দিনমনি অস্তাচলে যাবার তখনো বেশ খানিকটা বাকি। ওহাইয়ো নদীর বিশাল জলরাশিতে সাপের জিহ্বার মত লকলক করছে অস্তমিত সূর্যের লাল শিখা। নদীর এ ধারটা বেশ প্রশস্ত ও খরস্রোতা। স্রোতের টানে নৌকোটি বারবার বেঁকে বেঁকে কূলের দিকে ধেয়ে যেতে চায়। হাল ধরে রাখাই বেশ দায়। তবুও রক্ষে যে নৌকোটি তুলো, ভুট্টো ও নানাবিধ পণ্যে ভর্তি। খালি নৌকো হলে হয়ত সহজেই ভেসে যেত দূরে।
আব্রাহাম আগে ডেন্টন অফুট নামে জনৈক্য এক বনিকের নৌকোয় ভাড়া খাটত। সেগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত বড় ইঞ্জিন চালিত স্টিমার। এটা অবশ্য তাঁর নিজের নৌকো, ইঞ্জিন নেই তাতে কী?
আব্রাহামের সেই স্মৃতিটি এখনো মনের মধ্যে প্রজ্বল্যমান, যেদিন সে সর্বপ্রথম ইঞ্জিন চালিত স্টিমার দেখেছিল। তখন তাঁর বয়স সবে মাত্র সাত কিংবা আট হবে। ১৮০৭ সনের বসন্তের এক সুন্দর বিকেলে সে তাঁর বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল লুইসভিল নদীর পাড়ে। যন্ত্রচালিত সেই যানটি তার চুল্লি থেকে ভস ভস কালো ধুয়ো নীল আকাশে ছড়িয়ে দিয়ে নদীর পানি কেটে বিজয়ী সৈনিকের মত এগিয়ে চলছিল সামনের দিকে।
সেটি একটি দেখার মত দৃশ্য বটে। সেই দৃশ্য দেখার জন্যে মুহুর্তের মধ্যে লুইসভিলের আশেপাশের গ্রাম থেকে ছুটে আসা শ’খানেক লোকের ভীড় জমে গেল নদীর দুকূল ঘেষে। আব্রাহামের বাবা লেখাপড়া জানতেন না বলে স্টিমারটির গায়ে কী লিখা সেটা পড়তে পারছিলেন না। পাশ থেকে কে একজন চেঁচিয়ে উঠলেন –ঐ দেখ স্টিমারটির গায়ে বড় করে নাম লিখা রয়েছে “দ্য ওয়াশিংটন”।
আব্রাহাম নৌকোর হালটি শক্ত করে ধরে রাখে আর মনে মনে ভাবে মিসিসিপির শাখানদী ওহাইয়োতেই যদি নৌকোটির এই অবস্থা হয় তবে মিসিসিপির ভয়াল স্রোত এটি সইবে কীভাবে? তখন আবার নৌকোটি খড়কুটোর মত ভেসে যাবে নাতো?
হালটি শক্ত করে ধরে রাখতে হাত দুটোতে বেশ ব্যথা অনুভব করলো আব্রাহাম। বেশ অনেক সময় ধরেই সে নৌকোর হালটি ধরে বসে আছে। জন হ্যাঙ্কস ও জোহান্সটন হতচ্ছাড়া দুটো হয়তো নৌকোর সামনে বসে খোসগল্পে মজেছে।

আব্রাহামের চিৎকারে দুজনই ছুটে এল এক সঙ্গে। এত চেঁচাচ্ছ কেন? হয়েছেটা কী? তোরা দেখেছিস নদীতে কী প্রচন্ড স্রোত?
