আমাদের রাজ্যে যে সমস্ত বেসরকারি বিদ্যালয় গুলি গড়ে উঠেছে, তারা মূলত কয়েকটা দিকের প্রতি যত্নবান হয়। সেটাকে বলে CIS বা Curriculum Infrastructure and Service বা বাংলায় ‘৩ প’-পাঠক্রম পরিকাঠামো ও পরিষেবা। রাজ্যের প্রচুর কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে যেখানে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের জন্য হয়তো মিড ডে মিলের ব্যবস্থা করা হয় না, হয়তো পোশাক, ব্যাগ, জুতো দেওয়া হয় না, তবুও ওই স্কুলগুলি এত জনপ্রিয় কেন? অভিভাবক অভিভাবকদের কেন এগুলির প্রতি বেশি ঝোঁক? সে কারণ গুলি তো পাঠক বহু পূর্বেই অবহিত। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলিকে যদি বাঁচাতেই হয়, তবে তাদের প্রতি আমাদের নজর দিতেই হবে। নতুবা একদিন বিদ্যালয়গুলি তার প্রয়োজনীয়তা হারাবে। আবার অনেক সময় দেখা যায় অভিভাবকরা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাক প্রাথমিকে ভর্তি করেন কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তারা স্কুলে আসে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তারা অন্য স্কুলে পড়ছে, বিশেষত বেসরকারি স্কুলগুলিতে। তবে এই দায় অবশ্যই শিক্ষকদের নিতে হবে। কিছুটা সরকারকেও। আমরা শিক্ষকরা হয়তো তাদের সেই পরিষেবা দিতে পারি না, যার ফল স্বরূপ তারা অন্য স্কুলে যাচ্ছে। শিক্ষক শিক্ষিকারা যদি তাদের প্রতি একটু যত্নবান হন, তাহলে তাদের স্কুলের প্রতি গুরুত্ব বাড়বে। তবে তার জন্য সরকারকেও তাদের উপর গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের জন্য বিশেষ পাঠ্যক্রমের ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে, কীভাবে তারা আরও বেশি শিখতে পারবে তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে আমার প্রস্তাব বইগুলি বিশেষতঃ কুটুম কাটামের ছবিগুলি যদি রঙিন করা হয়, তবে সেই বইগুলির প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আকর্ষণ আরো বাড়বে। ছবির একটা জগত তৈরি হবে তার কাছে। তারপর সেই ছবির জিনিসকেই যখন প্রিন্ট আকারে দেখবে, পড়ার প্রতি তার আগ্রহ বাড়বে। এটাকে বলে কনসেপ্ট অ্যাবাউট পিকচার অ্যাণ্ড প্রিন্ট বা CAPP (Concept about Picture and Print)।অর্থাৎ ছবি দেখবে ও পরে সেগুলিকে প্রিন্ট রূপে দেখলে ছবি ও লেখার মধ্যে তারা সমন্বয় সাধন বা Correlate করতে শিখবে। বইয়ের ছবির পাশাপাশি বর্ণ, সংখ্যা এগুলিকে চেনানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি বইয়ের পাতাতে কর্মপত্র থাকবে, তারা হাতে কলমে কাজ করবে, প্রয়োজনে একাধিক অনুশীলনীর পৃষ্ঠা রাখতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রয়োজন মত আরও অনেক কর্মপত্র তৈরি করে নেবেন।তাঁদের এই নির্দেশ দিতে হবে তার জন্য বইয়ের শেষে একাধিক ফাঁকা পৃষ্ঠা রাখা যেতে পারে। ‘আমার বই’-এর মতো প্রতিটি পৃষ্ঠার শেষে শিখন পরামর্শ ও শিখন এর উদ্দেশ্য লিখতে হবে। যখন একটা বাচ্চা প্রথম শ্রেণীতে উঠবে, সে ন্যূনতম কতটুকু শিখে যাবে,অর্থাৎ তার লার্নিং আউটকাম গুলি কী হবে অর্থাৎ তার প্রত্যাশিত শিখন সামর্থ্যগুলি কে চিহ্নিত করতে হবে। তবেই একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকার আগ্রহ থাকবে ও দায়বদ্ধতা থাকবে যে বছরের শেষে আমাকে এই সকল ছাত্র-ছাত্রীকে একটা মানদন্ডে পৌঁছে দিতে হবে। তার জন্য আমাদের যা করণীয় তা আমাদের করতে হবে। এই যে একটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে এনে দেওয়া, এর ফলেই তাদের শিখন পরিপূর্ণ হবে বলে আমি মনে করি। তবে একশ শতাংশ সাফল্য হয়ত কোনো কিছুতেই আমরা আশা করি না। কিন্তু —

“Something will come out of something and nothing will come out of nothing.”
তাই আমাদের চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?
প্রাক-প্রাথমিকের বইগুলি নিয়ে আলোচনা ও কিছু পরামর্শঃ —
যে শিশুর বয়স মোটামুটি তিন-চার বছর তারা এই সময়ে লিখতে শুরু করে তখন আপনার কাজ হবে আপনাকে বিভিন্ন ধরনের রাইটিং প্যাটার্ন শেখানো। যেমন বিভিন্ন চিহ্ন, সরলরেখা, বৃত্ত, বক্ররেখা ইত্যাদি। এগুলোকে বলে সাইকোলজিক্যাল প্যাটার্ন (Psychological Pattern)। এই প্যাটার্ন গুলি শিশুকে প্রথাগত লেখার জগতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। যেমন ইংরেজিতে ”A”-এই বর্ণটি লিখতে গেলে তিনটি সরলরেখার প্রয়োজন। তাহলে এই তিনটি রেখা অঙ্কন করা আমাকে আগে শেখাতে হবে। তবে সে কিন্তু “A” লিখতে শিখবে অর্থাৎ তার “A” লেখার বৃত্তটা সম্পূর্ণ হবে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ”কুটুম কাটাম” বইতে এই ধরনের সাইকোলজিক্যাল প্যাটার্ন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলি বিন্দু দিয়ে আঁকা হয়েছে। শিশুরা এই বিন্দুগুলি জুড়ে জুড়ে প্যাটার্নগুলি আঁকবে ও ধীরে ধীরে তারা এমনিতেই আঁকতে ও লিখতে শিখবে। এগুলির মূল উদ্দেশ্য হল লেখা শেখানোর আগে এই প্যাটার্ন গুলি শিখলে তাদের লেখার Direction গুলিও ভুল হবে না। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিণত বয়সে এসে ‘কাটুমকুটুম’ বইতে যে আকারনিষ্ঠ বিমূর্ত রূপ তুলে ধরেছিলেন, সেই বইটির কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদও এই বইটির অবতারণা করেছেন। ‘কুটুম কাটাম’ বইটি নিঃসন্দেহে প্রাক-প্রাথমিক বাচ্চাদের এক অপরিহার্য পুস্তক। এর সাথে আরও কিছু বর্ণ, সংখ্যা এগুলি ব্যবহার করলে তাদের শিক্ষা আরও প্রথম থেকেই মজবুত হয়ে উঠবে। আর এদেরও গুরুত্ব দিতে হবে, না হলে ওই যে বললাম বেসরকারি স্কুলগুলোর রমরমা বাড়বে। প্রাক প্রাথমিক স্তরের অনেক বাচ্চা এখন প্রথাগত বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পার হওয়ার আগেই কিন্তু সংখ্যা শিখে যায়, তারা কিন্তু বর্ণ লিখতে শেখে যায়,তারা কিন্তু অভিজ্ঞতাহীন সাদা পাতার মতো নয়। তারা বেশকিছু ভাষিক অভিজ্ঞতা, কিছু বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতা নিয়েই কিন্তু বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে প্রবেশ করে। সুতরাং এই সমস্ত বাচ্চাদের পরিপক্বতার জন্য প্রথম থেকেই যদি কিছু বর্ণ বা সংখ্যা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অবগত করানো যায় এই বইতে তাহলে তাদের জন্য তা আরও ফলপ্রসূ হবে। (ক্রমশ)