দেশভাগের আগুন তখনও নেভেনি। বীরভূমের লাভপুরের কাছে কাঁদরকুলো আর বলরামপুর গ্রামে শুরু হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। একদল সশস্ত্র মানুষ এগিয়ে আসছিলেন গ্রাম আক্রমণের জন্যে। সেই উন্মত্ত দলটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন একজন ডাক্তার। গায়ে সাধারণ লুঙ্গি আর গেঞ্জি। সশস্ত্র মানুষগুলি তাঁকে দেখে বিস্মিত। ডাক্তারবাবু দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক কারণে আত্মগোপন করে ছিলেন। দাঙ্গার সম্ভাবনার কথা শুনেই তিনি ছুটে এসেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। আক্রমণকারী দলের তলোয়ারধারী পাণ্ডাটির হাত জড়িয়ে ধরেছিলেন পৈতে দিয়ে। বলেছিলেন: ‘এই ব্রাহ্মণ হত্যা না করে তোমাকে ঐ গ্রাম আক্রমণ করতে দেব না।’ দাঙ্গা থামিয়ে দিতে সফল হয়েছিলেন তিনি। এই একবারই নয়। আগে আরও একবার এইরকম সাম্প্রদায়িক হানাহানিকে উপস্থিত বুদ্ধির জোরে ছত্রভঙ্গ করে দিতে পেরেছিলেন কাজিপাড়া-লাঙ্গলহাটায়। তিনি ডাক্তার রাধানাথ চট্টরাজ (১৯০৮-৮৮)। শুধু এই দু-টিই নয়। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন আরও এক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা। পরাধীন ভারতবর্ষে, লাভপুরের নিকটবর্তী একটি গ্রাম কল্যাণপুরে শুরু হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। ডাক্তার হিসেবে আহত মোমিন সেখ ও ওসমান সেখের চিকিৎসা করেছিলেন রাধানাথ চট্টরাজ। ফেরার সময়ে তাঁর পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন কাজিপাড়ার অন্যতম মাতব্বর তোবারক হোসেন, বাঘা গ্রামের ভূপতি কুণ্ডু প্রমুখ। দাবি ছিল: ‘আমরা আপনাকে ৫০০ টাকা দিচ্ছি আপনি যেন পুলিশ চালানী কেসের Certificate দেবেন না’। নরম কথায় কাজ না-হওয়ায় শুরু হয়েছিল ভীতি প্রদর্শন। কোনো রকমে নিজেকে রক্ষা করে বাড়ি ফিরেছিলেন তরুণ ডাক্তার রাধানাথ। বাড়িতে বাবা বললেন: ‘. . . খবরদার ঘুস নিওনা। অসত্যের উপর ভিত্তি করে ডাক্তারখানা হবে না। তুমি ন্যায়ত এবং ধর্ম্মত যা দেখেছো তাই লিখবে।’ আজীবন নির্ভয়ে বাবার এই আদেশ শিরোধার্য করে পথ চলেছিলেন রাধানাথ।
রাধানাথ চট্টরাজের পৈতৃক ভিটে ছিল বীরভূমের লাভপুরের কাছে ঠিবা গ্রামে। আশপাশের মানুষজন বলেন ‘ঠিবে’। পাশেই কুয়ে নদী। কাঁদরের কুলে এই গ্রাম। বাবা নৃত্যগোপাল চট্টরাজ ছিলেন পরম বৈষ্ণব। আয় সামান্য। বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে টোলে সংস্কৃত পড়ে তাঁরই মতো গুরুগিরি করবে। রাধানাথ লিখেছেন: ‘বাবার ইচ্ছা ছিল আমি যেন সংস্কৃতর [য.] ভালো পণ্ডিত হয়ে ভাগবত পাঠ এবং আমাদের পৈত্রিক [য.] পেশা গুরুগিরি করি। আমার কিন্তু মোটেই সেই ইচ্ছা ছিল না।’ ‘রাধানাথ’ নামটির মধ্যেও আছে বৈষ্ণবতার সাক্ষ্য। শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ জিউ ছিলেন ঠিবায় প্রতিষ্ঠিত তাঁদের পারিবারিক বিগ্রহ। ১৯২৭-এ ম্যাট্রিক পাশ করে রাধানাথ গেলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়তে।
