| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

এক ঐতিহাসিক বিবাহ, তোসিকো! তুমি সত্যিই সুখী

Reporter
পেজ ফোর, বিশেষ প্রতিনিধি / ৩৩৪ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৫ আগস্ট, ২০২২

যে বিবাহের কথা বলতে যাচ্ছি, সেটি এক অভিনব ঐতিহাসিক বিবাহ। জাপানে এক ভারতীয়র সঙ্গে এক জাপানি কন্যার বিবাহ। অথচ বিবাহটা একেবারেই প্রেমঘটিত নয়। আর ভারতীয় ভদ্রলোক পুরোপুরি বাঙালি। বিবাহে পৌরোহিত্য করেছেন মিস্টার মিত্‌সুরু টোয়েমা, যিনি প্রিন্স টোয়েমা নামে বেশি পরিচিত ছিলেন জাপানে। বিবাহ সভায় উপস্থিত ছিলেন হেরম্বলাল গুপ্ত। যিনি যশোরের প্রখ্যাত পণ্ডিত বিদ্যারত্ন মহাশয় উমেশচন্দ্রের পুত্র। ভাই ভগবান সিং গিয়ানি, এককালের গদর পার্টির কর্মসচিব এবং লালা লাজপৎ রায়ের ব্যক্তিগত সচিব কেশোরাম সবরওয়াল। আর উপস্থিত ছিলেন প্রিন্স টোয়েমার একান্তভাবে বিশ্বস্ত ও অনুগত শিষ্য মি. আজু সোমা এবং মিসেস কোকো সোমা, পাত্রীর বাবা এবং মা।

বিবাহটি ছিল একান্তভাবেই প্রয়োজনের তাগিদে। পাত্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিবিপ্লবী রাসবিহারী বসু, পাত্রী কুড়ি বছরের জাপানি কন্যা তোসিকো সোমা। ভারতের অগ্নিযুগের সেই ১৯১৫ সাল। মাতৃভূমি ভারতবর্ষ ত্যাগ করে ১২ মে রাসবিহারী বসু এস এস সানুকিমারু নামের জাপানিগামী একটি জাহাজে উঠে বসলেন। তাঁর জাপানে পৌঁছানোর সঠিক তারিখটি অবশ্য জানা যায়নি। মোটামুটি ভাবে বলা যেতে পারে ওই সালের জুন মাসে তিনি কোবে এসেছিলেন। ১৯১৫ সালের আগস্ট মাসে লালা লাজপৎ রায়ের ব্যক্তিগত সচিব কেশোরাম সবরওয়াল টোকিওতে রাসবিহারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তখন তিনি (রাসবিহারী) পি এন ঠাকুরের ছদ্মবেশে টোকিওতে বসবাস করছিলেন। জাপানে তাঁর অজ্ঞাত বসবাসের জন্য আর্থিক সাহায্য ছিল সম্ভবত অনুশীলন সমিতির।

তবু তাঁর মন ভারাক্রান্ত। কেমন করে তিনি জাপানে দীর্ঘ সময় অজ্ঞাত জীবনযাপন করবেন! কেমন করে তিনি ভারতীয় বিপ্লবীদের বিদেশ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র পাঠিয়ে সাহায্য করবেন? সিডিসন কমিটির রিপোর্টে জানা যায় তিনি কিছুদিন নেলসন নামের এক জার্মানির বাড়িতেও বসবাস করেছিলেন। ঠিকানা ছিল ২২ ইয়াংটেসিপু রোড, সাংহাই। এক সময় এক নৌকাতে সাংহাইয়ের পুলিশ দুই চীনাকে ২২৯টি পিস্তল এবং ২০ হাজার ৮৩০টি কার্তুজ সমেত গ্রেপ্তার করে। সেই তদন্তেই ধরা পড়ে রাসবিহারীর ওই ঠিকানা। ওই ঠিকানা পাওয়া গিয়েছিল বিপ্লবী অবনী মুখার্জির নোটবুকেও যখন তিনি সিঙ্গাপুরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

