যতদূর জানা যায়, সপ্তম-অষ্টম শতকে খেলার মাঠে টিম স্পিরিট নিয়ে আসার জন্য র্যাগিং শুরু হয়েছিল। ইউরোপে শুরু হয়েছিল অষ্টম শতকের মাঝামাঝি। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ১৮২৮-১৮৪৫ সাল পর্যন্ত র্যাগিং উইক ছিল। বিশেষ করে ছাত্র সংস্থা পাই, আলফা, বিটা, কাপ্পা এই র্যাগিং সপ্তাহের প্রচলন ঘটাতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় ইউরোপ-আমেরিকায় শুরু হলেও বর্তমানে আমাদের এই উপমহাদেশেই র্যাগিং চর্চা বেশি। এবং যা এদেশে চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। প্রতিবছর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছোট-বড় র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেই থাকে। প্রকাশ্যে আসে না বলেই সেগুলি আমাদের অজানা থেকে যায়। আর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে সদ্য কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা পড়ুয়াদের উপর। কেউ কেউ আবার র্যাগিং মেনেও নিতে শিখে যায়। তার চেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, কারো কারো কাছে র্যাগিং স্বাভাবিক ঘটনা মনে হওয়ায়, পরের বছর সিনিয়র হওয়ার পর তারা নিজেরাই জুনিয়রদেরকে র্যাগিং করতে শুরু করে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলিতে র্যাগিংকে বলা হয় ‘হেজিং’, ফ্রান্সে ‘বিজুটাহে’, পর্তুগালে ‘প্রায়ে’, অস্ট্রেলিয়ায় ‘বাস্টার্ডাইজেশন’ ইত্যাদি।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম বা অষ্টম শতক থেকেই র্যাগিং গ্রিক সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে দেশের কোনো খেলার দলে নতুন খেলোয়াড় এলে, তার মধ্যে কতটুকু একতা রয়েছে তা ঝালাই করে নিতে, এবং তার মধ্যে ‘টিম স্পিরিট’-এর বীজ বপন করে দিতে, সিনিয়াররা তার নানা পরীক্ষা নিত, তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি যাচাই করত। সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে র্যাগিং-এর অনেক পরিবর্তন ঘটে। একটা সময় সৈন্যদলগুলিতে র্যাগিং হত। মনে করা হয় সেখান থেকেই র্যাগিং শিক্ষাক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর দিকে র্যাগিংয়ের নামকরণ করা হতো বিভিন্ন গ্রিক বর্ণ, যেমন- আলফা, ফি, বিটা, কাপা, এপসাইলন, ডেল্টা প্রভৃতি নামানুসারে। তখন র্যাগকে বলা হতো গ্রিক লেটার অর্গানাইজেশন বা ফ্র্যাটার্নিটি। শুরুর দিকের র্যাগিংয়ের প্লেজেসদেরকে কেবল কিছু সাহসিকতা, শারীরিক সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা নিয়েই ছেড়ে দেওয়া হতো। কিন্তু পরবর্তীতে সিনিয়ারদের সঙ্গে জুনিয়ারদের সম্পর্ক তৈরি করার উপায়টি প্রাণঘাতি রূপ পায়।
র্যাগিংয়ের প্রথম বলি হন মর্টিমার লেগেট। ১৮৭৩ সালে নিউ ইয়র্কের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে র্যাগিংয়ের জন্য কাপা আলফা ফ্র্যাটার্নিটিতে আনা হয়। এক রাতে, সেই ফ্র্যাটার্নিটিতে তাঁর চোখ বেঁধে দেওয়া হয়, তারপর তাঁকে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁকে রাস্তা চিনে ফিরে আসতে বলা হয়। নিয়ম অনুযায়ী রাস্তায় ফ্র্যাটার্নিটির অন্য দু’জন জুনিয়ারের সঙ্গে তাঁর দেখা হবে এবং তাঁরা চোখ খুলে দেবেন। হলোও তাই, এরপর তাঁরা তিনজন মিলে একটি ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করেন, কিন্তু তাঁরা খুব ভুল করে ফেলেছিল, যেটিকে তারা ঢাল মনে করেছিল, সেটি আসলে ছিল ৩৭ ফুট উচ্চতার খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল। দু’জন জুনিয়ার নিজেদের সামলে নিলেও মর্টিমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একদম নিচে গিয়ে পড়ে যান। শক্ত পাথরের উপর পড়ে তার শরীরটা পুরোপুরি থেতলে যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর র্যাগিঙের ধরণ ধারণে অনেক পরিবর্তন ঘটে আগের থেকে আরও ভয়াবহ ও নৃশংস হয়ে ওঠে। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অনেকেই সৈন্যদলে নাম লিখিয়েছিলন, যেখানে তারা অনেক কঠিন রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে যখন তারা বাড়ি ফিরে এসে আবার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এলেন, তখন তাঁরা সৈন্যদলে শেখা রীতিনীতিগুলিকেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করলেন। ফলে র্যাগিং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ হয়ে উঠলো। যদিও যুদ্ধ চলাকালীন সৈন্যদলে যেসব রীতিনীতি মানতে হতো, সেগুলির কারণ ছিল সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা, কঠিন কোনো মিশনে যাওয়ার জন্য তারা উপযুক্ত কি না তা যাচাই করা। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ওই সব রীতিনীতি এল তখন সেগুলি হয়ে উঠলো যথেচ্ছ ব্যবহার।
আমাদের দেশে প্রথমে সৈন্যদলে পরে ইংরেজি স্কুলগুলিতে র্যাগিং আসে। র্যাগিং ভয়াবহ রূপ ধারণ করে স্বাধীনতারও অনেক পরে। এমনকি গত শতাব্দীর ৬০’র দশকের শেষ ভাগ পর্যন্তও র্যাগিং বিরাট কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যার সূচনা ঘটল উচ্চশিক্ষার দ্বার সমাজের সর্বস্তরের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে। গত শতকের শেষে শিক্ষার্থীরাই র্যাগিংকে সংস্কৃতি এবং ভয়াবহ রূপে নিয়ে আসে। কেউ কেউ ক্লাস-পরীক্ষা ইত্যাদির পরোয়া করত না, অন্যদেরকেও তেমনটা ভাবার চেষ্টা করাতো। অন্য আর সবকিছুর চেয়ে, র্যাগিংয়ের মাধ্যমে জুনিয়রদেরকে ‘ভদ্রতা শেখানো’-ই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখনও যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং নিয়ে বেশি মাতামাতি করে, তাদের মানসিকতাও ঠিক একই রকম। র্যাগিঙ্গের জন্য ক্ষয়িষ্ণু ছাত্র রাজনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময়েই র্যাগিংয়ের নেতৃত্বে শুধু সিনিয়ররা নয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনেরও হাত থাকে। যে কারণে র্যাগিং প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।