ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি কবি, লেখক, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক গি দ্য মপাসাঁর (Guy de Maupassant) ১৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ। তাঁর পুরো নাম অঁরি রনে আলব্যার গি দ্য মপাসাঁ। আধুনিক ছোটগল্পের অন্যতম স্তম্ভ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দিলে প্রায় তাবৎ বাঙালি গল্পলেখকের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মপাসাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে।
ন্যাচারালিজম বা অতিবাস্তবতাবাদের শিল্পী মপাসাঁ তিনশ ছোট গল্প লিখেছেন। ভাষার স্বচ্ছতা, সারল্য, চরিত্র নির্মাণে অব্যর্থ তুলির আঁচড়, ভঙ্গিতে চাপা বিদ্রুপাত্মক, গতিতে দ্রুত ও ঋজু — গল্পগুলি পাঠককে চমকে দেয়। গল্পগুলি উত্তম পুরুষের জবানীতে রচিত। মপাসাঁর জীবনকথা বিচিত্র, আনন্দ উজ্জ্বল হলেও বিষন্নতা ও নৈরাশ্যের কুহেলিকায় আচ্ছন্ন।
১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে স্বনামে প্রকাশিত একটি কাব্যগ্রন্থ Des Vers-এর মধ্যে দিয়ে তার সাহিত্যজগৎে পদার্পণ। প্রথম কাব্যগ্রন্থে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। কবিতাগুচ্ছে জীবনের কদর্য্য ও অবক্ষয়ী রূপের নির্ভেজাল বর্ণনা ফরাসী সরকারকে শঙ্কিত করে।
এই সময় প্যারিসে তরুণ সাহিত্যিকদল একটি সাহিত্যিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন। নাম Less Sovress de Medan। এখানে মপাসাঁর প্রথম বড় গল্প ‘ব্যুল দ্য সুইফ’ (Boule de Suif–চর্বির তাল) প্রকাশিত হয়। ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পটভুমিতে একজন বেশ্যার কাহিনী। ১৮৮৩ সালে আরেকটি বিখ্যাত গল্প প্রকাশিত হল, মাদমোয়াজেল ফিফি। এরপর প্রথম উপন্যাস Un-rie। উপন্যাসটি সরকারি রোষানলের শিকার হল। ১৮৮৫ সালে রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস “বেল আমি” (Bel Ami)। বলা হয়ে থাকে, ছোটগল্পকার হিসেবে যতটুকু পারদর্শী ছিলেন, উপন্যাসে তিনি ততটা ঋজুগতি ধরে রাখতে পারেননি।
তাঁর বহু রচনায় নরনারীর যৌনজীবন সম্বন্ধে মাঝে মাঝে যে বেআব্রু বর্ণনা আছে, যার কিছুটা পর্নোগ্রাফির ধার ঘেঁষে যায়। ব্যক্তিগত জীবনে মপাসাঁ বেপরোয়া হলেও শেষদিকে শারিরীক ব্যাধি, মানসিক বিষন্নতায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘ, ঋজুদেহী এই নরম্যান ক্রমেই সিফিলিস ও গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নুব্জ হয়ে পড়লেন। মপাসাঁ দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বিকল মানসিক অবস্থায় দেহমনে জীর্ণ হয়ে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে কবরের হিমস্তব্ধ অন্তরালে শয্যা নিলেন।
অনুমান করতে বাধা নেই, নারীঘটিত ব্যাপারে তিনি ছিলেন বোহেমিয়ান। তাই উত্তরজীবনে মপাসাঁ ছিলেন বিষন্ন, নিরুৎসুক ও একাকী। Farewell (বিদায়) গল্পটি কি তাঁরই আত্মজীবনীর ছিন্নপত্র! উত্তম পুরুষের জবানীতে অনুবাদিত এই গল্পের মধ্যে দিয়ে জন্মদিবসে তাঁকে স্মরণ করি।
Farewell :
বয়সজনিত বিবর্তন জীবনের এক স্বাভাবিক ঘটনা। পঞ্চাশ বছর বয়স অবধি এ নিয়ে ভাবিনি কিন্তু হঠাৎ এক স্বভাবিক কিন্তু মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সেই পরিবর্তন আমি ধরতে পারলাম। বারো বছর আগের কথা। কোন এক রৌদ্রস্নাত সকালে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক সমুদ্র সৈকতে আমার পরিচয় হয় এক সুন্দরী ললনার সঙ্গে। জুলি। তার চাউনি, চাপা হাসি, বাতাস কাঁপা চুলের গুচ্ছ, তার মুগ্ধ করা শারীরিক লালিত্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।