তবে তিনি সাংহাই থেকে ঠিক কবে যে জাপানে ফিরে এসেছিলেন তা বলা যায় না। ক্ষিতিশচন্দ্র দাসের একটা লেখা থেকে জানতে পারা যায় যে ১৯১৫ সালের ২৭ নভেম্বর লালা লাজপৎ রায়, রাসবিহারী বসু এবং হেরম্ব গুপ্ত জাপানের কোয়েটোতে একটি প্রকাশ্য সভা অনুষ্ঠিত করেন। এই সভার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ধনতান্ত্রিক গ্রেট-ব্রটেন কেমন করে ভারতের উপর শোষণ চালাচ্ছে তা জনগণকে অবহিত করা। এই মিটিংয়ের পর জাপানে অধিষ্ঠিত ব্রিটিশ কূটনৈতিক পি এন ঠাকুর সম্বন্ধে সজাগ হয়। যদিও এই মিটিংয়ের সময়ের ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ দেখা যায়। তবে শ্রীমতী কোকো সোমার লেখা থেকে এটুকু পরিষ্কার জানা যায় যে ২৮ নভেম্বর রাসবিহারীকে জাপানে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ রাজের হাতে সমর্পণ করার একটি গ্রেপ্তারী পরোয়ানার খসড়া প্রস্তুত ছিল।

ভাই ভগবান সিং রাসবিহারীকে আধুনিক চীনের প্রখ্যাত স্থপতি ডক্টর সান্‌ ইয়েত সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করান। এই সুবাদেই পরিচয় হয় প্রিন্স টোয়েমার সঙ্গে। যেহেতু সান্ ইয়েত সেন প্রিন্স টোয়েমার প্রাসাদেই বসবাস করছিলেন। আর এই প্রিন্স টোয়েমাই পরে হয়েছিলেন জাপানে রাসবিহারী বসুর একান্তভাবেই জীবন রক্ষাকর্তা।

দুয়ারে মৃত্যুর ঘন্টা বাজছে। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মারকুইস ওকামা ব্রিটিশ রাজের চাপের কাছে মাথা নত করেছিলেন। তিনি জাপানে বসবাসকারী অবাঞ্ছিত ভারতীয় লালা লাজপৎ রায়, রাসবিহারী বসু এবং হেরম্ব গুপ্তকে জাপানে গ্রেপ্তার করে ভারতে ব্রিটিশরাজের হাতে সমর্পণ করতে বদ্ধপরিকর হন। আর ভারতে ব্রিটিশরাজও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এঁদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য। লালাজি কোনওমতে আমেরিকাতে পালিয়ে বাঁচেন। প্রিন্স টোয়েমা বাকি দুজন মৃত্যুপথযাত্রী ভারতীয় বিপ্লবীকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসেন। প্রিন্স টোয়েমার একান্ত অনুগত শিষ্য মিস্টার এবং মিসেস সোমা তাঁদের একাধারে বেকারী ও বাসভবনে আশ্রয় দিলেন দুই ভারতীয়কে। ১৯১৫ সালের ২৮ অক্টোবর রাতের অন্ধকারে অতি গোপনে তাঁরা বেকারীতে এসে উঠলেন। পরের দিন জাপান নিউজ পেপার ঘোষণা করল রাসবিহারী ও তাঁর বন্ধুর অন্তর্ধানের কথা।

টোকিওর প্রাণকেন্দ্রে প্রিন্স টোয়েমার বাসভবন। রাসবিহারী টোয়েমার টুপি এবং কিমানো (জাপানি পোশাক) আর হেরম্ব গুপ্ত মিস্টার তাকুদার (জাপানের জাতীয় আন্দোলনের নেতা) একটি লম্বা ওবারকোট পরে বাগানের পেছনের দরজা দিয়ে টোয়েমার বাসভবনে আসতেন। আলাপ-আলোচনার পরে অতি সন্তর্পণে একইভাবে বিদায় নিতেন। প্রিন্স টোয়েমার বাসভবনের চারপাশে থাকত জাপানি পুলিশের দল। ইউনিফর্ম পরিহিত ও সাধারণ পোশাকের গোয়েন্দারা সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত রাসবিহারীর জন্য ওত পেতে থাকত। তাবে তাদের নিরাশ হতে হতো। দুটি ভারতীয় বিপ্লবীর জীবন রক্ষা করার জন্য প্রিন্স টোয়েমা এবং তাঁর অনুগতরা কত যে বিপদের ঝুঁকি নিতেন তা সহজেই অনুমেয়। তাঁদের নিজেদের কোনও স্বার্থ ছিল না শুধু মহৎ কাজের জন্য নিবেদিত দুটি প্রাণ রক্ষা করাই ছিল তাঁদের কাম্য।

তখন জাপান সরকারের নজর ছিল ব্রিটিশ সরকারের মনোরঞ্জন করার দিকে। তাই জাপান সরকারের উদ্দেশ্য ছিল যেন-তেন প্রকারে তাঁদের গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে ব্রিটিশ রাজের মনতুষ্টি করা। তাই যদি টোয়েমা এবং সোমা পরিবার ধরা পড়তেন তবে তাঁরা দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হতেন। তাঁরা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যেতেন। তবু তাঁরা ন্যায়ের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি। ভারত এই জাপানিদের অবদান কোনদিন ভুলবে না।

