‘আমার মেয়েবেলা’ লিখে বাংলা-সাহিত্যের যিনি অশেষ উপকার করেছেন বলে ভাবেন, সেই তসলিমা নাসরিন দিদিভাইকে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা — ‘ছেলেবেলা কারে কয়’? ‘ছেলেবেলা’র ‘ছেলে’ অংশটি কি ‘মেয়ে’ শব্দের মেল কাউন্টারপার্ট বা পুরুষপ্রতিস্পর্ধী? এই রে, কেমন একটা নতুন শব্দ এসে গেল কলমে। যা হোক, এ ‘ছেলে’ সে ‘ছেলে’ নয়৷ হাফপ্যান্ট-পরা সুকুমারমতি গোলগাল সুবোধ বালক কিংবা চোঙা-পরিহিত সিগারেট-ফোঁকা রোমিওপ্রবর সে নয়৷ এ ‘ছেলে’র উৎসের দিকে নজর ফেরানো যাক৷ সংস্কৃত ‘শাবক’ শব্দ থেকে প্রাকৃত ‘ছাব’ শব্দ হয়ে বাংলা ছাবাল ও ছাওয়াল শব্দটি আসছে৷ ‘ছাওয়াল’ থেকেই ‘ছেলে’৷ সুতরাং ‘ছেলে’ শব্দটি লিঙ্গনিরপেক্ষ, সংস্কৃত-ঘেঁষা ‘শাবক’ শব্দের মতো৷ ‘শাবক’ যেমন স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের জীবনের প্রথম ভাগটিকে চিহ্নিত করে, ‘ছেলে’ শব্দটিও তেমনি৷ ইংরেজি Kid বা Offspring -এর মতো৷ তামিল ভাষায় ‘চিল্লে’ মানে বালক, পুত্র বা শিশু। মালয়ালম ভাষায় ‘চেওল’ মানে বালক। দ্রাবিড় শব্দ বাংলা ভাষায় ভূরি ভূরি। ‘চিল্লে’ বা চেওল থেকেও ‘চেলে’ তথা ‘ছেলে’ আসতে পারে৷
সুতরাং ‘ছেলেবেলা’ লিখলে শুধু তসলিমা নাসরিন কেন, প্রত্যেক মহিলার জীবনের প্রথম কালকে বোঝানো যায়৷ তবু তসলিমা ‘মেয়েবেলা’ লিখলেন কেন? তা কি শুধু পুরুষতন্ত্রের গালে একটা থাপ্পড় কষানোর জন্য, নাকি নিজের অজ্ঞতাবশত?
‘মেয়েবেলা’ শব্দটি কি আদৌ মেয়েজীবনের প্রথম খণ্ডকালকে বোঝায়? একেবারেই নয়৷ ‘মাতৃকা’ শব্দ থেকে প্রাকৃত ‘মাইয়া’ শব্দ হয়ে বাংলা ‘মেয়ে’ শব্দটির উৎপত্তি৷ যে নারী ‘মা’, সে-ই ‘মেয়ে’৷ ‘ছাওয়াল’ শব্দের শাবক-দ্যোতনা ‘মেয়ে’ শব্দটিতে বিন্দুমাত্র নেই৷
সুতরাং ‘মেয়েবেলা’ মোটেই নারীজীবনের প্রথম খণ্ডকালকে বোঝাতে পারে না৷ বস্তুত এটি একটি অর্বাচীন শব্দ, যা বড় জোর ‘নারীজন্ম’ বা ‘মেয়েজীবন’ বোঝাতে পারে। একদা একটি প্রতিষ্ঠিত পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক দাবি করেছিলেন, ‘মেয়েবেলা’ শব্দটি তসলিমার সৃষ্টি৷ কী অদ্ভুত দাবি৷ আমাদের বাংলা ভাষার একটা অসীম দক্ষতা আছে নিত্যনতুন শব্দের জন্ম দেওয়ার৷ কোনও লেখক যদি দাবি করে ‘হিজড়েবেলা’ শব্দটি তার সৃষ্টি, তবে কি তাকে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে? আসলে ‘মেয়েবেলা’ বা ‘হিজড়েবেলা’ শব্দদুটির মধ্যেই গিমিক বা সাংস্কৃতিক ধূর্ততা কাজ করছে৷ Boyhood বা Girlhood, — দুটি ইংরেজি শব্দেরই বাংলা ‘ছেলেবেলা’৷ ‘মেয়েবেলা’ লিখলে হয়তো জ্ঞানীগুণীজনের পিঠচাপড়ানি পাওয়া যায়, তবে ভাষাজ্ঞানহীনতা প্রকাশ হয়ে পড়ে৷
এটাও ঠিক, বাংলা সাহিত্যে কেউ কোনও ‘শব্দ’ সৃষ্টির পেটেন্ট দাবি করতে পারে না৷ নতুন শব্দের সৃষ্টি হয় ভাষার উৎকর্ষে, লেখকের কেরামতিতে নয়৷ এবং সবিনয়ে জানাই, ‘ছেলে’ ও ‘মেয়ে’ শব্দদুটিই বিভ্রান্তির কারণ৷
‘বেটাছেলে’ ও ‘মেয়েছেলে’ শব্দদুটির সংক্ষিপ্ত রূপ এরা৷ সংক্ষিপ্ত হওয়ার সময় বেটাছেলের ‘বেটা’ বাদ যাচ্ছে৷ বলা যায়, এখানেই পুরুষতন্ত্রের কারসাজি এবং মাতৃতন্ত্রের প্রশ্রয় ও প্রতিবাদহীনতা৷ আসলে ‘শিবরাত্রির সলতে’ সোনার টুকরো ছেলে আমাদের মায়েদের মনে এককালে গেড়ে বসেছিল৷ ছাওয়াল হলে ‘পুংলিঙ্গধারী’ হওয়াই বাঞ্ছনীয়৷ না হলে বংশরক্ষা হবে কী করে?
তাই ‘ছেলে’ বলতে আমরা সুকুমারমতি সুবোধ বালক ও কুকুমারমতি রোমিও চ্যাংড়াদের বুঝে আসছি৷ মায়েদের অবাধ প্রশ্রয়ই এর কারণ৷ তসলিমাদের ‘ছেলেবেলা’ শব্দটির আরও গভীরে যেতে হবে এবং বুঝতে হবে, ‘ছেলেবেলা’র বিকল্প ‘মেয়েবেলা’ হতে পারে না৷ ছেলেবেলা না লিখে ছোটোবেলা লিখলে তা হবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর সমান৷
এবার আসা যাক একটি ক্রোনোলজিক্যাল বিষয়ে। ‘মেয়েবেলা’ শব্দটি বঙ্গসাহিত্যে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন লীলা মজুমদার তাঁর একটি লেখায়। ১৯৮৭ সাল। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত পাকদণ্ডী নামক স্মৃতিচারণমূলক উপন্যাসে, নাকি না অন্য কোথাও, তা ঠিক মনে পড়ছে না। তসলিমার অবচেতন মনে কৈশোরে পড়া সেই শব্দটি থাকতেই পারে। তাই সময়সুযোগ বুঝে অন্য একটি প্রসঙ্গে শব্দটি কাজে লাগিয়ে দিলেন। আসলে দোষটা তাঁর নয়, শব্দটি তাঁকে জোগান দেওয়ার লোকের।