আমাদের শাস্ত্রে সাতটি ঊর্ধ্বলোক। ভূলোক, ভুবর্লোক, স্বর্লোক, মহর্লোক, জনলোক, তপোলোক, সত্যলোক। মহঃ+ লোক= মহর্লোক। এই ‘মহঃ’ লোকে উত্তরণের দিনটিই মহ+আলয়+আ, তথা মহালয়া।
প্রচলিত ধারণা অনুসারে ‘মহালয়া’ শব্দটির অর্থ — মহান যে আলয় বা আশ্রয়। ‘মহালয়া’ শব্দটিকে স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই দিনেই পিতৃপক্ষের অবসান হয় এবং অমাবস্যার অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলোকময় দেবীপক্ষের শুভারম্ভ হয়। এখানে দেবী দুর্গাই হলেন সেই মহান আলয় বা আশ্রয়।
মহালয়া থেকে দুর্গাপূজার দিন আসতে হাতেগোনা কয়েকটি দিন। মহালয়ার ৬ দিন পর মহাসপ্তমী।
ত্রেতা যুগে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অকালে দেবীর আরাধনা করেছিলেন লঙ্কা জয়পূর্বক সীতাকে উদ্ধারের জন্য । আসল দুর্গাপূজা হলো বসন্তে, সেটাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র অকালে-অসময়ে পূজা করেছিলেন বলে এই শরতের পূজাকে শারদীয় পূজা ও দেবীর অকাল-বোধন বলা হয়।
সনাতন ধর্মে কোনো শুভ কাজ করতে গেলে, বিবাহ করতে গেলে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের জন্য, সঙ্গে সম্পূর্ণ জীব-জগতের জন্য তর্পণ করতে হয়, অঞ্জলি প্রদান করতে হয় । তর্পণ মানে খুশি করা, রামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের আগে এদিনে এমনই তর্পণ করেছিলেন।
পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই মহালয়া। এমনটিও বলা হয়ে থাকে যে, পিতৃপক্ষের অবসানে, অন্ধকার অমাবস্যার সীমানা ডিঙিয়ে আমরা যখন আলোকময় দেবীপক্ষের আগমনকে প্রত্যক্ষ করি – তখনই সেই মহালগ্নটি আমাদের জীবনে ‘মহালয়া’-র বার্তা বহন করে আনে। এ ক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীই হচ্ছে সেই মহান আশ্রয়, তাই উত্তরণের লগ্নটির নাম মহালয়া। মহালয়ার মধ্য দিয়েই দেবীর মর্ত্যে আগমনের সূচনা ঘটে। বিশেষ পূজা আর মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খধ্বনি ও চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আবাহন করা হয়।
মহালয়ার সঙ্গে অবসান হয় কৃষ্ণপক্ষের। এর পর সূচনা হয় দেবীপক্ষের। এরপর শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত নয়টি রাত্রিতে দুর্গার নয়টি রূপের পূজা চলে। এই নয়টি রূপের নাম হল- শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘণ্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী, সিদ্ধিদাত্রী।
বাংলার মাটিতে যেভাবে দুর্গাপূজার গুরুত্ব রয়েছে, ঠিক সেভাবেই মহালয়াও পালিত হয় ব্যাপক আড়ম্বরে। বাংলায় সবাই মহালয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে কারণ এখানে দেবী দুর্গাকে কন্যা রূপে মানা হয়। তিনি যেন সন্তানসন্ততিসমেত বাপের বাড়ি তথা পিত্রালয়ে আসছেন। এই দিনে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরি করা হয়, তার চোখ আঁকা হয় এবং প্রতিমাসহ মণ্ডপ সাজানো হয়। দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কারিগররা আগে থেকেই কাজ শুরু করলেও মহালয়ার দিন প্রতিমাকে চূড়ান্ত রূপ দেন। আর এটাই প্রথা হয়ে আসছে বহু যুগ ধরে। মহালয়ার দিনে পিতৃপক্ষ শেষ হয় এবং এই দিন থেকে দেবীপক্ষের সূচনা হয়।
মহাভারতের আখ্যান মতে, কর্ণ কুন্তীর পুত্র হয়েও নিয়তির বিধানে নিজের অজ্ঞাতেই দুর্যোধনের সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে পরিণত হন। বীরত্বের পাশাপাশি তিনি দাতা হিসেবে অদ্বিতীয় হয়ে ওঠেন। তাঁর কাছে কিছু চেয়ে বিমুখ হয়নি কখনো কেউ। সোনা-দানা, মণিমাণিক্য, যে যা চেয়েছে তাই দিয়েছেন তিনি। এমনকি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষাপ্রদায়ক অভেদ্য কবচকুণ্ডলও তিনি অবলীলায় হাসিমুখে দান করেছেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ নিহত হন। তবে পুণ্যময় কাজের পরিণামে স্থান পান স্বর্গে। নরলোকে যে পরিমাণ সম্পদ তিনি দান করেছিলেন তার সহস্রগুণ ফিরে আসে তাঁর কাছে। স্বর্ণ-সম্পদের বিপুল বৈভবের নিচে তিনি যেন চাপা পড়ে যান। তবুও দুঃখী তিনি। সব পাচ্ছেন তিনি কিন্তু পাচ্ছেন না খাদ্য। এই যন্ত্রণা তাকে অস্থির করে তোলে।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর কর্ণ যান যমরাজের কাছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই বলেন, এ কেমন বিচার!
