়, নুন, কেরোসিন, চিনি প্রভৃতি আমদানি করা অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য এবং বহুক্ষেত্রে একেবারেই অসম্ভব। এতদিন ছিল শুধু রেলগাড়ির অভাব, এবার সেই সঙ্গে দেখা দিল গ্রাম্য যানবাহনেরও অভাব। ফলে শহরের সঙ্গে গ্রামের এবং এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের যোগাযোগ নষ্ট হইয়া যাইতেছে।’
৪) ‘শহরে চাউল এখনও দুষ্প্রাপ্য, দাম আবার বাড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, অথচ পুরো রেশনিং এখনও চালু হয় নাই।’
৫) ‘কয়লার অভাবে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হইবার উপক্রম। উৎপাদন বন্ধ হইলে লক্ষ লক্ষ মজুর দুঃস্থ শ্রেণীতে পরিণত হইবে এবং সকলরকম জিনিষেরই দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে।’
শংকর তাঁর ‘অতি সত্বর সত্তরে’ প্রবন্ধে লিখছেন, “সে এক অদ্ভুত সময়। ধনধান্য ভরা দেশ ভরে উঠল ‘ফ্যান দাও’ ক্রন্দনে। পৃথিবীর ইতিহাসে চিরকালের স্থান করে নিল বাংলার মহামন্বন্তর। তখনও কিন্তু শাসকের সঙ্গে শাসিতের তর্কযুদ্ধ — ফেমিন কাকে বলে ? যুদ্ধবিড়ম্বিত শাসকের দাবি, এটা দুর্ভিক্ষ নয়, চাল-ডাল-নুন হাটেবাজারে যথেষ্ট আছে। কিন্তু দামবেড়ে গিয়েছে, নের্বাধ চাষা হঠাৎ ধনী হওয়ার প্রলোভনে ঘরের ধান বিক্রি করে দিয়েছিল, এখন সেই ধান ডবল দামে কিনতে হচ্ছ। এই মন্বন্তর অনাহারের নয়, এর নাম ম্যালনিউট্রিশন। কত লোক মারা গেল সেই তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশে, কত লোক মহামারির কবলে পড়ল তার হিসেব নিয়েও দুই পক্ষের তর্কযুদ্ধ। আমি তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র, এক কোটি স্বদেশবাসীকে অনাহারে মরতে দেখলাম, ভাগ্যবানরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু তাঁদের চিন্তা — অন্নপ্রাশনের বাঙালি মুখে আটার রুটি গুঁজে দেওয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত কাদের ?” (চলবে)