অঙ্ক সম্পর্কে কার কী ধারণা জানি না, তবে আমার অনেকটাই ভীতি ছিল ছেলেবেলায়।যাকে বলে ‘ফোভিয়া’।একেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়
Dyscalculia or Number dyslexia or math dyslexia.
মনে পড়ে ক্লাস সিক্সে ২১ পাওয়ার কথা।আর ক্লাস সেভেনে ২৭ পাওয়ার কথা। অঙ্ক মানে আমার কাছে ছিল এক বিভীষিকা। ‘নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পের সুকুমারের কথা আমাদের মনে পড়ে। অঙ্কের মাস্টারমশাই তাদের কাছে ছিলেন বিভীষিকা স্বরূপ। তাঁর প্রকাণ্ড হাতের প্রকাণ্ড চড় খেয়েও ছাত্রছাত্রীরা কাঁদতে সাহস পেত না। কাঁদলে তিনি বলতেন — “পুরুষ মানুষ হয়ে অঙ্ক পারিস না, তার উপর কাঁদতে লজ্জা করে না। এক্ষুনি পা ধরে স্কুলের পুকুরে ছুড়ে ফেলে দেবো।” আমাদের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। একে অঙ্ক পারি না, তার উপর চোখ রাঙানি, তর্জন, গর্জন। আমাদের মাস্টারমশাই আবার বলতেন প্লেটোর একটা কথা — “অঙ্ক হইল আত্মার ঔষধ, অঙ্ক না শিখিলে দর্শন বোঝা যায় না।” মাঝে মাঝে কী যে বিড়বিড় করে বলতেন সকলে বুঝত না। বুঝেছিস বললেই, মার খাওয়ার ভয়ে আমরা তৎক্ষণাৎ ইতিবাচক মাথা নাড়তাম। এভাবেই না বোঝার বোঝা ঘাড়ে নিয়েই পিঠ কুঁজো করে বাড়ি ফিরতে হত।
বিশেষত পাটীগণিত। আর জ্যামিতির কথা উঠলেই তো আমি সেখানে নেই। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। বীজগণিত মোটামুটি বুঝতাম। কিন্তু ওই সন্তোষজনক। মনে পড়ে তখন আমার ক্লাস সিক্স, প্রাইভেট টিউশনে গেছি। সরল অঙ্ক না প্র্যাকটিস করে যাওয়ায় ওখানে করতে পারিনি। সে দিন তো স্কুলে যাওয়ায় বন্ধই হল দেরি করে ছুটি দেওয়ার কারণে, উপরন্তু কান ধরে উঠবোস, কাঁচা কঞ্চির বাড়ি, কটু বাক্যটাও হজম করতে হল নির্দ্বিধায়। বদমাশ নিয়ম তখনও রপ্ত করতে পারিনি। যাইহোক রপ্ত করতে বেশি দিন লাগেনি। পরের বছর ক্লাস এইট। একলাফে অঙ্কে অভাবনীয় প্রোগ্রেস।একলাফে ২৭ থেকে ৫৯।এই সময় বাবা বাহবা দিয়েছিল — ‘হবে তোর, আরেকটু ধরে ধরে প্র্যাকটিস কর।’
ক্লাস নাইনেও অঙ্কে ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। শেষে মাধ্যমিকে এসে ৮০ তে ঠেকেছিল। কিন্তু এখানে এসে একটা আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল আমার। ত্রিকোণমিতি আর সমানুপাতের অঙ্ক গুলি আমার প্রিয় ছিল। সেই দুটি অঙ্কই আমি ভুল করে এসেছিলাম। না হলে ৮০ র কোঠাটা হয়তো ৯০ এ গিয়ে ঠেকত। এই আক্ষেপটা আমার এখনো আছে। হয়তো যতদিন আছি ততদিনই থাকবে।
তবে অনেক দিন ধরে প্রাথমিক এ পড়ানোর সুযোগ পেয়ে এই বিষয়টা সম্পর্কে কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি ছাত্র-ছাত্রীদের গণিতভীতির মূলত দুটি কারণ সব সময় চোখে পড়ে আমাদের। সেগুলো হচ্ছে-
সাবলীলতা (Autometacity) ধারণাগত স্বচ্ছতা (Conceptual Understanding) গণিত যেহেতু একটা বিমূর্ত (Absrtuct) বিষয়, তাই সে বিমূর্ত বিষয় সম্পর্কে একটা ভীতি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু আমরা যদি কিছু মূর্ত (Concrete) বা বিষয় নিয়ে প্রথমে তাদের অবগত করাই, তারপর যদি আমরা বিমূর্তের দিকে যায় তাহলে সেই গণিত শিক্ষা শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটাই সাবলীল হবে এবং তাদের ধারণাগত স্বচ্ছতা আসবে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মেলার মাঠে, দোকানে, রাস্তা-ঘাটে, বাজারে, দোকানে গণিতের প্রচুর উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেই সমস্ত প্রাক্ গাণিতিক ধারণাগুলিই শিশুর ভিত্তি (Base) নির্মাণে সাহায্য করে। এই ধারণাগুলিই যদি প্রথাগত গণিতের সঙ্গে জুড়ে দিই তাহলেই গণিত শিক্ষা শিশুদের কাছে সহজ হয়ে উঠবে। বোঝা হয়ে উঠবে না। না বোঝার বোঝা আর বয়ে বেড়াতে হবে না।