জন, আব্রাহামের দিকে উদ্দেশ্য করে বলল, দাদা তুমি এতটা উতলা হচ্ছ কেন? বছরের এই মৌসুমটায় ওহাইয়ো নদী বরাবরই এমন ভয়াল রূপ ধারণ করে। এবার হালটি বরং আমায় দাও, তুমি খানিক বিশ্রাম কর গিয়ে।
আব্রাহাম জনের হাতে হালটি ধরিয়ে দিয়ে নৌকোর ছইয়ের যে ধারটায় মাস্তুলটি সেখানটায় এলেন পা টিপে টিপে, পাছে নৌকোর ছইটি ভেঙ্গে যায়। মাস্তুলটায় তাঁর পিঠটি এলিয়ে দিয়ে একটু আয়েশ করে বসল সে। তাঁর দীর্ঘ শরীরের জন্য বসার সময় একটু ঋজু হয়ে বসতে হয়।
১৯ বছরের একজন কিশোর অথচ এই বয়সেই কেমন তড়তড়িয়ে লম্বা হয়ে গেলেন তিনি, উচ্চতায় ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি। কিন্তু অপুষ্টির ফলে দৈর্ঘের সঙ্গে মানানসই ওজন হয় নি তার।
ওহাইয়ো নদীতে আজ বেশ হাওয়া দিচ্ছে। পড়ন্ত বিকেলের এমন মৃদ্যুমন্দ বাতাস আব্রাহামের মনটিকে ক্ষনিকেই ভাবাবেশে ভরে তুলল। তার দীর্ঘ কেশদাম ও উড়ুক্কু চুলগুলো ধানক্ষেতের নবীন চারাগাছগুলোর উপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে যেমনটি দোল খেতে থাকে সেরকম হতে লাগল।
এরকম অবসরে আব্রাহাম সাধারণত বই পড়তে পছন্দ করে। তাঁর বইয়ের থলেটি সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। আর সেই থলেটি নানাবিধ গ্রন্থে ভর্তি। সেটার মধ্যে যেমন রয়েছে বাইবেল, আরব্য রজনীর গল্প ঠিক তেমনি রয়েছে ঈশপের গল্পগুলো, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুসো উপন্যাস, শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ ও হ্যামলেট আর বার্নসের কাব্য।
থলে থেকে রুশোর দ্য কনফেশন বইটি বের করে কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করে আবার থলেটিতে ভরে রাখল সযত্নে। আজ তাঁর মনটি খানিকটা উদাস। কিছুতেই গ্রন্থে মন বসাতে পারছে না সে।
কোথায় সে, দু’দন্ড আয়েশ করে বসবে ভেবেছিল কিন্তু বিবিধ চিন্তা ভাবনাগুলো যেন জড় হতে শুরু করল তাঁর মাথায়, তাঁর মত এমন একজন মানুষ কী সারাটা জীবন এই মাঝি মাল্লার কাজ করে জীবন চালাবে? তাঁর জন্য কী এর চেয়ে ভাল কিছু অপেক্ষা করে নেই? সে কী তাঁর পরিবারে কুলটা হয়ে জন্মেছে? সেটাই হবে হয়ত, তা না হলে তাঁর এমন ধনী পিতা তাঁর জন্মের সাথে সাথেই কেন এমন নিঃস্ব হয়ে গেলেন?
