আমাদের রাজ্যে ছেলেমেয়েদের বয়স পাঁচ বছরের গণ্ডী পার হওয়ার পরই প্রথাগত বিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রবেশ করে। কিন্তু তার অক্ষরের জ্ঞান দেওয়া হয় আরও পরে, প্রধানত প্রথম শ্রেণী থেকে। কারণ প্রাক প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাদানে যে যে শিখন সামগ্রী বা বই (কুটুম কাটাম, মজারু) ব্যবহৃত হয়, তাতে তাদের অক্ষরের সঙ্গে খুব একটা পরিচয় ঘটাতে সাহায্য করে না।
তবে হ্যাঁ, ‘কুটুম কাটাম’ বইতে কিছু সংখ্যা (ইংরেজি,বাংলা), কিছু ছবির সঙ্গে বর্ণের সংযোগ স্থাপন, ছবির মাধ্যমে গল্প, বিন্দু যোগ করে বর্ণের সঙ্গে পরিচয়, সংখ্যা গোণা, রঙ করা, কিছু নকশা বা প্যাটার্ন শেখানো, যেগুলি পরবর্তীতে তাদের বাংলা ও ইংরেজি সংখ্যা ও বর্ণ লিখতে সাহায্য করবে।
অনেক ছাত্রছাত্রীকে দেখা যায় ‘ল’ কে উল্টো করে লিখতে, আবার ছোটো হাতের b কে d আবার d কে b, কিংবা ধরুন M আর W কে গুলিয়ে ফেলা, উল্টো করে N লিখতে। তার জন্য এই বইতে বিশেষ কিছু নকশা বা প্যাটার্ন শেখানো হয়েছে। এগুলি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ গুলিকে বলা হয় সাইকোলজিকাল প্যাটার্ন। মূলত রাজ্যের সুসংহত শিশু বিকাশ কেন্দ্র (ICDS=Intregrated Child Development Scheme) গুলিতে শিশুদের অক্ষরজ্ঞানের পরিচয় দেওয়া হয়, পুষ্টির দিকটাও নজর দেওয়া হয়। প্রথাগত বিদ্যালয়ে প্রবেশ না করার আগ পর্যন্ত একটা শিশুও কিন্তু অভিজ্ঞতাহীন সাদা কাগজ নয়। সে কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা নিয়েই বিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রবেশ করে। বাচ্চারা প্রথাগত বিদ্যালয় প্রবেশ করার আগে এই আইসিডিএস সেন্টার গুলোতে যায়। সেখান থেকেও তারা কিছুটা শেখে, বাড়ির পরিবেশ থেকেও সে কিছু শেখে। কিন্তু বিদ্যালয়ের আঙিনায় এসে কিন্তু ওই এক বছরে তাদের বিশেষ কিছু শেখানো হচ্ছে না। তবে কী শিখছে? ছবি আঁকা, কথা বলা, গল্প বলা, পাজলজ্ গেম, গান, ছড়া, কবিতা, আবৃত্তি ইত্যাদি। কিন্তু তাদের জন্য নির্মিত মডিউলে এসবের খুব কমই আছে। তাহলে এই এক বছর তারা কি প্রথাগত পাঠ থেকে বঞ্চিত হবে? এখন তো রাজ্যের বেশকিছু সুসংহত শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলিকে সরকার ‘শিশু আলয়’-এ রূপান্তরিত করেছে। এগুলোর মূল লক্ষ্য হল আনন্দদায়ক পরিবেশে শিশুকে পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করার পাশাপাশি তার অক্ষর জ্ঞানের পরিচয় ঘটানো। আগে এই আইসিডিএস সেন্টার গুলোতে মূলত বাচ্চারা আসতে চাইত না। তাদের সেন্টার অভিমুখী করানোর জন্য রাজ্য সরকার এগুলিকে ‘শিশু আলয়’-এ রূপান্তরিত করেছে। এতে আরও বেশিসংখ্যক বাচ্চা এর আওতায় এসেছে। তারা যাতে সেখানে আনন্দ পায় সেই উদ্দেশ্যে বর্ণ কার্ড, চিত্র কার্ড, পাজেলড্, খেলার নানা সামগ্রী ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক বাচ্চা যারা ভয় পায়, পড়তে চায় না; তাদের ভয় ভাঙছে। শিখন সামগ্রী নিজ হাতে তারা নাড়াচাড়া করছে। এর ফলে জয়ফুল লার্নিং (Joyful Learning) এর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই ধাঁচে রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যদি (‘শিশু আলয় প্রকল্প’) এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া যায়, আমার মনে হয় তাদের ভবিষ্যৎ পথ চলাটা সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। এক কথায় বলতে হয় শুরুতেই যদি একটা বাচ্চা পথ চলতে হোঁচট খায় তবে তার পথ চলা যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি প্রথাগত বিদ্যালয় পৌঁছে প্রথমেই সে যদি বাধাপ্রাপ্ত হয় পরবর্তীতে সে আগ্রহ হারাবে পড়াশোনার প্রতি।

