স্বপ্ন না সত্যি! গায়ে চিমটি কেটেও বিশ্বাস হচ্ছে না, রঘুসর্দারবাড় জালপাই গ্রামের মৎস্যজীবীদের। ক’বছর আগেও যে যাদব মাঝি তাঁদের সঙ্গে নৌকায় করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেত সেই যাদব সুদূর কানাডা, আমেরিকায় পড়াশোনা, গবেষনা করে এখন ভারতের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইটির অন্যতম ধানবাদ আইআইটির প্রফেসর পদে যোগ দিতে চলেছে। প্রফেসর পদে যোগ নিয়োগ পত্র হাতে পেয়েছেন যাদব মাঝি। রঘুসর্দারবাড় জালপাই ও শৌলার দরিদ্র মৎস্যজীবী মানুষদের কাছে এ যেন এক আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের ছোঁয়া লাগার মতো ঘটনাই বটে।

স্কুলের এক অনুষ্ঠানে পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা শাসক পূর্ণেন্দু মাজি ও প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ইয়ের মাঝে ড.যাদব মাঝি।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি-১ ব্লকের রঘুসর্দারবাড় জালপাই গ্রামের দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবারের ছেলে যাদব মাঝি। স্থানীয় নয়াপুট সুধীরকুমার হাইস্কুল থেকে ২০০৮ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৮৬.২৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে স্টার পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলেও দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবারের ছেলে হওয়ার কারনে রুজি রোজগারের আশায় যাদব আর স্কুলমুখো না হয়ে গ্রামের মৎস্যজীবীদের সঙ্গে নৌকায় করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বঙ্গোপসাগরের কিনারে প্রত্যন্ত এলাকার নয়াপুট সুধীরকুমার হাইস্কুলে সেই সময় নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে বসন্তকুমার ঘোড়ই যোগ দেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে বসন্তবাবু লক্ষ্য করেন, স্কুলের ২০০৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের কলা বিভাগের একাদশ শ্রেণিতে মাত্র এগারোজন ছাত্রছাত্রী। বিজ্ঞান বিভাগ চালু করার অনুমোদন থাকলেও শুধুমাত্র কলা বিভাগ চলে। স্কুলের একাদশ শ্রেণিতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্কুলের সর্বোচ্চ নম্বর (৮৬.২৫%) পেয়ে প্রথম বিভাগে স্টার মার্কস নিয়ে পাশ করা ছেলে যাদব মাঝি একাদশ শ্রেণিতে অনুপস্থিত। এমনকি একাদশ শ্রেণিতেও ভর্তি হয়নি ছেলেটি। যাদব মাঝি নামে ছেলেটি মাধ্যমিকে স্কুলের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও কেন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়নি বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ইয়ের মনে কৌতুহল তৈরি হয়। খোঁজ নিতেই জানতে পারলেন নয়াপুট সুধীর কুমার হাইস্কুলের সহ-শিক্ষক সন্দীপ জানা’র গ্রামের পাশেই রঘুসর্দারবাড় জালপাই গ্রামে যাদবের বাড়ি। শোনামাত্রই সহ-শিক্ষক সন্দীপ জানাকে সঙ্গে নিয়ে মোটর সাইকেলে যাদব মাঝি বাড়ির উদ্দেশে ছুটলেন।