অথচ তাঁর জন্মের কিছুকাল আগ পর্যন্তও তাঁর পিতা থমাস লিংকন বেশ বিত্ত বৈভবের অধিকারী ছিলেন। ৬০০ একরেরও উপরে জমি নিয়ে ছিল তাঁদের খামার। আস্তাবলে ছিল প্রচুর অশ্ব। গৃহপালিত গবাদি পশু ছিল অগুন্তি।

কেন্টাকির যে স্থানটিতে তাঁদের বসবাস ছিল সেই হার্ডিন কাউন্টিতে তাঁর বাবা সবসময় সম্মানিত নাগরিক হিসাবে বিবেচিত ছিলেন। প্রায়শই তাঁর ডাক পড়ত জুরিদের আসনে বসার। কখনো কখনো তাঁকে কারারক্ষীদের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হত। কিন্তু আজ সেসব শুধুই অতীত স্মৃতি। আব্রাহামের মা ন্যান্সি হ্যাঙ্কস লিংকনও ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবার হতে আগতা এক নারী। আব্রাহামের জম্নের কিছুকাল আগে থেকেই তার বাবা বিভিন্ন জায়গায় দায় দেনা শোধ করতে বিক্রি করতে শুরু করলেন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি।
আর এভাবেই বেঁচতে বেঁচতে একটা সময় কপর্দকশূন্য হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর রইল না। সম্পত্তির যতটুকুই বা ছিল সেটুকুও মালিকানা জটিলতা ও মামলা মোকদ্দমায় হাতছাড়া হয়ে গেল। আর এই হত দরিদ্রতার মধ্যে তাঁর জন্ম হল ১৮০৯ সনের ১২ ফেব্রুয়ারি কেন্টাকি রাজ্যের হজেনভিল গাঁয়ে এক কাঠের তৈরি কুঁড়ে ঘরে।
যদিও তাঁর বাবা তাঁকে উদ্দেশ্য করে প্রায়ই গর্ব করে বলেন— বুঝেছিস আব্রাহাম, আমাদের পূর্ব পুরুষেরাও ছিলেন অনেক উচ্চ বংশের। তাঁরা এসেছিলেন ইংল্যান্ড থেকে। ১৬৩৭ সনে ম্যাসেচুসেটস রাজ্যে বসবাস করতে শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু পরে বাস উঠিয়ে ক্রমাগত মার্কিন দেশের দক্ষিন পশ্চিমে সরে যেতে থাকেন। গল্প বলার এ পর্যায়ে এসে আব্রাহামের বাবা একটু জিরোয়। বয়স ও ক্রমাগত পরিশ্রমে নূ্জ্যমান এই মনুষটি গল্প করতে করতে প্রায়ই এভাবে ক্লান্ত হয়ে যান।
এবার তিনি তাঁর গল্প আবার শুরু করেন। তোর পিতামহ একদিন জঙ্গল পরিষ্কার করে যখন শস্যের বীজ বুনছিলেন, ঠিক সেই সময় মার্কিন দেশের আদি বাসিন্দা অর্থাৎ রেড ইন্ডিয়ানরা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। পালাবার কোনো পথ নেই। তোর দাদা একা, সাথে শুধুমাত্র জনা পাঁচেক শ্রমিক। কিন্তু রেড ইন্ডিয়ানরা সংখ্যায় বিশ থেকে পঁচিশ জনের মত। ঘোড়ার উপর থেকে তোর দাদাকে লক্ষ্য করে একটি বর্ষা নিক্ষেপ করল একটি রেড ইন্ডিয়ান। বর্ষাটি বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে গেল। সাথে সাথে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়লেন তিনি।
