সত্যজিৎ রায়ের বরাবরই আকর্ষণ ছিল বাঘের প্রতি বলা যেতে পারে এ এক অন্যরকম মুগ্ধতা। ছোটবয়সে তাঁর খাতায় একবার এক রঙিন বাঘের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী নন্দলাল বসু। সেই বাঘকেই সত্যজিৎ রায় তাঁর গল্পের অলংকরণে, কখনো বইয়ের প্রচ্ছদে কখনও বা বিজ্ঞাপনে জীবনের নানা সৃষ্টিতে বহুভাবে ব্যবহার করেছেন। অভিনেতা রবি ঘোষের কথায়, জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন “হীরক রাজার দেশে” বাঘের সঙ্গে শুটিংয়ের সময়। আর এখানেই হালটা ধরেছিলেন সত্যজিৎ রায়। পরিচালকের স্ট্যামিনা যেখানে অনড় সেখানে অভিনেতার কোন রিস্ক নেই—পরিচালক যেখানে দ্বিধাগ্রস্থ সেখানেই শিল্পীর মৃত্যু।
‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার পর্দায় বাঘের সঙ্গে যে দৃশ্য দেখে এখনও আমরা সবাই আপ্লুত হয়ে যাই সেই শুটিংয়ের গল্পই আজ বলবো। এখনকার মত অ্যানিমেটেড বা গ্রাফিকাল নয় সেইকালে এক আস্ত বাঘমামাকে নিয়ে সিনেমায় কাজ করেছিলেন মানিকবাবু। সত্যজিৎ রায় বলতেন—জানোয়ারের মতিগতি বোঝা মানুষের চেয়ে অনেক সহজ কারণ তাদের মন মানুষের মতো এতো জটিল নয়।
সিনেমার আউটডোর ছিলো মাদ্রাজের প্রসাদ স্টুডিয়োতে বিশেষ একটা সেটে। এক প্রবাসী বাঙালির মাধ্যমে বাঘ দেখার বন্দোবস্ত করা হল। দিনটা ছিল দুর্গা সপ্তমী। শুটিং হবে মহা অষ্টমী থেকে আর বাঘের সঙ্গে নবমী থেকে।

প্রথমে সৌমেন্দু রায়, মানিকদা (সত্যজিৎ রায়), পুনু, কালু, সন্দীপ, রঞ্জিতদা, রবি ঘোষকে বাঘ দেখাতে নিয়ে গেল মাদ্রাজের বাসিন্দা সকলের প্রিয় বলাই। বাঘের ডেরায় পৌঁছানোর পর খাঁচা থেকে বাঘকে বের করা হলো। মানিকদার সবার আগে বাঘের কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত দিলেন। সবাই দূরে দাঁড়িয়ে। এরপর মানিকদা রবি ঘোষ কে ডেকে বললেন, ‘এসো কোন ভয় নেই। বাঘটা বুড়ো চোখেও দেখে কম।’ মানিকদা বললেন রবি ঘোষকে, ‘গায়ে হাত দাও।’ একবার হাঁউ করে তাকালো বটে কিন্তু আর কিছু করেনি। এবার সবাই মিলে হোটেলে ফিরে গেল খুব মেজাজে। সমস্যা হলো বাঘটাকে পছন্দ করলেন না সত্যজিৎ রায়। পুনরায় সন্ধান চলতে লাগল। অবশেষে এক বিরাট বাঘের সন্ধান পাওয়া গেল। বাঘটি মানিকবাবুকে দিয়েছিলেন টাইগার গোবিন্দরাজ বলে এক বিখ্যাত ব্যক্তি।
ট্রেইন্ড কিন্তু বিরাট বাঘিনীর কথা শুনে রবি ঘোষ খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ভয়ে হোটেলের ম্যানেজার রঞ্জিতদার সঙ্গে দুর্গা মায়ের দর্শন করে এলেন। রবি ঘোষ এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে মনে হয়েছিল মানিকদা এই শুটিং-টা বাতিল না করে দেন। তারপর মনে ভরসা করে ভাবলেন যদি মরতেই হয় তবু লোকে বলবে—সত্যজিৎ রায়ের শুটিং করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন রবি ঘোষ। সে যাই হোক, সেদিন পুরো সাহসটাই যুগিয়ে ছিলেন সত্যজিৎ রায়।
বাঘের ট্রেনার ছিলেন একজন মহিলা। বাঘটাকে ফ্লোরে আনতে প্রায় সাড়ে দশ ফুট এক বিরাট খাঁচায় (চাকাওয়ালা) করে প্রায় জনা ষোল লোকজন বাঘের গাড়ি ঠেলে একটি দরজার মুখে দাঁড় করানো হলো। মানিকবাবু খাঁচার কাছে গেলেন এবং খাঁচার গেট খুলে দিতে বললেন। এক লাফে বাঘটা বেরিয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে তাদের লোকজন হাতে একটা লাঠি দিয়ে ফ্লোরে আওয়াজ করতে লাগলো। বাঘটাকে বসে আনার জন্য ভীষণভাবে লোকজনেরা দেশীয় ভাষায় অনেক কিছু বলে চলছিল। এরপর বাঘের মুভমেন্ট চেক হলো এবং দেওয়াল ঘেঁষে বাঘটা বসলো। ট্রেনার সমেত লোকজন বাঘটাকে চেপে ধরল এবং একটা ভিজে কাপড় দিয়ে ট্রেনার বাঘের গা মুছতে লাগলেন। ততক্ষণে মানিকদা ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে বসে আছেন। ক্যামেরাটা প্রায় বাঘের থেকে ২০ গজ দূরে জুম ফিট করা।