যাদবের কানাডা যাওয়ার মুহুর্তের স্কুলে বিদায় সম্বর্দ্ধনা
যাদবের বাড়ি গিয়ে যাদবের বাবা লঙ্কেশ্বর বাবুর মুখে শুনলেন, যাদব মাছ ধরতে গেছে আসতে দেরি হবে। প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ই যাদবের বাড়ির বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে করতে একসময় বারান্দায় পেতে রাখা তক্তোপোষের উপর বিছানো মাছ ধরার জালের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। স্কুলের সদ্য যোগ দেওয়া নতুন প্রধান শিক্ষকের এহেন ভূমিকায় যাদবের বাবা সহ বাড়ির লোকজনও কিছুটা বিস্মিত ও একই সঙ্গে আনন্দিত যে যাদবকে খুঁজতে স্বয়ং হেডমাস্টার বাড়িতে এসেছেন দেখে। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টার পর মাছ ধরে বাড়িতে এসে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিজের বাড়িতে দেখতে পেয়ে অবাক যাদব নিজেও।
তক্তোপোষের উপর বসেই প্রধান শিক্ষক বসন্তবাবু কথা বলেন যাদবের সঙ্গে। কথাবার্তার মধ্যেই বসন্তবাবু বুঝে যান যাদব শুধু মেধাবী নয়, ছাইচাপা আগুন। যাদবকে চাপ দিলেন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে। চাপ দিলেন পরিবারের লোকজনদের। যাদবের বাবা লঙ্কেশ্বর বাবু ও যাদব রাজি হতেই যাদব মাঝি-সহ আরও কয়েকজন ছাত্রছাত্রী নিয়ে নয়াপুট সুধীরকুমার হাইস্কুলে ২০০৮ সালেই প্রথম শুরু করলেন উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগের একাদশ শ্রেণি। সেই সময় স্কুলের ছাত্রাবাস ভাঙাচোরা অবস্থায় বন্ধ থাকায় ও যাদবের বাড়ির আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বসন্তবাবু যাদবকে কাঁথিতে নিজের বাড়িতেই নিয়ে আসেন। দু’বছর প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ইয়ের বাড়িতে থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান নিয়ে সুধীরকুমার হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন যাদব।

যাদবের কানাডা যাওয়ার মুহুর্তের স্কুলে বিদায় সম্বর্দ্ধনা
এরপর রামকৃষ্ণ মিশনের বেলুড় মঠ বিদ্যামন্দির থেকে রসায়নে বিএসসি ও মুম্বইয়ের আইআইটি থেকে মাস্টার্স করেন। ২০১৬ সালে কানাডার ক্যুইনস ইউনিভার্সিটি যাদবকে জৈব রসায়ন নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ দেয়। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার স্কুলের ছাত্রের উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশযাত্রার জন্য ওই বছরেই সুধীরকুমার হাইস্কুলের পক্ষ থেকে কাঁথি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের স্বামী রামময়ানন্দজী, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অশিক্ষক কর্মচারী ও স্কুলের ছাত্রীদের উপস্থিতিতে সংবর্ধিত করা হয়। কানাডার ক্যুইনস ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক্টরেট করেন জৈব রসায়ন নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এবার ভারতের ধানবাদ আইআইটি থেকে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেওয়ার নিয়োগ পত্র। সামনের সেপ্টেম্বর মাসেই আইআইটি ধানবাদের প্রফেসর হিসেবে যোগ দেবেন উপকূলের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র মৎস্যজীবী পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে ডা. যাদব মাঝি।

তখন অতিবর্ষনের জলে ডুবে যাওয়া স্কুল মাঠে লাগানো গাছ বাচাঁতে ব্যস্ত প্রধান শিক্ষক সাথে যাদব মাঝি।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ই বলেন, “যাদবের কৃতিত্বে আমরা গর্বিত।” ডা. যাদব মাঝি জানান, “মাধ্যমিকে পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেও অর্থের অভাবে পড়া বন্ধ-ই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্কুলের প্রধান শিক্ষক বসন্তকুমার ঘোড়ইয়ের বিশেষ সাহায্য আর অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাহায্যে এই কঠিন যাত্রা কিছুটা সহজ হয়েছিল। “ডা. যাদব আরও বলেন, “বসন্ত স্যার না থাকলে আজ আমি এই জায়গায় আসতেই পারতাম না। মৎস্যজীবী পরিবারের আর দশটা ছেলের মত পড়া ছেড়ে সমুদ্রে মাছ শিকারই করতাম।”
খুবই গর্বের বিষয়। এ যেন পাঙ্কে পদ্ম ফুল। এখোনো যে সরকারি বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে গবেষক অধ্যাপক গুণীজন হওয়া যায় তা এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ড. যাদব মাঝি স্যার।
অভিনন্দন যাদব মাঝিকে। আগুন কখনো
ছাই চাপা পড়ে থাকে না। অভিনন্দন প্রধান শিক্ষক বসন্ত ঘোড়ইকে। তিনি না হাত বাড়িয়ে দিলে যাদবের এই বিকাশ হয়তো সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ সাংবাদিক সুব্রত গুহাকে এরকম একটি নজির সৃষ্টিকারী ঘটনা তুলে ধরার জন্য।
Initially I pay my heartfelt congratulation to the ginius Jadab Majhi.I also convey thanks to the great teacher Basanta Babu.He created a history in his glorious job.Our society should learn from this instance.