আজু সোমা তাঁর বেকারীর লোকজনদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন এবং তাঁদের সহযোগিতা প্রার্থনা করতেন। বেকারীর লোকেরাও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। তাঁরা ঠিক করেছিলেন তাঁরা তাঁদের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তাঁদের প্রভুর অতিথিকে অর্থাৎ দুই ভারতীয় বিপ্লবীকে রক্ষা করবেন। আর রাসবিহারী তো শ্রীমতী কোকো সোমাকে ‘মা’ বলেই অভিহিত করতেন।

তবুও বিপদ এলো। জাপানি পুলিশ হানা দিল বেকারীতে। সন্ধান চলল। কিন্তু বিফল হলো কারণ তখন দুই ভারতীয় বিপ্লবী বেকারী থেকে স্থান পেয়েছেন সোজাসুজি জাপানি পরিবারের অন্দরমহলে অর্থাৎ শ্রীমতী সোমার বাসভবনে। সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হলো এভাবে। ঘটল একটি আশাতীত ঘটনা। ১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসে একটি ব্রিটিশ যুদ্ধ জাহাজ একটি হংকংগামী জাপানি স্টিমারে হানা দিল এবং ছয়জন জাপানিকে ধরে নিয়ে গেল। এই ঘটনায় জাপানিরা ব্রিটিশ আক্রমণে ফেটে পড়ল। ভয়ানক আন্দোলন শুরু হলো ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ভারতীয় বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা নাকচ হলো। কিন্তু তখনও রাসবিহারীর পক্ষে প্রকাশ্যে আসা নিরাপদ ছিল না। সাময়িকভাবে বিপদ কাটলেও ব্রিটিশ কূটনৈতিক নতুনভাবে জাপান সরকারকে চাপ দিতে লাগল যাতে রাসবিহারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানার পুনরায় আদেশ জারি হয়। তাই রাসবিহারীকে মিস্টার সোমার আশ্রয় থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আজু সোমা সবসময়ই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। নজর দিতেন তাঁর সুবিধা-অসুবিধা এবং নিরাপত্তার দিকে। যদিও তিনি অধিকাংশ সময়েই থাকতেন ছদ্মবেশে। এই অবস্থআর পরিপ্রেক্ষিতে প্রিন্স টোয়েমা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি চিন্তা করে দেখলেন এই ভারতীয় বিপ্লবীকে বিপদমুক্ত করার একটি পথই খোলা আছে এবং তা হলো রাসবিহারীকে জাপানের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করিয়ে নেওয়া। একমাত্র তাহলেই তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশিকে গেপ্তার করে স্বদেশি সরকার অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কাছে সমর্পণ করার পরিপ্রেক্ষিতে যে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা তা নাকচ করা সম্ভবপর হবে। কিন্তু নাগরিক অধিকার পেতে হলে তাঁকে তিনটি শর্ত মানতে হবে। প্রথম শর্তে একটি জাপানি কন্যার পাণিগ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয় শর্তে জাপানি ভাষায় যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করতে হবে এবং তৃতীয় একটানা জাপানে সাত বৎসর বসবাস করতে হবে। প্রিন্স টোয়েমা তাঁর প্রস্তাবটি আজু সোমাকে বললেন এবং এও জানালেন যে তাঁর কন্যা কুমারী তোসিকো রাসবিহারীকে বিবাহের জন্য মনোনয়ন করতে পারে।

শ্রীমতী কোকো সোমা (তোসিকার মা) এক প্রবন্ধে লিখেছেন : ‘এই অভাবনীয় সিদ্ধান্তে প্রথমে আমরা খুবই মুষড়ে পড়লাম। আমরা রাসবিহারীকে আমাদের পুত্রের মতন ভালবাসতাম ঠিকই কিন্তু তোসিকোর সঙ্গে তাঁর বিবাহ ছিল অকল্পনীয়। আমরা স্বপ্নেও তা কখনও ভাবতাম না। … তবে এটাও অনুভব করেছিলাম যে এছাড়া আর পথ নেই। রাসবিহারীর উপর ব্রিটিশ অ্যামব্যাসির নজর প্রখর থেকে প্রখরতর হচ্ছিল। তিনি ঘোরতর বিপদে ছিলেন। … অবশেষে আমি টোয়েমার সিদ্ধান্ত নিয়ে তোসিকোর সঙ্গে কথা বললাম। ‘তোসিকো ! তুমি কি বোসকে (রাসবিহারী) রক্ষা করতে পার ? এটা তোমার কাছে একটা বিরাট মহৎ প্রেরণার বিষয়। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, যে এ কাজ পারে।’ তোসিকোর উত্তর, ‘আমাকে এ ব্যাপারে চিন্তা করার সময় দাও।’