আব্রাহাম কেন নিজেকে অলুক্ষুনে কিংবা কুলটা ভাববে না? তাঁর যখন কেবল মাত্র ৯ বছর বয়স তখন তাঁর মা মারা গেলেন। মারা যাবার সময় তাঁর মা ছোট্ট আব্রাহামকে রেখে গেলেন তাঁর একমাত্র দিদির কাছে, যিনি তাঁকে আদর যত্নে লালন পালন করতেন।
কিন্তু সে তো সত্যি সত্যি দূর্ভাগা। তা না হলে কী তাঁর একমাত্র দিদিরও মৃত্যু হয় সন্তান প্রসব করতে গিয়ে? ঘরের কাজে অপটু আব্রাহামের বাবা, সারা বুশ বলে এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করে আনলেন। সারার নিজেরও আগের বিয়ের তিনটি সন্তান ছিল। তাঁর এই সৎ মা ঘরে আসাতে আব্রাহাম ভেবেছিল তাঁর এই সৎ মা বুঝি তার উপর নিপীড়ন নির্যাতন চালাবেন কিন্তু হল তার উল্টো। বিড়ালের ভাগ্যে যেন শিকে ছিঁড়ল। আগের বিয়ের তিনটি সন্তান থাকা সত্ত্বেও অসীম মমতায় তিনি তাঁকে কাছে টেনে নিলেন। হৃদয়বতী এই মহিলা মা মরা আব্রাহামকে নিজের ছেলেমেয়ের মত লালন পালন করতে লাগলেন।
আব্রাহামের এখনো সবকিছু মনে আছে। তাঁর বাবা আর্থিক অবস্থার সুরাহা করতে না পেরে ইন্ডিয়ানার কেন্টাকি থেকে পুরো পরিবার মুসাফিরের মত যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তির গাঁটরি তুলে উপস্থিত হলেন ইলিনয় রাজ্যে। এখানে তাঁরা নতুন করে ঘর বাঁধল— এসব ভাবতে ভাবতে আব্রাহাম খানিকটা আবেগ তাড়িত ও চোখ দুটো তাঁর ঈষৎ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।
হঠাৎ করে পেছন থেকে মামাত ভাই জনের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো আব্রাহাম। অতীতের ইতিহাস কল্পনা করতে করতে কত দূর চলে গিয়েছিল সে। জন কে উদ্দেশ্য করে আব্রাহাম বলল, এসব মাঝিমাল্লার কাজ করতে আর ভাল লাগে না। এবার অন্য কিছু করা যায় কী না ভাবছি। জন বলল, দাদা অন্য কী করবে?
ডেন্টন অফুট বলেছে নিউ সালেমে সে যে দোকানটি চালু করতে চলেছে সেই দোকানের কর্মচারী হিসেবে সে আব্রাহামকে নিযুক্ত করবে।
জন তার কপালটি খানিক কুঁচকে বলল, অফুট একটি ধান্দাবাজ লোক। দাদা, তুমি কিছুতেই তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করো না।
আব্রাহাম ঈষৎ হেসে বলল, কথাটা তুই মন্দ বলিস নি। আজ তোকে আমি আমার মনের একটি স্বপ্নের কথা বলছি যা আমি আগে কখনোই কাউকে বলি নি। আমি ইলিনয় রাজ্যের আইন সভার সদস্য হওয়ার জন্যে নির্বাচন করতে চাই। নৌকোর মাঝি মাল্লার কাজ এবারের মত এখানেই শেষ।
আমি ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজে নিজে প্রচুর আইনের বই পড়েছি। তোকে আজ বলতে দ্বিধা নেই আইন নামক বিদ্যেটির অনেকটাই এখন আমার আয়ত্বে।
জন এবার সকৌতুকে আব্রাহামের দিকে তাকাল—তুমি আবার আইন বিষয়ে আগ্রহান্বিত হলে কখন?