একটার পর একটা ইট সাজিয়ে যেমন বিরাট একটা বাড়ি তৈরি হয়, তার ভিত যদি মজবুত না হয়, তবে বাড়ি ভেঙে পড়ে। তেমনি তাদের শুরুতেই যদি ভিতটা মজবুত করার চেষ্টা করা হয়, তাতে ক্ষতি কি? তাই এই সমস্ত বাচ্চাদের জন্য বিদ্যালয়ে আলাদা শ্রেণীকক্ষ, পাঠ্যক্রম, তাদের জন্য যদি আলাদা শিক্ষক ও শিক্ষোপকরণ এর ব্যবস্থা করা যায় তাদের শিখন আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে। প্রথাগত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেখা যায় এই প্রাক প্রাথমিক শ্রেণির বাচ্চাদের বিশেষ করে কোনো রকম নজর দেওয়া হয় না। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে আমাদের অনেক ত্রুটি রয়েছে।সঠিক নিয়মে তাদের পাঠ আত্মস্থ করার জন্য চাই ট্রেনিং, যথেষ্ট অনুশীলন। তবে তাদের এই কর্মযজ্ঞে শামিল করা যাবে বলে সন্দেহ নেই। আমাদের রাজ্যে বেশিরভাগ বিদ্যালয়গুলিতে ঘরের অপ্রতুলতা, শিক্ষকের অপ্রতুলতা, যথেষ্ট পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের অভাব শিক্ষার গতিকে অনেকটাই নিম্নমুখী করেছে। একই শ্রেণিকক্ষে দুটি বা তিনটি ক্লাসের বাচ্চা একসাথে বসে পাঠ দেওয়া হয়। তার ফলে আশানুরূপ ফল তারা পায় না। আবার প্রাক প্রাথমিক স্তরের জন্য কোন বিদ্যালয়েরই সেরকম যত্ন নেওয়া হয় না। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কারণ তাদের কোন নির্দিষ্ট সিলেবাস নেই। তাই তাদের ওপর কোনো কড়াকড়িও করা হয় না। তারা আসে, হইহল্লা করে আর মিড-ডে-মিল খেয়ে বিদ্যালয় পরিত্যাগ করে। এটাই বাস্তব চিত্র। কিন্তু শিক্ষার ‘শ’ ও সে এই এক বছরে আয়ত্ত করতে পারে না। তারা এসে নিজে নিজেই লেখে, পড়ে, শোনে। তাই বলে কি তারা শেখে না? অবশ্যই শেখে। কিন্তু আমরা সেখানে ঠিকমতো সহায়ক বা ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা পালন করি না। তাই তাদের শিক্ষাও অসমাপ্ত থেকে যায়। আবার প্রথম শ্রেণী থেকেই তাদের প্রথাগত শিখন শুরু হয় ‘আমার বই’, ‘সহজ পাঠ (প্রথম ভাগ)’ দিয়েই। এক্ষেত্রে একটা বিরাট ফাঁক থেকে যায়। তাহলে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য এমন একটা পাঠক্রম রচনা করা উচিত যাতে ওই পাঠ্যক্রমটি প্রথম শ্রেণীর সঙ্গে একটা সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। বর্তমানে শিক্ষা দপ্তর থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর উপযোগী লার্নিং আউটকাম বা কাম্য শিখন সামর্থ্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য এরকম কোন কাম্য শিখন সামর্থ্য দেওয়া হয়নি। যার ফলে প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি থেকে কিছু না শিখেই বাচ্চারা প্রথম শ্রেণীতে প্রবেশ করছে। তাই এই সমস্ত কচিকাঁচাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আমাদের এগোনো উচিত। এতদিন এই প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক-অভিভাবিকা সকলের অভাব-অভিযোগ ছিল। প্রায় বছর দশেক আগে এই শ্রেণীর উৎপত্তি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। তাহলে এতদিনেও তাদের জন্য কোন কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বা নির্দিষ্ট পাঠক্রমের ব্যবস্থা করল না সরকার? প্রশ্নটা এখানেই। এজন্যই কিন্তু বেসরকারি স্কুলগুলির রমরমা। ব্যাঙের ছাতার মতো এখানে-ওখানে গজিয়ে উঠছে বেসরকারি বিদ্যালয়। তারা তাদের বাচ্চাদের অনেক যত্ন নিয়ে সমস্ত বিষয়গুলি দেখভাল করেন। আর আমরা তাদের সেই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করি। তাহলে একদিন না একদিন আমাদের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলি তার গুরুত্ব হারাবে। দিনের-পর-দিন বিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রসংখ্যা যেভাবে কমছে তাতে আমার মনে হয় এর চাইতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে যাবে। তাই ব্যাপারটা সরকারের মাথায় রাখা উচিত। (ক্রমশ)
ধন্যবাদ