… একমাস পার হয়ে গেল।… আমি তোসিকোকে আমার ঘরে ডাকলাম। তার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলাম। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে সাগ্রহে তার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সে কি তার স্বাধীন ইচ্ছাকে উপেক্ষা করতে পারবে ? আমি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবু অপেক্ষা করতে লাগলাম তার উত্তরের জন্য। … খুব দৃঢ়তার সঙ্গে সে উত্তর দিল — ‘মা’ অনুগ্রহ করে আমাকে মিস্টার বোসের কাছে যাওয়ার অনুমতি দাও এবং আমি তাঁকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।’ … আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম তার এই মহৎ উদ্দেশ্যে। আমার দু চোখ বাষ্পাচ্ছন্ন হলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি জানো এ বিয়ে আনন্দের বিয়ে নয়। সত্যিই, তুমি মিস্টার বোসের সঙ্গে নিজেকে মিলেয়ে দিতে পারবে ? সত্যিই, তুমি কি যে কোনও মূল্যে মিস্টার বোসকে রক্ষা করতে পারবে ?’ আমি প্রকৃত পরিস্থিতি তার কাছে বারংবার বাখ্যা করলাম সে ছিল তাঁর সংকল্পে অটল।”

এইবার কথা হলো রাসবিহারী কিভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন ! কেউ জানে না তিনি এখনও পর্যন্ত অবিবাহিত আছেন কিনা ! বিশেষ করে এটাও জানা আছে যে ভারতীয় ছেলে মেয়েদের যৌবন আসার আগেই বিবাহ হয়ে যায়। শ্রীমতী সোমা যখন প্রিন্স টোয়েমার সিদ্ধান্তের কথা রাসবিহারীকে জানালেন এবং তাঁর মতামত জানতে চাইলেন তখন তাঁর উত্তর ছিল — ‘আমি বিবাহিত নই। আমি পনের বৎসর বয়সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি আমার জীবন ভারতের স্বাধীনতা লাভের জন্য উৎসর্গ করব। আমি কখনও বিয়ের কথা চিন্তা করি না। … আজ কেমন করে বিবাহিত জীবনের কামনা করি ? তবে এটা যদি মিস্টার টোয়েমা এবং কুমারী তোসিকোর ইচ্ছা হয়, আমি তা অবশ্যই মেনে নেব।’ সুতরাং বিয়ের সানাই বেজে উঠল। সে ঐতিহাসিক অভিনব বিবাহ। স্বয়ং প্রিন্স টোয়েমার পৌরোহিত্যে বিবাহ হয়ে গেল রাসবিহারী-তোসিকোর। তবে বিয়ের পরেই রাসবিহারী প্রকাশ্যে আসেননি। কারণ তখনও শর্ত অনুযায়ী তাঁর জাপানে একটানা সাত বৎসর জাপানে একটানা বসবাস সম্পূর্ণ হয়নি। তাঁর আট বৎসরের বিবাহিত জীবনে তাঁকে সতের বার বাসা বদল করতে হয়েছিল। তাঁদের একটি কন্যা সন্তান কুমারী তেতসুকু বসু এবং একটি পুত্র সন্তান মাস্টার মাশাহিদাবা অশোক বসু জন্মগ্রহণ করে। তাঁর জাপানি ভাষা শিক্ষাও চলতে থাকে। ১৯২৩ সালে রাসবিহারী জাপানের নাগরিক অধিকার লাভ করেন এর এক বছর বাদে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তোসিকো মারা যান। মেয়ের মৃত্যুর প্রায় দশ বছর বাদে মিস্টার সোমা জামাই রাসবিহারীকে একবার বলেছিলেন তাঁর দ্বিতীয়বার বিবাহের কথা। রাসবিহারী বসু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন : ‘তোসিকোর ভালবাসা আবার খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এরকম চিন্তা করাও আমার কাছে যন্ত্রণাদায়ক। তোসিকো সবসময় আমার সঙ্গেই আছে যেমন সে আমার আট বৎসরের অজ্ঞাত অথচ আনন্দময় বিবাহিত জীবনে ছিল। তাছাড়া আমার জন্মভূমিকে উৎসর্গ করা হয়ে গেছে।’

শ্রীমতী সোমা তাঁর স্মৃতির আলোয় বেঁচে থাকা তাঁর মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন : ‘তোসিকো! তুমি সত্যিই সুখী, কারণ তুমি একটা বৃহৎ মাপের মানুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছিলে।’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev