স্বপ্নের নায়ক নায়িকাদের সামনে থেকে দেখার মুগ্ধতায় মুহুর্মুহু হাততালির শব্দে নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়াম যেন কোনো রূপকথার শহর। আঠাশতম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অসাধারণ অভিভাবকত্বের সুর বেঁধে অমিতাভ, শাহরুখ-এর মত ভারতীয় সিনেমার দুই আইকনকে সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মধ্যে আরও একবার হাজির করে অসামান্য দৃশ্যপট উপহার দিলেন।
২০১২ সাল থেকে কোভিড ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে একবার মাত্র আলাদা আলাদা এলেও নয় নয় করে সাতবার ভারতীয় সিনেমার দুই স্তম্ভ সমান শাহেনশাহ বাদশা অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খান একসাথে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন। দেশে আর কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে এই দুই স্টারকে একসঙ্গে এতবার দেখা যায় নি। এহেন অসামান্য একটা কীর্তির পালক যা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একমাত্র বাংলাই পেরেছে।
অমিতাভ বচ্চন, জয়া বচ্চন, শাহরুখ খান, রানী মুখার্জী, সৌরভ গাঙ্গুলী, শত্রুঘ্ন সিনহা, মহেশ ভাট, অরিজিৎ সিং, কুমার শানু, চঞ্চল চৌধুরীদের সঙ্গে প্রসেনজিৎ, দেব, আবীর, শুভশ্রীদের দেখার আবেগ উচ্ছ্বাসে এবারও ভাসলো হাজার হাজার মানুষ নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে। এই কারণেই আমি আজ ছবিওয়ালার গল্পে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের কিছু ছবি কিছু অসাধারণ মুহূর্তের কথা শেয়ার করছি যা ভারতবর্ষের আর কোথাও দেখা সম্ভব নয়। কারণ ছবি তোলা তো বটেই কিন্তু দিদির সঙ্গে ওনাদের সম্পর্ক, এর ঘরোয়া রূপটা দেখাও আমার জীবনের একটি অন্যতম অভিজ্ঞতা।

নন্দনের বাঁধাগতের আলোচনার মঞ্চ থেকে বিগত এগারো বছর ধরে নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়া কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালটি মমতা বন্দোপাধ্যায়-এর জাদুকাঠির স্পর্শে আজ দৃশ্যতই একটি উৎসবে পরিনত হয়েছে। যেখানে আমার আপনার মত সিনেমা ভক্তদের চোখের সামনে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খানের মত স্টারদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন উনি।
ফলত দুর্গাপুজো, ঈদ, বড়দিন, বইমেলার মত কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবও মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরেই আজ সার্বজনীন। অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান এর মত বিশ্বখ্যাত অভিনেতারা ফি বছরই এটা এড়াতে পারেন না শুধুমাত্র বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতার জন্য। কারণ ওই রত্নখচিত স্টারদের সঙ্গে ওনার সম্পর্কটা আত্মীয়ের মত।
আসলে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মানুষের মনের সহজ ভাষার সাধারণত্ব অর্জন করেছেন তাঁর সহজাত সরল স্বভাবে। আর সেই সাধারণত্বকে সময়ের সরণিতে ধরে রাখার জন্যই অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, রাখী গুলজার, শর্মিলা ঠাকুর, কমল হাসান, সঞ্জয় দত্ত, অভিষেক বচ্চন, কাজল, রানী মুখার্জী, বিদ্যা বালান, ঐশ্বর্যা রাই, মৌসুমী চ্যাটার্জীরা তাঁর একডাকে চলে আসেন এই উৎসবে। একবার নয় বারবার।

আমন্ত্রণের মধ্যে আন্তরিকতা দিদির বরাবরের সম্পদ। উনি যতটা সহজ সরল গরীব গুর্বোদের কাছে ঠিক ততটাই আপন সিনেমার পর্দার ওই উজ্জ্বল নামীদামী মানুষগুলোর কাছেও। দিদির এই সহজাত মাধুর্যের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে তাই বলিউডের বাদশারা এই উৎসবে যোগ দেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
আপনারা ভাবতে পারেন, এদের কাওকে টাকা পয়সা দিতে হয়না! এরা দিদির কথা ফেলতে পারেন না। প্রায় প্রতিবছর অমিতাভজী হাতজোড় করে দিদির কাছে অনুমতি চান পরেরবার যেন উনি আর না ডাকেন। দিদিও প্রতিবার সেই অনুরোধ এমনভাবে উড়িয়ে দেন যে উনি না এসে পারেন না। মাধুর্য্য এতটাই।
প্রতিবার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অমিতাভ বচ্চন যেভাবে ফিল্ম সম্পর্কে রীতিমত পড়াশোনা করে এসে বক্তব্য রাখেন তাতেই একটা বই করা যায়। ওই নিয়মিত আসছেন বলে দায়সারা দু-এক কথা বলতে হয় তা মোটেও নয়। শাহরুখ দিদির আশেপাশে যেরকম করে ঘোরে মনে হয় দিদি যেন ওঁর পাশের বাড়ির কেউ। জয়া, রাখী, শর্মিলা, মৌসুমীরা তো বাংলারই মেয়ে। কলকাতা এলে স্বাভাবিক একটা নাড়ীর টানে তাদের উচ্ছ্বাস তো এমনিতেই ঝরে পরে কিন্তু দিদির সঙ্গে ওদের কথাবার্তা যেন মা ঠাকুমাদের সঙ্গে গল্প করার মত। আবার রানী, কাজলরা দিদিকে যেভাবে পাশে নিয়ে ছবি তোলার জন্য অস্থির হয়, দেখে মনে হবে ওরাই যেন কোনো স্টারকে হঠাৎ সামনে দেখেছে। মহেশ ভাট, কমল হাসানরা আবার সসম্ভ্রমে দিদির সঙ্গে কথা বলেন। আর দিদি ছুটে ছুটে চারদিকে সবার খোঁজ খবর নিচ্ছেন…. এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!!
অতীতে আমরা সকলেই দেখেছি বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে কলকাতার আর্টিস্টদের চেনাজানার সূত্রটা তেমন ছিলোনা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটা জুড়ে দিয়েছেন। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমেই দিদি টলিউডের সব সিনেমা আর্টিস্টদের নিজে থেকে অমিতাভ-শাহরুখদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। এখন তো কলকাতার দেব, প্রসেনজিৎ, মিমি, নুসরত, জুনদের দেখলেই শাহরুখ, অমিতাভ চিনে নেন। এমনকি মঞ্চে বলিউড-টলিউডের আর্টিস্টদের একসাথেই বসার ব্যবস্থা থাকে।

একবার গ্রিনরুমে সন্ধ্যা মুখার্জী বসেছিলেন। দিদি সন্ধ্যাদির হাত ধরে টেনে পরিচয় করিয়েছেন অমিতাভ জয়ার সাথে। তেমনই সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মাধবীদি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত বাংলা সিনেমার দিকপাল আর্টিস্টদের অমিতাভ শাহরুখদের সঙ্গে কথা বলিয়ে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন। আর শুধু সিনেমা শিল্পীদেরই নয়….রাশিদ খান, দ্বিজেনদা, অজয় চক্রবর্তীর মত গায়ক যারা বাংলার গর্ব তাদের সঙ্গেও দিদি বলিউড তারকাদের একটা মেলবন্ধন জুড়ে দিয়েছেন।
কেউ মুম্বাইয়ের অনেক বড়ো মাপের অভিনেতা, আবার কেউ কলকাতার সাধারণ মানের নায়ক — কিন্তু এই উৎসবে দিদি সকলকেই ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। তাইতো শাহরুখ-এর মত স্টার প্রসেনজিৎ, আবীর, অরিন্দম শীলদের দেখেই নমস্কার করে হাত ধরার মতো দৃশ্য দেশের আর কোথাও দেখা সম্ভব?
আসলে রাজনীতির বাইরে দিদি এতটাই ঘরোয়া যে ওই অতো নামিদামি স্টারদের ওনার সঙ্গে সেলফি তোলার রীতিমত হিড়িক পড়ে। একজন মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষেত্রে এটা মোটেও কোনো সহজ ব্যাপার নয়। এই বাংলাতেও কয়েকটা মুখ্যমন্ত্রী আমিও দেখেছি তারা কেউই মাটির মানুষ ছিলেন না। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার বলতে কোনো বাধা নেই বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তো দূরের ব্যাপার দেশের কোনো মুখ্যমন্ত্রীই আমাদের দিদির মত এতো সহজভাবে মেলামেশা করতে পারেন না। তাদের মুখ্যমন্ত্রীসুলভ ভাবভঙ্গি রীতিমত চোখে পরে।
এই জায়গায় আমাদের মুখ্যমন্ত্রী একমাত্র ব্যতিক্রম। আমাকে যখন বলেন, “এটা তোল? আমাদের সকলের একটা গ্রুপ ফটো তুলে দে।”….আমার নিজেরই ওনাকে তখন মুখ্যমন্ত্রী মনে হয়না। একজন আর্টিস্টকে সামনে দেখলে আমার আপনার যেমন আনন্দে ছবি তুলতে ইচ্ছে হয়…. দিদিও ওমনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ছবি তুলে দিতে বলেন যখন ওনার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবকে দিদি সিনেমাপ্রেমীদের ও সিনেমাশিল্পীদের একটা মিলনমেলায় পরিনত করেছেন। সিনেমা তো তৈরি হয় মানুষের কথা ভেবে। মানুষই শিল্পীদের স্টার বানায়। স্বাভাবিক সেই স্টারদের সামনে থেকে দেখার আকাঙ্ক্ষা কার না হয়? ফলে নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের কাছে চলচ্চিত্র উৎসব করে দিদি যেন প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছেন।
চলচ্চিত্র উৎসব নিয়েও বিরোধীরা কটাক্ষ করেন বটে কিন্তু চৌত্রিশ বছর জমানায় আপনারা যাদের নিয়ে এসেছেন তাদের সঙ্গে শুধু শুষ্কং কাষ্টং ঘাড় গুঁজে তাত্বিক আলোচনা দেখে মনে হতো সিনেমা যেন কোনো সিরিয়াস বিষয়বস্তু। ওটা সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে!! তাই চলচ্চিত্র উৎসব হতো অনেকটা কলার উঁচিয়ে। বাম আমলে যেসব বোদ্ধারা এই উৎসবে আসতেন তাদের সাধারণ সিনেমাপ্রেমী লোকজন জীবনেও নাম শুনেছি কি সন্দেহ থাকতো। বলিউডের উপস্থিতি তো নৈব নৈব চ।
