‘দুর্নীতি মুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যার রাজনীতিতে আসা, দিল্লির তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী সেই ‘মাফলারম্যান’ই আজ দুর্নীতি মামলায় ইডির হাতে গ্রেপ্তার। আয়কর বিভাগে জয়েন্ট কমিশনার পদে থাকাকালীন সমাজের বিভিন্ন অংশে ঘটে চলা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সড়ব হয়ে চাকরি ছেড়ে সরকারিভাবে নামেন সমাজ বদলের লক্ষ্যে। নানান ঘটনায় রাতারাতি উঠে আসেন খবরের শিরোনামে। জন্ম হয় আম আদমি পার্টির। এই পার্টির নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘ঝাড়ু’ কে বেছে নেন। লক্ষ্য ‘মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর…’ দুর্নীতি। ঘর থেকে বেরিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করে ধূলো ময়লা সাফ করার ঝাড়ু।
যদিও এর বহু আগে ঝাঁটা নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিলনা রাজনীতিতে। মোদী থেকে মমতা হাতে ঝাড়ু নিয়ে রাস্তা সাফ করা নিয়ে কম ধুলো ওড়েনি। সেই ধুলোতে জল ছেটাতে এগিয়ে এসেছিলেন বিরোধীরাও।

সে যাই হোক, বড়লোক হোক আর গরিব হোক, রাজনীতিবিদ হোক কিম্বা সাফাইকর্মী, তান্ত্রিক কিম্বা কৃষক ঝাড়ুর কদর কখনো কমেনি। এর একটি ভালো নামও আছে সন্মার্জনি যার আভিধানিক অর্থ হল সংশোধন।
ঝাড়ু আবিষ্কারের কোন সঠিক তারিখ নেই। প্রয়োজনই এর উৎপত্তি। গাছের ডাল-পালা দিয়ে পরিষ্কার করার সময় দরকার মতো বিবর্তন ঘটতে থাকে। বাইবেলে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দুধর্মে ঝাড়ুকে দেবী লক্ষ্মীর প্রতিনিধি হিসেবে মনে করা হয়। বাড়িতে ধুলো ময়লা জমলে বলা হয় নেগেটিভ এনার্জি প্রবেশ করেছে। ফলে সেই পরিবারে আর্থিক সংকট, অশান্তি, শোক মাথাচাড়া দেয়। তাই এ নেগেটিভ এনার্জিকে সরাতে ঝাড়ুর ব্যবহার করা হয়। কৃষক পরিবারগুলি পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ঝাঁটা কে খড়ের টুকরো দিয়ে বাওনি বেঁধে বাহান্ন পৌটি (অফুরন্ত) হওয়ার প্রার্থনা জানায়।
তৈরী করার বিভিন্ন উপাদানের ভিত্তিতে এর নানান নাম। যেমন ধরুন —

ফুলঝাড়ু : মালভূমি এলাকায় পতিত জমিতে অনাদরে জন্মানো এক ধরনের ঘাস যার থেকে তৈরি হয় ফুল ঝাড়ু। মঞ্জরিসহ লম্বা তৃণকান্ড ঝাড়ুতে প্লাস্টিকের হাতল (খাপ) পড়িয়ে ব্যবহার করা হয়। শহরের ঘরগুলিতে দেখতে সুন্দর ঝাড়ুর ব্যবহার বেশি। আজকাল ব্যবসার তাগিদে এই সব ঘাসের চাষ করা হয় নিয়ম মেনে সার ও সেচ প্রয়োগ করে। এই ঝাঁটা দেখতে অনেকটা প্রাণীর ল্যাজের মত।
বারণ : খেজুর গাছে পাতা লম্বালম্বি চিরে দিয়ে তৈরি হয় এটি। একত্রে অনেকগুলি একসাথে শক্ত করে সুতো দিয়ে বেঁধেতৈরি হয়। প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষি শ্রমিকদের তৈরি বারণ কুটির শিল্প বাড়তি রুজি রোজগারের পথ দেখায়।

কাশঝাড়ু : আশ্বিন কার্তিক মাসে নদীর ধারে রেললাইনের পাশে, ধানে জমির পাশে শরতের সৌন্দর্য কাশফুল দিয়ে তৈরি করা হয় ঘর মোছার ঝাড়ু। কাশফুলের দিন শেষ হলে কাশফুলের দন্ড সংগ্রহ করে বানানো হয় কাশঝাড়ু। কাশবন তৈরি করতে অতিরিক্ত পরিচর্যা বা সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না, আপনা থেকে অথবা বীজ ছিটিয়ে দিলেই সৃষ্টি হয় কাশবন। কাশফুল চারা গাছ একটু বড় হলেই কিছু অংশ কেটে গবাদি পশুদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া গ্রামেতে ঝাঁটা, ডালি তৈরি করতে, ছাঁউনি দিতে এর ব্যবহার করা হয়। তবে অন্যান্য ঝাঁটার মতো এগুলো শক্তপোক্ত হয় না।
নারকেল কাঠির ঝাঁটা : সবাইকে পাল্লা দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে এক নম্বরে এই ঝাঁটা। এই ঝাঁটাকে কোথাও বলে খেংরা বা শিকের ঝাঁটা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে প্রয়োজন হয় নারকেল ঝাঁটা। প্রতিটি বাড়িতেই এই ধরনের ঝাঁটা তাই অবশ্যই থাকে। বড়ো বঁটিতে নারকেল পাতা থেকে আলাদা করে নেওয়া শক্তদণ্ডটিকে। এই সরু কাঠিগুলোকে রোদে শুকিয়ে একত্রিত করে মজবুত করে বাঁধা হয় নারকেল ঝাঁটা। সাধারণত গোড়ার দিকে একটি শক্ত বাবলা বা শাল কাঠের শঙ্কু আকৃতির লম্বা টুকরো (একে বলা হয় গুঁজি) ঢুকিয়ে লোহার বলয় দিয়ে ঝাঁটা বাঁধা হয়।

বেশি ব্যবহার করার ফলে ঝাঁটার মুখগুলো ক্ষয়ে সরু হয়ে যায়। তখন সরু মুখগুলোকে কেটে দিয়ে বানানো হয় মুড়ো ঝাঁটা। গৃহ নির্মাণের সময় লোকের কুনজর থেকে বাঁচার জন্য মুড়ো ঝাঁটার খোঁজ পরে। ভিত খোঁড়ার পর বাঁশের ডগায় ছেঁড়া জুতো, ভাঙা ঝুড়ি, ভাঙ্গা কুলোর সঙ্গে মুড়োঝাঁটা বেঁধে টাঙিয়ে দেওয়ার সংস্করণ আছে।
সম্প্রতি Amazon-এ দেখা গেছে নারকেল ঝাঁটা বিক্রি হতে। প্রোডাক্টের নাম Swadeshi Desi Kharata Broom, Heavy Duty and Thick ইত্যাদি।
ফাইবার ঝাঁটা : আধুনিক যুগে ঝাঁটা তৈরির উপকরণের সহজলভ্যতা কমে আসায় সিন্থেটিক ফাইবার দিয়ে ঝাঁটার চাহিদা বাড়ছে। এগুলির সুবিধা আছে প্রচুর, ফুলঝাড়ুর মতো গুঁড়ো ঝরে, সহজে কাঠি ভাঙ্গে না, ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়া যায়।

নিপা কাঠির ঝাঁটা : বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঠি দিয়ে ঝাঁটা তৈরি হচ্ছে পূর্ব বর্ধমান জেলা, পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, কলকাতা-সহ একাধিক জায়গায়। প্রস্তুতকারকদের তরফে জানা গিয়েছে, এ রাজ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে নিপাকাঠি আমদানি করেন হলদিয়া এবং অন্যান্য জায়গার মহাজনেরা। এরপর সেখান থেকেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঝাঁটা ব্যবসায়ীরা সেই কাঠি সংগ্রহ করে ঝাঁটা প্রস্তুত করেন।
দেব দেবীর মন্দিরগুলিতে ময়ূরের ঝরে পড়া লম্বা পেখম সংগ্রহ করে একত্রে বেঁধে ঝাড়ু তৈরি করে মন্দির প্রাঙ্গণ ঝার দেওয়া হয়। এই ঝাড়ুর সঙ্গে যেন পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা মিশে আছে।
বাস্তুশাস্ত্র বলে সূর্যোদয়ের প্রথম চার ঘন্টার মধ্যে ঘর ঝাঁট দেওয়ার সঠিক সময়। এর ফলে বাড়িতে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে, ঘরে পজেটিভ এনার্জি থাকে। সূর্যাস্তের পর ঘর ঝাঁট দেওয়ার নিয়ম নেই। শনিবার, মঙ্গলবার, ভাদ্র পৌষ ও চৈত্র মাসে ঝাঁটা নির্মাণ নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়।
ঠাকুরের স্থান বা আলমারির কাছে ঝাঁটা রাখবেন না। বাড়ির কোন সদস্য ঘর থেকে বেরোনোর সময় ঝাঁট দেওয়া উচিত নয়, বলে সেই কাজ নাকি ব্যর্থ হয়। ঝাঁটা দিয়ে গরু বা কুকুরের মত অবলা জীবকে কখনো পেটাতে নেই যদিও বা ছোটবেলায় আমার মত অবলা জীবেরা এই ঝাঁটা দিয়েই মায়ের হাতে মার খেয়েছে।
এখনতো ধনতেরাসের সময় ঝাড়ু কেনার চল হয়েছে। অতএব দেখা যাচ্ছে ঝাঁটাকে যতই তুচ্ছ, অশ্রদ্ধা করা হোক না কেন, এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।