ট্রেনার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাঘটা সাথ কৌন কাম করেগা?’ রবি ঘোষ বললেন “হাম”। ট্রেনার রবি ঘোষের হাতে সেই ভিজে কাপড়-টা দিয়ে বললেন, ‘এইশা কারকে বুলাতে যাইয়ে। ট্রেনার আবার বললেন, ‘উম্মা উম্মা বোল জাইয়ে।’ ‘উম্মা’ বাঘটির নাম। নামটা শুনলে ও ভাববে নিজেরই পরিচিতরা কেউ আছে।
বাঘটার সামান্য গোঙ্গানি আর বড় বড় নিঃশ্বাস রবি ঘোষকে ভয়ে জড়ো করে দিয়েছে। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে শুরু হলো শুটিং।

রাজকোষ পাহারা দিচ্ছে একটা বাঘ। বাঘের মাথার উপর দেওয়ালে পেরেকে ঝোলানো রয়েছে চাবি। ‘পায়ে পড়ি বাঘ মামা’ গানের শুটিং। লোকজন সমেত ক্যামেরার জুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। ভিজে কাপড়টা গায়ে বুলিয়ে যাচ্ছেন রবি ঘোষ। ভুল করে ‘উম্মা উম্মা’ বদলে একবার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘উমা’। তৎক্ষণাৎ মাদ্রাজি বাঘের ‘জাত্যাভিমানে’ ঘা লাগলো। বাঘ একবারে দাঁড়িয়ে উঠলো। দূর থেকে ট্রেনার লাঠির আওয়াজ করলো আবার উম্মা উম্মা বললেন রবি ঘোষ। সত্যজিৎ রায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘রবি ঠিক হ্যায়?’
বেস্ট চিৎকার করে রবি ঘোষও বললেন, ‘হ্যাঁ মানিকদা, একেবারে আমার কন্ট্রোলে টেক করতে পারেন।’
এইবার শুরু হল টেকিং-এর তোড়জোড়। নিমাই ঘোষ কাছে এসে পটাপট ছবি তুলতে লাগলেন। ছবি তোলা হলো এমনকি বাঘকে কিস করছে রবি ঘোষ এমন ছবিও নেওয়া হল। শুরু হল শুটিং যেটা সবাই পর্দায় দেখেছেন। বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাঘকে নিয়ে ক্যামেরার সামনে কাজ শেষ হয়ে গেল। মানিকদা “প্যাক আপ” বললেন। ট্রেইনার সমেত সবাই রবি ঘোষের অসীম সাহসের প্রশংসা করতে লাগলেন। সেই দিনটায় যে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছিলো, সারাজীবন কেউ ভোলেননি।
এখনকার মতো কম্পিউটার গ্রাফিক্সের বাঘ নয়, সত্যিকারের বাঘ নিয়ে শ্যুটিংয়ের ধকল সামলাতে পারতেন সত্যজিৎ রায়। এমন একটা পরিস্থিতি এবং এমন একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া খুব কমই ঘটে
একজন অভিনেতার ভাগ্যে। অবশ্য পর্দার পিছনের হালটা ধরে রয়েছেন কে সেটাই সবচাইতে বড় প্রশ্ন। এখানেই ক্যারিশমা সত্যজিৎ রায়ের। আজ ২রা মে সত্যজিৎ রায়ের ১০২তম জন্মজয়ন্তী। আপামর বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে এই দিনটি উদযাপনের। তিনি একাধারে পরিচালক, সাহিত্যিক, অঙ্কন শিল্পী, সঙ্গীতকার। অমর সৃষ্টি দিয়ে তিনি আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। জন্মদিনে তাঁকে জানাই শতকোটি প্রণাম।
আমার বাঘ হওয়ার খুবই ইচ্ছা ছিল। হয়েও ছিলাম। পরিস্থিতির চাপে বিড়াল হয়ে গেছি।
খুবই সুন্দর উপস্থাপনা। খুবই সুন্দর।
পুরুষদের ভালো থাকার পাসওয়ার্ড এটাই ????
থ্যাংক ইউ ❤️
কি কাণ্ড!
জব্বর কান্ড,????
অবিস্মরণীয় ঘটনা দিয়ে মানিকদা ও রবি ঘোষের শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রশংসনীয়, দারুণ পরিকল্পনা ও লেখনী
দুই বিরল প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ।
অনেক ধন্যবাদ ????????
অপূর্ব শ্রদ্ধাঞ্জলি*বিশ্বের সবার দিল জিত অর্থাৎ
“সত্যজিৎ”ভারতবর্ষের একমাত্র পরিচালক যিনি
গান গল্প সুর চিত্রকলা,সিনেমা,পরিচালনায় নিজ
প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন,তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আপনার গল্পের ছলে শ্রদ্ধা সুমন নিবেদন সবার
ভালোলাগবে।ভালোলাগা ভালোবাসা।
খুব সুন্দর বললেন। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।