যেমন — মনে করুন বাচ্চাকে ১ শেখাবেন। কীভাবে শেখাবেন? দেখবেন আপনার বাচ্চা ১-১০০ গটগট করে মুখস্থ করে বলে ফেলছে এক নিমেষে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনার বাচ্চা সব সংখ্যা শিখে ফেলেছে। প্রত্যেক সংখ্যার নির্দিষ্ট একটা প্যাটার্ন থাকে, তার ভিতরের রহস্য থাকে, সেটা সে কিন্তু রপ্ত করতে তখনও পারেনি। সেজন্য একটা সংখ্যা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পেতে গেলে সেই সংখ্যার “নাম-মান-চিহ্ন” সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা গঠন করতে হবে। ব্যাপারটা কীরকম? যেমন-১। যখন মুখে বলছি, এটা ওর নাম। প্রত্যেক সংখ্যার একটা করে মান থাকে, তেমনি এরও একটা মান রয়েছে। হাতের কাছে কিছু “Low cost, No cost” TLM হিসাবে রাখবেন। যেমন-তেঁতুলের বীজ, ঝাঁটার কাঠি, প্লাস্টিকের স্ট্র ইত্যাদি যা দিয়ে তারা গুণে দেখাতে পারবে। তাহলে ১ মুখে বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা মূর্ত জিনিস একটি নিয়ে গুণবে। প্রয়োজনে অ্যাবাকাস ব্যবহার করতে পারেন। এরপর আসবে মান। প্রত্যেক সংখ্যার দুটি করে মান থাকে। একটা স্থানীয় মান আর একটা প্রকৃত মান। তাহলে ১ সংখ্যার স্থানীয় মান (Place Value) অর্থাৎ সে কোন স্থানে রয়েছে — একক স্থানে রয়েছে। সুতরাং তার স্থানীয় মান ১ এবং তার প্রকৃত মান, যেটা চোখে দেখছি সেটাও (Face value) ১। এই বিষয়টা ছাত্রছাত্রীরা জানবে, তবে সেই সংখ্যা সম্পর্কে তার পরিপূর্ণ ধারণা গঠিত হবে। এবার আপনি ১ সংখ্যাটা কীভাবে লিখতে হয় বোর্ডে লিখে দেখিয়ে দিলেন। বললেন এটা ১ এর চিহ্ন।
এভাবে স্টেপ বাই স্টেপ সংখ্যা সম্পর্কে ছাত্রাত্রীদের অবগত করাতে হয়।
আবার সংখ্যা সম্পর্কে আরো একটি জিনিস বেশ কার্যকর সেটি হল — “শো-ব-গো-প-লে”।
অর্থাৎ — শোনা, বলা, গোণা, পড়া, লেখা।
এটা একটু ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাক।
ধরুন আপনি বাচ্চাকে ২ শেখাবেন। কীভাবে শেখাবেন? ধরুন সে যদি হয় একদম Early Grade এর একজন বাচ্চা, যে কোনদিন বাড়িতে ২ শেখেনি।
তাদের এভাবে শেখাতে পারেন —
আপনি একটি গল্প দিয়ে শুরু করুন।কারণ শিশুরা গল্প শুনতে ভালোবাসে।

গল্পটা এরকম হতে পারে-“আমি আজ রাত ২ টোর সময় ঘুম থেকে উঠে ২ টো বিস্কিট দিয়ে ২ কাপ চা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হলাম। ২ কিমি যেতে না যেতেই অটোর ২ টো টায়ার পাংচার হয়ে গেল। অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম। ২ কিমি হাঁটার পর পথে ২ জন পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল। জানলাম তারাও আমার সঙ্গে কলকাতা যাবে। বাসে উঠলাম। জমিয়ে ২ ঘন্টা গল্প হল। ততক্ষণে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।” এবার এখান থেকে ছোট ছোট প্রশ্ন করুন। যেমন — আজ আমি কটার সময় ঘুম থেকে উঠেছিলাম? কটা বিস্কিট খেয়েছিলাম? কয় কাপ চা খেয়েছিলাম? ইত্যাদি। তাহলে বোঝা যাবে তারা গল্পটা আদেও শুনেছে কি না। এই গল্পটার মধ্যে একটা শব্দ তাদের মনে Strike করবে। সেটা — ‘২’ (দুই)। অর্থাৎ তারা প্রথমে ২ শব্দটা শুনল। তারা মুখে ২ সংখ্যাটা বলল। এবার গোণা। পরিচিত কিছু টি.