সে বিবাহিত। স্বামী প্রতি শনিবার আসে, সোমবার ফিরে যান। ঐ ভদ্রলোক সম্বন্ধে কেন ঈর্ষান্বিত হয়নি, ঠিক কেন তা বলতে পারবো না।
কী প্রেমেই না পড়েছিলাম। তার অঢেল যৌবন, লালিত্য, পরিচ্ছন্ন স্বকীয়তার সঙ্গে পরিচিত হবার আগে আমি কখনো ভাবিনি, নারী এতখানি আকর্ষণীয়া
ও আনন্দদায়িনী হতে পারে।…
আমার এমন অবস্থা মাস তিনেক স্থায়ী হয়েছিলো। তারপর কাজে চলে গেলাম আমেরিকায়। মন দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে। তাকে আমি ভুলতে পারিনি। একের পর এক বছর পার হয়ে যায় — ধীরে ও দ্রুততায়, নীরবে ও সোচ্চারে। মনে হয়, যেন কয়েক মাস যাবৎ আমরা একে ওপরের কাছ থেকে দূরে সরে আছি।
গত বসন্তে জনকয়েক বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে করে ফিরছি, এক স্বাস্থ্যবতী মহিলা চারটি ছোট ছোট মেয়ে নিয়ে এই কামরায় উঠলেন। আমি ঐ ছানাপোনা সহ ‘মুরগীমাতা’-র দিকে ভ্রুক্ষেপ করিনি। ট্রেন ছুটে চলেছে। এমন সময় মহিলাটি আমায় জিজ্ঞেস করলেন, “মাপ করবেন, আপনি কি মসিয়ে কারনীর?”
“হ্যাঁ ম্যাডাম।”
সামান্য বিষন্নতা ছোঁয়া লাগা খুশির হাসি হেসে বললো, “আমাকে চিনতে পারছো না?”
আমাকে দ্বিধায় পেয়ে বসে। কোথায় যেন দেখেছি, মনে করতে পারছি না!!
মহিলাটি সামান্য লজ্জাকরুন হয়। বলে, “মাদাম জুলি লেফেব্রিকে মনে আছে?”
জীবনে এতবড় আঘাত কখনো পায়নি। একলহমায় মনে হলো, যেন একখণ্ড অবগুণ্ঠন আমার চোখের সামনে ছিঁড়ে ফেলা হলো। উপলব্ধি করলাম এক মর্মান্তিক সত্যকে। এই সে!! এমন বিরাট পরিবর্তন কি ভাবে সম্ভব! প্রকৃতির বিরুদ্ধে অভিমান পুঞ্জীভূত হয়ে ওঠে।
হতবাক হয়ে চেয়ে থাকি। তারপর তার হাত ধরি, আমার চোখ সজল হয়ে ওঠে। আমি তার নিহত যৌবনের বেদনায় মুহ্যমান।
সেও অভিভূত হয়ে বলে, “আমি অনেক বদলে গেছি, তাই না? দেখছো তো, আমি কেমন মা হয়েছি, শুধুমাত্র মা, যথার্থ জননী। আর কিছুই সত্য নয়, সবকিছুই ফুরিয়ে গেছে। তোমারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চুল সাদা হয়ে গেছে। বারো বছর অনেকটাই”।
ট্রেন পৌঁছালো ম্যাসনস লাফিতিতে। বিদায় লগ্নে পুরোনো বান্ধবীর হাতে চুম্বন করি। আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না।
রাত্রে নিজের ঘরে একাকী আয়নার সামনে দাঁড়াই। দীর্ঘক্ষণ নিজের বর্তমান প্রতিরূপের দিকে চেয়ে থাকি। এখন বুঝতে পারি, আমি কি ছিলাম, আর এখন কি হয়েছি। কোথায় গেলো আমার যৌবনদীপ্ত মুখমন্ডল! এখন আমি প্রকৃতই বৃদ্ধ। বিদায় আমার যৌবন।।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : মপাসাঁ রচনাবলী, ডক্টর অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং উইকিপিডিয়া।
কবি ও লেখক মপাসাঁকে কিছুটা জানালাম, তাঁর অনবদ্য ছোট গল্পটি পড়লাম।
বহুমুখী লেখিকা ধন্যবাদ রিঙ্কি সামন্ত।
অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????????
কবি ও লেখক মপাসাঁকে কিছুটা জানালাম, তাঁর অনবদ্য ছোট গল্পটি পড়লাম।
বহুমুখী লেখিকা রিঙ্কি সামন্তকে ধন্যবাদ।
Besh bhalo
খুবই ভালো লাগল
থ্যাংক ইউ ❤️
খুব ভালো। মপাসাঁ জন্মবার্ষিকীতে অসাধারণ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????????