১৯৩৩-এ এলএমএফ পাশ করেছিলেন রাধানাথ চট্টরাজ। ছাত্র অবস্থাতেই ডাক্তার-শিক্ষক রমেশ চক্রবর্তীর সহায়ক হিসেবে শিখেছিলেন অপারেশনের খুঁটিনাটি। অধ্যাপক রমেশ চক্রবর্তী রাধানাথকে বলেছিলেন: ‘ভবিষ্যতে তুমি একজন ভাল সার্জেন হবে। ভবিষ্যত উজ্জ্বল। গাঁয়ে খামোকা কুইনিন মিক্সচার, এলকালী মিক্সচার দেবে। এত ভাল operation যে সব তুমি শিখলে সব ভুলে যাবে।’ সেখানেই আর-এক শিক্ষক অবনী ভট্টাচার্য বলেছিলেন: ‘না সরকারী চাকরী করতে হবে না। গ্রামে চলে যাও। শহরে এ-টিমের লাইন্সম্যান হওয়ার চেয়ে গ্রামের সি-টিমের ক্যাপ্টেনি করগা। . . . গ্রামীণ গরিবরা বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পাচ্ছেনা। তোমাদের মতো আত্মভোলা ডাক্তারদের গ্রামই হল আদর্শ স্থান। টাকার পেছনে ছুটবেনা।’ স্বপ্নের হাতছানিকে উপেক্ষা করে রাধানাথ ফিরে এসেছিলেন গ্রামে। বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন পথে যাবেন তিনি। বাবা বললেন: ‘ আমি তোমাকে খুব কষ্ট করে পড়িয়েছি। গ্রামেই বস। গরিবরা সুচিকিৎসা পায়না। গরিবদের প্রতি দৃষ্টি রেখে কাজ করবে। তোমার অন্নকষ্ট হবে না। যেন কদাচ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হবে না।’ তরুণ রাধানাথ বাবার আদেশকে শিরোধার্য করেছিলেন। না, নিরন্ন মানুষদের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে তাঁর ঘরে অন্নের অভাব ঘোচেনি। ১৯৮০-৮১ খ্রিস্টাব্দে ‘আত্মস্মৃতি’ বইটির শেষে তিনি জানিয়েছিলেন: ‘দারিদ্র আমার চিরসাথী হয়েছে’। রাধানাথের সুপুত্র অমিয় চট্টরাজ লিখেছেন: ‘১৯৮৮-র ২০শে ডিসেম্বর, প্রথম পৌষের পড়ন্ত বেলায় একঘন্টা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা কষে এক রকম বিনা চিকিৎসায় দেহ রাখলেন বাবা [য.]।’
রাধানাথের উদ্যোগেই ১৯৩০-এ ঠিবা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পোস্ট অফিস। গ্রাম থেকে বাইরে যাবার কোনো রাস্তা ছিল না। সংঘর্ষের পথেই ১৯৩৫-এ ঠিবা-বাঘসিনা সড়কটি তৈরি হয়েছিল তাঁর প্রচেষ্টায়। আবাদি জমির উপর দিয়ে তৈরি হয়েছিল রাস্তা। তার মধ্যে ছিলেন অল্প কিছু সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। রাস্তা তৈরি হওয়ার জন্যে জমি দিয়েছিলেন বহু সাধারণ মানুষ। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তাঁরাই। আত্মজীবনীর পাতা থেকে আপনাদের শোনাই সে-কাহিনি: ‘কাজ চলছে, এমন সময় বন্দুকের আওয়াজ। রামঘাটি থেকে কিছু লোক লাঠিয়াল আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। লেগে গেল মারামারি। . . . পালটা আক্রমণের জন্য রামঘাটির লাঠিয়াল নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অনেক আহত হয়ে ছুটে পালাচ্ছে। আমি সেই মারমুখি জনতাকে বললাম রাস্তার কাজ শেষ না করে কারও পালানো হবে না। সেই কাজ হলো।’ বিধায়ক-ডাক্তার রাধানাথ চট্টরাজের আগ্রহেই গড়ে উঠেছিল ঠিবা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। তাঁর আজীবনের স্বপ্ন ছিল কুয়ে নদীর মোহানা সংস্কার করা। তা হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৩-তে প্রতিষ্ঠিত লাভপুর কলেজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর পরেই। ১৯৬৯-এ সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার কথা ভেবে লাভপুরের কাছেই মোনা চিতুরা গ্রামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রাধানাথ চট্টরাজ। লেনিনের জন্মশতবর্ষে প্রতিষ্ঠা বলে নাম রেখেছিলেন লেনিন সেন্টিনারি কলেজ। মোনা চিতুরা গ্রামের নিঃসন্তান বিধবা শ্যামমোহিনী দেবী নিঃশর্তে দান করেছিলেন পনেরো বিঘা জমি। সানন্দে সম্মতি জানিয়েছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। সাধারণ মানুষের নিরন্তর পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল ছয়টি কক্ষ বিশিষ্ট একশো কুড়ি ফুট লম্বা একটি পাকা বিল্ডিং। শুরু হয়ে গিয়েছিল পঠনপাঠনও। কিন্তু রাজনীতির সংকীর্ণ আবর্তে লেনিন সেন্টিনারি কলেজের স্বপ্ন বিনষ্ট হয়েছিল দ্রুত।