—শোন, আমি এবার তোকে পুরো ঘটনাটি খুলে বলছি। এখন থেকে তিন চার বছর আগে আমার বয়স তখন কেবল চৌদ্দ কিংবা পনের। আমি আমার ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকোটি নিয়ে সাংগোমন নদী ধরে চলে যেতাম ওহাইয়ো নদীর লুইসভিল মোহনায়। ডিঙ্গি বাইতে আমার বেশ ভালই লাগত।
একদিন ওহাইয়ো নদীর পাড়ে আমার ডিঙ্গিটি নিয়ে বসে আছি। হন্তদন্ত হয়ে দুজন ভদ্রলোক আমার ডিঙ্গিতে এসে চেপে বসলেন এবং বললেন, এই খোকা আমাদের নদীটি একটু পার করে দাও তো? দয়া করে বসে থেকো না। একটু চটজলদি ডিঙ্গিটি চালাও। আমাদের তাড়া আছে। আব্রাহাম এবার জনের দিকে তাকিয়ে বলল, জন, তুই তো জানিস আমি ছোট থেকেই অকৃত্রিম ভাবে মানুষের উপকারে এগিয়ে আসি। এবারো সেটির ব্যতয় ঘটলো না।
আমি তাদের ওহাইয়ো নদী পার এনে করে অন্য পাড়ে নামিয়ে দিলাম। দু’জন ভদ্রলোকের মধ্যে একজন ডিঙ্গি থেকে নেমে যাবার আগ মুহুর্তে আমার পকেটে এক প্রকার জোর করেই গুঁজে দিলেন এক ডলার। সেই এক ডলার হাতে পাওয়া মানে ছিল আমার কাছে একটি পুরো পৃথিবী হাতে পাওয়া।
আমি লোভে লোভে রোজ ডিঙ্গি নিয়ে যেতে শুরু করলাম ওহাইয়ো নদীর লুইসভিল ঘাটে। আমার রোজগারের একটি অংশ তুলে দিতাম বাবার হাতে আর অন্য অংশটি দিয়ে বিভিন্ন লেখকদের বই কিনে পড়তে শুরু করলাম। কথায় বলে অভাগার কপালে সুখ বেশিদিন টেকে না।
আমার ক্ষেত্রেও সেরকম কিছু ঘটল। লুইসভিলের আশেপাশের কিছু মন্দ লোক আমার পেছনে শত্রু হিসেবে জুটে গেল। তারা আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিজেরাই এই নৌকো পারাপারের ব্যবসা ফাঁদতে চায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন একদিন আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল কেন্টাকি কাউন্টি কোর্টে।
বিচারপতি ভালো করে কেন্টাকির বিভিন্ন আইনপত্র ঘেঁটে দেখলেন, সামান্য এই ডিঙ্গি দিয়ে নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে লোকজন পারাপারের মধ্যে কোনো আইন লঙ্ঘিত হয় নি। তাই আমার উপর আরোপিত সকল অভিযোগ থেকে আমি অব্যহতি পেলাম।
কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার জীবনের একটি বড় ঘটনা ঘটে গেল। আমি কোর্টের বিচার কার্য বিশেষ করে উকিলদের যুক্তি তর্ক দেখে অতিশয় মুগ্ধ হলাম। জীবনের এই প্রথম আমি ছাপা আকারে আমেরিকার স্বাধীনতার সনদ দেখা ও পড়ার সুযোগ পেলাম।
আর আমি মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আইন বিষয়ে আরো ব্যাপক অধ্যয়ন করে আমি আইনজীবী হব। কোর্ট থেকে বেরুনোর সময় কোর্টের কন্সটেবল টমাসের কাছ থেকে ইন্ডিয়ানা রাজ্যের সংবিধানটি চেয়ে আনতেও ভুললাম না। জন, এতক্ষন মন্ত্রমুগ্ধের মত আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে ছিল। গল্প শেষ হওয়ার পরও ঘোর যেন কাটছিল না কিছুতেই। কিছুটা জোরে নিশ্বাস ফেলে জন বলল, এই হল তাহলে তোমার উকিল হয়ে ওঠার কাহিনি।
লুইসভিল থেকে বত্রিশ দিন নৌকা চালিয়ে তারা পৌছল নিউ অরলিয়ন্স শহরে। যাত্রা বিরতি হিসেবে শুধুমাত্র টেনেসির মেম্ফিস শহরে কাটিয়েছে মাত্র একটি রাত।
নিউ অরলিয়ন্সে এসে আব্রাহামের চোখ যেন একেবারে ধাঁধিয়ে গেল। এত সুন্দর আভিজাত্যময় শহর আব্রাহাম আগে কখনোই দেখে নি। কী সুন্দর সুরম্য অট্টালিকা। সবকিছু যেন গোছান এবং পরিপাটি। নিউ অরলিয়ন্সের দক্ষিন পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে বিশাল মিসিসিপি নদীটি। উত্তরে র্যাম্পার্ট ষ্ট্রীট এবং সেইন্ট ক্লাউড এভিনিউ। পূবে রয়েছে ফ্রাঙ্কলিন এভিনিউ এবং পশ্চিমে এস্প্লানেড এভিনিউ।
নৌকোর অন্যান্য শ্রমিক ও মাঝি মাল্লাদের মালপত্র খালাস করার নির্দেশ দিয়ে, মামত ভাই জন ও ভাই জোহান্সটনকে সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন শহরটি ঘুরে দেখতে। তাঁরা দেখতে পেল রাস্তার দু ধারে প্রচুর দৃষ্টিনন্দন ও আভিজাত্যময় দোকানপাট। আর সেই সব সুন্দর দোকানগুলোতে রাজ্যের সব সুদৃশ্য তৈজসপত্রে ঠাসা। বেশিরভাগ জিনিসপত্রই এখানকার আসে ইউরোপ থেকে। বিশেষ করে ফ্রাস থেকে।
আব্রাহাম এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, এই যে ভায়া, এখানে দেখার মত কী কী আছে? প্রতি উত্তরে দোকানি বলল, ক্যানাল স্ট্রীটে চলে যান, সেখানে আজ সার্কাস দেখানো হচ্ছে।
আব্রাহাম ও তাঁর সঙ্গীরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলেন ক্যানাল স্ট্রীটে। এখানে এসে আব্রাহামের চোখ ও প্রাণ দুটোই জুড়িয়ে গেল। এক পাশে সার্কাস খেলা চলছে। অন্য পাশে একটি আবক্ষ মূর্তির সামনে একটি লোক বক্তৃতা করে যাচ্ছে অনবরত। আর লোকজন মনোযোগ দিয়ে সেটা শ্রবণ করছে।
কী একটা হট্টগোল ও চেঁচামেচিতে সকলের দৃষ্টি সেদিকে নিক্ষিপ্ত হল। ঘটনাটি আর কিছুই নয়, কিছু নিগ্রো দাসদের শিকল দিয়ে বেঁধে নিলামে তোলার আয়োজন করা হচ্ছে। আব্রাহামের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এবার সেদিকে। জনাবিশেকের মত একটি নিগ্রো দাসদলকে শিকল দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিলামে তোলার জন্যে। তাদের হাতে পায়ে এমন কী গলাটি পর্যন্তও শিকল দ্বারা শৃঙ্খলিত।
আব্রাহাম ব্যক্তিগত ভাবে প্রচন্ড দাসপ্রথা বিরোধী মানুষ। সে যেখানে বসবাস করে সে রাজ্যটি দাসমুক্ত। আর সে জন্যে সে দাস সংস্কৃতির সংগে খুব একটা পরিচিতও নয়। কিন্তু একজন মানুষ সে সাদা কিংবা কালো যাই হোক না কেন, এভাবে নির্যাতিত নিপীড়িত হতে দেখলে আব্রাহামের মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে, তঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।