অফুরন্ত স্বর্ণ রত্ন তিনি পাচ্ছেন, কিন্তু সেসব তো খাদ্য নয়। ক্ষুধার অন্ন নয়। কাজেই সোনাদানার তাঁর দরকার নেই। দরকার খাদ্য।
কর্ণের এই জিজ্ঞাসার মুখে যমরাজ কিছুটা বিব্রত কণ্ঠেই বলেন, এর আমি কী করব? নরলোকে মানুষ যা দান করে, পরলোকে এসে তাই কয়েক সহস্রগুণ ফিরে পান।
কর্ণ কুণ্ঠিত ভাবেই বলেন, আমি তো মর্ত্যে দানে কোনো ত্রুটি রাখিনি। আমার সব ধনসম্পদ আমি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছি। তাহলে কেন বঞ্চিত থাকব খাদ্য-পানীয় থেকে?
যমরাজ বলেন, তুমি ধনসম্পদ দান করেছ, এটা সত্য। কিন্তু তুমি কোনো দিন কাউকে অন্নদান করনি। দাওনি কোনো তৃষ্ণার্তকে জল। সে কারণে এখানে বঞ্চিত তুমি সেসব থেকে।
কিন্তু আমি যে ক্ষুধায় অস্থির। এর একটা বিহিত করুন আপনি। ফিরিয়ে নিন সম্পদ, পরিবর্তে দিন একটু খাদ্য। একটু জল।
যমরাজ বলেন, আমি নিরুপায়। ঈশ্বরের বিধান বদলের কোনো ক্ষমতা আমার নেই।
-না জেনে অপরাধ করেছি। অন্ন-জল দান যে এত মহোত্তম দান, এটা জানা ছিল না। সেই অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ক্ষমা করুন। একটা কিছু প্রতিবিধান করুন।
কর্ণের প্রতি যমরাজ সদয় হন। বলেন, বেশ একটা সুযোগ তোমাকে দিচ্ছি। তুমি এক পক্ষের জন্য মর্ত্যলোকে ফিরে যাও। যথেচ্ছ দান কর অন্ন-জল।
এরপর পনেরো দিনের জন্য কর্ণ ফিরে আসেন মর্ত্যে। এই পনেরো দিন তিনি অকাতরে দান করেন অন্ন-জল। পরিণামে স্বর্গে ফিরে পান অন্ন-জল।
আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত পনেরো দিন কর্ণের ছিল দ্বিতীয় দফার মর্ত্য বাস। আর এই পনেরটি দিনই হিন্দু শাস্ত্রে পিতৃপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত। কর্ণ স্বর্গলোক তথা মহর্লোকে ফিরে আসেন যে অমাবস্যা তিথিতে- সেটিই অভিহিত মহালয় বা মহালয়া নামে।
আমাদের মহালয়া বাণীকুমার-বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র-পঙ্কজকুমার মল্লিকের-রাইচাঁদ বড়ালের স্মৃতি উসকে দেয়। কাশফুলের গন্ধমাখা শরতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। কয়েকটি অবিস্মরণীয় গানই হয়তো আকাশবাণীর প্রভাতী মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের প্রাণভোমরা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সুললিত কণ্ঠের ন্যারেশন যে ভাবগাম্ভীর্যের সন্নিবেশ করে, গানগুলি যেন তাতে ময়ানের কাজ করে। দ্বিজেন, মানবেন্দ্র, শ্যামল, পান্নালাল, প্রতিমা, উৎপলা, সুপ্রীতি, শিপ্রা, সন্ধ্যা, আরতির কণ্ঠের কালজয়ী গানগুলি না থাকলে শুধু বীরেনবাবু অনুষ্ঠানের অমোঘ টান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারতেন কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।
১৯৭৬এ উত্তমকুমারের মহিষাসুরমর্দিনী (দেবী দুর্গতিহারিণীম) অনুষ্ঠানটি সুপারফ্লপ কেন হয়েছিল, তার সম্বন্ধে কিছু কথা বলতেই হয়। উত্তমকুমারের বেশিরভাগ ছবিই তখন ফ্লপ করছিল। সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে তাঁর নিবিড় অন্তরঙ্গতা তখনকার রক্ষণশীল বঙ্গসমাজ মেনে নিতে পারেনি। তাঁর কেরিয়ারের স্বর্ণযুগ তখন তিনি পার হয়ে এসেছেন। তাই বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠের জাদুকরী মায়ায় আচ্ছন্ন বঙ্গসমাজ উত্তমকুমার-গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের ‘মহালয়া’ বর্জন করেছিল।যদিও মান্না দে, লতা মঙ্গেশকার, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়রা এই অনুষ্ঠানে খারাপ গান গাননি, তবু আগের অনুষ্ঠানের গায়কগায়িকাদের ছাপিয়ে যেতে পারেননি। উত্তমকুমার নাটকীয়তা পরিহার করে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে ভাষ্যপাঠ করে হয়তো কোনও ভুল করেননি, কিন্তু বাঙালি শ্রোতা তাঁর নতুন ভার্সন বা ডিকশন মেনে নেয়নি। এটাই মহানায়কের দুর্ভাগ্য।