১৯৪৯-এ প্রায় এগারো মাস রাধানাথ চট্টরাজ আত্মগোপন করে ছিলেন রাজনৈতিক কারণে। ১৯৬৫-র জানুয়ারি থেকে ১৯৬৬-র জুন পর্যন্ত ভারত রক্ষা আইনে বিনা বিচারে তাঁকে জেলে থাকতে হয়েছিল। ১৯৫৭ এবং ১৯৬২-র সাধারণ নির্বাচনে বীরভূমের লাভপুর কেন্দ্র থেকে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এ যুক্তফ্রন্টের সময়েও বিধায়ক ছিলেন তিনি। বীরভূমে অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রান্তিক কৃষকদের জীবনসংগ্রামকে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশভাগের আগে-পরে চার দশক জুড়ে। উত্তরপ্রজন্ম তাঁর কথা আর কতটুকুই-বা মনে রেখেছেন!
রাধানাথ চট্টরাজের কথা প্রথম পড়েছিলাম রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায়। রাঘব পড়েছিলেন রাধানাথের আত্মজীবনীর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। ‘আত্মস্মৃতি’ নামে ২০১৪-র ডিসেম্বরে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল পারিবারিক উদ্যোগে। গত শতকের সাতের দশকের শেষে ‘বারোমাস’ পত্রিকায় প্রকাশিত রাধানাথের ‘রাঢ় বাংলার বন্যা’ নিবন্ধটি সুধী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ-লেখা পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল দুবরাজপুরের ‘চণ্ডীদাস’ পত্রিকায়। ‘আত্মস্মৃতি’ গ্রন্থের শেষে প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছে। ২০১৮-র গোড়ায় ‘চণ্ডীদাস’ পত্রিকার জয়দেব মেলা সংখ্যায় ‘আত্মস্মৃতি’ বইটির কথা লিখেছিলেন অধ্যাপক অনির্বাণ বিশ্বাস। রাঢ় বাংলার দামোদর-অজয়-ময়ূরাক্ষী-কংসাবতীর পাশাপাশি আছে দ্বারকা-ব্রাহ্মণী-বক্রেশ্বর-কোপাই-পাগলা বাঁশলই। ১৯৫৬ এবং ১৯৭৮-এর প্রলয়ঙ্করী বন্যায় পীড়িত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দরদি ডাক্তার রাধানাথ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন ‘বন্যার কারণ’, ‘রাঢ়ভূমির নদীপ্রকল্প’, ‘উত্তর রাঢ়ে নদী-সমস্যা’, জলাধার নির্মাণের সমস্যা প্রভৃতি বিষয়গুলি নিয়ে। রাঢ় বাংলায় বন্যার কবল থেকে জনজীবনকে রক্ষা করতে হলে কী কী কার্যক্রম জরুরি, তার একটা সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছিলেন এই প্রবন্ধে। তারপরেও কেটে গেল চারটি দশক। আমরা সে-সব দিকে কর্ণপাত করলাম না বিশেষ। এমনকী, বীরভূমচর্চার বিস্তৃত পরিসরে রাধানাথ চট্টরাজের এই প্রবন্ধটিও রয়ে গেল অনুল্লেখের অন্ধকারে। বিস্মরণই কি তবে আমাদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার?
ঋণ: রাধানাথ চট্টরাজ, ‘আত্মস্মৃতি’, বোলপুর: প্রকাশক অমিয় চট্টরাজ, প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০১৪। উদ্ধৃতির বানান অপরিবর্তিত আছে।
রাধানাথ চট্টরাজ মহাশয বীরভুম জেলায় যাঁরা সি পি আই বা অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তুলেছিলেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বোলপুর কলেজ