আমি জানি, আজও যারা সাহিত্য, ফিল্ম-এর সঙ্গে যুক্ত তারা অনেকটাই বামমনস্ক। আমার নিজেরও ছিলো। কিন্তু তারজন্য সিনেমা উৎসব গুরুগম্ভীর সাধারণ লোকজনের ধরাছোঁয়ার বাইরে হবে কেন এটা আমার মাথায় ঢুকতো না। দিদি কিন্তু ঠিক সেটাই আত্মধাবন করে মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি সিনেমার বার্ষিক উৎসবকে যেন দুয়ার খুলে দিয়ে নিয়ে এসেছেন নেতাজী ইনডোরে।
বামেরা চৌত্রিশ বছর ধরে গোটা বাংলায় রাজকীয়ভাবে থেকেও সহজ চিন্তার অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে বেঁচে থাকা মানুষের আনন্দের দোসর সামান্য সিনেমাকেও কিরকম যেন কুয়োর ব্যাঙ করে রেখেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখানেও আপনাদের দশ গোল দিয়েছেন। আসলে মানুষের মনের দুঃখ কষ্ট অসুবিধা শুধু নয় তাদের আনন্দের কারণগুলোও উনি অন্তর থেকে অনুভব করেন। তাই চলচ্চিত্র উৎসবের আমেজ এখন শুধু কলকাতা নয় গোটা বাংলার।
আমি জানি, এই লেখা পড়ে আপনারা আমাকে চটিচাটা, দালাল, চাকরি বাঁচানোর ধান্দা বলে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি মনের মধ্যে পুষে রাখা ক্ষোভ প্রকাশ করবেন। বাস্তবে আমি ওনার দলের কে কোথায় জেলে যাচ্ছে কি অন্য দলে, কে দুর্নীতি করেছে…. এসব নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু একজনকে দেখি যিনি তাঁর গভীর জীবনবোধের টুকরো টুকরো জুড়ে একজন স্নেহময়ী রূপে আমার আপনার বাড়ির একজনের মত হয়ে উঠেছেন। যা অমিতাভ, শাহরুখরাও অস্বীকার করতে পারেননা। আমিও সেই টানেই ওনার সঙ্গে আছি।

ফলে আপনারা আমাকে যাই বলুন তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ রাজনীতিই সবকথা বলে না। তাই আমি যেগুলো বলছি সেগুলো পড়তে হবে। শুনতে হবে। ভাবতেও হবে। কারণ অমিতাভ, শাহরুখের মত অভিনেতারা একটা ফোন পেয়েই যে কোনো মঞ্চে চলে আসার মত সহজলভ্য নয়। এদের এক একটা অনুষ্ঠানে আনতে কাঠখড় কিরকম পোড়াতে হয় তা যারা নিয়ে যায় তারা জানে। সেখানে একটা চলচ্চিত্র উৎসবে বিনা পারিশ্রমিকে বারবার আসা শুধুমাত্র ওই ছোটখাটো মানুষটি তাদের কাছে ভালোবাসার একটা জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন।
যাইহোক, এই ছবিওয়ালা প্রতিবছর এদের ছবি তোলে। আগে আগে চোখের ইশারায় টুকটাক কুশল বিনিময় এখন মুখের ভাষায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন চেনাজানা হয়ে যাবার ফলে দিদির মত ওনারাও ছবি তুলে দিতে বলেন। যে নায়ক নায়িকাদের আমিও ছোট থেকে বড়ো হবার সময় সিনেমায় দেখেছি আজ তাদের ছবি তুলছি, কথা বলছি….এটা সাধারণ দর্শকদের মত আমার কাছেও কম আনন্দের বিষয় নয়।
আজ তাই ছবিওয়ালার গল্পে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে নিলাম বাংলার বারো মাসের তেরো পার্বণের মধ্যে সিনেমা উৎসবও ধীরে ধীরে একটা পার্বণ হয়ে ওঠার কাহিনীচিত্র। যেটি একজন আদ্যন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অসাধারণ ভাবনার সুন্দর একটা আয়োজন। আমিও কতিপয় সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন যে ওই দৃশ্যগুলোকে বিনি সুতোর মালার মত গেঁথে রাখতে পারছি।
নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে বিগত এগারো বছর ধরে আমার তোলা কয়েকশো ছবির মধ্যে থেকে মাত্র কয়েকটি ছবি নিয়ে তৈরি এলব্যামটি ছুঁয়ে দেখার অনুরোধ করছি।
১৭ ডিসেম্বর ২০২২