আকস্মাৎ তাঁর দৃষ্টি স্থির হল একটি যুবতী মেয়ের দিকে। যুবতীটি সম্ভবত ষোড়শ বর্ষীয়া। বর্ণ শংকর অর্থাৎ সাদা কালো মিশ্রণে জন্মেছে সে। কী অসাধারণ সুন্দর তার গায়ের রঙ, যেন সোনার রঙ দিয়ে তৈরি। নয়নাভিরাম দেহবল্লরী। দীর্ঘাঙ্গীনী, সুঠাম দেহ, উন্নত বক্ষ। হাত দুটো সরু ও লম্বাটে। পা দুটো যেন অপ্সরাদের মত। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে ও শরীরে ময়লা ও ধূলো বালি লেগে থাকায় মেয়েটির রুপ দেহের সৌন্দর্য সে ভাবে ফুটে ওঠেনি।
আব্রাহাম জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছে কিন্তু আজ তাঁর বলতে দ্বিধা নেই এই ষোড়শ বর্ষীয়া যুবতীটি যেন ক্ষনেই তার হৃদয় হরণ করে নিল। শিকল শৃঙ্খলিত পুরো দাস দলটিকে তোলা হল নিলাম মঞ্চে। তামাসা দেখার জন্যে ইতিমধ্যে মঞ্চের চারপাশে অনেক দর্শক জমে গেল নিমেষেই। আব্রাহাম ও তাঁর সঙ্গীরাও দর্শক সারিতে সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। এই পুরো নিগ্রো দাস দলটির মালিক মাইকেল ডগলাস নামের এক শ্বেতাঙ্গ। তিনি একজন পেশাদার দাস বিক্রেতা। তিনি মঞ্চে উঠেই একটি বক্তৃতা দিলেন। বললেন, আমি টেনেসির মেম্ফিস থেকে সর্বোতকৃষ্ট কিছু দাস নিয়ে এসেছি। সবগুলো দাসই নিলামের নিয়মানুযায়ী বিক্রি হবে।
শুধুমাত্র এই ষোড়শ বর্ষীয়া যুবতীর ক্ষেত্রে একটু ভিন্নতা হবে। এরঁ মূল্য ৬০০ ডলার দিয়ে শুরু করব। তারপর সর্বোচ্চ দাম প্রদানকারীকে মেয়েটাকে প্রদান করা হবে। একেকটি দাস সাড়ে তিনশো ডলারে বিক্রি হল, কোনোটি আবার বিক্রি হল চারশো ডলারে। মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীটি ক্ষনে ক্ষনে আব্রাহামের দিকে তাকাচ্ছিল। সেই চাহনিতে কী এক আর্তি! কী এক মায়া! সেটা আব্রাহাম কাকে বোঝাবে? তাঁর মামত ভাই জন তাঁর চেয়ে অনেক বেশি চটপটে ও সুদর্শন কিন্তু মেয়েটি তাকে কেন এমন বারবার করে দেখছে? চোখের ইশারা দিয়েই যেন কত কথা বলতে চায় সে। এ যেন কত কথাই তুমি যাও গো বলে, কোনো কথা না বলে।
মেয়েটি মনে হয় তার মালিকের কাছ থেকে কিনে নেয়ার জন্য আব্রাহামকে ইশারা দিচ্ছে। কিন্তু কীভাবে কিনবে সে ঐ যুবতীটিকে? তাঁর পকেটে সর্বসাকুল্যে আছে মাত্র পঁচিশ ডলার। কিছু দাস বিক্রি হওয়ার পর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসাতে দাস বিক্রেতা সেদিনের মত দাস বিক্রি মুলতুবি করে বললেন, মহোদয় আপনারা দয়া করে আবার কাল এখানে জমায়েত হবেন। বাকি দাসগুলো কাল সকালেই বিক্রি হবে।
পুরো দাস দলটিকে রাখা হল নিউ অরলিয়ন্সের সিটি কর্পোরেশন থেকে বরাদ্দকৃত কারাগারের মত পুরোনো একটি দালানের সামনের একটি কুঠরীতে।
দালানের নিচের প্রকোষ্ঠটি রাস্তার সাথে একেবারে লাগোয়া। কেউ চাইলে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে দাসদের সাথে কথা বলা যায়। আব্রাহামের পা দুটো তাঁর মনের অজান্তেই তাঁকে সেই দাসরক্ষিত প্রকোষ্ঠটির কাছে নিয়ে গেল। কী এক যাদুমন্ত্র ও সম্মোহনী শক্তির কাছে সে পরাভূত হয়ে চলে এল সেখানে তার মাথায় যেন আজ কিছুই খেলছে না। তত তার একটি মাত্র চিন্তা কিভাবে কি মুক্ত করা যায় না মেয়েটাকে? মোটা লৌহ নির্মিত শিকের বাইরে থেকেই ইশারা দিয়ে মেয়েটিকে কাছে ডাকল আব্রাহাম। জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী, তোমার বাড়িই বা কোথায়? তুমি দাস হলে কীভাবে? আব্রাহামের দু’চোখ জুড়ে শত সহস্র প্রশ্ন।
