এবার আলোচনা করব ‘মজারু’ নিয়ে।
এই বইতেও ছবি ছাড়া তেমন কিছুই নেই।কিছু সংযোগ স্থাপন দক্ষতা, কিছু সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (পাজেলড্), ছবির সঙ্গে তার নামের আদ্যাক্ষরের সংযোগ স্থাপন ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে।এগুলোর পাশাপাশি বইটিতে কিছু জিনিস সংযোজন করা যেতে পারে —
খেলার ছলে সংখ্যা শেখানো। নীচে একটি সংগৃহীত ছড়া দিলাম —
“আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।
বল অনিতা ১।
তুই পাবি কেক।
তুই একটু খাবি, আমি একটু খাব।
আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।
বল অনিতা ২।
তুই পাবি রুই।
তুই একটু খাবি, আমি একটু খাব।
আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।
বল অনিতা ৩।
তুই পাবি বীণ।
তুই একটু বাজাবি, আমি একটু বাজাব।
আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।

বল অনিতা ৪।
তুই পাবি আচার।
তুই একটু খাবি, আমি একটু খাব।
আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।
বল অনিতা ৫।
তাথৈ তাথৈ নাচ।
তুই একটু নাচবি, আমি একটু নাচব।
আজ আমি অনিতাকে গুণতে শেখাবো।”
অথবা
“১ যাবে শ্বশুরবাড়ি
২ ডাকে গাড়ি।
৩ নিল নিজ হাতে/রসগোল্লার হাড়ি।
৪ কাঁধে বাক্স নিল
৫ ধরে ছাতা,
৬ ডেকে বলছে হেঁকে/যাব কলকাতা রে ভাই,/যাব কলকাতা।
৭ ভায়া ঢোলক বাজায়
৮ বাজায় বাঁশি।
৯ মুখে শঙ্খ ফোঁকে,
১০ বাজায় কাঁশি।।”
তাছাড়া সংখ্যা শেখানোর বা চেনানোর জন্য মামার বাড়ি যাওয়া খেলাটা বিশেষ কাজে দেবে। এগুলোও বইতে সংযোজন করা যেতে পারে। অনেক ছড়ার ব্যবহার করে অনেক পরিচিত শব্দগুলিকে শেখানোর ব্যবস্থা করলে আশা করি তারা আনন্দের সাথে শিখবে। যেমন —
“Cap মাথে Dog সাথে
হাতে নিয়ে Pen,
সেজে গুজে School এ
যায় দেখো Hen।’
অথবা
“দুলে দুলে পড়ে খোকা
বি ও বো,জি ও গো
খুকু হেসে বলে জানি
নার ইংরেজি নো।”
অথবা
“I মানে আমি
You মানে তুমি
এদুটি শিখে,
He মানে সে,
They মানে তারা
লিখলে পরে,
চকোলেট দেব সোনা
দুহাত ভরে।”
তাছাড়া প্রচলিত কিছু ছড়া ছবি-সহ দিলে তাদের একঘেঁয়েমি কাটবে।
এবার আসি ‘বিহান’-এর কথায়। এটা প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক নয়। এটা শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি একটা নির্দেশিকা বলা যেতে পারে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা মানে বুনিয়াদি শিক্ষার প্রথম সোপান। শিক্ষকের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হল শিশুর মন ও মান বোঝা। তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন — “কী শিখাইব তাহা ভাবিবার বটে, কিন্তু যাহাকে শিখাইব তাহার মনটাও কী উপায়ে পাইব সেটাও কম কথা নয়।” তাই এই স্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের সক্রিয়তা ভিত্তিক নানা কাজ বা Activity-Based Learning বা হাতে কলমে কাজ ও খেলাচ্ছলে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যালয় যে তাদেরই একটা জায়গা এটা তারা বুঝতে শিখবে। একটা কথা প্রচলিত আছে —
“আমাদের বিদ্যালয়
নয়তো শুধু বিদ্যারই আলয়
নাচবে সেথা,গাইবে সেথা,
গড়বে তাকে মিত্রালয়।”

শিশু কখনো বুঝবে না যে সে কোথায় আছে, বাড়িতে না স্কুলে। এভাবে সে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ খুঁজে পাবে। শিক্ষক এমনভাবে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশবেন যাতে তাদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকার একটা ফ্রেন্ড ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড এর সম্পর্ক তৈরি হয় এবং শিক্ষার একটা সোপান তৈরি হয়ে যায়। তাদের বয়সের সাথে সাযুজ্য রেখেই ‘বিহান’ মডিউলটি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে এর Apply বা প্রয়োগ কীভাবে হবে? শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষক আছেন, গাইড বুক আছে, কিন্তু এগিয়ে আসার মানুষ নেই। তবে এখানে সরকারের এদের প্রতি একটু ঘাটতিও রয়েছে, অবহেলাও বলা যেতে পারে।না হলে এই দশ বছরে সরকারের টনক নড়লো না! সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাক-প্রাথমিককে নিয়ে নাকি মাথা ঘামাচ্ছে। তার জন্য নির্দিষ্ট শ্রেণীকক্ষ, আলাদা শিক্ষকের ব্যবস্থা করবেনএবং তাঁদের (শিক্ষক-শিক্ষিকাদের) আলাদা বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন।কতদূর সত্য তা জানি না, তবে উদ্যোগ সাধু। আরো অনেক সংস্থা যেমন — ইউনিসেফ এর পিছনে সবসময়ই রয়েছে। তারাও এগিয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও আসবে সন্দেহ নেই। ‘বিহান’ বইতে বিভিন্ন সংগীতের ব্যবহার, ছড়া বা গল্পের ব্যবহার, এগুলি অনুশীলনের মাধ্যমে কথা বলতে শেখা, কথা বলার ধরণ, রীতিনীতি এগুলি তারা শিখবে। ইউনিসেফ তাই প্রতিটি শিশুকে গুরুত্ব দিয়েই তাদের কীভাবে আরো উৎকর্ষ সাধিত হয় তার ব্যবস্থা করেছে। তাদের মতে ‘এভরি চাইল্ড স্পেশাল’ (“Every child is special.”) অর্থাৎ প্রতিটি শিশুই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আশ্চর্য এক শক্তি। তাদের এই অন্তর্নিহিত শক্তির পূর্ণ বিকাশের ফলে তাদের শিক্ষা সম্পন্ন হবে। বিবেকানন্দ বলেছিলেন — “Education is the manifestation of perfection already in men.”
তারা প্রত্যেকেই এক একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। তাদের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে তার বিকাশ ঘটানোর সময় এখনই। প্রাক প্রাথমিক শ্রেণীকে একসময় বলা হতো ‘ইনফ্যান্ট’। শব্দটির অভিধান গত অর্থ হল ‘অতি বাচ্চা শিশু’। তারা ক্ষুদ্র হলেও কিন্তু তুচ্ছ নয়। তাই সরকার তাদের যেন ‘Orphan’ না ভাবে। তাদের প্রতি সুনজর বর্ষিত হোক।
প্রত্যেকটি শিশুকেই যাতে সরকার পোষিত বিদ্যালয়ের আঙিনায় আনা যায়, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে আমরা সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হব।