এল.এম যেমন — তেঁতুল বীজ, কাঠি, প্লাস্টিকের স্ট্র ইত্যাদি হাতে নিয়ে তারা সেগুলির থেকে ২ টি গুনল সকলকে দেখিয়ে দেখিয়ে। এভাবে তারা গোণা শিখল। এবার পড়া। আপনি বোর্ডে লিখে দিলেন ২ কীভাবে লিখতে হবে। বার বার তার উপর হাত বুলিয়ে তার Direction-টা দেখিয়ে দিলেন। অনেকে উল্টো লেখে, সেই বদ অভ্যাস কাটানোর জন্য। তারা আপনার সঙ্গে ২ সংখ্যাটি পড়ল সমস্বরে। সবশেষে লেখা। তাদের আপনি ২ সংখ্যাটি খাতায় লিখতে বললেন। দুই একজনকে নাম ধরে বোর্ডে ডেকে নিয়ে লিখতে বললেন। এতে তাদের ভয় কাটবে। এভাবেই ২ শেখার বৃত্তটা সম্পন্ন হবে। যদিও এটা একদিনের কাজ নয়। তবে এভাবে করুন, বাড়ির বাচ্চাদের শেখান।
ভাষা শিক্ষার যেমন চারটি স্তম্ভ রয়েছে “শোনা-বলা-পড়া-লেখা”, তেমনি গণিত শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষত সংখ্যার ক্ষেত্রে এই পাঁচটি স্তম্ভ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে আপনার বাচ্চাটির সামনে অ্যাবাকাস, কিছু তেঁতুল বীজ, রঙবেরঙের সংখ্যা কার্ড দিন। এগুলো নিয়ে তাকে নাড়াচাড়া করতে দিন। সে খুব তাড়াতাড়ি গোণা শিখে যাবে। যারা একদম প্রথম প্রথম শিখছে তাদের একটি করে সংখ্যা বেশ কিছু দিন ধরে শেখান। সিরিয়াল বাই সিরিয়াল অর্থাৎ পরপর কোন সংখ্যা আপনাকে শেখাতেই হবে এমন কোন মানে নেই। অর্থাৎ ১,২,৩,৪,৫,৬ এরকম না শিখিয়েও ৪,৩,৬,২,১,৫ এরকমটাও শেখাতে পারেন। মোট কথা সে যেন সংখ্যা শিখতে পারে। সংখ্যা সম্পর্কে তার যেন সঠিক বোধ জন্মায়। যেমন — ধরুন বাচ্চাকে ‘১’ শেখাবেন। কয়েকটি সাদা কাগজে রঙিন পেন দিয়ে ১ সংখ্যাটি লিখে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় আঁঠা দিয়ে সেঁটে দিন। শোবার ঘরে, বেসিনের পাশে, বারান্দায় অর্থাৎ আপনার বাচ্চাটি যেখানে বেশি ঘোরাফেরা করে। সে সব সময় যাতে সংখ্যাটি দেখে। দেখার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ওর সাথে সংখ্যাটি উচ্চারণ করবেন। এভাবে ৪-৫ দিন চলুক। তারপর আবার নতুন সংখ্যা দেবেন। আমি নিজে এই পরীক্ষা করেছি আমার বাচ্চার উপর। ভালো ফল পেয়েছি।
তাই সবশেষে সকলকে বলব গণিতকে ভয়ে নয়, ভালেবেসে গ্রহণ করতে বলুন আপনার বাচ্চাকে। প্রয়োজনে গল্পের মাধ্যমে সংখ্যা শেখান।
একটি সংগৃহীত ছড়া নীচে দিলাম —
“১ যাবে শ্বশুরবাড়ি
২ ডাকে গাড়ি।
৩ নিল নিজ হাতে
রসগোল্লার হাড়ি।
৪ কাঁধে বাক্স নিল
৫ ধরে ছাতা,
৬ ডেকে বলছে হেঁকে
যাব কলকাতা রে ভাই,
যাব কলকাতা।
৭ ভায়া ঢোলক বাজায়
৮ বাজায় বাঁশি।
৯ মুখে শঙ্খ ফোঁকে,
১০ বাজায় কাঁশি।।”
নিজের বাচ্চার প্রয়োজনে আরো তৈরি করুন এরকম ছড়া। দেখবেন আপনার বাচ্চা যেন কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়ে, যেন তার সর্বাঙ্গীণ বিকাশ হয়।
প্রসেনজিৎ দাস, শিক্ষক, বেতাই আখড়াপাড়া, বেতাই, তেহট্ট, নদীয়া।
ধন্যবাদ
প্রসেজিৎ দা pfd. টা দেখব ভেবে আর দেখা হয়ে ওঠেনি,আজ দেখলাম।বেশ ভাল। আরো এগিয়ে যেতে হবে ——
৷৷৷৷৷ ৷ ধন্যবাদ ৷৷৷৷৷৷৷