মেয়েটি জানাল, তার নাম এলিজাবেথ ডগলাস। এসেছে মেম্ফিস থেকে। তার মাও একজন দাস। আর সে ঘরে জন্ম নেওয়ায় সেও একজন দাস। আব্রাহাম জিজ্ঞাস্যু দৃষ্টিতে জানতে চায়, তাহলে কী ঐ বুড়ো ডগলাসই তোমার পিতা? অশ্রুসিক্ত নয়নে মেয়েটি বলল, হ্যাঁ। ঐ ইতর, জানোয়ার, পশুটিই আমার জন্মদাতা পিতা। আমি তার হাত থেকে বাঁচবার জন্যে বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিলাম বলেই আমাকে ঐ জানোয়ারটা বিক্রি করে দিচ্ছে।
আব্রাহাম কিছুতেই ভেবে পায় না একজন বাবা কী করে তার নিজের ঔরসজাত কন্যাকে নিলামে তুলতে পারে? দক্ষিন অঞ্চলীয় আমেরিকানরা সত্যিই বেশ বর্বর। তাদের দুজনের আলাপচারিতা চলল গভীর রাত অবধি। পরদিন সকালে আবার যথারীতি দাস দলটিকে নিলাম মঞ্চে তোলা হল। বিক্রি শুরু হল এলিজাবেথ ডগলাসকে দিয়ে। ইচ্ছে করেই দাস বিক্রেতা ধূর্ত ডগলাস ধুয়ে মুছে মেয়েটিকে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নিয়ে এসেছে তাছাড়া এলিজাবেথের পরিধেয়টিকেও আজ বেশ সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে। কামিজের মত একটি বস্তু পরানো হয়েছে তাকে। সেটি কোমরের একটু নিচে নেমেই শেষ হয়ে গেছে। উরুর বেশ খানিকটা অনাবৃত। বক্ষটি অর্ধ নগ্ন। বেশি দামে বিকোনোর জন্যেই মেয়েটিকে এই বসনে রাখা হয়েছে। দর্শক সারি থেকে কেউ কেউ মঞ্চে উঠে মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। যেমনটি করা হয় পশু হাটে পশু ক্রয় বিক্রয় করার সময়। কেউ হাত বুলোচ্ছে মেয়েটির উরুতে, কেউ আবার বক্ষে, কেউ কেউ আবার …। এ যেন এক নারকীয় দৃশ্য! কুরুচিপূর্ণ এসব দৃশ্য দেখে আব্রাহাম নিদারুন কষ্ট পেল। মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত কাঁটা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে তাঁর হৃদয়।
আব্রাহাম ভারাক্রান্ত কন্ঠে জন কে উদ্দেশ্য করে বলল, তোরা আমাকে বিক্রি করে ঐ মেয়েটিকে বাঁচা। জন বলল, দাদা সেটা তো সম্ভব নয়। এ দেশে সাদারা দাস হিসেবে বিকোয় না। আইন সেটার স্বীকৃতি দেয় না।
আব্রাহাম এবার রাগে ক্রোধে জনের কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে বলল, জন, আমি যদি জীবনে একবার, শুধুমাত্র একটি বার সুযোগ পাই তবে এই দাস প্রথা নির্মূল করে ছাড়ব আর এর জন্যে আমাকে যতই মূল্য দিতে হোক না কেন তুই দেখে নিস। তোরা দয়া করে আমাকে এবার এখান থেকে নিয়ে চল। এ দৃশ্য যে আমি আর কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। প্লিজ…প্লিজ… এবার আমাকে নিয়ে চল।
লেখক : গল্প, নিবন্ধ, প্রবন্ধকার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।